বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাম্যবাদী’ (১৯২৫) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর দার্শনিক ও মানবতাবাদী কবিতা হলো ‘ঈশ্বর’। এই কবিতায় কবি ঈশ্বরকে আকাশ-পাতাল বা মন্দির-মসজিদে খোঁজার পরিবর্তে নিজের অন্তরে এবং মানুষের মাঝেই খোঁজার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। স্রষ্টা যে সৃষ্টির মাঝেই বিরাজমান—এই অমোঘ সত্যটি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | ঈশ্বর |
| কবির নাম | কাজী নজরুল ইসলাম |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | সাম্যবাদী |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৫ (পৌষ ১৩৩২ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | মানবতাবাদী ও দার্শনিক লিরিক কবিতা (Humanist / Philosophical Lyric) |
কবি ও গ্রন্থ পরিচিতি:
১৯২৫ সালের ডিসেম্বরে (পৌষ ১৩৩২ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সৃষ্টি। এই গ্রন্থে কবি মানুষের অধিকার, সাম্য, শোষণহীন সমাজ এবং অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান গেয়েছেন। ‘ঈশ্বর’ কবিতায় নজরুল আধ্যাত্মিকতার এক নতুন সংজ্ঞা দিয়েছেন, যেখানে তিনি বলেছেন স্রষ্টাকে খুঁজতে বনে-জঙ্গলে বা পাহাড়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। মানুষের মাঝেই তাঁর প্রকাশ। শাস্ত্রের অন্ধ অনুকরণ না করে নিজের ভেতর ডুব দিলেই সত্যের সন্ধান মেলে—এই মানবতাবাদী দর্শনই সাম্যবাদী চেতনার মূল ভিত্তি।
ঈশ্বর কবিতা (সম্পূর্ণ)
কে তুমি ফিরিছ বনে-জঙ্গলে, কে তুমি পাহাড়-চূড়ে?
হায় ঋষি দরবেশ,
বুকের মানিকে বুকে ধ’রে তুমি খোঁজ তারে দেশ-দেশ।
সৃষ্টি রয়েছে তোমা পানে চেয়ে তুমি আছ চোখ বুঁজে,
স্রষ্টারে খোঁজো-আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে!
ইচ্ছা-অন্ধ! আঁখি খোলো, দেশ দর্পণে নিজ-কায়া,
দেখিবে, তোমারি সব অবয়বে প’ড়েছে তাঁহার ছায়া।
শিহরি’ উঠো না, শাস্ত্রবিদের ক’রো না ক’ বীর, ভয়-
তাহারা খোদার খোদ্ ‘ প্রাইভেট সেক্রেটারী’ ত নয়!
সকলের মাঝে প্রকাশ তাঁহার, সকলের মাঝে তিনি!
আমারে দেখিয়া আমার অদেখা জন্মদাতারে চিনি!
রত্ন লইয়া বেচা-কেনা করে বণিক সিন্ধু-কুলে-
রত্নাকরের খবর তা ব’লে পুছো না ওদের ভুলে’।
উহারা রত্ন-বেনে,
রত্ন চিনিয়া মনে করে ওরা রত্নাকরেও চেনে!
ডুবে নাই তা’রা অতল গভীর রত্ন-সিন্ধুতলে,
শাস্ত্র না ঘেঁটে ডুব দাও, সখা, সত্য-সিন্ধু-জলে।
Ishwar Kobita romanized version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- আত্মোপলব্ধি ও ঈশ্বরপ্রেম: ঈশ্বর বা স্রষ্টাকে বাইরের জগৎ, ধর্মগ্রন্থ বা তীর্থস্থানে না খুঁজে নিজের অন্তরে খোঁজার উদাত্ত আহ্বান।
- ধর্মের প্রকৃত স্বরূপ: ধর্মব্যবসায়ী ও শাস্ত্রবিদের অন্ধ অনুকরণ না করে নিজের ভেতর ডুব দিয়ে সত্য-সিন্ধুর সন্ধান করার মানবতাবাদী দর্শন—এই কবিতার মূল প্রাণ।
উৎস:
কবিতাটির প্রামাণ্য পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি কাজী নজরুল ইসলামের প্রামাণ্য রচনাবলী ও ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশনা (১৯২৫) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।























