Editor's Choice

আসে রজনী সন্ধ্যামণির প্রদীপ জ্বলে, গুল বাগিচা | নজরুল সঙ্গীত

গোধূলির ধূসর আলো পেরিয়ে ধীর পদক্ষেপে সন্ধ্যার নিস্তব্ধ অবগাহন এবং বিরহকাতর মানবহৃদয়ের শান্ত সমর্পণের এক অনুপম দৃশ্যকাব্য “আসে রজনী সন্ধ্যামণির প্রদীপ জ্বলে”। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিশিষ্ট গীতিগ্রন্থ ‘গুল বাগিচা’-র (১৯৩৩) অন্তর্ভুক্ত এই গানটিতে সন্ধ্যার মায়াময় আগমনকে এক স্বর্গীয় উপাসনা ও রূপক সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত করা হয়েছে। হালকা শাস্ত্রীয় রাগ ‘পিলু’-র স্নিগ্ধ-করুণ মেজাজ ও কাহারবা তালের মসৃণ লয়ে কবি এখানে সন্ধ্যামণি ফুলের প্রস্ফুটনকে সন্ধ্যার গৃহকোণে প্রদীপ প্রজ্বলন এবং অস্তগামী আকাশের রূপকে এক নিরালা আরতির সাথে তুলনা করেছেন—যেখানে চরাচরের ক্লান্তির সাথে সাথে বিরহীর নয়নজলও ধীরে ধীরে এক পরম শান্তিতে স্তব্ধ হয়ে আসে।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
শিরোনামআসে রজনী সন্ধ্যামণির প্রদীপ জ্বলে
পর্যায়প্রকৃতি পর্যায় (সন্ধ্যা ও সাঁঝের গান / রোমান্টিক প্রকৃতিগীতি)
সংগীত সংকলনগুল বাগিচা (প্রথম সংস্করণ: ২৭ জুন ১৯৩৩ / ১৩৪০ বঙ্গাব্দ)
প্রকাশকগ্রেট ইস্টার্ন লাইব্রেরি (মূল্য: এক টাকা)
রেকর্ডিং সংস্থাস্বদেশী মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানী
উৎসর্গজিতেন্দ্রনাথ ঘোষ (স্বদেশী মেগাফোন-রেকর্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী)
গীতিকার ও সুরকারকাজী নজরুল ইসলাম
সংগীতধারানজরুল সঙ্গীত (রাগাশ্রয়ী প্রকৃতি-বিরহের গান)
রাগপিলু
তালকাহারবা (আট মাত্রা: ৪+৪)
মূল উপজীব্যসন্ধ্যার পদধ্বনি, সন্ধ্যামণির রূপক প্রদীপ, গোধূলির রূপ, মহাজাগতিক আরতি ও বিরহীর শান্ত সমর্পণ
প্রধান চিত্রকল্পসন্ধ্যামণির প্রদীপ, ছায়া-আঁচল, গোধূলি-ধূসর বাতাস, চাঁদের থালায় আরতি, সন্ধ্যা-তারা, বিরহীর নয়নজল
আবেগীয় আবহশান্ত সমাহিত ভাব, মাধুর্য, স্নিগ্ধ বিষাদ ও প্রকৃতির নিঃশব্দ সান্ত্বনা

 

আসে রজনী সন্ধ্যামণির প্রদীপ জ্বলে গানের কথা :

আসে রজনী, সন্ধ্যামণির প্রদীপ জ্বলে
ছায়া-আঁচল-ঢাকা কানন-তলে।।
তিমির দু’ কূল দুলে গগনে, গোধূলি-ধূসর সাঁঝ-পবনে
তারার মানিক অলকে ঝলে।।
পূজা আরতি লয়ে চাঁদের থালায়
আসিল সে অস্ত-তোরণ নিরালায়।
ললাটের টিপ্‌ জ্বলে সন্ধ্যা-তারা
গিরি-দরি বনে ফেরে আপন-হারা
থামে ধীরে ধীরে বিরহীর নয়ন-জলে।।

 

Ashe Rajani Shondhyamonir Prodip Jole Gaaner Kotha:

Ashe rajani, shondhyamonir prodip jole
Chhaya-anchol-dhaka kanan-tole.
Timir du’ kul dule gogone, godhuli-dhusor sanjh-pobone
Tarar manik oloke jhole.
Puja arati loye chander thalay
Ashilo se ostho-toron nir alay.
Lolater tip jole shondhya-tara
Giri-dori bone phere apon-hara
Thame dhire dhire birahir noyon-jole.

গানের মূল ভাব

“আসে রজনী সন্ধ্যামণির প্রদীপ জ্বলে” গানটির মূল ভিত্তি হলো দিনের আলো নিভে প্রকৃতির কোলে আঁধার নেমে আসার মধ্য দিয়ে এক পরম প্রশান্তি ও আত্মিক সান্ত্বনার প্রকাশ। সন্ধ্যাকে কবি এখানে কোনো ভীতিপ্রদ অন্ধকারের রূপ হিসেবে দেখেননি, বরং তাকে দেখেছেন এক নিভৃত ও লাজুক বধূর রূপে—যে ছায়াঢাকা আঁচল বিছিয়ে কাননের নিচে পদার্পণ করছে।
সন্ধ্যার এই আগমন যেন এক মহাজাগতিক প্রার্থনার মতো। সন্ধ্যামণি ফুল রূপ নিয়েছে প্রদীপের, চাঁদ রূপ নিয়েছে আরতির থালার, এবং প্রথম উদিত সন্ধ্যাতারা যেন সেই মহাশক্তির কপালে পরা জ্বলজ্বলে সিঁদুরের টিপ। প্রকৃতির এই অপূর্ব আরাধনায় নিসর্গের সমস্ত চঞ্চলতা যেমন স্থির হয়ে যায়, তেমনি সারাদিনের ক্লান্তির পর বিরহকাতর মানুষের অন্তরের অবিশ্রান্ত অশ্রুপাতও এক গভীর বৈরাগ্য ও শান্তিতে ধীরে ধীরে থেমে আসে।

চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ

১. সন্ধ্যামণির প্রদীপ ও কাননের ছায়া-আঁচল

  • “আসে রজনী, সন্ধ্যামণির প্রদীপ জ্বলে / ছায়া-আঁচল-ঢাকা কানন-তলে…”
    প্রকৃতির ব্যক্তিত্বারোপের (Personification) এক অপূর্ব নিদর্শন। রজনী যেন এক শান্ত গৃহিণী, যে কাননের তলদেশে ছায়াময় আঁচল টেনে দিয়ে সন্ধ্যামণি ফুলের প্রদীপ জ্বালিয়ে নিভৃতে প্রবেশ করছে।

২. গোধূলি-বাতাস ও তারার কেশশোভা

  • “তিমির দু’ কূল দুলে গগনে, গোধূলি-ধূসর সাঁঝ-পবনে / তারার মানিক অলকে ঝলে…”
    আকাশের দুই কূলে অন্ধকারের তরঙ্গের দোলাচল। গোধূলির ধূসর বাতাসে যেন রজনীর খোলা চুলে প্রথম উদিত তারারা মানিক-রত্নের মতো জ্বলজ্বল করে আলো ছড়াচ্ছে।

৩. চাঁদের থালায় পূজা আরতি ও অস্ত-তোরণ

  • “পূজা আরতি লয়ে চাঁদের থালায় / আসিল সে অস্ত-তোরণ নিরালায়…”
    নিসর্গের সান্ধ্য আরাধনা। পশ্চিমের যে অস্ত-তোরণে সূর্য বিদায় নিয়েছে, সেই নির্জন তোরণের দ্বারে রূপালী চাঁদের থালায় আরতির অর্ঘ্য সাজিয়ে রজনী নীরবে উপস্থিত হয়।

৪. সন্ধ্যা-তারা ও বিরহীর অশ্রুর প্রশমন

  • “ললাটের টিপ্‌ জ্বলে সন্ধ্যা-তারা… গিরি-দরি বনে ফেরে আপন-হারা / থামে ধীরে ধীরে বিরহীর নয়ন-জলে…”
    প্রকৃতির শান্তিদায়িনী ক্ষমতা। পাহাড় ও বনের মাঝে বিচরণ করা সন্ধ্যাতারার দীপ্তি যেন প্রকৃতির ললাটে শোভিত পবিত্র টিপ। প্রকৃতির এই গভীর প্রশান্তি সারাদিনের বিচ্ছেদে কাতর বিরহীর নয়নজলকে ধীরে ধীরে মুছে দিয়ে এক পরম সান্ত্বনা দান করে।

বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন

দিনের সূর্য অস্তাচলে বিলীন হওয়ার সাথে সাথে চরাচরে যে আলোহীনতার সৃষ্টি হয়, তা মানুষের মনের বিচ্ছেদের প্রতীক। বিরহী হৃদয়ের আশাহীন নয়ন সারাদিন প্রিয়জনের পথ চেয়ে ক্লান্ত হয়ে যখন নিরাশার মুখোমুখি হয়, তখন নিশীথের নির্জনতা এসে সেই চোখের জলের ধারাকে স্পর্শ করে। অস্তাচলের দ্বারে দিনের আলোর বিদায়-আঘাত এখানে কোনো স্থায়ী হাহাকারে রূপ নেয় না; বরং সন্ধ্যামণির স্নিগ্ধ প্রদীপ ও সন্ধ্যাতারার আলোর পরশে আশাহীন চোখের অশ্রু ধীরে ধীরে শুকিয়ে এক নিবিড় আত্মিক শান্তিতে রূপান্তরিত হয়।

সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য

  • রূপক ও দৃশ্যকল্পের ঐশ্বর্য: সন্ধ্যামণিকে প্রদীপ, আকাশকে কেশদাম, তারাকে অলকের মানিক এবং চাঁদকে আরতির থালা হিসেবে রূপায়িত করে অপূর্ব এক সান্ধ্য রূপকল্প বিনির্মাণ করা হয়েছে।
  • প্রকৃতি ও মানবমনের নিবিড় সাযুজ্য: প্রকৃতির সান্ধ্য রূপের সাথে মানুষের বিরহযাতনার প্রশমনের চমৎকার সংযোগ গানের প্রতিটি চরণে স্পষ্ট।
  • কোমলকান্ত পদাবলি ও অনুপ্রাস: ‘তিমির দু’ কূল দুলে’, ‘গোধূলি-ধূসর সাঁঝ-পবনে’—শব্দচয়নে এক ললিত ও গীতিময় ধ্বনিমাধুর্য বিদ্যমান।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা

  • পিলু রাগের শান্ত-করুণ মেজাজ: অপরাহ্ণ ও সন্ধ্যার মধ্যবর্তী রাগ ‘পিলু’-র মিশ্র চলন গানের স্নিগ্ধ বিষাদ ও সন্ধ্যার শান্ত রূপকে সুরের মাধ্যমে জীবন্ত করে তোলে।
  • কাহারবা তালের মসৃণ প্রবহমানতা: আট মাত্রার কাহারবা তালের ধীর ও ললিত গতি গানের বাণীর শান্ত ভাবটিকে অক্ষুণ্ণ রাখে।
  • কোমল স্বরের নমনীয় প্রয়োগ: পিলু রাগের কোমল গান্ধার ও কোমল নিখাদের সূক্ষ্ম কাজ বাণীর আর্তি ও সন্ধ্যার নিস্তব্ধতাকে মূর্ত করে।

শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি

  • কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬): প্রকৃতিকে ইন্দ্রিয়ঘন রূপ, রঙ ও রোমান্টিক বিষাদের মেলবন্ধনে রূপায়িত করায় নজরুল ছিলেন অদ্বিতীয়।
  • গুল বাগিচা সংকলনের ভূমিকা: ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে নজরুলের ঠুংরি, দাদরা ও গজল আঙ্গিকের যে বৈচিত্র্যময় রূপ প্রকাশিত হয়, এটি তারই এক উজ্জ্বল নিদর্শন। স্বদেশী মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানির মাধ্যমে গানটি সমকালীন শ্রোতাদের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।

সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

“আসে রজনী সন্ধ্যামণির প্রদীপ জ্বলে” বাংলা সান্ধ্যগীতির ধারায় এক কালজয়ী সৃষ্টি। সারাদিনের ব্যস্ততা ও ক্লান্তির অবসানে সন্ধ্যার নিস্তব্ধতায় মন যখন শান্ত হতে চায়, তখন এই গানটি নিসর্গ ও অন্তর্জগতের মাঝে এক অপূর্ব প্রশান্তির সেতুবন্ধন রচনা করে।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. গুল বাগিচা (প্রথম সংস্করণ, ২৭ জুন ১৯৩৩ / ১৩৪০ বঙ্গাব্দ), কাজী নজরুল ইসলাম, গ্রেট ইস্টার্ন লাইব্রেরি, কলকাতা।
  2. নজরুল রচনাবলী ও গীতি সংকলন, নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
  3. নজরুল সঙ্গীত পরিক্রমা ও রাগকোষ, সুফি জুলফিকার হায়দার।
Tags :

কাজী নজরুল ইসলাম

<div id="model-response-message-contentr_6711829050503afa" class="markdown markdown-main-panel md-content enable-luminous-fast-follows enable-updated-hr-color tutor-markdown-rendering" dir="ltr" aria-live="polite"> <div>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।</div> </div>

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত