বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের শেষ পর্বের অমর জীবনীকাব্য ‘মরুভাস্কর’-এর (১৯৫১) অন্যতম হৃদয়স্পর্শী ও জ্যোতির্ময় খণ্ড-কবিতা “আলো আঁধারি”। শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবনীর পটভূমিতে রচিত এই কাব্যে পুত্রশোকের নিদারুণ অন্ধকার থেকে নিখিলের মুক্তির আলোকবর্তিকার উদয়কে অপূর্ব মহিমায় রূপায়িত করা হয়েছে। কনিষ্ঠ পুত্র আব্দুল্লাহর অকালমৃত্যুতে বৃদ্ধ পিতামহ আব্দুল মুত্তালিব ও বিধবা মাতা আমিনার বুকভাঙা হাহাকারের প্রেক্ষাপটে বিশ্বনবীর শুভ জন্ম কীভাবে আরবের মরুপ্রান্তরে স্বর্গের আশীর্বাদ ও অলৌকিক আশার আলো জ্বেলে দিয়েছিল—কবিতাটি সেই ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক সত্যের এক অনুপম কাব্যগাথা।
Table of Contents
Toggleকবিতার বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| কবিতার নাম | আলো আঁধারি |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | মরুভাস্কর (প্রথম প্রকাশ: ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দ / ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ) |
| গ্রন্থের বিন্যাস | ৪টি সর্গ এবং মোট ১৮টি খণ্ড-কবিতা সংবলিত সিরাতকাব্য |
| কবি | কাজী নজরুল ইসলাম |
| মূল বিষয়বস্তু | হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শুভ জন্ম, পিতামহ আব্দুল মুত্তালিবের পুত্রশোক ও আনন্দ, অলৌকিক স্বপ্নদর্শন ও নামাকরণ |
| প্রধান চরিত্র | আব্দুল মুত্তালিব, বিবি আমিনা, শিশু মুহাম্মদ (সা.), কুরাইশ সর্দারবৃন্দ |
| প্রধান চিত্রকল্প | সাহারা-মরু, শোকের শুভ্রশিখা, সাফা-মারওয়া পর্বতের কম্পন, স্বর্গের পাখি, ললাটের দিব্যজ্যোতি, কাবার মুনাজাত |
| আবেগীয় আবহ | বিষাদ থেকে পরম আনন্দোচ্ছ্বাস, আধ্যাত্মিক বিস্ময়, বাৎসল্য ও চিরন্তন মুক্তির আশ্বাস |
দাদা কবিতা (পুরো কবিতা)
সব-কনিষ্ঠ পুত্র সে প্রিয় আবদুল্লার শোকে,
সেদিন নিশীথে ঘুম নাকো মুত্তালিবের চোখে!
পঁচিশ বছর ছিল যে পুত্র আঁখির পুতলা হয়ে,
বৃদ্ধ পিতারে রাখিয়া মৃত্যু তারেই গেল কি লয়ে!
হয়ে আঁখিজল ঝরে অবিরল পঁচিশ-বছরি স্মৃতি,
সে স্মৃতির ব্যথা যতদিন যায় তত বাড়ে হায় নিতি!
বাহিরে ও ঘরে বক্ষে নয়নে অশ্রুতে তারে খোঁজে
সহসা বিধবা আমিনারে হেরি সভয়ে চক্ষু বোজে!
ওরে ও অভাগি, কে দিল ও বুকে ছড়ায়ে সাহারা-মরু?
অসহায় লতা গড়াগড়ি যায় হারায়ে সহায়-তরু!
আঙনে বেড়ায় ও যেন রে হায় শোকের শুভ্রশিখা,
রজনিগন্ধা বিধবা মেয়েরে লয়ে কাঁদে কাননিকা!
মন্থরগতি বেদনা-ভারতী আমিনা আঙনে চলে,
হেরিতে সহসা মুত্তালিবের আঁধার চিত্ততলে
ঈষৎ আলোর জোনাকি চমকি যায় যেন ক্ষণে ক্ষণে,
আবদুল্লার স্মৃতি রহিয়াছে ওই আমিনার সনে।
আসিবে সুদিন আসিবে আবার, পুত্রে যে ছিল প্রাণ
পুত্র হইতে পৌত্রে আসিয়া হবে যে অধিষ্ঠান।
দিন গোনে মনে মনে আর কয়, ‘বাকি আর কত দিন,
লইয়া অ-দেখা পিতার স্মৃতিরে আসিবি পিতৃহীন!’
মুত্তালিবের আঁধার চিত্তে জ্বলেছে সহসা বাতি,
সেদিন আসিবে যেন শেষ হলে আজিকার এই রাতি!
চোখে ঘুম নাই শূন্যে বৃথাই নয়ন ঘুরিয়া মরে,–
নিশি-শেষে যেন অতন্দ্র চোখে তন্দ্রা আসিল ভরে!
কত জাগে আর লয়ে হাহাকার, আঁধারের গলা ধরি
আর কতদিন কাঁদিবে গো, চোখে অশ্রু গিয়াছে মরি!
আয় ঘুম হায়, হয়তো এবার স্বপনে হেরিব তারে,
বিরাম-বিহীন জাগি নিশিদিন খুঁজিয়া পাইনি যারে!
হেরিল মুত্তালিব অপরূপ স্বপ্ন তন্দ্রা-ঘোরে,–
অভূতপূর্ব আওয়াজ যেন গো বাজিছে আকাশ ভরে!
ফেরেশতা সব যেন গগনের নীল শামিয়ানা-তলে
জমায়েত হয়ে তকবীর হাঁকে, সে আওয়াজ জলে থলে
উঠিল রণিয়া। ‘সাফা’ ‘মারওয়ান’ গিরি-যুগ সে আওয়াজে
কাঁপিতে লাগিল, উঠিল আরাব, ‘আসিল সে ধরা মাঝে!’
কে আসিল ? সে কী আমিনার ঘরে? ছুটিতে ছুটিতে যেন
আসিল যে ঘরে আমিনা! ওকি ও, গৃহের ঊর্ধ্বে কেন
এত সাদা মেঘ ছায়া করে আছে? শত স্বর্গের পাখি
বসিতেছে ওই গেহ-পরি যেন চাঁদের জোছনা মাখি!
ঝুঁকিয়া ঝুঁকিয়া দেখিছে কী যেন গ্রহ তারাদল আসি
আকাশ জুড়িয়া নৌবত বাজে ভুবন ভরিয়া বাঁশি!…
টুটিল তন্দ্রা মুত্তালিবের অপরূপ বিস্ময়ে –
ছুটিল যথায় আমিনা – হেরিল নিশি আসে শেষ হয়ে।
আমিনার শ্বেত ললাটে ঝলিত যে দিব্য জ্যোতি-শিখা,
কোলে সে এসেছে – হাতে চাঁদ তার ভালে সূর্যের টিকা!
সে রূপ হেরিয়া মুর্ছিত হয়ে পড়ল মুত্তালিব,
একী রূপ ওরে একী আনন্দ একী এ খোশনসিব!
চেতনা লভিয়া পাগলের প্রায় কভু হাসে কভু কাঁদে,
যত মনে পড়ে পুত্রে, পৌত্রে তত বুকে লয়ে বাঁধে!
পৌত্রে ধরিয়া বক্ষে তখনই আসিলেন কাবা-ঘরে,
বেদি পরে রাখি শিশুরে করেন প্রার্থনা শিশু তরে।
‘আরশে’ থাকিয়া হাসিলেন খোদা – নিখিলের শুভ মাগি
আসিল যে মহামানব – যাচিছে কল্যাণ তারই লাগি!
ছিল কোরেশের সর্দার যত সে প্রাতে কাবায় বসি
যোগ দিল সেই ‘মুনাজাতে’ সবে আনন্দে উচ্ছ্বসি।
সাতদিন যবে বয়স শিশুর – আরবের প্রথামতো
আসিল ‘আকিকা’ উৎসবে প্রিয় বন্ধু স্বজন যত!
উৎসব শেষে শুধাল সকলে শিশুর কী নাম হবে,
কোন সে নামের কাঁকন পরায়ে পলাতকে বাঁচি লবে।
কহিল মুত্তালিব বুকে চাপি নিখিলের সম্পদ,–
“নয়নাভিরাম! এ শিশুর নাম রাখিনু ‘মোহাম্মদ’!”
চমকে উঠিল কোরেশির দল শুনি অভিনব নাম,
কহিল, ‘এ নাম আরবে আমরা প্রথম এ শুনিলাম।
বনি-হাশেমের গোষ্ঠীতে হেন নাম কভু শুনি নাই,
গোষ্ঠী-ছাড়া এ নাম কেন তুমি রাখিলে, শুনিতে চাই!’
আঁখিজল মুছি চুমিয়া শিশুরে কহিলেন পিতামহ –
“এর প্রশংসা রণিয়া উঠুক এ বিশ্বে অহরহ,
তাই এরে কহি ‘মোহাম্মদ’ যে চির-প্রশংসমান,
জানি না এ নাম কেন এল মুখে সহসা মথিয়া প্রাণ।”
নাম শুনি কহে আমিনা –‘স্বপ্নে হেরিয়াছি কাল রাতে
‘আহ্মদ’ নাম রাখি যেন ওর!’ ‘জননী, ক্ষতি কি তাতে’
হাসিয়া কহিল পিতামহ, ‘এই যুগল নামের ফাঁদে,
বাঁধিয়া রাখিনু কুটিরে মোদের তোমার সোনার চাঁদে!’
একটি বোঁটায় ফুটিল গো যেন দুটি সে নামের ফুল,
একটি সে নদী মাঝে বয়ে যায়, দুইধারে দুই কূল!
Dada Kobita (Puro Kobita)
Shedin nishithe ghum nako Muttaliber chokhe!
Ponchish bochhor chhilo je putro ankhir putola hoye,
Briddho pitare rakhia mrityu tarei gelo ki loye!
Hoye ankhijol jhore obiral ponchish-bochhori smriti,
She smritir byatha jotodin jay toto bare hay niti!
Baire o ghore bokkhe noyone oshrute tare khoje
Shohosa bidhoba Aminare heri shobhoye chokh boje!
Ore o abhagi, ke dilo o buke chhoriye Sahara-moru?
Oshohay lota goragori jay hariye shohay-toru!
Angone beray o jeno re hay shoker shubhrashikha,
Rojonigondha bidhoba meyere loye kande kanonika!
Monthorgoti bedona-bharoti Amina angone chole,
Herite shohosha Muttaliber andhar chittotole
Ishot alor jonaki chomki jay jeno khone khone,
Abdullah-r smriti rohiyaachhe oi Aminar shone.
Ashibe shudin ashbe abar, putre je chhilo pran
Putro hoite poutre ashiya hobe je odhisthan.
Din gone mone mone ar koy, ‘Baki ar koto din,
Loiya o-dekha pitar smritire asibi pitrihin!’
Muttaliber andhar chitte jwoleche shohosha bati,
Shedin ashbe jeno shesh hole ajikaar ei rati!
Chokhe ghum nai shunye brithai noyon ghuriya more,–
Nishi-sheshe jeno otondro chokhe tondra asilo bhore!
Koto jage ar loye hahakar, andharer gola dhori
Ar kotodin kandibe go, chokhe oshru giyechhe mori!
Ay ghum hay, hoyto ebar shopone heribo tare,
Biram-bihin jagi nishidin khunjiya paini jare!
Herilo Muttalib oporup shopno tondra-ghore,–
Obhutpurbo awaj jeno go bajichhe akash bhore!
Fereshota shob jeno gogoner nil shamiyana-tole
Jomayet hoye takbir hanke, she awaj jole thole
Uthilo roniya. ‘Safa’ ‘Marwan’ giri-jug she awaje
Kampite lagilo, uthilo Arab, ‘Asilo she dhora majhe!’
Ke asilo? She ki Aminar ghore? Chhুটite chhুটite jeno
Asilo je ghore Amina! Oki o, griher urdhe keno
Eto sada megh chhaya kore achhe? Shot swarger pakhi
Bositechhe oi geh-pori jeno chander jochhona makhi!
Jhুঁকিয়া jhুঁকিয়া dekhichhe ki jeno groho taradol ashi
Akash juriya nobot baje bhubon bhoriya bashi!…
Tutil tondra Muttaliber oporup bismoye –
Chhutil jothay Amina – herilo nishi ashe shesh hoye.
Aminar shwet lolate jholit je dibbo jyoti-shikha,
Kole she eshechhe – hate chand tar bhale shurjer tika!
She rup heriya murchhito hoye porlo Muttalib,
Eki rup ore eki anondo eki e khoshonshib!
Chetana labhiya pagoler pray kobhu hashe kobhu kande,
Joto mone pore putre, poutre toto buke loye bandhe!
Poutre dhoriya bokkhe tokhoni asilen Kaba-ghore,
Bedi pore rakhi shishure koren prarthona shishu tore.
‘Arshe’ thakiya hashilen Khoda – nikhiler shubho magi
Asilo je mohamanob – jachichhe kollyan tari lagi!
Chhilo Quraish-er sordar joto she prate Kabay boshi
Jog dilo shei ‘munajate’ shobe anonde uchchhhashi.
Shatdin jobe boyosh shishur – Araber protha-moto
Asilo ‘Akika’ utsobe priyo bondhu shojon joto!
Utsob sheshe shudhalo sokole shishur ki nam hobe,
Kon she namer kankon poraye polatoke banchhi lobe.
Kohilo Muttalib buke chhapi nikhiler shompod,–
“Noyonabhiram! E shishur nam rakhinu ‘Mohammad’!”
Chomke uthilo Quraishir dol shuni obhinob nam,
Kohilo, ‘E nam Arab-e amra prothom e shunilam.
Boni-Hashemer goshthite hen nam kobhu shuni nai,
Goshthi-chhara e nam keno tumi rakhile, shunite chai!’
Ankhijol muchhi chুমিয়া shishure kohilen pitamah –
“Er proshongsha roniya uthuk e bishwe ohoroh,
Tai ere kohi ‘Mohammad’ je chiro-proshongshoman,
Jani na e nam keno elo mukhe shohosha mothiya pran.”
Nam shuni kohen Amina – ‘Shopne heriyachhi kal rate
‘Ahmad’ nam rakhi jeno or!’ ‘Jononi, khoti ki tate’
Hashiya kohilo pitamah, ‘Ei jugol namer phande,
Bandhiya rakhinu kutire moder tomar shonar chande!’
Ekti bontay phutil go jeno duti she namer phul,
Ekti she nodi majhe boye jay, duidhare dui kul!
কবিতার মূল ভাব
চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. আব্দুল্লাহর শোক ও আমিনার মৌন আর্তি
- “পঁচিশ বছর ছিল যে পুত্র আঁখির পুতলা হয়ে… আঙনে বেড়ায় ও যেন রে হায় শোকের শুভ্রশিখা…”কাব্যিক বেদনার চরম রূপ। পিতা আব্দুল মুত্তালিবের অশ্রুহীন শূন্য দৃষ্টি এবং বিধবা আমিনার নিঃশব্দ পদচারণাকে কবি তুলনা করেছেন সাহারার রুক্ষ মরুভূমি ও রজনীগন্ধার শুভ্র কান্নার সাথে। কিন্তু সেই নিদারুণ শোকের মাঝেও গর্ভস্থ শিশুর স্মৃতি আব্দুল মুত্তালিবের হৃদয়ে জোনাকির মতো ক্ষণিক আশার আলো জ্বালায়।
২. মহাজাগতিক সুসংবাদ ও স্বপ্নদর্শন
- “ফেরেশতা সব যেন গগনের নীল শামিয়ানা-তলে জমায়েত হয়ে তকবীর হাঁকে… সাফা মারওয়ান গিরি-যুগ সে আওয়াজে কাঁপিতে লাগিল…”ঐতিহাসিক মুহূর্তের অপার্থিব রূপায়ণ। নবীর শুভাগমনে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। নীলাকাশে শুভ্র মেঘের ছায়া, স্বর্গের পাখির সমাবেশ এবং গ্রহ-নক্ষত্রের অবনমিত হয়ে তাকানোর দৃশ্য প্রমাণ করে যে এটি কোনো সাধারণ শিশুর জন্ম নয়, বরং নিখিলের পরিত্রাতার আগমন।
৩. নবজাতকের রূপলাবণ্য ও কাবার আঙিনায় মুনাজাত
- “আমিনার শ্বেত ললাটে ঝলিত যে দিব্য জ্যোতি-শিখা, কোলে সে এসেছে—হাতে চাঁদ তার ভালে সূর্যের টিকা / পৌত্রে ধরিয়া বক্ষে তখনই আসিলেন কাবা-ঘরে…”অন্ধকার চিরে সূর্যের উদয়। নবজাতকের ভালে সূর্যের মহিমা ও কোলে চাঁদের স্নিগ্ধতা দেখে পিতামহ আনন্দে মূর্ছিত হয়ে পড়েন। সঙ্গে সঙ্গে পৌত্রকে বুকে চেপে তিনি পবিত্র কাবার বেদিতে রেখে নিখিলের কল্যাণের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়ার মুনাজাত করেন।
৪. অভিনব নামাকরণ: ‘মুহাম্মদ’ ও ‘আহমদ’
- “নয়নাভিরাম! এ শিশুর নাম রাখিনু ‘মোহাম্মদ’ / এর প্রশংসা রণিয়া উঠুক এ বিশ্বে অহরহ… স্বপ্নে হেরিয়াছি কাল রাতে ‘আহ্মদ’ নাম রাখি যেন ওর…”নামকরণের ঐতিহাসিক তাৎপর্য। আরবের প্রথা ভেঙে কুরাইশ বংশের অপরিচিত নাম ‘মুহাম্মদ’ (চির প্রশংসিত) রাখার কারণ হিসেবে পিতামহ জানান, বিশ্বজুড়ে যেন এই শিশুর প্রশংসা চিরকাল ধ্বনিত হয়। মাতা আমিনার স্বপ্নে পাওয়া ‘আহমদ’ এবং পিতামহের রাখা ‘মুহাম্মদ’—এই দুই মহিমান্বিত নামের যুগল বন্ধনে পরম স্নেহে কুটিরে বাঁধা পড়েন বিশ্বনবী।
বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন
সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
- ঐতিহাসিক সিরাত ও কাব্যিক কল্পনার অপূর্ব সমন্বয়: ইসলামী ইতিহাসের প্রামাণ্য ঘটনাকে নজরুল কোনো শুষ্ক বিবরণে সীমাবদ্ধ না রেখে অত্যন্ত আবেগঘন বাংলা রূপকের আবহে জীবন্ত করে তুলেছেন।
- অনুপম দৃশ্যপট ও চিত্রকল্প: ‘শোকের শুভ্রশিখা’, ‘নীল শামিয়ানা’, ‘ভালে সূর্যের টিকা’ এবং ‘দুটি সে নামের ফুল’—চিত্রকল্পগুলো কবিতার দৃশ্যপটকে চোখের সামনে নাটকের মতো দৃশ্যমান করে তোলে।
- আরবি-ফারসি ও তৎসম শব্দের মেলবন্ধন: ‘মুত্তালিব’, ‘তকবীর’, ‘খোশনসিব’, ‘মুনাজাত’ শব্দের সাথে ‘বেদনা-ভারতী’, ‘নয়নাভিরাম’, ‘দিব্য জ্যোতি-শিখা’-র মতো শব্দের শৈল্পিক সংমিশ্রণ নজরুলের ভাষার সমৃদ্ধিকে প্রমাণ করে।
ছন্দ, রূপকল্প ও নান্দনিক বৈশিষ্ট্য
- পয়ার ও মাত্রাবৃত্তের প্রবাহ: দীর্ঘ আখ্যানধর্মী কবিতাটি পয়ারের চতুর্দশপদী সুষম চালে প্রবহমান। প্রতি চরণের অন্ত্যমিলের নিপুণতা পাঠকে এক গভীর সুরময় আবেশ দান করে।
- নাটকীয় রূপান্তর: শোকাবহ পরিবেশ থেকে হঠাৎ ঐশ্বরিক উৎসবের আবহে রূপান্তরের নাটকীয়তা কবিতার গতিকে অত্যন্ত বেগবান ও আকর্ষণীয় করেছে।
- ভক্তি ও বাৎসল্যের রস: এখানে ভক্তি কেবল দূরবর্তী কোনো শ্রদ্ধা নয়; পিতামহের পৌত্রবাৎসল্য ও জননীর স্নেহের স্পর্শে তা অত্যন্ত মানবিক ও মধুর রূপ ধারণ করেছে।
কবি ও স্রষ্টা পরিচিতি
- কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬): বাঙালির জাতীয় কবি ও মানবতার কণ্ঠস্বর। নজরুলের কাব্যজীবনের এক অনন্য ও অমর অধ্যায় তাঁর রাসুল-প্রেম। ১৯৪২ সালে অসুস্থ হয়ে বাকরুদ্ধ হওয়ার আগে তিনি মহানবীর (সা.) জীবনালেখ্য নিয়ে ‘মরুভাস্কর’ মহাকাব্য রচনার কাজ শুরু করেছিলেন, যা ১৯৫১ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
- মরুভাস্কর কাব্যগ্রন্থ: বাংলা ভাষায় মহানবীর (সা.) পূর্ণাঙ্গ কাব্যিক জীবনচরিত হিসেবে ‘মরুভাস্কর’ এক ঐতিহাসিক সৃষ্টি। এতে রাসুলের জন্ম থেকে শুরু করে ওফাত পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে নজরুল অসাধারণ কাব্যসুষমায় রূপ দিয়েছেন।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
উৎস ও তথ্যসূত্র
- মরুভাস্কর (প্রথম প্রকাশ: ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দ / ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ), কাজী নজরুল ইসলাম।
- নজরুল রচনাবলী (কাব্য ও জীবনী সংকলন), নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
- নজরুল-জীবনী ও কাব্য পরিক্রমা, রফিকুল ইসলাম।























