Editor's Choice

অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থের ‘কোরবানী’ কবিতা — কাজী নজরুল ইসলাম

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ (১৯২২)-এর একটি অত্যন্ত ওজস্বী, শক্তিদায়ী ও আধ্যাত্মিক ভাবচেতনায় সমৃদ্ধ সৃষ্টি হলো ‘কোরবানী’। এই কবিতায় কোরবানি বা আত্মত্যাগের প্রকৃত অর্থ কেবল হত্যা বা পশুবলি নয়, বরং তা যে অন্যায় ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে ‘সত্যাগ্রহ’, আত্মশক্তি ও সাহসের উদ্‌বোধন এবং মুক্তির পথ—তা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামকোরবানী
কবির নামকাজী নজরুল ইসলাম
মূল কাব্যগ্রন্থঅগ্নিবীণা
প্রকাশের বছর১৯২২ (কার্তিক ১৩২৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনবিপ্লবী ও আত্মোৎসর্গমূলক লিরিক কবিতা (Revolutionary / Sacrificial Lyric)

কবি ও গ্রন্থ পরিচিতি:

১৯২২ সালের অক্টোবর মাসে (কার্তিক ১৩২৯ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত ‘অগ্নিবীণা’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মাইলফলক। এই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘কোরবানী’ কবিতায় কবি ইসলামের ইব্রাহিম ও ইসমাইলের কোরবানি তথা ত্যাগের আদর্শকে স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তির লড়াইয়ের সাথে যুক্ত করেছেন। কবি পরিষ্কার ঘোষণা করেছেন যে কোরবানি কোনো অন্ধ পশুবলি নয়, বরং এটি আত্মশক্তি জাগানোর এবং পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক মহৎ প্রয়াস। ইব্রাহিম ও হাজেরার আত্মত্যাগের উদাহরণের মাধ্যমে কবি মুসলিম জাতিকে কাপুরুষতা ও ভীরুতা ছেড়ে রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে ‘আজাদি’ বা স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

কোরবানী কবিতা (পুরো কবিতা):

ওরে
হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !
  
দুর্বল! ভীরু ! চুপ রহো, ওহো খামখা ক্ষুব্ধ মন !
  
          ধ্বনি উঠে রণি’ দূর বাণীর, –
  
          আজিকার এ খুন কোরবানীর !
  
          দুম্বা-শির     রুম্-বাসীর
  
শহীদের শির সেরা আজি !- রহমান কি রুদ্র নন ?
  
          ব্যাস ! চুপ খামোশ রোদন !
আজ
শোর ওঠে জোর “খুন দে, জান দে , শির দে বৎস” শোন !
ওরে
হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !

  

ওরে
হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !
  
          খন্জর মারো গদ্র্দানেই,
  
          পন্জরে আজি দরদ নেই,
  
          মর্দানী’ই    পর্দা নেই,
  
ডরতা নেই আজ খুন্-খারাবীতে রক্ত-লুব্ধ-মন !
  
          খুনে খেলবো খুন-মাতন !
দুনো
উনমাদনাতে সত্য মুক্তি আনতে যুঝবো রণ ।
ওরে
হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন

  

ওরে
হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !
  
          চ’ড়েছে খুন আজ খুনিয়ারার
  
          মুসলিমে সারা দুনিয়াটার !
  
          ‘জুলফেকার’ খুলবে তার
  
দু’ধারী ধার শেরে-খোদার ,       রক্তে-পূত-বদন !
  
          খুনে আজকে রুধবো মন
ওরে
শক্তি-হস্তে মুক্তি, শক্তি রক্তে সুপ্ত শোন্ ।
ওরে
হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন

  

ওরে
হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !
  
          আস্তানা সিধা রাস্তা নয়,
  
          ‘আজাদী মেলে না পস্তানো’য় !
  
          দস্তা নয়     সে সস্তা নয় !
  
হত্যা নয় কি মৃত্যুও ? তবে রক্তে লুব্ধ কোন্
  
          কাঁদে-শক্তি-দুস্থ শোন_
“এয়্
ইবরাহীম্ আজ কোরবানী কর শ্রেষ্ঠ পুত্র ধন !”
ওরে
হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন

  

ওরে
হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !
  
          এ তো নহে লহু তরবারের
  
          ঘাতক জালিম জোরবারের
  
          কোরবানের জোরজানের
  
খুন এ যে, এতে গোদ্র্দ ঢের রে, এ ত্যাগে ‘বুদ্ধ’ মন !
  
এতে     মা রাখে পুত্র পণ !
তাই
জননী হাজেরা বেটারে পরা’লো বলির পূত বসন !
ওরে
হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন
ওরে
হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !
  
          এই দিনই ‘মিনা’-ময়দানে
  
          পুত্র-স্নেহের গর্দানে
  
          ছুড়ি হেনে ‘খুন ক্ষরিয়ে নে’
  
রেখেছে আব্বা ইবরাহীম সে আপনা রুদ্র পণ !
  
          ছি ছি ! কেঁপোনা ক্ষুদ্র মন !
আজ
জল্লাদ নয় , প্রহ্লাদ-সম মোল্লা খুন-বদন !
ওরে
হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন

  

ওরে
হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !
দ্যাখ্
          কেঁপেছে ‘আরশ’ আসমানে
  
          মন-খুনী কি রে রাশ মানে ?
  
          ত্রাস প্রাণে ? তবে রাস্তা নে !
  
প্রলয় বিষাণ ‘কিয়ামতে’ তবে বাজবে কোন্ বোধন ?
  
          সে কি    সৃষ্টি-সংশোধন ?
ওরে
তাথিয়া তাথিয়া নাচে ভৈরব বাজে ডম্বরু শোন্ !-
ওরে
হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !

  

ওরে
হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !
  
          মুসলিম-রণ-ডঙ্কা সে,
  
          খুন দেখে করে শঙ্কা কে ?
  
          টঙ্কারে অসি ঝঙ্কারে,
ওরে
হুঙ্কারে , ভাঙি গড়া ভীম কারা, ল’ড়বো রণ-মরণ !
  
          ঢালে    বাজবে ঝন্-ঝনন্ !
ওরে
সত্য মুক্তি স্বাধীনতা দেবে এই সে খুন-মোচন !
ওরে
হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !

  

ওরে
হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !
  
          জোর চাই, আর যাচনা নয়,
  
          কোরবানী-দিন আজ না ওই ?
  
          বাজনা কই?  সাজনা কই?
  
কাজ না আজিকে জান্ মাল দিয়ে মুক্তির উদ্র্ধরণ ?
  
          বল্ – “যুঝবো জান ভি পণ !”
ওই
খুনের খুঁটিতে কল্যাণ-কেতু, লক্ষ্য ঐ তোরণ,
আজ
আল্লার নামে জান্ কোরবানে ঈদের পূত বোধন ।
ওরে
হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !

 

 

Korbani Kobita romanized version:

Ore Hotya noy aaj ‘Satyagraha’ shoktir udbodhon!

Durbol! Bhiru! Chup roho, oho khamkha khubdho mon!

  Dhwani uthe roni’ dur banir, –

  Aajikar e khun korbanir!

  Dumba-shir Rum-basir

Shohider shir shera aji! – Rahman ki Rudra non?

  Byas! Chup khamosh rodan!

Aaj Shor othe jor “khun de, jaan de, shir de bots” shon! Ore Hotya noy aaj ‘Satyagraha’ shoktir udbodhon!

Ore Hotya noy aaj ‘Satyagraha’ shoktir udbodhon!

  Khanjar maro gordanei,

  Panjore aji dorod nei,

  Mordanী’i porda nei,

Dorta nei aaj khun-kharabite rokto-lubdho-mon!

  Khune khelbo khun-maton!

Duno Unmadonate satya mukti ante jhujhbo ron. Ore Hotya noy aaj ‘Satyagraha’ shoktir udbodhon!

Ore Hotya noy aaj ‘Satyagraha’ shoktir udbodhon!

  Ch’রেchhe khun aaj khuniyarar

  Muslime shara duniyatar!

  ‘Zulfekar’ khulbe tar

Du’dhari dhar Sher-e-Khodar, rokto-put-bodon!

  Khune aajke rudhbo mon

Ore Shokti-hoste mukti, shokti rokte supto shon. Ore Hotya noy aaj ‘Satyagraha’ shoktir udbodhon!

Ore Hotya noy aaj ‘Satyagraha’ shoktir udbodhon!

  Astana sidha rasta noy,

  ‘Azadi mele na postano’y!

  Dosta noy, se sosta noy!

Hotya noy ki mrittyuo? Tobe rokte lubdho kon

  Kande-shokti-dustho shon—

“Ey Ibrahim aaj korbani kor shreshtho putro dhon!” Ore Hotya noy aaj ‘Satyagraha’ shoktir udbodhon!

Ore Hotya noy aaj ‘Satyagraha’ shoktir udbodhon!

  E to nohe lohu torbarer

  Ghatok jalim jorbarer

  Korbaner jorjaner

Khun e je, ete gord dhere re, e tyage ‘Buddha’ mon!

Ete ma rakhe putro pon! Tai Jononi Hajera बेटare poralo bolir puto boson! Ore Hotya noy aaj ‘Satyagraha’ shoktir udbodhon!

Ore Hotya noy aaj ‘Satyagraha’ shoktir udbodhon!

  Ei dini ‘Mina’-moydane

  Putro-sneher gordane

  Chhuri hene ‘khun khoriye ne’

Rekhechhe abba Ibrahim se aponar Rudra pon!

  Chhi chhi! Kempona khudro mon!

Aaj Jollad noy, Prohlad-shom molla khun-bodon! Ore Hotya noy aaj ‘Satyagraha’ shoktir udbodhon!

Ore Hotya noy aaj ‘Satyagraha’ shoktir udbodhon!

Dekh Kempechhe ‘Arsh’ ashmane

  Mon-khuni ki re rash mane?

  Tras prane? Tobe rasta ne!

Proloy bishan ‘Kiyamate’ tobe bajbe kon bodhon?

  Se ki srishti-shongshodhon?

Ore Tathiya tathiya nache Bhairab, baje Domboru shon! Ore Hotya noy aaj ‘Satyagraha’ shoktir udbodhon!

Ore Hotya noy aaj ‘Satyagraha’ shoktir udbodhon!

  Muslim-ron-donka se,

  Khun dekhe kore shonka ke?

  Tonkare osi jhonkare,

Ore Hunkare, bhangi gora Bhim kara, lorbo ron-moron!

  Dhal-e bajbe jhon-jhonon!

Ore Satya mukti swadhinota debe ei se khun-mochon! Ore Hotya noy aaj ‘Satyagraha’ shoktir udbodhon!

Ore Hotya noy aaj ‘Satyagraha’ shoktir udbodhon!

  Jor chai, ar jachona noy,

  Korbani-din aaj na oi?

  Bajna koi? Sाजna koi?

Kaj na ajike jaan-mal diye muktir uddharon?

  Bol – “Jhujhbo jaan bhi pon!”

Oi Khuner khutite kollyan-ketu, lokkho oi toron, Aaj Allar name jaan korbane Eider puto bodhon. Ore Hotya noy aaj ‘Satyagraha’ shoktir udbodhon!

 

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
  • ত্যাগের নতুন অর্থ: কোরবানি বা বলিদানকে কেবল গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতা না ভেবে তাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই এবং আত্মশক্তি জাগানোর ‘সত্যাগ্রহ’ হিসেবে প্রতিভাত করা।
  • স্বাধীনতার সংগ্রাম ও আত্মোৎসর্গ: ইব্রাহিমের ত্যাগের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে পরাধীনতার গ্লানি মুছে আত্মাহুতি ও সংগ্রামের মাধ্যমে প্রকৃত স্বাধীনতা (‘আজাদি’) অর্জনের উদাত্ত আহ্বান—এই কবিতার মূল প্রাণ।
Tags :

কাজী নজরুল ইসলাম

<div id="model-response-message-contentr_6711829050503afa" class="markdown markdown-main-panel md-content enable-luminous-fast-follows enable-updated-hr-color tutor-markdown-rendering" dir="ltr" aria-live="polite"> <div>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।</div> </div>

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

    Join Us!

    Hey there! Here’s a neat way to recieve our latest posts & updates – just subscribe to our newsletter.

    Error: Contact form not found.

    Zero spam, Unsubscribe at any time.