বাংলা আধুনিক ও রোমান্টিক গানের ধারায় ‘এক্সোটিক’ (Exotic) সৌন্দর্য ও কল্পনার এক অনন্য শিখর “দূর দ্বীপবাসিনী চিনি তোমারে চিনি”। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী গীতিগ্রন্থ ‘গানের মালা’-র (১৯৩৪) অন্তর্ভুক্ত এই গানটিতে সুদূর প্রশান্ত মহাসাগরের কোনো এক নির্জন দ্বীপের অনিন্দ্যসুন্দরী নারীর মোহময় রূপকে সুরে ও বাণীতে মূর্ত করা হয়েছে। ট্রপিক্যাল মশলাদ্বীপের সুবাস, পাহাড়ি বাঁশির মেঠো তান এবং সাগরের উত্তাল ঝড়ের সাথে এক বিদেশিনী রমণীর রহস্যময় হাসিকে কবি একাকার করে দিয়েছেন। দ্রুত কাহারবা তালের চটুল দোলায় এবং আবহমান পলিনেশিয়ান বা হাওয়াইয়ান দ্বীপীয় সুরের অনুপ্রেরণায় রচিত এই গানটি বাংলা গীতিসাহিত্যে রোমান্টিক দূরদর্শিতার এক চিরসবুজ ক্লাসিক।
Table of Contents
Toggleগানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| শিরোনাম | দূর দ্বীপবাসিনী চিনি তোমারে চিনি |
| পর্যায় | প্রণয়গীতি পর্যায় (বিদেশীসুরাশ্রিত / রোমান্টিক প্রকৃতি-প্রেম) |
| সংগীত সংকলন | গানের মালা (প্রথম প্রকাশ: ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ) |
| গীতিকার ও সুরকার | কাজী নজরুল ইসলাম |
| সংগীতধারা | নজরুল সঙ্গীত (বিদেশী সুরাশ্রিত আধুনিক কাব্যগীতি) |
| সুর ও রূপ | প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপের সুরের অনুপ্রেরণা (হাওয়াইয়ান/লাতিন ও লোকজ পিলু-খাম্বাজ মিশ্রণ) |
| তাল | কাহারবা (আট মাত্রা: ৪+৪, দ্রুত ও নৃত্যময় লয়) |
| মূল উপজীব্য | সুদূর দ্বীপের রহস্যময়ী রূপসী, ট্রপিক্যাল প্রকৃতির রূপলাবণ্য, রোমান্টিক কল্পনা ও অচিন প্রিয়ার অন্বেষণ |
| প্রধান চিত্রকল্প | দূর দ্বীপ, দারুচিনির দেশ, সুমন্দ ভাষিণী, প্রশান্ত সাগর, তুফান ও ঝড়, পাহাড়ি বাঁশি, এলাচ ফুল, কবরী |
| আবেগীয় আবহ | মুগ্ধতা, রোমাঞ্চ, উচ্ছ্বাস, স্বপ্নাতুরতা ও রূপের মাধুর্য |
দুর দ্বীপ বাসিনী চিনি তোমারে চিনি গানের কথা :
দূর দ্বীপবাসিনী,
দূর দ্বীপবাসিনী, চিনি তোমারে চিনি
দারুচিনিরও দেশে, তুমি বিদেশিনী গো
সুমন্দ ভাষিনী দূর দ্বীপবাসিনী
প্রশান্ত সাগরে, তুফানে ও ঝড়ে
প্রশান্ত সাগরে তুফানে ও ঝড়ে
শুনেছি তোমারি অশান্ত রাগিনী
শুনেছি তোমারি অশান্ত রাগিনী
দূর দ্বীপবাসিনী,
চিনি তোমারে চিনি
দারুচিনিরও দেশে, তুমি বিদেশিনী গো
সুমন্দ ভাষিনী, দূর দ্বীপবাসিনী।
বাজাও কি বন সুর পাহাড়ি বাঁশিতে
বনান্ত ছেয়ে যায় বাসন্তী হাঁসিতে
বাজাও কি বন সুর পাহাড়ি বাঁশিতে
বনান্ত ছেয়ে যায় বাসন্তী হাঁসিতে
তব কবরী মূলে, নব এলাচেরও ফুল
দোলে কুসুম বিলাসিনী।
দূর দ্বীপবাসিনী, চিনি তোমারে চিনি
দারুচিনিরও দেশে, তুমি বিদেশিনী গো
সুমন্দ ভাষিনী, দূর দ্বীপবাসিনী ..
Dur dipo bashini chini tomare chini lyrics :
Dur Dipo Basini
Dur Dipo Basini Chini Tomare Chini
Daruchiniro dese tumi bideshini go
Sumanta bhasini, Dur Dipa Basini
Prasanto sagorey Tufane o jhore
Sunechi tomari ashanto ragini
Prasanto sagorey Tufane o jhore
Sunechi tomari ashanto ragini
Dur Dipo Basini
Dur Dipo Basini Chini Tomare Chini
Daruchiniro dese tumi bideshini go
Sumanta bhasini, Dur Dipa Basini
Bajao ki bonosur pahari banshite
Bonanto cheye jay basonti haasite
Bajao ki bonosur pahari banshite
Bonanto cheye jay basonti haasite
Tobo kobori mule Nobo elachero ful
Doley kushum bilashini.
Dur Dipo Basini Chini Tomare Chini
Daruchiniro dese tumi bideshini go
Sumanta bhasini, Dur Dipa Basini
গানের মূল ভাব
চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. দারুচিনির দেশ ও বিদেশিনীর চিরচেনা রূপ
- “দূর দ্বীপবাসিনী, চিনি তোমারে চিনি / দারুচিনিরও দেশে, তুমি বিদেশিনী গো সুমন্দ ভাষিনী…”গানটির সূচনাই হয় এক অদ্ভুত রোমান্টিক বিস্ময় দিয়ে। হাজার মাইলের ব্যবধানে থাকা সত্ত্বেও কবির অন্তর সেই বিদেশিনীকে নিজের চেনা বলে দাবি করে। ‘দারুচিনির দেশ’ এবং মিষ্টি-মৃদু কথার ‘সুমন্দ ভাষিণী’ সম্বোধনে ভৌগোলিক দূরত্ব মুহূর্তেই আত্মিক ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়।
২. প্রশান্ত মহাসাগর ও অশান্ত রাগিনী
- “প্রশান্ত সাগরে, তুফানে ও ঝড়ে… শুনেছি তোমারি অশান্ত রাগিনী…”মহাজাগতিক প্রকৃতির বৈপরীত্য। একদিকে শান্ত ও নীলাভ প্রশান্ত মহাসাগর, অন্যদিকে তার বুকে জেগে ওঠা প্রচণ্ড ঝড় ও তুফান। এই প্রাকৃতিক তাণ্ডবের মাঝেই কবি বিদেশিনীর অবাধ্য, বুনো ও স্বাধীন মনের অশান্ত সংগীত শুনতে পান।
৩. পাহাড়ি বাঁশি ও বাসন্তী হাসির বনভূমি
- “বাজাও কি বন সুর পাহাড়ি বাঁশিতে / বনান্ত ছেয়ে যায় বাসন্তী হাঁসিতে…”শ্রবণ ও দৃশ্যের অপূর্ব সংমিশ্রণ। পাহাড়ের বাঁশের তৈরি আদিম বাঁশি থেকে যখন সুর ঝরে পড়ে, তখন অরণ্যের শেষ সীমানা পর্যন্ত সেই সুরের ছোঁয়ায় প্রস্ফুটিত হয় বসন্তের পুষ্পিত হাসি। প্রকৃতির সাথে নারীর আনন্দ এখানে একাকার।
৪. এলাচের ফুল ও কবরীর কুসুম-বিলাস
- “তব কবরী মূলে, নব এলাচেরও ফুল দোলে কুসুম বিলাসিনী…”নজরুলের অনন্য ট্রপিক্যাল চিত্রকল্প। সাধারণ বকুল বা চামেলির বদলে চুলের খোঁপায় (কবরী মূলে) শোভা পাচ্ছে সদ্যফোটা সুবাসিত এলাচের ফুল। এই বুনো অলংকরণ বিদেশিনী নারীকে কৃত্রিম নাগরিক সমাজের বাইরে এক পরম স্বাধীন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তিতে রূপ দিয়েছে।
বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন
সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
- ঐতিহাসিক অগ্রগামিতা ও ট্রপিক্যাল রূপক: পরবর্তীকালে জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতায় যে “দারুচিনি দ্বীপের ভিতর যেমন সবুজ ঘাস” উপমাটি বিখ্যাত হয়েছিল, তার বহু আগেই নজরুল বাংলা সাহিত্যে দারুচিনি ও এলাচের গন্ধমাখা দ্বীপীয় রোমান্টিক রূপকল্পের সার্থক রূপায়ণ ঘটিয়েছিলেন।
- ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সুবাস ও বর্ণচ্ছটা: এলাচ ও দারুচিনির সুবাস (ঘ্রাণ), প্রশান্ত সাগরের রূপ ও কবরী মূলের ফুল (দৃষ্টি), এবং পাহাড়ি বাঁশির সুর (শ্রবণ)—সব মিলিয়ে গানটি এক পরিপূর্ণ ইন্দ্রিয়ঘন পরিবেশ তৈরি করে।
- ধ্বনিময় প্রবাহ ও ললিত পদাবলি: ‘বাসিনী-চিনি-বিদেশিনী-ভাষিনী-রাগিনী-বিলাসিনী’—দীর্ঘ ‘ঈ’ কারান্ত অন্ত্যমিলগুলোর মসৃণ বিন্যাস গানটিকে অসম্ভব গীতিময় ও শ্রুতিমধুর করেছে।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা
- বিদেশী সুরের দেশীয় রূপান্তর: নজরুল ছিলেন বাংলা গানে বিশ্বসুর সংযোজনের পুরোধা। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের (হাওয়াইয়ান বা ক্যারিবীয় অঞ্চলের ট্রপিক্যাল সুর) আবহকে তিনি ভারতীয় রাগসংগীতের সহজ ও ললিত কাঠামোর সাথে মিলিয়ে এই অমর সুর সৃষ্টি করেছিলেন।
- কাহারবা তালের প্রবহমান নাচ: আট মাত্রার দ্রুত কাহারবা তালের ছন্দ সাগরের তরঙ্গের মতো অবিরাম দুলতে থাকে, যা গানটির পদাবলিতে এক স্বাভাবিক নৃত্যময়তা দান করে।
- লাতিন ও ফোক ব্যঞ্জনা: কণ্ঠের স্বরক্ষেপণে এক ধরনের অবাধ ও চপল গতি বজায় থাকে, যা সমকালীন ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের ভারী চাল থেকে গানটিকে এক মুক্ত ও আধুনিক মেজাজ এনে দেয়।
শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি
- কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬): বাঙালির জাতীয় কবি ও অবিসংবাদিত সংগীতস্রষ্টা। বাংলা গানে বৈচিত্র্যের দিক থেকে নজরুলের সমকক্ষ কেউ নেই। তিনি যেমন একদিকে ভজন, শ্যামাসঙ্গীত ও ইসলামি গান লিখেছেন, তেমনি কিউবান, স্প্যানিশ ও হাওয়াইয়ান সুরের অনুপ্রেরণায় বাংলা আধুনিক গানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।
- ঐতিহাসিক পরিবেশনা: লোকসংগীত সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদ, আধুনিক গানের কিংবদন্তি আশা ভোঁসলে, ফিরোজা বেগম এবং পরবর্তীকালে হৈমন্তী শুক্লা ও চিত্রা সিংয়ের মতো বহু খ্যাতনামা শিল্পীর কণ্ঠে গানটি গীত হয়ে সমগ্র ভারতবর্ষে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
উৎস ও তথ্যসূত্র
- গানের মালা (প্রথম সংস্করণ, ১৯৩৪), কাজী নজরুল ইসলাম।
- নজরুল রচনাবলী (বিদেশীসুরাশ্রিত ও আধুনিক গান সংকলন), নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
- নজরুল সঙ্গীতের সুর পরিক্রমা ও উৎস সন্ধান, সুফি জুলফিকার হায়দার।






















