বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ঝিঙে ফুল’ (১৯২৬) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম আবেগঘন ও কালজয়ী শিশুতোষ সৃষ্টি হলো ‘মা’। এই কবিতায় মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, অপরিসীম ত্যাগ এবং সন্তানের প্রতি অকৃত্রিম স্নেহের কথা অত্যন্ত সহজ, সাবলীল ও মর্মস্পর্শী ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | মা |
| কবির নাম | কাজী নজরুল ইসলাম |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | ঝিঙে ফুল |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৬ (১৩৩৩ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাস) |
| প্রকাশক | ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ নম্বর কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিট, কলিকাতা |
| উৎসর্গ | বীর বাদলকে |
| কবিতার ধরন | মাতৃবন্দনা ও শিশুতোষ কবিতা (Ode to Mother / Children’s Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯২৬ সালে প্রকাশিত ‘ঝিঙে ফুল’ মূলত শিশুদের জন্য লেখা হলেও ‘মা’ কবিতাটি সব বয়সের মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। সন্তানের সুখ-দুঃখে মায়ের যে সার্বক্ষণিক উদ্বেগ, তার শিয়রে জেগে থাকা এবং নিজের সর্বস্ব দিয়ে সন্তানকে বড় করে তোলার যে শাশ্বত রূপ—নজরুল এখানে সেই চিরায়ত মাতৃমূর্তিরই বন্দনা করেছেন।
মা কবিতা (পুরো কবিতা)
একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই,
মায়ের মতন এত
আদর সোহাগ সে তো
আর কোনোখানে কেহ পাইবে না ভাই।হেরিলে মায়ের মুখ
দূরে যায় সব দুখ,
মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় পরান,
মায়ের শীতল কোলে
সকল যাতনা ভোলে
কত না সোহাগে মাতা বুকটি ভরান।
কত করি উৎপাত
আবদার দিন রাত,
সব সন হাসি মুখে, ওরে সে যে মা!
আমাদের মুখ চেয়ে
নিজে রন নাহি খেয়ে,
শত দোষে দোষী তবু মা তো ত্যজে না।
ছিনু খোকা এতটুকু,
একটুতে ছোটো বুক
যখন ভাঙিয়া যেত, মা-ই সে তখন
বুকে করে নিশিদিন
আরাম-বিরামহীন
দোলা দিয়ে শুধাতেন, ‘কী হল খোকন?’
আহা সে কতই রাতি
শিয়রে জ্বালায়ে বাতি
একটু অসুখ হলে জাগেন মাতা,
সবকিছু ভুলে গিয়ে
কেবল আমারে নিয়ে
কত আকুলতা যেন জগন্মাতা।
যখন জনম নিনু
কত অসহায় ছিনু,
কাঁদা ছাড়া নাহি জানিতাম কোনো কিছু,
ওঠা বসা দূরে যাক –
মুখে নাহি ছিল বাক,
চাহনি ফিরিত শুধু মা-র পিছু পিছু!
তখন সে মা আমার
চুমু খেয়ে বারবার
চাপিতেন বুকে, শুধু একটি চাওয়ায়
বুঝিয়া নিতেন যত
আমার কী ব্যথা হত,
বলো কে এমন স্নেহে বুকটি ছাওয়ায়!
তারপর কত দুখে
আমারে ধরিয়া বুকে
করিয়া তুলেছে মাতা দেখো কত বড়ো,
কত না সুন্দর
এ দেহ এ অন্তর
সব মোরা ভাই বোন হেথা যত পড়।
পাঠশালা হতে যবে
ঘরে ফিরি যাব সবে,
কত না আদরে কোলে তুলি নেবে মাতা,
খাবার ধরিয়া মুখে
শুধাবেন কত সুখে
‘কত আজ লেখা হল, পড়া কত পাতা?’
পড়ে লেখা ভালো হলে
দেখেছ সে কত ছলে
ঘরে ঘরে মা আমার কত নাম করে!
বলে, ‘মোর খোকামণি।
হিরা-মানিকের খনি,
এমনটি নাই কারও!’ শুনে বুক ভরে!
গা-টি গরম হলে
মা সে চোখের জলে
ভেসে বলে, ‘ওরে জাদু কী হয়েচে বল!’
কত দেবতার ‘থানে’
পিরে মা মানত মানে –
মাতা ছাড়া নাই কারও চোকে এত জল।
যখন ঘুমায় থাকি
জাগে রে কাহার আঁখি
আমার শিয়রে, আহা কীসে হবে ঘুম!
তাই কত ছড়া গানে
ঘুম-পাড়ানিরে আনে,
বলে, ‘ঘুম! দিয়ে যা রে খুকু-চোখে চুম!’
দিবানিশি ভাবনা
কীসে ক্লেশ পাব না,
কীসে সে মানুষ হব, বড়ো হব কীসে;
বুক ভরে ওঠে মার
ছেলেরই গরবে তাঁর,
সব দুখ সুখ হয় মায়ের আশিসে।
আয় তবে ভাই বোন,
আয় সবে আয় শোন
গাই গান, পদধূলি শিরে লয়ে মা-র;
মার বড়ো কেউ নাই –
কেউ নাই কেউ নাই!
নত করি বল সবে ‘মা আমার! মা আমার!’
Ma Kobita (Puro Kobita)
Ma-er moton aha
Ekti kothay eto sudha mesha nai,
Mayer moton eto
Ador sohag se to
Ar konokhane keho paibe na bhai.
Herile mayer mukh
Dure jay shob dukh,
Mayer kolete shuye juray poran,
Mayer shital kole
Shokol jatona bhole
Koto na sohage mata bukti bhoran.
Koto kori utpat
Abdar din rat,
Shob shon hashi mukhe, ore se je ma!
Amader mukh cheye
Nije ron nahi kheye,
Shoto doshe doshi tobu ma to tyaje na.
Chhinu khoka etotuku,
Ektute chhoto buk
Jokhon bhangiya jeto, ma-i se tokhon
Buke kore nishidin
Aram-biramhin
Dola diye shudhat en, ‘Ki holo khokon?’
Aha se kotoi rati
Shiyore jw alaye bati
Ektu oshukh hole jagen mata,
Shobkichhu bhule giye
Kebol amare niye
Koto akulota jeno Jaganmata.
Jokhon janam ninu
Koto oshohay chhinu,
Kanda chhara nahi janitam kono kichhu,
Otha bosha dure jak –
Mukhe nahi chhilo bak,
Chahni phirito shudhu ma-r pichhu pichhu!
Tokhon se ma amar
Chumu kheye barbar
Chapiten buke, shudhu ekti chaoway
Bujhiya niten joto
Amar ki byatha hoto,
Bolo ke emon snehe bukti chhaw ay!
Tarpor koto dukhe
Amare dhoriya buke
Koriya tulechhe mata dekho koto boro,
Koto na shundor
E deho e ontor
Shob mora bhai bon hetha joto poro.
Pathshala hote jobe
Ghore phiri jabo shobe,
Koto na adore kole tuli nebe mata,
Khabar dhoriya mukhe
Shudhaben koto sukhe
‘Koto aj lekha holo, pora koto pata?’
Pore lekha bhalo hole
Dekhechho se koto chhole
Ghore ghore ma amar koto nam kore!
Bole, ‘Mor khokamoni.
Hira-manik er khoni,
Emonti nai karo!’ Shune buk bhore!
Ga-ti gorom hole
Ma se chokher jole
Bheshe bole, ‘Ore jadu ki hoyechhe bol!’
Koto debotar ‘thane’
Pire ma manat mane –
Mata chhara nai karo chokhe eto jol.
Jokhon ghumay thaki
Jage re kahar ankhi
Amar shiyore, aha kise hobe ghum!
Tai koto chhora gane
Ghum-paranire ane,
Bole, ‘Ghum! Diye ja re khuku-chokhe chum!’
Diban ishi bhabna
Kise klesh pabo na,
Kise se manush hobo, boro hobo kise;
Buk bhore othe mar
Cheler-i gorbe tar,
Shob dukh sukh hoy mayer ashise.
Ay tobe bhai bon,
Ay shobe ay shon
Gai gaan, pododhuli shire loye ma-r;
Mar boro keu nai –
Keu nai keu nai!
Noto kori bolo shobe ‘Ma amar! Ma amar!’
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- মায়ের নামের অতুলনীয় মাধুর্য:“যেখানেতে দেখি যাহা / মা-এর মতন আহা / একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই,”
— কবি শুরুতেই স্পষ্ট করেছেন যে, পৃথিবীতে ‘মা’ শব্দের মতো এত সুধামাখা শব্দ আর দ্বিতীয়টি নেই। মায়ের মতো এমন নিঃস্বার্থ আদর-সোহাগ পৃথিবীর অন্য কোথাও, কারও কাছে পাওয়া সম্ভব নয়।
- নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও শাশ্বত আশ্রয়:সন্তান যত অন্যায় বা উৎপাতই করুক না কেন, মা হাসিমুখে তা মেনে নেন। নিজের আহার-নিদ্রা বিসর্জন দিয়ে সন্তানের রোগ-শোকে শিয়রে জেগে থাকেন। সন্তানের শত অপরাধ সত্ত্বেও মা তাকে কখনো ত্যাগ করেন না। পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ-যাতনা মায়ের শীতল কোলে মাথা রাখলেই জুড়িয়ে যায়। মায়ের এই অপরিসীম ত্যাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাঁর পদধূলি নেওয়ার আহ্বানই এই কবিতার মূল সুর।
উৎস
কবিতা বা গানটির সম্পূর্ণ পাঠ পেতে আপনি খুব সহজেই গুগলে ‘মা কবিতা কাজী নজরুল ইসলাম’ লিখে অনুসন্ধান করে নিতে পারেন।























