শরতের শারদোৎসবে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ও চিরায়ত উৎসবের আবহে কাজী নজরুল ইসলামের এক অনাবিল, প্রাণবন্ত ও আনন্দমুখর সৃষ্টি “মা এসেছে মা এসেছে”। তাঁর বিখ্যাত গীতিগ্রন্থ ‘গানের মালা’-র (১৯৩৪) অন্তর্ভুক্ত এই আগমনি গানে গ্রামবাংলার চিরচেনা শারদীয় উৎসবের বাঁধভাঙা উল্লাস মূর্ত হয়ে উঠেছে। বাউল ও ভাটিয়ালির মিশ্র মেঠো সুরের দোলায় এবং দাদরা তালের চঞ্চল গতিতে রচিত এই গানটিতে প্রকৃতির রূপবদল, শিউলি-পদ্মের সুবাস, সানাই-ঢোলের নিনাদ এবং দৈনন্দিন জীবনের জটিলতা ভুলে মায়ের আগমনে পরম আনন্দে মেতে ওঠার এক উদাত্ত আহ্বান ধ্বনিত হয়েছে।
Table of Contents
Toggleগানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| শিরোনাম | মা এসেছে মা এসেছে (উঠল কলরোল) |
| পর্যায় | ভক্তিমূলক পর্যায় (আগমনি গান) |
| সংগীত সংকলন | গানের মালা (প্রথম প্রকাশ: ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ) |
| গীতিকার ও সুরকার | কাজী নজরুল ইসলাম |
| সংগীতধারা | নজরুল সঙ্গীত (লোকসুর-আশ্রিত আগমনি গীতি) |
| সুর ও রাগ | বাউল–ভাটিয়ালি মিশ্র সুর |
| তাল | দাদরা (ছয় মাত্রা: ৩+৩) |
| মূল উপজীব্য | দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন, শারদীয় উৎসবের বাঁধভাঙা উল্লাস, কর্মবিরতি ও মায়ের সান্নিধ্যে আত্মহারা আনন্দ |
| প্রধান চিত্রকল্প | সানাই-কাঁসর-ঢোল, ভরা নদীর কূল, শিউলি-শালুক-পদ্মফুল, নীল আকাশে টোল, আনন্দের বেহিসাবি খরচ |
| আবেগীয় আবহ | উৎসবমুখর আনন্দ, বাৎসল্য, পরম তৃপ্তি ও ক্ষণস্থায়ী মিলনের তীব্র আর্তি |
মা এসেছে মা এসেছে গানের কথা :
মা এসেছে মা এসেছে
উঠল কলরোল।
দিকে দিকে উঠল বেজে
সানাই কাঁসর ঢোল॥
ভরা নদীর কূলে কূলে,
শিউলি শালুক পদ্মফুলে,
মায়ের আসার আভাস দুলে,
আনন্দ-হিল্লোল।
সেই পুলকে পড়ল নিটোল
নীল আকাশে টোল॥
বিনা কাজের মাতন রে আজ কাজে দে ভাই ক্ষমা,
বে-হিসাবি করব খরচ সাধ যা আছে জমা।
এক বছরের অতৃপ্তি ভাই
এই কদিনে কীসে মিটাই,
কে জানে ভাই ফিরব কিনা
আবার মায়ের কোল।
আনন্দে আজ আনন্দকে
পাগল করে তোল॥
Ma Esheche Ma Esheche Gaaner Kotha:
Ma esheche ma esheche
Uthlo kolorol.
Dike dike uthlo beje
Sanai kansor dhol.
Bhara nodir kule kule,
Shiuli shaluk poddophule,
May-er ashar abhash dule,
Anondo-hillol.
Shei puloke porlo nithol
Nil akashe tol.
Bina kajer maton re aj kaje de bhai khoma,
Be-hishabi korbo khoroch shadh ja ache joma.
Ek bochhorer atripti bhai
Ei kodine kise mitai,
Ke jane bhai firbo kina
Abar mayer kol.
Anonde aj anondoke
Pagol kore tol.
গানের মূল ভাব
চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. বাদ্যের গর্জন ও নিসর্গের চঞ্চলতা
- “মা এসেছে মা এসেছে উঠল কলরোল / দিকে দিকে উঠল বেজে সানাই কাঁসর ঢোল…”গানটির সূচনাই হয় শারদোৎসবের তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্য দিয়ে। সানাইয়ের মিষ্টি সুর, কাঁসর ও ঢাক-ঢোলের মিলিত নিনাদ উৎসবের আবহকে চারদিকে ছড়িয়ে দেয়।
২. প্রকৃতির সাজ ও আকাশের স্নিগ্ধ হাসি
- “ভরা নদীর কূলে কূলে, শিউলি শালুক পদ্মফুলে / মায়ের আসার আভাস দুলে, আনন্দ-হিল্লোল / সেই পুলকে পড়ল নিটোল নীল আকাশে টোল…”শরতের বর্ণিল রূপের অনুপম রূপক। বর্ষার পর নদীর টইটম্বুর কূল এবং শিউলি, শালুক ও পদ্মফুলের প্রস্ফুটন জানান দেয় যে প্রকৃতি দেবীমাতার বরণের ডালি সাজিয়ে বসেছে। শরতের মেঘমুক্ত নীল আকাশকে কবি এক হাস্যোজ্জ্বল মুখমণ্ডলের সাথে তুলনা করেছেন, যেখানে আনন্দের আতিশয্যে যেন গালে মিষ্টি ‘টোল’ পড়েছে।
৩. বৈষয়িক কর্মবিরতি ও মুক্ত উল্লাস
- “বিনা কাজের মাতন রে আজ কাজে দে ভাই ক্ষমা / বে-হিসাবি করব খরচ সাধ যা আছে জমা…”পার্থিব হিসাবি জীবনের বিরুদ্ধে উৎসবের জয়গান। প্রতিদিনের ঘামঝরানো কাজের চিন্তা দূরে ঠেলে দিয়ে অন্তরে জমিয়ে রাখা সমস্ত অপূর্ণ সাধ ও ভালোবাসাকে অকুণ্ঠচিত্তে খরচ করে উৎসবের আনন্দে বিলীন হওয়ার আহ্বান।
৪. ক্ষণস্থায়ী সান্নিধ্য ও অনন্ত ব্যাকুলতা
- “এক বছরের অতৃপ্তি ভাই এই কদিনে কীসে মিটাই / কে জানে ভাই ফিরব কিনা আবার মায়ের কোল / আনন্দে আজ আনন্দকে পাগল করে তোল…”মিলনমুহূর্তের গভীরতম সত্য। মা মর্ত্যে থাকেন মাত্র কয়েকটা দিন। এক দীর্ঘ বছরের জমে থাকা তৃষ্ণা এত কম সময়ে মেটানো অসম্ভব, এবং আগামী বছর আবার তাঁর দর্শন পাওয়া যাবে কি না তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই এই অনিশ্চয়তাকে তুচ্ছ করে উপস্থিত আনন্দকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার জন্য আনন্দকেই পাগল করে তোলার ব্যাকুলতা প্রকাশিত হয়েছে।
বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন
সাহিত্যিক ও লোকজ বৈশিষ্ট্য
- অতুলনীয় রূপক ও চিত্রকল্প: নীল আকাশের হাসিকে ‘টোল’ পড়ার সাথে তুলনা করা বাংলা গীতিসাহিত্যের অন্যতম মৌলিক ও মনোহর চিত্রকল্প।
- সহজিয়া বাঙালিয়ানা: উমা বা দুর্গাকে কোনো দূরবর্তী দেবী না ভেবে ঘরের মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করার পারিবারিক স্নেহ ও বাৎসল্যবোধ গানটিকে অত্যন্ত অন্তরঙ্গ করেছে।
- ছন্দময় প্রবহমানতা: অনুপ্রাস ও চটুল অন্ত্যমিলের নিপুণ ব্যবহার গানটিতে ঢাকের কাঠির মতো এক অবিরাম নৃত্যময় গতি সৃষ্টি করেছে।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা
- বাউল ও ভাটিয়ালির অপূর্ব সংমিশ্রণ: নদীমাতৃক বাংলার ভাটিয়ালির উদাসী টান এবং বাউলের বাঁধভাঙা নাচের ছন্দের মেলবন্ধন গানটির সুরকে মেঠো মাটির সুবাস দিয়েছে।
- দাদরা তালের সমাহার: ছয় মাত্রার দাদরা তালের সাবলীল লয় উৎসবের আনন্দময় পদচারণাকে এক সাবলীল প্রবহমানতা দান করেছে।
- উৎসবপ্রধান গায়কী: সুরের বিস্তার এমনভাবে বিন্যস্ত যাতে একক কণ্ঠের পাশাপাশি সমবেত কণ্ঠেও এটি উৎসবের উদ্দীপনা ছড়িয়ে দিতে পারে।
শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি
- কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬): বাঙালির জাতীয় কবি ও বহুমুখী সংগীতস্রষ্টা। তিনি একাধারে শ্যামাসঙ্গীত, ভজন, ইসলামি গানের পাশাপাশি অজস্র কালজয়ী আগমনি ও বিজয়ার গান রচনা করেছেন। ধর্মীয় আচারকে ছাপিয়ে উৎসবের সামাজিক ও মানবিক রূপকে তিনি চিরকাল অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
- গানের মালা সংকলন (১৯৩৪): নজরুলের জীবদ্দশায় প্রকাশিত অন্যতম প্রধান সংগীতগ্রন্থ ‘গানের মালা’, যার বহু গান তৎকালীন গ্রামোফোন রেকর্ডের মাধ্যমে বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে শারদোৎসবের আনন্দবার্তা পৌঁছে দিয়েছিল।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
উৎস ও তথ্যসূত্র
- গানের মালা (প্রথম সংস্করণ, ১৯৩৪), কাজী নজরুল ইসলাম।
- নজরুল রচনাবলী (ভক্তিমূলক ও লোকসংগীত সংকলন), নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
- নজরুল সঙ্গীত পরিক্রমা ও লোকসুর সমীক্ষা, সুফি জুলফিকার হায়দার।























