সনাতন ধর্ম অবলম্বনে নজরুলের ভক্তিগীতির বৈচিত্র্য : কাজী নজরুল ইসলামের গানের বিভিন্ন পর্যায়গুলির মধ্যে ভক্তিগীতি পর্যায়ের গান তাঁর একটি সৃজনশীল অনবদ্য সৃষ্টি। ধর্মীয় ভাবাবেগকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি ইসলাম ও সনাতন ধর্মের বিষয়ভিত্তিক ভক্তিগীতি রচনা করেন। আমরা সনাতন ধর্মবিষয়ক ভক্তিগীতি আলোচনার মাধমে সঠিক তথ্য উপস্থাপন করে বৈচিত্র্যগত দিক তুলে ধরার চেষ্টা করব।

সনাতন ধর্ম অবলম্বনে নজরুলের ভক্তিগীতির বৈচিত্র্য । নজরুলের ভাবনা
মন্তব্য :সজনীকান্ত দাস এর মতে, “ভক্তিগীতি রচিত না হলে নজরুল সাঙ্গীতিকভাবে সব মানুষের কাছাকাছি যেতে পারতেন না, শুধুমাত্র ইসলামী ও সনাতন ধর্মের ভক্তিগীতির সুর ও বাণী এক শ্রেণীর মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল। তাই কাজী নজরুল অসাম্প্রদায়িকতায় ছিলেন সবার উর্ধ্বে”
তথ্য সংগ্রহ : বাংলা ভক্তিগীতির ধারা
লেখক : সুবোধ সেন
ভক্তিগীতি বৈচিত্র্যসমূহ নিম্নরূপ :
ঈশ্বর বন্দনা :
নজরুলের ঈশ্বর বন্দনা ভক্তিগীতির একটি অংশ বিশেষ। ঈশ্বর বন্দনামূলক গানগুলি মূলত সৃষ্টিকর্তা এবং মানুষের মধ্যে একটি আধ্যাত্মিক বন্ধন, যার মাধ্যমে ঈশ্বরকে পাবার আকুতি বর্ণনা সম্ভব। যেমন :
যুগ যুগ ধরি লোকালয়ে মোর প্রভুরে খুঁজিয়া বেড়াই
গ্রন্থ : নজরুল গীতি অখণ্ড
সুর : হিন্দোল দ্বিতীয় খণ্ড
রেকর্ড নং : ৭৩৭৭
শিল্পী : শংকর মিশ্র
পর্যায় : ভজন
রাগ : মাঢ়
তাল : কাহার্বা ।

শ্যামাসঙ্গীত :
কালী বিষয়ক ভক্তিমূলক গানকে শ্যামা সঙ্গীত বলে। কাজী নজরুলের সমসাময়িক যাঁরা শ্যামা সঙ্গীত রচনা করেন তাঁরা হলেন, রামপ্রসাদ সেন (১৭২০-১৮২৯) কমলাকান্ত (১৭৭২-১৮২১) দাসরথি (১৮০৬-১৮৫৬) রসিক রায় (১৮৫০-১৮৩৬)।
“বলরে জবা বল”
গ্রন্থ : রাঙা জবা
স্বরলিপি : সুরবাহার, রেকর্ড নং : ৭৪২১
শিল্পী : মৃণাল কান্তি ঘোষ, তাল : দাদূরা
পর্যায় : শ্যামা (ভক্তিমূলক)।
দূর্গা বিষয়ক :
দূর্গা দেবী অসীম শক্তিসম্পন্ন। তিনি দশদিক থেকে জনকল্যাণ বয়ে আনতেন। নজরুল দুর্গা বিষয়ক গান রচনার ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেন।
“এলরে এল ঐ রণ রঙ্গীনি”
গ্রন্থ : বুলবুল তৃতীয় খণ্ড।
স্বরলিপি : নজরুল স্বরলিপি ৮ম খণ্ড
প্রকাশ কাল : সেপ্টেম্বর ১৯৪২,
পর্যায় : ভক্তিগীতি সুর চিত্তরায়,
রাগ : চন্দ্রকোষ, তাল : কাহার্বা

আগমনি :
বিভিন্ন ক্ষেত্রে দূর্গার আগমনকে কেন্দ্র করে লিখিত গানকে আগমনি পর্যায়ের গান বলে ।
“জাগ যোগ মায়া জাগ মৃন্ময়ী”
গ্রন্থ : গীতি শতদল,
স্বরলিপি : নজরুল স্বরলিপি (৭ম খণ্ড)
রেকর্ড নং : ৭১৫৬, শিল্পী : কে. মল্লিক
তাল : একতাল, রাগ : যোগীয়া
পর্যায় : ভক্তিমুলক
শিবসঙ্গীত :
সনাতন ধর্মে দেবতাদের মধ্যে শীবকে অন্যতম মানা হয়। যার পদচারনায় দেবকুল সর্বদাই মানবকুলে সজাগ দৃষ্টি রেখেছিল। নজরুলের শিব বিষয়ক সঙ্গীত তাঁর রচিত ভক্তিগীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। “গরজে গম্ভীর গগনে কন্তু
গ্রন্থ : বুলবুল,
উপন্যাস : সেতু-বন্ধনে
স্বরলিপি : নজরুল স্বরলিপি
স্বরলিপিকার : কাজী নজরুল ইসলাম
পর্যায় : ধ্রুপদ (ভক্তিমূলক)
রাগ : মালকোষ, তাল : তেওড়া (গীতাঙ্গি)
পোখোয়াজ : ব্যবহৃত হয়

ভজন :
ভজন গানে সাধারণত ঈশ্বরস্তুতি বর্ণনা হয়ে থাকে। এছাড়ও এ গানে রয়েছে রামায়ণ মহাভারতের বিবিদ পসেঙ্গ।
গান : “হে বিধাতা দুঃখ শোকমাঝে
গ্রন্থ : গীতি,
স্বরলিপি : সঙ্গীতাঞ্জলী (চতুর্থ খণ্ড)
প্রকাশ কাল : জুলাই ১৯৩৫,
শিল্পী : কনিকা বন্দোপাধ্যায়
পর্যায় : ভজন,
রাগ : মধুমাধবী সারং,
তাল : ত্রিতাল।
কীর্তন :
কীর্তন পর্যায়ের গান একটি ব্যতিক্রম ধরনের সঙ্গীত। শ্রীচৈতন্য দেবকে কীর্তনের প্রবর্তক বলা হয়। এর গায়নে সাধারণত হারমোনিয়াম, কর্তাল বাঁশি, বেহালা, খোল ব্যবহৃত হয় ও সুরের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যময় তাল ফেরতাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার হতে দেখা যায়।
আমি কলহেরী তরে কলহ করেছি
গ্রন্থ : নজরুল গীতি অখণ্ড (অখণ্ড),
স্বরলিপি : নজরুল ইন্সইিটউট (৩য় খণ্ড)
স্বরলিপিকার : সুধীন দাস,
রেকর্ড নং : ৫৩৭
শিল্পী : নিলীমা বন্দোপাধ্যায
পর্যায় : ভক্তিমূলক (কীর্তন)
তাল : ফেরতা

স্বরস্বতী :
সনাতন ধর্মে সরস্বতী দেবীকে বিদ্যার দেবী মানা হয়। তিনি এই ধরাধামে মানবকুলে বিদ্যা প্রদান করেন। এ প্রসঙ্গে নজরুল রচনা করেন-
“জয় বাণী বিদ্যাদায়িনী”
গ্রন্থ : চন্দ্রবিন্দু,
শিরনাম : স্বরস্বতী বন্দনা
স্বরলিপি : নজরুল স্বরলিপি (৫ম খণ্ড)
পর্যায় : ভক্তিমূলক,
রাগ : খাম্বাজ,
তাল : একতাল
রাম প্রসঙ্গ :
“মন জপ নাম শ্রী রঘু, পতি রাম”
এ গানটি মহাঅবতার রামচন্দ্র সম্পর্কে নজরুলের রচনা।
গ্রন্থ : সন্ধ্যামালতি,
স্বরলিপি : নজরুল স্বরলিপি (৯ম খণ্ড)
পর্যায় : ভক্তিমূলক,
তাল : ঝাঁপতাল,
রাগ : মিশ্র তিলং
রেকর্ড নং : ১২১৯৬

রাধা কৃষ্ণ :
মহাঅবতার শ্রীকৃষ্ণ বিশ্বব্রমাণ্ডে মানবকুলকে ধর্মানুরাগী করবার ক্ষেত্রে বহুমুখী শক্তির পরিচয় দিয়েছেন। তাইতো তাঁর জীবনের সাথে বৃন্দাবন জড়িত। রাধা ও কৃষ্ণ অবলম্বনে নজরুলের সঙ্গীত নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে ৷
যেমন : “ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মহা অবতার
গ্রন্থ : রাঙাজবা,
স্বরলিপি : নজরুল স্বরলিপি (৫ম খণ্ড)
প্রকাশ : ডিসেম্বর ‘১৯৩৫,
রেকর্ড নং : ৪১৭২
শিল্পী : দেবেন বিশ্বাস,
পর্যায় : ভক্তিমূলক,
তাল : কাহাবা।
শ্রীগৌরাঙ্গ :
শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভু কলিযুগে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ তাইতো নজরুলের চর্চাগান : একি অপরূপ যুগল মিলন |
গ্রন্থ : নজরুল রচনা সম্ভার (চতুর্থ খণ্ড),
নাটিকা : বিষ্ণুপ্রিয়া,
শিল্পী : মুকুন্দ,
পর্যায় : ভক্তিমূলক,
তাল : কাহার্বা

সীতা প্রসঙ্গ :
সীতাকে বলা হয় কমলরূপিনী শক্তি স্বরূপিনী। তিনি ছিলেন শ্রীরাম এর পত্নী। তাঁর সম্পর্কে নজরুলের রচিত গান হোল :
“কমলারূপিনী শক্তিস্বরূপিনী”
পর্যায় ভক্তিমূলক,
তাল-দাদৃরা।
শ্রীরামকৃষ্ণ প্রসঙ্গ :
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব সনাতন ধর্মের একজন মহাপুরুষ। তাঁর প্রসঙ্গেও নজরুলের সঙ্গীত রচনা ব্যাপকতা পেয়েছে।
যেমন : “জয়তু শ্রী রাম কৃষ্ণ নমঃ নমঃ
গ্রন্থ : নজরুল গীতি (অখণ্ড)
স্বরলিপি : নজরুল স্বরলিপি ৮ম খণ্ড)
রেকর্ড নয় : ৫৪৫৬
শিল্পী : ভাবনী চন্দ্র দাস,
সুর : মনরঞ্চন সেন,
রাগ : ইমন,
তাল : একতাল ।
স্বামী বিবেকানন্দ প্রসঙ্গ :
স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন মানব সম্প্রদায়ের মুক্তির প্রশ্নে একজন মহাপুরুষ যাকে নিয়ে নজরুল রচনা করেন, সন্ন্যাসী বীর”
গ্রন্থ : বনগীতি,
স্বরলিপি : কলগীতি,
প্রকাশকাল : ১৯৩৭
রেকর্ড নয় ৯৮৮৭ :
তাল : তেওড়া,
শিল্পী : যুথিকা রায়, কমল দাশ।
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংদেবের জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে স্বামী বিবেকানন্দ সম্পর্কে কবি এ গানটি রচনা করেন।
হরিলুটের গান :
সনাতন ধর্মে ধর্মীয় উপাসনা ভিত্তিক এক ধরনের গীতরীতিকে হরিলুটের গান বলে । যেমন : লাগলো হরি লুটের বাহার
উপসংহার :
উপরোক্ত গানগুলো ভক্তিমূলক পর্যায়ের গান। কাজী নজরুলের রচিত সঙ্গীত ভাণ্ডারকে পরিপূর্ণতা দিতে এ গানগুলো সহায়ক ভূমিকা রেখেছে ।

