শিল্পনন্দন ও সাহিত্যতত্ত্ব প্রশ্নে নজরুলের বক্তব্য

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এমন এক সাহিত্যিক, যিনি কেবল রাজনৈতিক বা সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, নন্দনতত্ত্ব ও সাহিত্যতত্ত্বের দার্শনিক আলোচনাতেও অনন্য অবদান রেখেছেন। তাঁর রচনা ও চিন্তায় শিল্পের উদ্দেশ্য, সাহিত্যের ভূমিকা এবং সমাজের সঙ্গে নন্দনের সম্পর্ক নিয়ে এক গভীর তাত্ত্বিক উপলব্ধি বিদ্যমান।

 

শিল্পনন্দন ও সাহিত্যতত্ত্ব প্রশ্নে নজরুলের বক্তব্য

 

শিল্পনন্দন ও সাহিত্যতত্ত্ব প্রশ্নে নজরুলের বক্তব্য

 

উপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে শিল্প ও নন্দন

উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিংশ শতকের প্রথমভাগে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের কারণে ভারতীয় সমাজে ইউরোপীয় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শিল্পতত্ত্বের ব্যাপক প্রভাব পড়ে। উপনিবেশবাদ শুধু রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করেনি; এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক আধিপত্য (Cultural Imperialism) প্রতিষ্ঠা করেছিল, যার ফলে ভারতীয় সমাজে “উচ্চ সংস্কৃতি” বলতে পশ্চিমা নন্দনতত্ত্বকেই আদর্শ হিসেবে গণ্য করা হতো।

এই প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠে কলকাতাকেন্দ্রিক তথাকথিত ‘বাবু সংস্কৃতি’, যার শিল্প ও সাহিত্যচর্চা ছিল অভিজাত শ্রেণির ভোগবাদী রুচির প্রতিফলন। এখান থেকেই জন্ম নেয় বেঙ্গল রেনেসাঁস, যেখানে সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা ও নাট্যচর্চায় পাশ্চাত্য শিল্পরীতি ও মানবতাবাদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তবে এই পুনর্জাগরণ ছিল মূলত এক সীমিত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ— এটি গণমানুষের জীবনবোধ ও বাস্তবতার সঙ্গে তেমন সংযোগ স্থাপন করতে পারেনি।

রবীন্দ্রনাথের নন্দনতত্ত্ব ও নজরুলের পথচলা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পাশ্চাত্য প্রভাবিত প্রবণতার মধ্যেও এক বিশ্বজনীন কিন্তু ভারতীয় মর্মসম্পন্ন নন্দনতত্ত্ব নির্মাণের চেষ্টা করেন। তাঁর সৃষ্টিতে মানুষ, প্রকৃতি ও ঈশ্বর — এই ত্রিবেণীর মিলন ঘটে, যা বিশ্বমানবতাবাদের দিকে ইঙ্গিত করে।

নজরুল রবীন্দ্রনাথের এই নন্দনতত্ত্বকে গভীরভাবে অনুধাবন করেন, কিন্তু নিজের পথ বেছে নেন অন্যভাবে। তিনি কেবল নান্দনিক প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং শিল্পকে মানবমুক্তির সংগ্রাম ও সামাজিক বিপ্লবের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর কাছে সাহিত্য কেবল রূপ বা সৌন্দর্যের অন্বেষণ নয় — এটি বিপ্লবী সৃষ্টিশক্তির প্রকাশ, যা অন্যায়, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে।

নজরুলের শিল্পদর্শন: নন্দনের সঙ্গে সংগ্রামের সংযোগ

নজরুল বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য ও শিল্পের সত্যিকার মূল্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তা মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে যায়। তাই তিনি নন্দনের ভাবনা থেকে বিমূর্ত সৌন্দর্যের পরিবর্তে জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তব নন্দনকে প্রাধান্য দেন।

তাঁর মতে—

“যে শিল্প মানুষের হৃদয় ছুঁতে পারে না, যে সাহিত্য দুঃখিতের চোখে অশ্রু আনতে পারে না, সেটি মৃত শিল্প, মৃত সাহিত্য।”

এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, নজরুলের শিল্পতত্ত্ব সম্পূর্ণরূপে মানবকেন্দ্রিক (Humanistic) এবং সমাজমুখী। তিনি শিল্পে শুধু রূপ বা সঙ্গতি নয়, চেয়েছেন চেতনার দীপ্তিজীবনের সত্য প্রকাশ

উপনিবেশবিরোধী নন্দনবোধ ও নজরুল

নজরুল ইউরোপীয় নন্দনতত্ত্বের প্রভাবকে স্বীকার করলেও তাতে আত্মসমর্পণ করেননি। বরং তিনি একটি স্বদেশচেতন, উপনিবেশবিরোধী নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলেন, যার শিকড় নিহিত ছিল ভারতের লোকজ, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যে।

তিনি বুঝেছিলেন, ইউরোপীয় নন্দনচেতনা ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যের উপর নির্ভরশীল; কিন্তু ভারতীয় শিল্পচেতনা সমষ্টির, জনগণের। তাই তিনি বলেছিলেন—

“আমি জনগণের কবি, আমি তাদের ব্যথা নিয়ে গান গাই, তাদের হাসি-কান্নায় আমার ছন্দ খুঁজে পাই।”

নজরুলের নন্দনতত্ত্বের এই বৈশিষ্ট্যই তাঁকে করে তুলেছিল উপনিবেশ-পূর্ব ও উপনিবেশ-বিরোধী শিল্পদর্শনের অন্যতম প্রতিনিধি

লোকজ জীবন, ছন্দ ও নন্দন

রবীন্দ্রনাথ যেখানে লোকজ জীবনের ছন্দ ও সুরকে গভীর অধ্যবসায়ে সাহিত্যক্ষেত্রে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেখানে নজরুল সেই লোকজ উচ্ছ্বাসকে আরও তীব্রভাবে, আরও গতিময় ছন্দে, এক প্রবল জীবনবোধে প্রকাশ করেছেন।
তাঁর গানের দোল, কবিতার ছন্দ, নাটকের সংলাপ—সবখানেই আছে গ্রামের মাঠ, দরিদ্র মানুষের প্রাণ, ধর্মীয় উৎসবের সুর ও বিদ্রোহের আগুন।

এই কারণে বলা হয়, নজরুল ছিলেন বাংলার জনগণের নন্দনচেতনার শিল্পী। তিনি যেমন রণতুর্য বাজিয়েছেন, তেমনি প্রেমের বাঁশিও বাজিয়েছেন।
তাঁর শিল্প ছিল neither elitist nor escapist— বরং grounded, inclusive, and revolutionary

বাবু সংস্কৃতির বিপরীতে নজরুলের নন্দনচিন্তা

নজরুলের সাহিত্যিক উপস্থিতি ছিল উপনিবেশিক “বাবু সংস্কৃতি”-র বিপরীতে এক সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ।
যেখানে অভিজাত সমাজ পশ্চিমা রুচি ও নন্দনের অনুকরণে ব্যস্ত ছিল, সেখানে নজরুল নিজের শিল্পে এনেছিলেন মাঠের ধুলা, দরিদ্রের ঘাম, কৃষকের কণ্ঠস্বর, কারারুদ্ধ মানুষের আর্তি।
এই গণমুখী নন্দনচিন্তা উপনিবেশিক নন্দনবাদের ভিত্তিকে নাড়া দিয়েছিল।

তাঁর কবিতা ও গানে শ্রেণি, ধর্ম, জাতিগত বিভাজন মুছে দিয়ে তিনি এক নতুন সাম্যবাদী নন্দনতত্ত্ব উপস্থাপন করেন, যা মানুষের মুক্তিকে শিল্পের প্রধান লক্ষ্য করে তোলে।

কাজী নজরুল ইসলাম

সবশেষে বলা যায়, নজরুলের শিল্পনন্দন ও সাহিত্যতত্ত্ব ইউরোপীয় সৌন্দর্যচেতনার অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং তা একটি মুক্তচিন্তার, উপনিবেশবিরোধী, মানবিক শিল্পদর্শন
তাঁর সাহিত্য একদিকে যেমন সৌন্দর্যের অনুসন্ধান, তেমনি অন্যদিকে তা ন্যায় ও মানবমুক্তির আহ্বান।

নজরুলের শিল্পের লক্ষ্য তাই কেবল রসসৃষ্টি নয়, বরং—

“মানুষকে জাগানো, মানুষকে মুক্ত করা, মানুষকে ভালোবাসা।”

এই কারণেই আজও তাঁর সাহিত্যচিন্তা সমকালীন, তাঁর নন্দনচেতনা সর্বকালীন।

Leave a Comment