নজরুলের গণসঙ্গীত রচনা তার সঙ্গীত প্রতিভার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৯০৫ পরবর্তী ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একটি সার্থক রচনা নজরুলের গণ-সঙ্গীত। অন্য সকল পর্যায়ের গানের বাহ্যিক প্রকাশের ধারা বিভিন্নতা অবলম্বন করলেও গণসঙ্গীতের গতিপ্রকৃতি একটি বাস্তবমুখী প্রকাশ। পরাধীনতার শৃঙ্খল হতে মুক্তিকামী মানুষের স্বাধীন চেতনা প্রকাশ পাবার জন্যেই মূলত নজরুলের গণ-সঙ্গীত রচনা।

নজরুলের গণসঙ্গীত । নজরুলের ভাবনা
মন্তব্য :
নজরুলের গণ-সঙ্গীত প্রসঙ্গে যারা মন্তব্য করেছেন তাদের মধ্যে চিত্তরঞ্জন দাসের মন্তব্য নিম্নরূপ:
‘পরাধীনতার বিরুদ্ধে নজরুলের যে-সকল গানগুলো অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল তাদের মধ্যে তাঁর গণসঙ্গীতের ব্যাপ্তি স্মরণযোগ্য।
তথ্য সংগ্রহ :
দেশ পত্রিকা, পুজা সংখ্যা ১৯৯৯।
নজরুলের গণসঙ্গীত রচানর প্রেক্ষাপট :
কাজী নজরুলের গণ-সঙ্গীত রচনার মূল প্রেক্ষাপট স্বাধীন ভারতবর্ষ প্রতিষ্ঠা। কবি অসুন্দরকে পরিহার করে সুন্দর ও সত্যকে প্রতিষ্ঠার জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তার সোচ্চার প্রতিবাদ স্বরূপ গণসঙ্গীত রচনায় মনোনিবেশ করেন। মূলত দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য নজরুলের গণ-সঙ্গীত রচনা।

নজরুলের গণসঙ্গীতের বিষয় :
নজরুলের গণ-সঙ্গীতের বিষয় বিদ্রোহমূলক। পরিপক্ক ও পরিমার্জিতভাবে বিদ্রোহমূলক বাণী বিন্যাস এবং বিষয়ভিত্তিক রচনা নজরুলের গণ-সঙ্গীতের মূল বৈশিষ্ট্য।
বাণী বিন্যাস :
গণসঙ্গীতের মূলচালিকাশক্তি হলো বাণীগত অবস্থান। বাণী সুদৃঢ় না হলে সে গান গনসঙ্গীত হিসাবে সার্থকতা পায় না। উদ্দীপনা তথা বিদ্রোহমূলক শব্দ এ গানের উপজীব্য বিষয়। বাণী বিন্যাসের ধারাবাহিকতায় গণসঙ্গীত সার্বিকভাবে ঐশ্বর্যমণ্ডিত ও গীতিময় |
বাক্যসমন্বয় :
গনসঙ্গীতে নজরুল গণচেতনামূলক শব্দ বিন্যাসের মধ্য দিয়ে বাক্য সমন্বয় সাধান করেন। বিদ্রোহভাবাবেগকে প্রাধান্য দিয়ে বাক্যের উপস্থাপনে সার্বিকভাবে মুক্তিকামী মানুষের স্বাধীন চেতনা বিন্যাসিত ।
সুরের আঙ্গীক বিশ্লেষণ :
গণসঙ্গীতের সার্থক প্রকাশের সুরের নান্দনিকতা এতটা প্রয়োজনীয় নয় বলে শাস্ত্রীয় অভিমত। যে-সঙ্গীত মূলত গণমানুষের কথা বলে তাই গণসঙ্গীত হিসাবে প্রবর্তিত। সুরের শ্রেণীবন্ধকরণ তথা সুরের গঠনপ্রনালী এখানে প্রয়োজনীয় নয় ।
রাগের ব্যবহার :
সুরের নিয়মতান্ত্রিক ধারা এখানে বেশ প্রয়োজনীয় নয় বলে রাগের ব্যবহার নজরুলের গণ-সঙ্গীতে অনুপস্থিত প্রায়। বিষয়ভিত্তিক এবং বিদ্রোহমূলক বাণীবন্ধনা এ গানের সার্থক প্রকাশ মাত্ৰ ৷
নজরুলের গণসঙ্গীতে তালের ব্যবহার :
নজরুল তার গণসঙ্গীতে মূলত তালের ব্যবহার করেছেন। তাঁর গণসঙ্গীতে যে তালের ব্যবহার দেখা যায় তার মধ্যে দাদ্রা, কাহারবার ব্যবহার সর্বাধিক।

দর্শনতত্ত্ব :
দর্শনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে গণসঙ্গীতে মূলত পরাধীনতার বিরুদ্ধে একটি বৈপ্লবিক প্রকাশ। নজরুলের গণ-সঙ্গীতে দর্শনতাত্ত্বিক আলোচনায় মূলত শ্ৰেণীসংগ্ৰামূলক বাণীবদ্ধ প্রকাশের সাঙ্গীতিক ধারা উপস্থাপিত হয়েছে।
অবয়ব প্রসঙ্গ :
নজরুলের গণ-সঙ্গীত সার্থকভাবে লঘুসঙ্গীত পর্যায়ের। নজরুলের গণ-সঙ্গীতে স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী, আভোগ এবং কখনো স্থায়ী এবং একাধিক অন্তরার অবস্থান লক্ষ করা যায় ।
গীতিশৈলী :
গীতিশৈলীর ক্ষেত্রে পরিবেশনা লঘুসঙ্গীত পর্যায়ের। প্রথম স্থায়ী পরবর্তীতে অন্তরা, সঞ্চারী, আভোগ পর্যায়ক্রমে পরিবেশিত হয়। একাধিক অন্তরার ক্ষেত্রে প্রথমে স্থায়ী, দ্বিতীয় পর্যায়ে পর্যায়ক্রমে অন্তরা পরিবেশিত হয়। নজরুলের গণ-সঙ্গীত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমবেতভাবে পরিবেশিত হয়ে থাকে ।
নজরুলের গণসঙ্গীত :
গানের কথা : ওঠরে চাষী জগৎবাসী
রচনাকাল ও স্থান : ১৯২৫ হুগলী
পত্রিকা : লাঙল, ২য় সংখ্যা ১৯২৫
গ্রন্থ : সর্বহারা
স্বরলিপি : সঙ্গীতান্জলী ২য় খণ্ড
শিরোনাম : কৃষানের গান
পর্যায় : গণসঙ্গীত
তাল : কাহারবা
বি : দ্র: ১৯২৬ সালের ৬ ও ৭ মার্চ কৃষ্ণনগরে নিখিল বঙ্গীয় প্রজাসম্মেলনের উদ্বোধনী সঙ্গীত উপলক্ষ্যে গীত হয় ।
উপসংহার :
উপরোক্ত আলোচনায় আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, নজরুলের গণ-সঙ্গীত রচনা তার বিদ্রোহ অনুভূতির একটি সাঙ্গীতীক প্রকাশ। যা বাংলা গানের ভাণ্ডারকে করেছে সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত ।

