Editor's Choice

কাজী নজরুল ইসলামের ‘চোখের চাতক’: বাংলা সুরকাব্যে বিরহ, গজল ও অকৃত্রিম ব্যাকুলতার দলিল

বাংলা গানের ইতিহাসে বিশ শতকের বিশের দশকটি ছিল এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সময়। বিশেষ করে ১৯২৬ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম নিজেকে যেভাবে গান ও সুরের জগতে সমর্পণ করেছিলেন, তা বাংলা কাব্যসংগীতের ব্যাকরণকে চিরতরে বদলে দেয়। এই সময়কালেই এইচএমভি (HMV) ও অন্যান্য গ্রামোফোন কোম্পানির সাথে তাঁর নিবিড় সান্নিধ্য গড়ে ওঠে, আর বাংলা গান লাভ করে নতুন ছন্দ, মেজাজ ও সুরের রঙ রূপ। ১৯২৮ সালে প্রকাশিত ‘বুলবুল’ (প্রথম খণ্ড) গ্রন্থে তিনি বাংলা গজলকে যে জনপ্রিয়তার চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছিলেন, তারই সরাসরি সুরময় বিস্তার ঘটেছিল ১৯২৯ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গানগ্রন্থ ‘চোখের চাতক’-এ।

প্রকাশকাল, উৎসর্গ ও গ্রন্থপরিচয়

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ২১ ডিসেম্বর (বাংলা ৭ অগ্রহায়ণ ১৩৩৬) কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ডি. এম. লাইব্রেরি থেকে ‘চোখের চাতক’ প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। প্রকাশের সময় বইটির মূল্য রাখা হয়েছিল মাত্র এক টাকা (এবং রাজ সংস্করণ পাঁচ সিকা)।

গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছিলেন তৎকালীন উদীয়মান সংগীতশিল্পী “কল্যাণীয়া বীণা-কণ্ঠী প্রতিভা সোম”-কে। এই প্রতিভা সোমই পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক প্রতিভা বসু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। নজরুলের জহুরি চোখ সেদিনই প্রতিভা সোমের কণ্ঠের মিষ্টতা ও সংগীতিক সম্ভাবনা চিনতে ভুল করেনি।

মোট ৫৩টি গানের এই সংকলনটিতে নজরুল কেবল ভাবুক কবি নন, বরং একজন পূর্ণাঙ্গ সুরকার, গীতিকার এবং সুর-গবেষক হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেছেন।

‘চোখের চাতক’: নামের আড়ালে তৃষ্ণার্ত রূপক

ভারতীয় পৌরাণিক লোকপ্রবাদে চাতক পাখি এক অনন্য প্রতীক। চাতক নাকি জলাশয় বা নদীর জল স্পর্শ করে না, সে আকাশমুখী হয়ে মেঘের একবিন্দু বৃষ্টির জলের জন্য চাতকপ্রতীক্ষায় প্রহর গুনতে থাকে।

নজরুল এই সংকলনের শিরোনামে ‘চোখ’ এবং ‘চাতক’কে মেলালেন এক গভীর কাব্যিক ভাবনায়। ‘চোখের চাতক’ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন রূপ আর সুরপানের অসীম তৃষ্ণায় কাতর আকুল হৃদয়কে। মানবমনের অধরা সৌন্দর্যের প্রতি যে তৃষ্ণা, প্রিয়জনকে না পাওয়ার যে বিরহ—তা নদীর জলে মেটে না, তার দরকার অধরা রূপসুধা। ‘চোখের চাতক’ সংকলনের গানগুলোতেও তাই ধ্বনিত হয়েছে অধরা প্রিয়তমকে না-পাওয়ার হাহাকার, বৃষ্টির শব্দে একা জেগে থাকার বেদনা আর সুরের ভেলায় ভেসে অজানার পানে পাড়ি জমানোর তীব্র বাসনা।

শাস্ত্রীয় সুর ও লৌকিক সুরের যুগলবন্দি

‘চোখের চাতক’ সংকলনের গানগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, নজরুল এখানে কত গভীরভাবে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত এবং লোকসুরকে একসূত্রে বেঁধেছিলেন। রাগের কঠোর কাঠামোর ভেতরে তিনি এমনভাবে ভাব ও শব্দের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন যা শাস্ত্রীয় সংগীতের জটিলতাকে সরিয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে আবেগের ঝড় তুলত।

এই গ্রন্থের প্রধান কয়েকটি গান এবং সেগুলোর সুরবৈচিত্র্য লক্ষ্য করলে তাঁর সংগীতপ্রতিভার প্রসার স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

১. গজল ও বিরহাশ্রয়ী গান

বাংলায় গজলকে স্থায়ী আসন দেওয়ার পেছনে এই সংকলনের গানগুলোর ভূমিকা অপরিসীম।
  • “মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর” — ভৈরবী রাগে রচিত এবং দাদরা তালে নিবদ্ধ এই গানটি বাংলা সংগীতে ভালোবাসার আবেশ ও ব্যাকুলতার এক চিরন্তন সৃষ্টি।
  • “কেউ ভোলে না কেউ ভোলে” — এই গানটির মধ্যে প্রেম ও অপ্রাপ্তির যে সর্বজনীন সত্য ফুটে উঠেছে, তা সহজেই শ্রোতার হৃদয় স্পর্শ করে।
  • “আজি এ শ্রাবণ-নিশি কাটে কেমনে” — মিঞাঁ কি মল্লার রাগে কাওয়ালি তালে রচিত এই গানটিতে বর্ষার রাত এবং প্রিয়হীনা মনের অস্থিরতার সুর নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

২. ভাটিয়ালি ও লোকায়ত ব্যাকুলতা

নজরুল কেবল দরবারি রাগে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। বাংলার পল্লিমাটির সুর, নদী ও সাম্পানের বিরহকেও তিনি ‘চোখের চাতক’-এ পরম মমতায় স্থান দিয়েছেন।

  • “আমার গহিন জলের নদী” — ভাটিয়ালি সুরের এই গানটিতে নদীর কূল ভাঙা আর মানুষের মন ভাঙার সমান্তরাল ট্র্যাজেডি ফুটে উঠেছে:
    “তুমি ভাঙো যখন কূল রে নদী ভাঙো একই ধার,
    আর মন যখন ভাঙো রে নদী দুই কূল ভাঙো তার।”
  • “আমার সাম্পান যাত্রী না লয়” — ভাঙা তরি আর নিঃসঙ্গ জীবনের এক রূপক আখ্যান এটি। জীবননদী থেকে নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসার বেদনাই এই ভাটিয়ালি গানটির মূল সুর।

৩. কীর্তন ও ভক্তিসুর

সংকলনটিতে রাগ ও গজলের পাশাপাশি বৈষ্ণব ভাবাশ্রয়ী কীর্তনের পরশও পাওয়া যায়। “আমি কী সুখে লো গৃহে রব, আমার শ্যাম হলো যদি যোগী” গানটিতে রাধাভাবের যে আকুলতা ও আত্মসমর্পণ ফুটে উঠেছে, তা নজরুলকে বাংলা কীর্তন সুরের এক অনন্য রূপকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

ভাষা ও কাব্যশৈলীর নিজস্বতা

‘চোখের চাতক’ গ্রন্থের গানগুলোতে নজরুলের ভাষাবিন্যাস ও শব্দচয়ন নজরকাড়া। একদিকে যেমন সংস্কৃত তৎসম শব্দের সুনিপুণ গম্ভীরতা, অন্যদিকে ফার্সি ও আঞ্চলিক বাংলা শব্দের সাবলীল মিশ্রণ।
নজরুল যখন লেখেন—
“আজি বাদল ঝরে মোর একেলা ঘরে
হায় কী মনে পড়ে মন এমন করে॥”
তখন সাধারণ কয়েকটি শব্দের বিন্যাসেই এক নিবিড় মেঘলা দুপুরের হাহাকার সজীব হয়ে ওঠে। তাঁর গানে অলংকার বা ছন্দ সাজানোর কৃত্রিম চেষ্টা নেই; সুরের টানেই যেন বাণী তার নিজস্ব রূপ খুঁজে নিয়েছে।

বাংলা সংগীতে ‘চোখের চাতক’-এর স্থায়ী দাগ

প্রকাশের পরপরই ‘চোখের চাতক’-এর গানগুলো গ্রামোফোন রেকর্ড মারফত ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। তৎকালীন জনপ্রিয় ও প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, কে মল্লিক এবং নলিনীকান্ত সরকারের কণ্ঠে এই সংকলনের গানগুলো অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করে।

‘চোখের চাতক’ কেবল ১৯২৯ সালের একটি গানের সংকলন নয়, এটি বাংলা কাব্যসংগীতের মোড় পরিবর্তনের এক ঐতিহাসিক দলিল। রবীন্দ্রনাথের আধুনিক গানের সুরধারার পাশে কাজী নজরুল ইসলাম যে ভিন্ন এক আবেগ, রাগসংগীতের উদার ব্যবহার এবং মধ্যপ্রাচ্যের গজলের সুবাস এনে যুক্ত করেছিলেন—তা বোঝার জন্য ‘চোখের চাতক’ পাঠ করা এবং এর গানগুলো অনুধাবন করা অপরিহার্য।

Tags :

কাজী নজরুল ইসলাম

<div id="model-response-message-contentr_6711829050503afa" class="markdown markdown-main-panel md-content enable-luminous-fast-follows enable-updated-hr-color tutor-markdown-rendering" dir="ltr" aria-live="polite"> <div>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।</div> </div>

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

    Join Us!

    Hey there! Here’s a neat way to recieve our latest posts & updates – just subscribe to our newsletter.

    Error: Contact form not found.

    Zero spam, Unsubscribe at any time.