স্বদেশের প্রতি অন্ধ স্তুতি নয়, বরং জাতির গভীর আত্মপ্রবঞ্চনা, অলসতা এবং শতাব্দীপ্রাচীন সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র আত্মধিক্কারের এক বিপ্লবী সৃষ্টি “স্বদেশ আমার জানি না তোমার”। কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী সংগীতগ্রন্থ ‘গুল বাগিচা’-র (১৯৩৩) অন্তর্ভুক্ত এই স্বদেশী গানে পরাধীনতার মূল কারণ হিসেবে বহিঃশত্রুর চেয়েও সমাজের অভ্যন্তরীণ অনৈক্য ও নিষ্পেষণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। শাস্ত্রীয় কেদারা রাগের ভাবগম্ভীর বিস্তার এবং একতালের ধীর ও সংযত লয়ে রচিত এই গানে কবি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন—যাদের আমরা ‘ক্ষুদ্র, ম্লেচ্ছ, কাঙাল’ ভেবে যুগ যুগ ধরে চরণে দলিত করে রেখেছি, সেই অন্ত্যজ ও শোষিত মানুষকে বুকে জড়িয়ে প্রায়শ্চিত্ত না করা পর্যন্ত পরাধীন ভারতমাতার মুক্তি বা প্রকৃত শুভদিনের সূচনা অসম্ভব।
Table of Contents
Toggleগানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| শিরোনাম | স্বদেশ আমার! জানি না তোমার শুধিব মা কবে ঋণ |
| পর্যায় | দেশাত্মবোধক পর্যায় (স্বদেশী গান / সাম্যবাদী জাগরণ) |
| সংগীত সংকলন | গুল বাগিচা (প্রথম সংস্করণ: ২৭ জুন ১৯৩৩ / ১৩৪০ বঙ্গাব্দ) |
| প্রকাশক | গ্রেট ইস্টার্ন লাইব্রেরি (মূল্য: এক টাকা) |
| রেকর্ডিং সংস্থা | স্বদেশী মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানী |
| উৎসর্গ | জিতেন্দ্রনাথ ঘোষ (স্বদেশী মেগাফোন-রেকর্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী) |
| গীতিকার ও সুরকার | কাজী নজরুল ইসলাম |
| সংগীতধারা | নজরুল সঙ্গীত (রাগাশ্রয়ী স্বদেশী গান) |
| রাগ | কেদারা |
| তাল | একতাল (১২ মাত্রা: ২+২+২+২+২+২) |
| মূল উপজীব্য | পরাধীনতার গ্লানি, আত্মপ্রবঞ্চনা ও অলসতার ধিক্কার, অস্পৃশ্যতা ও জাতপাতের প্রায়শ্চিত্ত, এবং সামাজিক সাম্যভিত্তিক জাতীয় মুক্তি |
| প্রধান চিত্রকল্প | ঋণের দায়, ললাট-লিখন, পাগলের ব্যথাশূন্যতা, শতাব্দীব্যাপী পাপ, পদদলিত কাঙাল-ম্লেচ্ছ, চরণের ধূলি, ব্যথা-মলিন জননী |
| আবেগীয় আবহ | গভীর অনুশোচনা, আত্মধিক্কার, বেদনাভারাক্রান্ত আর্তি ও বিপ্লবী সংকল্প |
স্বদেশ আমার জানি না তোমার গানের কথা:
স্বদেশ আমার! জানি না তোমার শুধিব মা কবে ঋণ।
দিনের পরে মা দিন চ’লে যায় এলো না সে শুভদিন।।
খাই দাই আর আরামে ঘুমাই
পাগলের যেন ব্যথা-বোধ নাই
ললাট-লিখন বলিয়া এড়াই ভীরুতা, শক্তি ক্ষীণ।
অভাগিনী তুমি, সন্তান তব সমান ভাগ্যহীন।।
কত শতাব্দী করেছি মা পাপ মানুষেরে করি ঘৃণা
জানি মা মুক্তি পাব না তাহার প্রায়শ্চিত্ত বিনা।
ক্ষুদ্র ম্লেচ্ছ কাঙাল ভাবিয়া
রেখেছি যাদেরে চরণে দাবিয়া
তাদের চরণ-ধূলি মাখি যদি আসিবে সে শুভদিন
নূতন আলোকে জাগিবে পুলকে জননী ব্যথা-মলিন।।
Shodesh Amar Jani Na Tomar Gaaner Kotha:
Shodesh amar! Jani na tomar shudhbo ma kobe rin.
Diner pore ma din chole jay elo na se shubhodin.
Khai dai ar arame ghumai
Pagoler jeno byatha-bodh nai
Lolat-likhon boliya erai bhiruta, shokti khin.
Obhagini tumi, shontan tobo shoman bhaggo-hin.
Koto shotabdi korechi ma pap manushere kori ghrina
Jani ma mukti pabo na tahar prayoshchitto bina.
Khudro mlechchho kangal bhabiya
Rekhechi jader-e chorone dabiya
Tader choron-dhuli makhi jodi ashbe se shubhodin
Notun aloke jagibe puloke jononi byatha-molin.
গানের মূল ভাব
“স্বদেশ আমার জানি না তোমার” গানটির মূল ভিত্তি হলো নজরুলের আপসহীন সাম্যবাদী চেতনা এবং জাতীয় চরিত্রহননকারী ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন। যেখানে বেশিরভাগ দেশাত্মবোধক গান কেবল দেশের রূপ ও সৌন্দর্যের জয়গানে সীমাবদ্ধ, সেখানে নজরুল এক নির্মম সত্যের আয়না দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছেন। পরাধীনতার দাসত্বে বন্দি থেকেও জাতি যখন কেবল খেয়ে-ঘুমিয়ে নিশ্চিন্তে দিন কাটায় এবং নিজের কাপুরুষতাকে ‘ভাগ্যের দোষ’ বা ‘ললাট-লিখন’ বলে সান্ত্বনা খোঁজে, কবি সেই নির্লজ্জ উদাসীনতাকে উন্মাদ বা পাগলের চৈতন্যহীনতার সাথে তুলনা করেছেন।
গানটির দ্বিতীয় অর্ধাংশে উঠে এসেছে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সাহসী রাজনৈতিক ও মানবিক আত্মোপলব্ধি। কবি স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়েছেন যে ব্রিটিশদের দাসত্ব আসলে ভারতবর্ষের দীর্ঘ শতাব্দীর অভ্যন্তরীণ পাপের শাস্তি। যে সমাজে মানুষকে জাতপাত, ধর্ম বা দারিদ্র্যের কারণে ‘ম্লেচ্ছ ও ছোটলোক’ আখ্যা দিয়ে পায়ের নিচে পিষ্ট করে রাখা হয়েছে, সেই সমাজে ঐশ্বরিক সুবিচার হতে পারে না। এই ঐতিহাসিক পাপের একমাত্র প্রায়শ্চিত্ত হলো সেই অপমানিত ও দলিত মানুষের পায়ের ধুলো মাথায় নিয়ে তাদের বুকে জড়িয়ে ধরা। তবেই অভাগিনী ভারতমাতার মুখের কালিমা ঘুচে এক পরম আনন্দের মুক্ত শুভদিন উদিত হবে।
চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. অনাদায়ী ঋণ ও পরাধীনতার দিনযাপন
- “স্বদেশ আমার! জানি না তোমার শুধিব মা কবে ঋণ / দিনের পরে মা দিন চ’লে যায় এলো না সে শুভদিন…”গানটির সূচনাই হয় সন্তান হিসেবে মাতৃভূমির প্রতি অপরিশোধিত দায়িত্বের এক গভীর গ্লানি দিয়ে। মুক্তির শুভদিন কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানোর মতো আপনা-আপনি আসে না—এই সত্যের মুখে দাঁড়িয়ে কবির বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২. ভোগলিপ্সা, ভীরুতা ও ভাগ্যের দোহাই
- “খাই দাই আর আরামে ঘুমাই, পাগলের যেন ব্যথা-বোধ নাই / ললাট-লিখন বলিয়া এড়াই ভীরুতা, শক্তি ক্ষীণ…”জাতির নির্লজ্জ অসংবেদনশীলতার বিরুদ্ধে চাবুকের মতো আঘাত। দেশ যখন বন্দিশালায় গোঙাচ্ছে, তখন মধ্যবিত্ত সমাজ নিজের ভীরুতা ও দুর্বলতাকে অদৃষ্টের লিখন বলে এড়িয়ে গিয়ে আহার-নিদ্রার সুখ ভোগ করছে। এই চৈতন্যহীনতাকে কবি তীব্র ঘৃণায় ধিক্কার জানিয়েছেন।
৩. শতাব্দীপ্রাচীন জাতপাতের পাপ ও প্রায়শ্চিত্ত
- “কত শতাব্দী করেছি মা পাপ মানুষেরে করি ঘৃণা / জানি মা মুক্তি পাব না তাহার প্রায়শ্চিত্ত বিনা…”সামাজিক অস্পৃশ্যতা ও বৈষম্যের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ। ব্রিটিশদের পরাধীনতার শিকল মূলত বহু শতাব্দী ধরে মানুষকে মানুষ হিসেবে অস্বীকার করার এবং ধর্মের নামে ঘৃণা ছড়ানোর পাপের ফল। নৈতিক ও মানবিক প্রায়শ্চিত্ত ছাড়া কখনোই রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ সম্ভব নয়।
৪. অন্ত্যজের পদধূলি ও মায়ের পুলকিত জাগরণ
- “ক্ষুদ্র ম্লেচ্ছ কাঙাল ভাবিয়া রেখেছি যাদেরে চরণে দাবিয়া / তাদের চরণ-ধূলি মাখি যদি আসিবে সে শুভদিন / নূতন আলোকে জাগিবে পুলকে জননী ব্যথা-মলিন…”গানটির চরম উত্তরণ ও মুক্তির শর্ত। যাদেরকে তথাকথিত উচ্চবর্ণ বা সমাজপতিরা যুগ যুগ ধরে পদদলিত করে রেখেছে, তাদের মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়ে চরণধূলি গায়ে মাখার মাধ্যমেই জাতীয় ঐক্যের শুভদিন আসবে। নির্যাতিত জনতার ক্ষমতায়নের মাধ্যমেই দুঃখিনী ভারতমাতার ব্যথা-মলিন মুখ নতুন আলোর পুলকে উদ্ভাসিত হবে।
বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন
সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
- সাম্যবাদী মানবতাবাদ (Egalitarian Philosophy): রবীন্দ্রনাথের “হে মোর দুর্ভাগা দেশ” কবিতার আত্মশুদ্ধির ভাবধারার সাথে নজরুলের এই গানের এক আত্মিক যোগসূত্র রয়েছে। মানুষে মানুষে কৃত্রিম ভেদাভেদ ঘুচিয়ে মুক্তির পথ খোঁজার দর্শন এখানে প্রধান।
- কঠোর ব্যঙ্গ ও আত্মসমালোচনা: “খাই দাই আর আরামে ঘুমাই / পাগলের যেন ব্যথা-বোধ নাই”—জাতীয় জড়তার এমন নিখুঁত ও তীক্ষ্ণ কাব্যিক আঘাত বাংলা সাহিত্যে বিরল।
- শব্দচয়ন ও অনুপ্রাস: ‘ঋণ-শুভদিন-হীন’, ‘ঘুমাই-নাই’, ‘ঘৃণা-বিনা’ এবং ‘দাবিয়া-মাখি যদি’-র মতো সাবলীল অন্তঃমিল বক্তব্যকে অত্যন্ত ঋজু ও ধারালো করেছে।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা
- কেদারা রাগের আত্মমগ্ন বিস্তার: গানটি কল্যাণ ঠাটের অন্তর্গত গম্ভীর ও আর্তিপ্রধান রাগ ‘কেদারা’-র ওপর প্রতিষ্ঠিত। কেদারার সুষম অবরোহণ ও মীড়ের কাজ বাণীর ভেতরের জাতীয় লজ্জা ও গভীর অনুশোচনাকে এক উদাত্ত ও ভাবগম্ভীর রূপ দান করে।
- একতালের ধীর ও সুসংহত লয়: ১২ মাত্রার একতালের শান্ত প্রবাহ গানের প্রতিটি শব্দের দার্শনিক গুরুত্বকে আত্মস্থ করার অবকাশ দেয়। এটি কোনো উচ্চকিত স্লোগান নয়, বরং এক জাতির অন্তরাত্মার গভীর আত্মানুসন্ধান।
- সুর ও কাব্যের মেলবন্ধন: সুরের আরোহী অংশে অন্ত্যজ মানুষের জাগরণের প্রত্যয়টি যখন ধ্বনিত হয়, তখন তা কেবল বেদনা প্রকাশ না করে এক বলিষ্ঠ আশাবাদের সঞ্চার করে।
শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি
- কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬): মানবতার মহান কবি ও অবিসংবাদিত সংগীতস্রষ্টা। নজরুল কেবল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কবি ছিলেন না; তিনি সমাজের অভ্যন্তরে গেড়ে বসা বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও সামন্তবাদী শোষণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় কণ্ঠস্বর ছিলেন।
- গুল বাগিচা ও স্বদেশী মেগাফোন রেকর্ড: ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত ‘গুল বাগিচা’ গ্রন্থে সংকলিত এই গানটি মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় এবং মুক্তিকামী দেশপ্রেমিকদের চেতনাকে নতুনভাবে উদ্বুদ্ধ করে।
- বিশিষ্ট রূপায়ণ: বিশিষ্ট নজরুলসংগীত শিল্পী মৃত্তিকা দাস সহ বহু প্রতিষ্ঠিত কণ্ঠশিল্পীর গম্ভীর পরিবেশনায় গানটি তাঁর স্বদেশী ও রাগপ্রধান ধারার এক অমর সৃষ্টি হিসেবে নিয়মিত গীত হয়ে আসছে।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
উৎস ও তথ্যসূত্র
- গুল বাগিচা (প্রথম সংস্করণ, ১৩৪০ বঙ্গাব্দ / ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দ), কাজী নজরুল ইসলাম, গ্রেট ইস্টার্ন লাইব্রেরি, কলকাতা।
- নজরুল রচনাবলী ও স্বদেশী গান সংকলন, নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
- নজরুল সঙ্গীত পরিক্রমা ও রাগ-বিশ্লেষণ, সুফি জুলফিকার হায়দার।
স্বদেশ আমার [ নজরুল সঙ্গীত ] – মৃত্তিকা দাস:
























