বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম দুই যুগের দুই বরপুত্র। দুজনই আধুনিক বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক অখণ্ড বাঙালি চেতনার এক চিরভাস্বর অধ্যায়। একদিকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—য যিনি শান্ত, সুসমাহিত, উপনিষদিক প্রজ্ঞা ও বৈশ্বিক নন্দনভাবনায় সমৃদ্ধ এক মহাসমুদ্র; অন্যদিকে ‘বিদ্রোহী’ কবি কাজী নজরুল ইসলাম—যিনি যৌবনের তূর্যবাদক, কালবৈশাখীর তাণ্ডব, পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার উদাত্ত আহ্বান এবং পলিমাটির মানুষের রক্তমাংসের আর্তনাদের অগ্নিকাণ্ড।
বিগত সময়ের মতো সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের একশ্রেণীর কূপমণ্ডূক, মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য নজরুলকে কৃত্রিমভাবে নিজেদের ‘ইসলামী ধর্মীয় প্রতিনিধি’ বানানোর অসৎ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সাথে, বাঙালি সমাজকে দ্বিধা-বিভক্ত করতে তারা এক কাল্পনিক ইতিহাস উদ্ভাবন করেছে—যেখানে দাবি করা হয়, রবীন্দ্রনাথ নাকি নজরুলকে ‘চেপে রেখেছিলেন’ কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র’ করেছিলেন। অথচ বাস্তব সত্য হলো, নজরুল কখনো কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় গণ্ডির কবি ছিলেন না; মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল সবচেয়ে চাবুক সমতুল্য। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সম্পর্ক ছিল স্নেহময় পিতৃতুল্য মহীরুহ ও স্পর্ধিত নবীন কবির এক পরম আত্মিক, শ্রদ্ধাপূর্ণ ও ঐতিহাসিক অখণ্ড বন্ধন।
Table of Contents
Toggleপ্রথম সাক্ষাৎ ও ধূমকেতুর আবির্ভাব: আশীর্বাদ বনাম কৃত্রিম বিভাজনের গল্প
১৯২০ সালের মাঝামাঝি সময়। করাচি সেনানিবাস থেকে হাবিলদারের পোশাক খুলে নজরুল ইসলাম কলকাতায় ফিরেছেন। ততদিনে বাংলা সাহিত্যের আকাশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অসামান্য উচ্চতায় আসীন। নোবেল পুরস্কার জয়ের পর তাঁর আসন বিশ্বজুড়ে। কিন্তু কলকাতায় তরুণ নজরুলের কবিতা ও গানের ঝোড়ো প্রবেশ সাহিত্যপাড়ায় তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করল।
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রনাথের সাথে নজরুলের প্রথম সাক্ষাৎ ঘটেছিল ১৯২১ সালের দিকে। সে সময় গজেন চট্টোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় কিংবা পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো তরুণদের সাথে নজরুল জোড়াসাঁকোয় যেতেন। নজরুলের প্রাণোচ্ছল উপস্থিতি, বাঁধভাঙা হাসি এবং তাঁর গম্ভীর ও সুরালো কণ্ঠে গান গাওয়ার ক্ষমতা রবীন্দ্রনাথকে প্রথম দিনই মুগ্ধ করেছিল।
রবীন্দ্রনাথ তরুণদের ভালোবাসতেন, কিন্তু নজরুলের ভেতরের অপ্রতিরোধ্য প্রাণশক্তি ও স্বকীয় সুরকে তিনি প্রথম সাক্ষাতেই চিনে নিয়েছিলেন। নজরুল যখন স্বরচিত গান কিংবা কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতেন, রবীন্দ্রনাথ চোখ বন্ধ করে তা শুনতেন এবং হেসে বলতেন, “তোর গলায় যে সুরের আগুন আছে রে নজরুল, তা দিয়ে তুই দেশকে জাগাতে পারবি।”
১৯২২ সালে নজরুল যখন অর্ধসাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু’ প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি আশীর্বাণী চেয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে গিয়েছিলেন। কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যা-ই বলুক না কেন, ইতিহাস বলে—রবীন্দ্রনাথ কোনো হীনমন্যতায় ভোগেননি, বরং সানন্দে তরুণ কবির এই দুঃসাহসিক রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে স্বহস্তে যে অমর আশীর্বাণীটি লিখে দিয়েছিলেন, তা বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক অনন্য সম্পদ:
“কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু—আয় চলে আয় রে ধূমকেতু,আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,দুর্দিনের এই দুর্গশিরেউড়িয়ে দে তোর বিজয়-কেতন!অশুচিরে কর ছাই,ধর্মাধর্মের সূক্ষ্ম বিচারে কাজ নাই…”
এই আশীর্বাণী কেবল একটি পত্রিকার শুভকামনা ছিল না; এটি ছিল বাংলা সাহিত্যের পরম অভিভাবক কর্তৃক এক তরুণ রাজবিদ্রোহী কবিকে পরাধীন ভারতের অন্যায়, সামাজিক কুসংস্কার ও অশুচির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার প্রত্যক্ষ মানসিক সম্মতিপত্র।
অনশন, ‘বসন্ত’ এবং আলিপুর জেল: ইতিহাসের অমলিন দলিল
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সম্পর্কের সবচেয়ে নাটকীয়, আবেগঘন ও ঐতিহাসিক অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ১৯২৩ সালে। রাজদ্রোহের অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে নজরুল তখন হুগলি ও পরবর্তীতে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দী। কারাকর্তৃপক্ষের দুর্ব্যবহার এবং রাজনৈতিক বন্দীদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে নজরুল জেলে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। দেখতে দেখতে অনশন ৩৯ দিনে গিয়ে ঠেকে।
নজরুলের শরীর দ্রুত ভেঙে পড়ছিল। সারা দেশ তখন তরুণ কবির জীবন নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন। এই সংকটময় মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবস্থান করছিলেন শিলংয়ে। নজরুলের দীর্ঘ অনশনের খবর পেয়ে রবীন্দ্রনাথ গভীর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি কালবিলম্ব না করে আলিপুর জেলের ঠিকানায় নজরুলকে উদ্দেশ্য করে একটি ঐতিহাসিক টেলিগ্রাম পাঠান:
“Give up hunger strike, our literature claims you.”(অনশন ভঙ্গ করো, আমাদের সাহিত্য তোমাকে দাবি করে।)
ব্রিটিশ জেল কর্তৃপক্ষ চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়ে সেই টেলিগ্রামটি নজরুলের হাতে পৌঁছাতে দেয়নি এবং তা ফেরত পাঠায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ থেমে থাকেননি; একই সময়ে (১৯২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে) রবীন্দ্রনাথ তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিনাট্য ‘বসন্ত’ নজরুলকে উৎসর্গ করেন। রবীন্দ্র-জীবনের ইতিহাসে এটি ছিল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। কারণ, রবীন্দ্রনাথ সচরাচর তাঁর সমকক্ষ বা প্রবীণদেরই গ্রন্থ উৎসর্গ করতেন। এক জেলে বন্দী তরুণ রাজদ্রোহী মুসলিম কবিকে নিজের রচনা উৎসর্গ করার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ প্রকারান্তরে ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে এক পরোক্ষ সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
গ্রন্থের উৎসর্গপত্রে স্পষ্ট লেখা ছিল: “শ্রীমান কবি কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু”।
পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় যখন শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন তিনি জেলে বন্দী এক তরুণ কবিকে ‘বসন্ত’ উৎসর্গ করলেন, তখন রবীন্দ্রনাথ জবাব দিয়েছিলেন:
“নজরুলকে আমি ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছি এবং উৎসর্গপত্রে তাকে ‘কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু’ লিখেছি। এতে অনেকে হয়তো আশ্চর্য হয়েছে… কিন্তু আমি তাকে বসন্তের কবি বলেই মনে করি। তার কাব্যে বসন্তের যে যৌবনবেগ ও তাণ্ডব আছে, তা বাংলা সাহিত্যে নতুন। তাকে জেলে পুরে রাখা হয়েছে বলে তার তেজ কমে যাবে না, বরং তার তেজ দিয়েই সে কারাপ্রাচীর ভেঙে বের হবে।”
হুগলি জেলে বসে যখন নজরুল রবীন্দ্র-উৎসর্গের খবর পেলেন, তখন তাঁর আনন্দ ও আবেগের সীমা ছিল না। জেলের চার দেয়ালের ভেতরেই তিনি পরম শ্রদ্ধায় ও আনন্দে রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘সৃষ্টিসুখের উল্লাসে’। বিশ্বকবির এই স্বীকৃতি ছিল নজরুলের জীবনের অন্যতম প্রধান আত্মিক শক্তি।
নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা: মৌলবাদী অপপ্রচারের মুখে চাবুক
আজকের দিনের কিছু ধর্মভিত্তিক ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নজরুলকে তাঁদের সংকীর্ণ দলীয় ‘ইসলামী কবি’ হিসেবে ব্র্যাকেটিং করতে চায়। অথচ ইতিহাসের নির্দয় সত্য হলো—নজরুল বেঁচে থাকতে এই ধর্মান্ধ মৌলবাদীরাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি লাঞ্ছিত করেছিল। নজরুল যখন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের গান গেয়েছেন, যখন তিনি শ্যামাসঙ্গীত ও কীর্তন রচনার পাশাপাশি ইসলামী গজল লিখেছেন, তখন তৎকালিন মোল্লা সম্প্রদায় ও ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা নজরুলকে ‘কাফের’, ‘মুরতাদ’ এবং ‘ইসলামের শত্রু’ বলে ফতোয়া দিয়েছিল। ‘ইসলাম দর্শন’ বা ‘মোসলেম ভারত’-এর মতো রক্ষণশীল সাময়িকীতে নজরুলের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করা হয়েছিল।
নজরুলের জীবনদর্শন কখনোই ধর্মান্ধতার তোষামোদী করেনি। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী কবি। তাঁর স্পষ্ট ঘোষণা ছিল:
“মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,সব দেশে, সব কালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।”
“জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিযাত খেলছে জুয়া!ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাতের ছেলে নয়তো চুয়ার!”
নজরুল কেবল মুখে অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলেননি, নিজের জীবনেও তা প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি নিজের সন্তানদের নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণা মোহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী, কাজী অনিরুদ্ধ—যেখানে হিন্দু ও মুসলিম ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছিল। তিনি একাধারে কালীর বন্দনা করেছেন, আবার রাসুলুল্লাহর (সা.) প্রেমে গজল লিখেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্মের আসল সত্য নিহিত রয়েছে ভালোবাসায়, বিভাজনে নয়।
যে নজরুল ধর্মীয় ধর্মান্ধতাকে জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করতেন, যে নজরুল ধর্মান্ধ মোল্লাদের ‘পাপী’ ও ‘ধর্মের ব্যবসায়ী’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন, আজ সেই নজরুলকেই মৌলবাদী বানানোর অপচেষ্টা এক ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি এবং চরম দেউলিয়াত্ব ছাড়া কিছুই নয়।
‘রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে চেপে রেখেছিলেন’—একটি অসৎ ও সাম্প্রদায়িক বয়ানের ব্যবচ্ছেদ
সাম্প্রতিককালে একটি মনগড়া ও সাম্প্রদায়িক বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুলকে কবি হিসেবে স্বস্তি দেননি, তাঁকে চেপে রেখেছিলেন এবং তাঁর উত্থানে বাধা হয়েছিলেন।’ এটি কোনো তথ্যভিত্তিক বা ঐতিহাসিক গবেষণা নয়, বরং বাঙালির দুই শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক রূপকারকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সত্তাকে ভেঙে দেওয়ার এক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।
এই মিথ্যা বয়ানের বিপরীতে ঐতিহাসিক বাস্তবতাগুলো অত্যন্ত পরিষ্কার:
- আশীর্বাদ ও স্বীকৃতি: নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ থেকে শুরু করে তাঁর প্রতিটি সামাজিক ও সাহিত্যিক পদক্ষেপকে রবীন্দ্রনাথ পরম স্নেহে স্বাগত জানিয়েছেন। নজরুল যখনই কোনো সংকটে পড়েছেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন।
- সংগীতের স্বায়ত্তশাসন: চলচ্চিত্রে কিংবা মঞ্চে রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহারের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের অনুমতি পাওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন। অথচ রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলামকে তাঁর গানের সুর ও পরিবেশনায় পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। চলচ্চিত্রায়িত ‘গোরা’ উপন্যাসের সঙ্গীত পরিচালনার সময় নজরুলের কাজ দেখে রবীন্দ্রনাথ ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।
- নজরুলের ওপর হামলার প্রতিবাদ: ১৯২৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে নজরুল যখন চরম সাম্প্রদায়িক ও রক্ষণশীলদের আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন, তখনো কলকাতা থেকে রবীন্দ্রনাথ নজরুলের সৃজনশীল স্বাধীনতার পক্ষাবলম্বন করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ যদি নজরুলকে ‘চেপে রাখতে’ চাইতেন, তবে তিনি এক রাজবন্দী তরুণকে নিজের কালজয়ী গ্রন্থ উৎসর্গ করতেন না, কিংবা তাকে ‘বসন্তের কবি’ অভিধায় ভূষিত করতেন না। প্রকৃতপক্ষে, রবীন্দ্রনাথ জানতেন যে তাঁর সুসমাহিত, মার্জিত রূপকল্পের বাইরে গিয়ে নজরুলের ঝোড়ো ও বুনো ভাষা বাংলা সাহিত্যকে এক নতুন রক্ত সঞ্চার করেছে। আর নজরুল জানতেন, রবীন্দ্রনাথ হলেন সেই বটবৃক্ষ, যার ছায়াতলে দাঁড়িয়ে তিনি নিজে ছায়া পেয়েছেন।
সমালোচকদের চক্রান্ত, ‘আমার কৈফিয়ৎ’ ও নজরুলের আত্মপক্ষ সমর্থন
১৯২০ ও ৩০-এর দশকে কলকাতার সাহিত্য জগতে ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকা এবং সজনীকান্ত দাসের নেতৃত্বে একদল রক্ষণশীল সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যে বৈরিতা সৃষ্টির জন্য প্রভূত চেষ্টা চালিয়েছিল। তারা রবীন্দ্র-অভিজাতপন্থা বনাম নজরুলের ‘মুসলিম’ ও ‘বিদ্রোহী’ অভিধাকে কেন্দ্র করে কাদা ছোড়াছুড়ি করত।
তারা প্রচার করেছিল যে নজরুল নাকি রবীন্দ্রনাথের অস্তিত্বকে মানেন না এবং রবীন্দ্র-যুগ শেষ করে নিজের অনুসারী তৈরি করতে চান। কিন্তু প্রজ্ঞাবান নজরুল এই চক্রান্তের ফাঁদে পা দেননি। তিনি তাঁর বিশ্ববিখ্যাত কবিতা ‘আমার কৈফিয়ৎ’-এ সমালোচকদের এই হীন মানসিকতাকে নির্দয়ভাবে চূর্ণ করেছিলেন:
“গুরুজন বাণী-‘সব চুপচাপ! ও যে মহাবীর খোকা রে!গুরুকে না মেনে মারে সে চাঁটি!’—বলি, ওরে বাঘ-ধোকা রে!গুরুকে মানি রে, তাঁহার আদেশ মানিয়া কাব্য করি না,রবি-কর-দীপ্ত আকাশে উড়ি রে, সূর্যকে ছোট করি না!”
নজরুলের এই পংক্তিগুলো মৌলবাদী ও ষড়যন্ত্রকারীদের মুখে সবচেয়ে বড় চাবুক। নজরুল পরিষ্কার জানিয়েছেন, রবি (রবীন্দ্রনাথ) হলেন আসমানের সূর্য। সেই সূর্যালোকে উদ্ভাসিত আকাশেই নজরুল তাঁর কাব্য-ডানা মেলে উড়ছেন। সূর্যকে সম্মান জানানোর অর্থ এই নয় যে পাখি নিজের ডানা ঝাপটানো বন্ধ করে দেবে!
নজরুল বিভিন্ন সাহিত্যসভায় পরম শ্রদ্ধায় বলতেন:
“আমাদের মাথায় যে সূর্য কিরণ দেয়, তাঁহাকে প্রণাম না করিয়া উপায় নাই। রবীন্দ্রনাথ আমাদের সাহিত্যের আকাশে সেই দেদীপ্যমান সূর্য। তাঁহাকে অতিক্রম করার চিন্তা অবান্তর। তবে সূর্যের আলো গ্রহণ করিয়া প্রতিটি উদ্ভিদ যেমন নিজ নিজ ফুল ফুটায়, আমিও তেমনি রবীন্দ্র-আলো গ্রহণ করিয়া আমার নিজস্ব ফোটা ফুলটি ফুটাইবার চেষ্টা করিতেছি।”
রবীন্দ্র-প্রয়াণে নজরুলের শোক: ‘রবি-হারা’র অমলিন হাহাকার
১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট (২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ)। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রনাথের জীবনাবসান ঘটে। সে দিন বিশ্বজুড়ে বাঙালি শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই মৃত্যুর সংবাদ সবচেয়ে মারাত্মক আঘাত হয়ে এসেছিল কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে।
সংবাদটি পাওয়ার মুহূর্তে নজরুল ছিলেন কলকাতা বেতার কেন্দ্রে। রবীন্দ্র-প্রয়াণের খবর শোনামাত্র নজরুল শোকের তীব্রতায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। সেই তীব্র শোকের মুহূর্তেই, নিজের সমস্ত আত্মিক বেদনাকে এক ছন্দে রূপ দিয়ে তিনি মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রচনা করেন তাঁর অমর শোককাব্য ‘রবি-হারা’।
ঐদিনই বিকেলে কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে নজরুল নিজে অশ্রুসজল কণ্ঠে আবৃত্তি করেন:
“দুপুরের রবি ঢলে পড়েছে অস্তাচলে…স্তব্ধ আকাশ, স্তব্ধ মেদিনী, স্তম্ভিত বসুধা।আজ ভারতের ভাগ্যগগন হতে খসে পড়লতাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ জ্যোতিষ্ক…”
কাব্যটির প্রতিটি ছত্রে ফুটে উঠেছিল একজন শিষ্যের পিতৃহারা হওয়ার আকুলতা:
“যুগ-অবসান হলো রে আজিকি!রবি নেভে নাই, রবি ডুবে নাই,রবি গেছে শুধু নামি অস্তাচলে—আমাদেরি অশ্রু-সাগরের অতল জলে।হে কবি! হে পরম বন্ধু আমাদের,তুমি চলে গেলে, কিন্তু তোমার অমর বাণীআমাদের বুকে অনন্তকাল বাজবে…”
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর নজরুল রচনার মাধ্যমে তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান এবং এর ঠিক এক বছরের মাথায়, ১৯৪২ সালে, নজরুল নিজেও এক অজানা স্নায়বিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে নীরব হয়ে যান। ইতিহাসবিদদের মতে, রবীন্দ্রনাথের চিরবিদায় নজরুলের মানসলোকে যে গভীর শূন্যতা তৈরি করেছিল, তা তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এক গভীর ট্র্যাজিক প্রভাব ফেলেছিল।
অখণ্ড বাঙালি চেতনার দুই ধ্রুবতারা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামকে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা কেবল ঐতিহাসিক সত্যের অপলাপ নয়, বরং বাঙালি সংস্কৃতির মূল শিকড়টিকে কেটে ফেলার এক গভীর চক্রান্ত।
রবীন্দ্রনাথ যদি হন বাংলা ভাষার গভীর প্রজ্ঞা, আধ্যাত্মিক সুউচ্চ শিখর ও নান্দনিক আভিজাত্য; তবে নজরুল হলেন সেই ভাষারই পলিমাটির প্রাণশক্তি, প্রতিবাদ, অধিকার আদায়ের হুংকার এবং সমতার পতাকা। রবীন্দ্রনাথ না থাকলে বাংলা সাহিত্য বিশ্বমঞ্চে মর্যাদা পেত না, আর নজরুল না থাকলে বাংলা সাহিত্য সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ঘাম ও রক্তের স্বর পেত না।
আজকের বাংলাদেশের যেসব মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী নজরুলকে তাদের ধর্মীয় সংকীর্ণতার ছাঁচে ঢালতে চায় কিংবা রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে বাঙালিকে বিভক্ত করতে চায়, নজরুলের নিজের জীবন ও সাহিত্যই তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য। নজরুল কোনো ধর্মান্ধ বা সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সম্পত্তি নন; তিনি অসাম্প্রদায়িক, মুক্তিকামী ও অখণ্ড বাঙালি চেতনার চিরন্তন প্রতীক। আর রবীন্দ্রনাথের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল নক্ষত্রের সাথে আসমানের, গুরুর সাথে শিষ্যের এবং এক অবিনাশী ভালোবাসার অখণ্ড বন্ধন।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর একজন প্রবিশিষ্ট তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, শিক্ষা ও আইসিটি উদ্যোক্তা, লেখক, সমাজসেবক এবং অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনার অনুরাগী। জাতীয় পর্যায়ে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা প্রসারে অবদানের পাশাপাশি তিনি আবহমান বাঙালি সংস্কৃতি ও কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদী ভাবধারাকে দেশ ও দেশের বাইরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াসে এই উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রকাশক হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন।
পেশাগত জীবনে তিনি একটি শীর্ষস্থানীয় টেলিকম প্রতিষ্ঠানের প্রধান তথ্যপ্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিআইও) হিসেবে দীর্ঘ সময় কৃতিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষাকে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘গুরুকুল নেটওয়ার্ক’। এর অধীনে ‘গুরুকুল অনলাইন লার্নিং নেটওয়ার্ক’, ‘গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক’, ‘গুরুকুল আইটি এনাবলড সার্ভিসেস’ ও ‘গুরুকুল কমার্শিয়াল’-এর মতো বহুমুখী কারিগরি ও প্রশিক্ষণমূলক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষানীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অবদানের অংশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিচালনা পরিষদের সদস্য এবং সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে তিনি ‘বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড’ (বাপেক্স)-এর পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক ছিলেন।
গণমাধ্যম ও চিন্তা-সাহিত্যের অঙ্গনেও তাঁর পদচারণা সুদীর্ঘ। তিনি ‘দৈনিক আজকের আলো’ পত্রিকার সাবেক সম্পাদক এবং জাতীয় অনলাইন পোর্টাল ‘জিলাইভ’ ও ‘দৈনিক খবরওয়ালা’ পত্রিকার সাবেক সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে সংবাদমাধ্যমের পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন। প্রযুক্তিভিত্তিক দেশ গঠন এবং বাঙালি জাতির অসাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিক পরিচয়কে একসূত্রে গেঁথে তিনি একাধিক গ্রন্থ ও নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ও ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ ভাবনাকেন্দ্রিক তাঁর রচিত গ্রন্থাবলী ও নিবন্ধগুলো নীতি-নির্ধারণী মহলে সমাদৃত। একই সাথে, বাঙালি সংস্কৃতির শেকড় ও ঐতিহ্যকে তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে তাঁর রচিত ‘আমার সংস্কৃতি’ গবেষণা সিরিজ সাহিত্যপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে; যারই প্রত্যক্ষ ফসল হিসেবে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, দর্শন ও সৃষ্টিকে সংরক্ষণের জন্য এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আত্মপ্রকাশ।
সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘সুফি ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে স্বাবলম্বী করা, যুবসমাজকে প্রযুক্তিদক্ষ করে গড়ে তোলা এবং ক্যারিয়ার গাইডলাইন প্রদানে ধারাবাহিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। একই সাথে তিনি নিজ জন্মভূমি কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) অঞ্চলের শিক্ষা, প্রযুক্তি, তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি ও রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় সক্রিয় অবদান রেখে চলেছেন। আধুনিক প্রযুক্তি, উচ্চমানসম্পন্ন শিক্ষা ও জাতীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনে একটি স্বাবলম্বী ও প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তোলাই তাঁর মূল লক্ষ্য।





















![উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন [ যুগবাণী, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন [ যুগবাণী, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম](/wp-content/uploads/2024/08/উপেক্ষিত-শক্তির-উদ্বোধন-1-1024x655.jpg)

