Editor's Choice

নতুন চাঁদ কাব্যগ্রন্থের ‘দুর্বার যৌবন’ কবিতা — কাজী নজরুল ইসলাম

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘নতুন চাঁদ’ (১৯৩৯) কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, বিদ্রোহী ও উদ্দীপনামূলক কবিতা হলো ‘দুর্বার যৌবন’। এই কবিতায় কবি তারুণ্যের অদম্য শক্তি, বাঁধনহারা উল্লাস এবং প্রচলিত সমাজব্যবস্থা ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে যৌবনের বিদ্রোহকে বন্দনা করেছেন।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামদুর্বার যৌবন
কবির নামকাজী নজরুল ইসলাম
মূল কাব্যগ্রন্থনতুন চাঁদ
প্রকাশের বছর১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ
কবিতার ধরনবিদ্রোহী ও যৌবন-বন্দনামূলক কবিতা (Rebellious ode to youth)

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

যারা নীতি ও মিথ্যা সংযমের দোহাই দিয়ে তারুণ্যের এই প্রবহমান ও বাধাহীন সৃজনশীল শক্তিকে দমিয়ে রাখতে চায়, কবি এই কবিতায় তাদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তারুণ্য কোনো হিসাব-নিকাশ বা লাভ-ক্ষতির তোয়াক্কা করে না; যৌবন হলো প্রলয়ংকরী বন্যার মতো, যা পথের সব বাধা ও আবর্জনা ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ধ্বংসের মাঝেই যে নতুন সৃষ্টির বীজ নিহিত এবং তারুণ্যের এই অকারণ উল্লাসই যে পরাধীন ও জরাগ্রস্ত জাতিকে মুক্ত করতে পারে—এটাই এই কবিতার মূল সুর।

দুর্বার যৌবন কবিতা (পুরো কবিতা):

ওরে অশান্ত দুর্বার যৌবন!
পরাল কে তোরে জ্ঞানের মুখোশ সংযম-আবরণ?
ভিতরের ভীতি ঢাকিতে রে যত নীতি-বিলাসীরা ছলে
উদ্ধত যৌবন-শক্তিরে সংযত হতে বলে।
ভাবে, ভাঙনের গদা লয়ে যদি যৌবন মাতে রণে,
গুড়ুক টানিতে পারিবে না বসে সোনার সিংহাসনে!

ওরে দুরন্ত! উড়ন্ত তোর পাখা কে বাঁধিল বল?
দীপ্ত জ্যোতির্শিখায় ঢাকিল শীর্ণ জরাঞ্চল?
ওরে নির্ভীক! ভিখ-মাগা যত পঙ্গুর দলে ভিড়ে –
আঁধার নিঙাড়ি আলো আনিত যে – সে রহিল বাঁধা নীড়ে!

যাহাদের মেরুদণ্ডে লেগেছে মেরুর হিমেল হাওয়া,
যাহাদের প্রাণ শক্তিবিহীন কঠিন তুহিনে ছাওয়া
তাদের হুকুমে প্রাণের বিপুল বন্যা রাখিলি রুখে?
মরুর সিংহ মার খায় সার্কাসি পিঞ্জরে ঢুকে।

সৃষ্টির কথা ভাবে যারা আগে সংহারে করে ভয়,
যুগে যুগে সংহারের আঘাতে তাদের হয়েছে লয়।
কাঠ না পুড়ায়ে আগুন জ্বালাবে বলে কোন অজ্ঞান?
বনস্পতির ছায়া পাবে বীজ নাহি দিলে তার প্রাণ!
তলোয়ার রেখে খাপে এরা, ঘোড়া রাখিয়া আস্তাবলে
রণজয়ী হবে দম্ভবিহীন বৈদান্তিকী ছলে!
প্রাণ-প্রবাহের প্রবল-বন্যা বেগে খরস্রোতা নদী
ভেঙেছে দু-কূল, সাথে সাথে ফুল ফুটায়েছে নিরবধি।

জলধির মহা-তৃষ্ণা জাগিছে যে বিপুল নদীস্রোতে,
সে কি দেখে, তার স্রোতে কি ডুবিল, কে মরিল তার পথে?
মানে না বারণ, ভরা যৌবন-শক্তিপ্রবাহ ধায়
আনন্দ তার মরণ-ছন্দে কূলে কূলে উথলায়।
জানে না সে ঘর আত্মীয় পর, চলাই ধর্ম তার
দেখে না তাহার প্রাণতরঙ্গে ডুবিল তরণি কার।

বণিকের দুটো জাহাজ ডুবিবে, তা বলে সিন্ধু-ঢেউ
শান্ত হইয়া ঘুমায়ে রহিবে – শুনিয়াছ কভু কেউ।
ঐরাবত কি চলিবে না, পথে পিপীলিকা মরে বলে?
ঘর পোড়ে বলে প্রবল বহ্নিশিখা উঠিবে না জ্বলে?

অঙ্ক কষে না, হিসাব করে না, বেহিসাবি যৌবন,
ভাঙা চাল দেখে নামিবে না কি রে শ্রাবণের বর্ষণ?
যৌবন কেনা-বেচা হবে কি রে বানিয়ার নিক্তিতে?
মুক্ত-আত্মা আজাদে ভোলাবে প্যাক্টের চুক্তিতে?
তরু ভেঙে পড়ে তাই বলে ঝড় আসবে না বৈশাখী!
ভীরু মেষ-শিশু ভয় পায় বলে রবে না ঈগল পাখি?

জ্ঞান ও শান্তি সংযম – বহু ঊর্ধ্বের কথা দাদা,
কহে নির্মল শান্তির কথা যার সারা গায়ে কাদা!
যে মহাশান্তি উদার-মুক্ত আকাশের তলে রহে,
কাম-ক্রোধ-লোভ-মত্ত জীবেরা আজ তারই কথা কহে।

অনন্ত দিক আকাশ যাহার সীমা খুঁজে নাহি পায়
এমন মুক্ত মানব দেখিলে শান্ত কহিয়ো তায়;
ওঠে তরঙ্গ অতি প্রবল যে বিরাট সাগরজলে
সেই উদ্‌বেল শক্তিরে তার অসংযমী কে বলে?
ডোবায় খানায় কূপে ঢেউ নাই, শান্ত তারাই বুঝি?
সংযমী বলে প্রতারক মোরা শুধু জড়তারে পূজি।

জাগো দুর্মদ যৌবন! এসো, তুফান যেমন আসে,
সুমুখে যা পাবে দলে চলে যাবে অকারণ উল্লাসে।
আনো অনন্ত-বিস্তৃত প্রাণ, বিপুল প্রবাহ, গতি,
কূলের আবর্জনা ভেসে গেলে হবে না কাহারও ক্ষতি।
বুক ফুলাইয়া দুখেরে জড়াও, হাসো প্রাণখোলা হাসি,
স্বাধীনতা পরে হবে – আগে গাও ‘তাজা ব-তাজা’র বাঁশি।

বসিয়াছে যৌবন-রাজপাটে শ্রীহীন অকাল জরা,
মৃত্যুর বহু পূর্বে এ-জাতি হয়ে আছে যেন মরা!
খোলো অর্গল পাষাণের, খুশি বহুক অনর্গল,
ঝাঁক বেঁধে নীল আকাশে যেমন ওড়ে পারাবত দল।
সাগরে ঝাঁপায়ে পড়ো অকারণে, ওঠো দূর গিরিচূড়ে
বন্ধু বলিয়া কন্ঠে জড়াও পথে পেলে মৃত্যুরে!
ভোলো বাহিরের ভিতরের যত বদ্ধ সংস্কার
মরিচা ধরিয়া পড়ে আছ সব আলির জুলফিকার!
জাগো উন্মদ আনন্দে দুর্মদ তরুণেরা সবে,
নাই-বা স্বাধীন হল দেশ, মানবাত্মা মুক্ত হবে।

 

Durbar Joubon Kobita (Puro Kobita):

Ore oshanto durbar joubon!
Poral ke tore gyaner mukhosh shongjom-abaron?
Bhitorer bhiti dhakite re joto niti-bilashira chhole
Uddhoto joubon-shoktire shongjoto hote bole.
Bhabey, bhangoner gada loye jodi joubon mate rone,
Guruk tanite paribe na boshe sonar singhashone!
Ore duronto! Uronto tor pakha ke bandhilo bol?
Dipto jyotishikhay dhakilo shirno joranchol?
Ore nirbhik! Bhikh-maga joto pongur dole bhire –
Andhar ningari alo anito je – se rohilo badha nire!
Jahader merudonde legechhe merur himel hawa,
Jahader pran shoktibihin kothin tuhine chhawa
Tader hukum-e praner bipul bonna rakhili rukhe?
Morur singho mar khay sarkasi pinjore dhuke.
Srishtir kotha bhabe jara age shonghare kore bhoy,
Juge juge shongharer aghate tader hoyechhe loy.
Kath na puraye agun jwalabe bole kon oggyan?
Bonosspotir chhaya pabe bij nahi dile tar pran!
Tolowar rekhe khape era, ghora rakhiya astabole
Ronjoyi hobe dombo-bihin baidantiki chhole!
Pran-probaher probol-bonna bege khorsrota nodi
Bhengechhe du-kul, sathe sathe phul phutayechhe nirabodhi.
Joldhir maha-trishna jagichhe je bipul nodisrote,
Se ki dekhe, tar srote ki dubilo, ke morilo tar pothe?
Mane na baron, bhora joubon-shoktiproboho dhay
Anondo tar moron-chhonde kule kule utholay.
Jane na se ghor atmiya por, cholai dhormo tar
Dekhe na tahar pran-toronge dubilo toroni kar.
Boniker duto jahaj dubibe, ta bole sindhu-dheu
Shanto hoiya ghumaye roh ibe – shuniyachho kobhu keu.
Oirabot ki cholibe na, pothe pipilika more bole?
Ghor pore bole probol bohnishikha uthibe na jwale?
Onko koshe na, hisab kore na, behisabi joubon,
Bhanga chal dekhe namibe na ki re shraboner bor shon?
Joubon kena-becha hobe ki re baniyar niktite?
Mukto-atma azade bholabe pacter chuktite?
Toru bhenge pore tai bole jhor ashbe na boishakhi!
Bhiru mesh-shishu bhoy pay bole robe na igol pakhi?
Gyan o shanti shongjom – bohu urdher kotha dada,
Kohe nirmol shantir kotha jar shara gaye kada!
Je maha-shanti udar-mukto akasher tole rohe,
Kam-krodh-lobh-motto jibera aaj tari kotha kohe.
Ononto dik akash jar shima khunje nahi pay
Emon mukto manob dekhile shanto kohiyo tay;
Othe torongo oti probol je birat sagorjole
Sei udbel shoktire tar oshongjomi ke bole?
Dobay khanay kupe dheu nai, shanto tarai bujhi?
Shongjomi bole protarok mora shudhu jorotare puji.
Jago durmod joubon! Eso, tufan jemon ashe,
Sumukhe ja pabe dole chole jabe okaron ullashe.
Ano ononto-bistrito pran, bipul probaho, goti,
Kuler aborjona bhese gele hobe na kaharo khoti.
Buk phulaiya dukhere jorao, hasho pran-khola hashi,
Swadhinota pore hobe – age gao ‘taja bo-taja’r banshi.
Bosiyachhe joubon-rajpat-e shrihin okal jora,
Mrittyur bohu purbe e-jati hoye achhe jeno mora!
Kholo orgol pashaner, khushi bohuk onorgol,
Jhak bendhe nil akashe jemon ore parabot dol.
Sagore jhapaye poro okarone, otho dur girichure
Bondhu boliya konthe jorao pothe pele mrittyure!
Bhulo bahirer bhitorer joto boddho shongskar
Moricha dhoriya pore achho shob alir zulfikar!
Jago unmod anonde durmod torunera shobe,
Nai-ba swadhin holo desh, manobatma mukto hobe.

Tags :

কাজী নজরুল ইসলাম

<div id="model-response-message-contentr_6711829050503afa" class="markdown markdown-main-panel md-content enable-luminous-fast-follows enable-updated-hr-color tutor-markdown-rendering" dir="ltr" aria-live="polite"> <div>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।</div> </div>

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

    Join Us!

    Hey there! Here’s a neat way to recieve our latest posts & updates – just subscribe to our newsletter.

    Error: Contact form not found.

    Zero spam, Unsubscribe at any time.