কাজী নজরুল ইসলামের ঠুমরী ও শাস্ত্রীয় ঠুমরীর তুলনামূলক আলোচনা : শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিশীলিত ধারায় ঠুমরী পর্যায়ের গান রচনা নজরুলের ৫টি ধারার সর্বশেষ পর্যায়। নজরুল রচিত ঠুমরী গানগুলো শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে পারদর্শিতার বৈশিষ্ট্য বহন করে আছে। ভাষাগত বিভক্তি থাকলেও বাংলা ঠুমরীর প্রকাশ এবং এর বৈশিষ্ট্য শাস্ত্রীয় ঠুমরীর মতোই। আমরা নজরুল সৃষ্ট ঠুমরীর সাঙ্গীতিক অবকাঠামো বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করছি মাত্র।

কাজী নজরুল ইসলামের ঠুমরী ও শাস্ত্রীয় ঠুমরীর তুলনামূলক আলোচনা । নজরুলের ভাবনা
মন্তব্য : ১. প্রভাত বসুর মতে, “একমাত্র নজরুলের ঠুমরী গানেই গায়কের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রকাশ পায় কিন্তু অপরিপক্ক শিল্পীর পক্ষে এ ধরনের প্রকাশ সমীচীন নয়। একমাত্র সার্থক নজরুলসঙ্গীত শিল্পীর পক্ষেই ঠুমরী অংগের গানের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ সম্ভব। (শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধারায় কাজী নজরুলের গান)”।
মন্তব্য : ২. চিত্তরঞ্জন দাস কর্তৃক সম্পাদিত “বাংলার কথা” পত্রিকায় কে. মল্লিক একটি তথ্য প্রকাশ করেন। সেখানে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত মননিবেশ সম্পর্কে নজরুলের একটি উক্তি প্রকাশ করেন “আমি মূলত : জমির উদ্দীন খাঁকেই আমার শাস্ত্রীয় শিক্ষাগুরু মনে করি কারণ আজকের ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল, টপ্পা ও ঠুমরী পর্যায়ের গান রচনা তাঁর কল্যানেই সাধিত হয়েছে।
ঠুমরী :
টপ্পার রাগিনীতে যে গান আদ্ধা, কাওয়ালী, যৎ ও ঠুমরী তালে গাওয়া হয়, তাকেই ঠুমরী গান বলা হয় ।
প্রেক্ষাপট ও উৎস :
রাগ প্রধান তথা রাগ ও তাল সৃষ্টির শুরু থেকেই নজরুল ঠুমরী পর্যায়ের গান রচনায় ব্রতি হন। বিভিন্ন সুরের সমন্বয়কে একটি ধারায় বর্ণিত করবার চেষ্টায় সার্থক প্রকাশ ঠুমরী ।

ঠুমরীর উদ্ভব :
ভারতের লক্ষ্ণৌকে ঠুমরীর উদ্ভব হিসাবে ধরে নেয়া যায়। ওস্তাদ সাদিক আলীখাঁকে ঠুমরীর প্রবর্তক হিসাবে ধরে নেয়া যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে গবেষনা করে দেখা গিয়েছে যে, গোলাম নবী ঠুমরী পর্যায়ের গানের প্রবর্তন করেন।
ঠুমরীর বৈশিষ্ট্যসমূহ :
১. শৃঙার রসাত্মক রাগ।
২. শুদ্ধ,শালংক শ্রেণীর রাগের প্রয়োগ লক্ষ্যণীয়
৩. গায়কিতে ভিন্ন ধরনের আমোজ সৃষ্টি।
৪. ঠুমরীর পরিবেশনা শিল্পীর উপর অনেকাংশ নির্ভরশীল
৫. মাধুর্য্য, লালিত্যে এবং সৌকুমার্য এর দিক দিয়ে ঠুরমী মহীয়সী ও প্ৰাণবন্ত ৷
৬. ঠুমরীর সার্থক পরিবেশনায় সুমধুর কণ্ঠস্বর আবশ্যকীয় ৷
৭. সকল রাগের ক্ষেত্রে ঠুমরী পরিবেশন সম্ভব নয়।
৮. বিভিন্ন ভাষায় ঠুমরী রচনা উপস্থাপনা ৷
৯. পরিবেশনা বা বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে ক্ষেত্র বিশেষে বৈচিত্র্যময়
১০. শুদ্ধ ও শালংক রাগে ঠুমরী রচনা হলেও পরিবেশনার সময় ইহা বিভিন্ন রাগে বিচরণ করে।
ঠুমরীর প্রকার :
উৎপত্তির শুরু থেকেই দুইধরনের ঠুমরীর লক্ষ্য করা যায়। একটি পূরবী ও অন্যটি পাঞ্জাবী। নজরুলের ঠুমরী পর্যায়ের গানে এ দুটি ধারাকে একত্রিত করে বহুমুখী সমন্বয় সাধন করেছ ৷

বিষয়বস্তু :
শাস্ত্রীয় ও নজরুলের ঠুমরীর বিষয়বস্তুর প্রেম ও বিরহ ভিত্তিক। অনেক ঠুমরীর বিষয় বিশ্লেষণ করে দেয়া যায় কখনো তা আধ্যাত্মিক ধারাটিকে ছুয়ে যায়। শিল্পী সার্থকরূপে ঠুমরী পরিবেশনের সময় বিষয়ভিত্তিক আবেদন-কে দর্শক সম্মুখে উপস্থাপন করেন।
ঠুমরীতে ব্যবহৃত রাগ :
শাস্ত্রীয় ও নজরুল সৃষ্ট ঠুমরীতে যে সকল রাগের ব্যবহার হতে দেখা যায় তা হলো কাফি, খাম্বাজ, পিলু, দেশ, বাঁরোয়া, কাফি-খাম্বাজ, গারা- খাম্বাজ, ঝিঁঝিট ইত্যাদি।
তালের ব্যবহার :
তাল হিসাবে দাদারা, কাহার্বা, যত্, আদ্ধা ঠুমরী, কাওয়ালী, পাঞ্জাবী ইত্যাদির ব্যহবার সচরাচর লক্ষ্যণীয়।
অবয়ব :
শাস্ত্রীয় ও লঘু, উভয় ঠুমরীর ক্ষেত্রেই স্থায়ী ও অন্তরা এই দুইটি বিভক্তিই নির্ধারিত। অর্থাৎ স্থায়ী ও অন্তরার সমন্বয় সাধনের মধ্যেই ঠুমরী পরিবেশিত হয়।
শব্দ ও বাক্যের সমন্বয় :
ঠুমরী বিশেষ করে বিষয়বস্তুর উপর নির্ভর করে বাণী রচিত। শব্দের গাঁথুনি পরিমার্জিত ভাবে বাক্য গঠনে সহায়তা করেছে। রচিয়তাগণ অনেকক্ষেত্রেই সুর সৃষ্টির পরেও বাণী পরিবর্তন করে থাকেন, যার জন্যে ঠুমরীর ক্ষেত্রে বাণী ও সুরের সংযোগে একটি বিশেষ গীতিরীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ।

গীতিশৈলী :
শাস্ত্রীয় ও নজরুলের ঠুমরীর গীতিশৈলী একই ধারা বহন করে। প্রথমে শুদ্ধ, শালংকশ্রেণীর রাগ হিসাবে সামান্য আলাপ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় পরবর্তীতে স্থায়ী অংশ পরিবেশন। শিল্পীর ক্ষমতানুসারে স্থায়ীর অংশেমুক্ত সুর বিন্যাসের অনুভূতি প্রকাশ পায় যা, বাণী সংযোগেও পরিবেশিত হয়।
বহুমুখী বিস্তারের পরে অন্তরার অনুপ্রবেশ ঘটে। অন্তরা গাইবার পর তার সপ্তকে ও মধসপ্তকে বিস্তার অংশ ঠুমরীকে বৈশিষ্ট্য প্রকাশে সহায়তা করে। স্থায়ী ও অন্তরার বিস্তার সম্পন্নের পর শিল্পীকে বিভিন্ন রাগের মিশ্রণ ঘটাতে দেখা যায় যা দর্শক শ্রোতাকে করে আবেশপুষ্ট।
অন্তরার, বিস্তারের পরে স্থায়ী অংশে ফিরে এসে তবলার বিভিন্ন মুখী বাহ্যিক প্রকাশ ঘটে যাকে আমরা লগগী বলে থাকি। লগ্গীর সামান্য পরে ঠুমরী পরিবেশনের যবনিকা টানা হয়।
উপসংহার :
শাস্ত্রীয় ঠুমরী ও নজরুল সৃষ্ট ঠুমরী প্রায় সমপর্যায়ের, তবুও শাস্ত্রীয় ঠুমরীর প্রচার, প্রসার ও ব্যাপকতা অনেক বেশি দেখা যায়। কাজী নজরুল ইসলামের ঠুমরী একটি সার্থক রূপ । তবে, একথা বলা যায় শাস্ত্রীয় ঠুমরী বা নজরুলের সৃষ্ট ঠুমরী কোনটিই শাস্ত্রীয়সঙ্গীতে বিশেষ পারদর্শিতা ছাড়া পরিবেশন সম্ভব নয়।
বিশেষ পরিবেশনা ছাড়া নজরুলের ঠুমরীর প্রচার দেখা যায় না। অবশেষে বলা যায়, কাজী নজরুলের ঠুমরী, তাঁর সঙ্গীত ভাণ্ডারের কাঠামোকে দৃঢ় করতে এবং পর্যায়ক্রমিক সঙ্গীত রচনার ধারাকে পরিপূর্ণ করতে সার্থক অবদান রেখেছে।

