Editor's Choice

আমার সকলি হরেছ , চন্দ্রবিন্দু | নজরুল সঙ্গীত

সন্তানহারা এক পিতার গভীর অন্তর্বেদনা ও সর্বস্ব হারানোর রিক্ততা থেকে উৎসারিত আত্মনিবেদনের এক পরম মরমি নিদর্শন “আমার সকলি হরেছ”। কাজী নজরুল ইসলামের বিশিষ্ট গীতিসংকলন ‘চন্দ্রবিন্দু’-র (১৯৩১) অন্তর্ভুক্ত এই ভক্তিমূলক গানটিতে লৌকিক শোক ও জাগতিক বিচ্ছেদকে পরমাত্মার সাথে মিলনের চরম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। প্রিয় পুত্র বুলবুলের অকালপ্রয়াণের পটভূমিতে রচিত এই গানে কবি অনুভব করেছেন যে, ঈশ্বর তাঁর প্রিয়জনদের কেড়ে নিয়ে আসলে তাঁর ও পরমেশ্বরের মধ্যকার যাবতীয় পার্থিব মায়ার আড়াল ভেঙে দিয়েছেন। রাগ আশাবরীর স্নিগ্ধ করুণ মেজাজ ও কাওয়ালি তালের সংযত ছন্দে এটি রিক্ত মানবাত্মার পরমেশ্বরে সমর্পিত হওয়ার এক অমর সুরময় আরতি।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
শিরোনামআমার সকলি হরেছ হরি এবার আমায় হ’রে নিও
পর্যায়ভক্তিমূলক পর্যায়
সংগীত সংকলনচন্দ্রবিন্দু (আশ্বিন ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ / সেপ্টেম্বর ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দ)
উৎসর্গশ্রীমদ্দাঠাকুর শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র পণ্ডিত মহাশয়ের শ্রীচরণকমলে
গীতিকার ও সুরকারকাজী নজরুল ইসলাম
সংগীতধারানজরুল সঙ্গীত (রাগাশ্রয়ী ভক্তিমূলক / ভজন)
রাগআশাবরী
তালকাওয়ালি (আট মাত্রা: ৪+৪)
মূল উপজীব্যশোকের রূপান্তর, নিখিল-হরণকারী ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ, মায়ার আড়ালমুক্তি ও পরমভক্তি
প্রধান চিত্রকল্পনিখিল-হরণ, হরির চরণ, মায়ার আড়াল, প্রিয়জন বিয়োগ, একমাত্র পরমপ্রিয়
আবেগীয় আবহগভীর শোকমিশ্রিত বৈরাগ্য, বিনম্র আর্তি, রিক্ততা ও পরম নির্ভরতা

আমার সকলি হরেছ গানের কথা:

আমার সকলি হরেছ হরি এবার আমায় হ’রে নিও।
যদি সব হরিলে নিখিল-হরণ তবে ঐ চরণে শরণ দিও।।
আমায় ছিল যারা আড়াল ক’রে
হরি তুমি নিলে তাদের হ’রে,
ছিল প্রিয় যারা গেল তারা (হরি) এবার তুমিই হও হে প্রিয়।।

Amar Shokoli Hoरेchho Ganer Kotha:

Amar shokoli horechho Hari ebar amay hore nio.
Jodi shob horile nikhil-horon tobe oi chorone shoron dio.
Amay chhilo jara aral kore
Hari tumi nile tader hore,
Chhilo priyo jara gelo tara (Hari) ebar tumii hao he priyo.

গানের মূল ভাব

“আমার সকলি হরেছ” গানটির মূল ভিত্তি হলো ‘হরি’ নামের প্রকৃত দার্শনিক অর্থকে জীবনের চরম সংকটে উপলব্ধি করা। সংস্কৃত ধাতু অনুসারে ‘হরি’ শব্দের অর্থ যিনি হরণ করেন বা হরণকারী। প্রিয় পুত্র বুলবুলের অকালমৃত্যুর পর নজরুল তাঁর পার্থিব জীবনের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। কিন্তু সেই অপরিসীম শোকের মুখে দাঁড়িয়েও তিনি কোনো অভিযোগ বা বিদ্রোহ করেননি; বরং ঈশ্বরকে ‘নিখিল-হরণ’ হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছেন।
কবির অন্তর্দৃষ্টিতে প্রিয়জনরা ঈশ্বরের সাথে তাঁর সম্পর্কের মাঝে এক ধরনের পার্থিব আড়াল তৈরি করে রেখেছিল। ঈশ্বর যখন তাদের হরণ করে নিয়ে গেলেন, তখন সেই মোহের পর্দা চিরতরে খসে পড়ল। পার্থিব প্রিয়জনদের বিদায়ের পর একমাত্র পরমাত্মাই কবির একমাত্র ‘প্রিয়’ সত্তায় পরিণত হন। তাই সমস্ত রিক্ততার শেষে কবি নিজের অহংকার ও ক্ষুদ্র অস্তিত্বটুকুও ঈশ্বরের চরণে সঁপে দিয়ে তাঁর মাঝে বিলীন হওয়ার আকুতি জানিয়েছেন।

চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ

১. নিখিল-হরণ ও আত্মবিলোপের শেষ আর্তি

  • “আমার সকলি হরেছ হরি এবার আমায় হ’রে নিও / যদি সব হরিলে নিখিল-হরণ তবে ঐ চরণে শরণ দিও…”
    গানটির সূচনাই হয় আত্মবিলোপের এক পরম সংকল্প দিয়ে। ঈশ্বর যখন সাধকের সমস্ত জাগতিক সম্বল কেড়ে নিয়েছেন, তখন সাধকের নিজের অস্তিত্বও আর অবশিষ্ট রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। সর্বস্ব হারানো ভক্ত তাই শেষ আশ্রয় হিসেবে কেবল সেই চরণযুগলকেই বরণ করে নিতে চায়।

২. পার্থিব মোহের আড়াল অপসারণ

  • “আমায় ছিল যারা আড়াল ক’রে, হরি তুমি নিলে তাদের হ’রে…”
    এক গভীর আধ্যাত্মিক সত্যের উন্মোচন। জগতের সম্পর্ক ও প্রিয়জনেরা মানুষকে জাগতিক মোহে ভুলিয়ে রাখে এবং ঈশ্বরের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ঈশ্বর তাদের অপসারণ করে মূলত ভক্তের চেতনাকে মায়ামুক্ত করেছেন।

৩. লৌকিক শূন্যতা থেকে পরমপ্রিয়তে উত্তরণ

  • “ছিল প্রিয় যারা গেল তারা (হরি) এবার তুমিই হও হে প্রিয়…”
    শোকের চূড়ান্ত রূপান্তর। পার্থিব সম্পর্কের নশ্বরতা উপলব্ধি করে কবি সেই শূন্যস্থান পূর্ণ করতে ঈশ্বরকে আহ্বান জানিয়েছেন। জগতের সমস্ত ক্ষণস্থায়ী প্রেম অপসৃত হয়ে কেবল শাশ্বত ও অবিনাশী ঈশ্বরের প্রেমই হৃদয়ের একমাত্র ধ্যানে পরিণত হয়েছে।

বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন

গানটিতে পুত্রশোক ও স্বজনবিয়োগের অবর্ণনীয় আঘাত এক নিঃসীম শূন্যতার জন্ম দিয়েছে। যে চোখ থেকে প্রিয়জনের দৃশ্য চিরতরে মুছে গেছে, সেই আশাহীন নয়নে এই পার্থিব জগতের প্রতি আর কোনো আকর্ষণ বা প্রত্যাশা অবশিষ্ট থাকে না। দৃষ্টি যখন বাইরের জগতের কোনো প্রাপ্তিতে আর ভরসা পায় না, তখনই সেই আশাহীন চোখ সম্পূর্ণ অন্তর্মুখী হয়ে পরম সত্যের দিকে নিবদ্ধ হয়। জাগতিক সব সম্পর্কের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার তীব্র ক্ষত এখানে কোনো অবসাদে রূপ নেয় না; বরং তা অহংকার চূর্ণ করে পরমেশ্বরের চরণে নিঃশর্ত আত্মনিবেদনের এক পবিত্র প্রশান্তিতে রূপায়িত হয়।

সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য

  • যমক ও শ্লেষ অলংকারের অনুপম ব্যবহার: ‘হরি’ (ঈশ্বর), ‘হরেছ’ (হরণ করেছ), ‘হ’রে নিও’ (বিলীন করে নাও) এবং ‘নিখিল-হরণ’—একই মূল ধাতুর শব্দকে নানা রূপে প্রয়োগ করে কবিতার প্রতিটি ছত্রে বিস্ময়কর ভাবগাম্ভীর্য সৃষ্টি করা হয়েছে।
  • শোকগাথার রূপান্তর: ব্যক্তিগত পুত্রশোককে কোনো হাহাকারে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে আধ্যাত্মিক ভজন ও সর্বজনীন ভক্তিসংগীতে উন্নীত করা নজরুলের সৃজনশীল ক্ষমতার অন্যতম সেরা নিদর্শন।
  • ঋজু ও সংক্ষিপ্ত প্রকাশ: কোনো অপ্রয়োজনীয় অলংকার ছাড়াই মাত্র কয়েকটি চরণে জীবনের মহত্তম বৈরাগ্য ও সমর্পণকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা

  • আশাবরী রাগের বৈরাগ্য ও আর্তি: গানটির সুর নির্মিত হয়েছে আশাবরী ঠাটের আশ্রয়ে। আশাবরী রাগের কোমল গান্ধার, কোমল ধৈবত ও কোমল নিখাদের ব্যবহার সকালের আলোয় যেমন এক উদাসীনতা ও বিষাদ তৈরি করে, তেমনি এই সুর অন্তরের রিক্ততাকে নিখুঁতভাবে প্রকাশ করে।
  • কাওয়ালি তালের বিলম্বিত সংহতি: আট মাত্রার কাওয়ালি তালের সংযত চলন গানের ভাবকে অস্থির হতে দেয় না; বরং তা এক নিবিষ্ট ও ধ্যানমগ্ন প্রার্থনার আবহ বজায় রাখে।
  • ভাবপ্রধান গায়কী: সুরের জটিল মারপ্যাঁচের চেয়ে শব্দের অন্তর্দহন এবং বাণীর গভীর আর্তিই এই গানের মূল নান্দনিক প্রাণ।

শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি

  • কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬): বাঙালির জাতীয় কবি ও বহুমুখী সংগীতস্রষ্টা। ১৯৩০ সালে কবির দ্বিতীয় পুত্র বুলবুলের মৃত্যুর পর নজরুলের জীবনে এক গভীর আধ্যাত্মিক রূপান্তর ঘটে। এই শোকাচ্ছন্ন পর্বেই তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ভক্তিমূলক ধারায় অসংখ্য অমর পদ ও শ্যামাসঙ্গীত-ভজন রচনা করেন।
  • চন্দ্রবিন্দু গীতিগ্রন্থের প্রেক্ষাপট: ১৯৩১ সালে প্রকাশিত ‘চন্দ্রবিন্দু’ গ্রন্থে প্রধানত রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও হাস্যরসাত্মক গান স্থান পেলেও, এর ভেতরে এই গানটির অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে কবি তাঁর সৃষ্টির নানা বৈপরীত্যের মধ্যেও অন্তরের গভীরতম শোক ও আধ্যাত্মিক সত্যকে অবহেলা করেননি।

cultural significance & সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

“আমার সকলি হরেছ” বাংলা ভক্তিসংগীত ও আধ্যাত্মিক সাহিত্যের এমন একটি নিদর্শন, যা মানুষকে শোকের চরম আঘাত কাটিয়ে আত্মিক প্রশান্তি খুঁজে পেতে শক্তি জোগায়। যে কোনো বড় ক্ষতি বা বিচ্ছেদের মুহূর্তে গানটি মানুষকে শেখায় কীভাবে জীবনের শূন্যতাকে ঈশ্বরের চরণে উৎসর্গ করে শান্তি লাভ করা যায়। বিভিন্ন শাস্ত্রীয় ভজন ও নজরুল সংগীতের আসরে এটি চরম বৈরাগ্য ও ভক্তির গান হিসেবে পরম শ্রদ্ধার সাথে গীত হয়।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. চন্দ্রবিন্দু, কাজী নজরুল ইসলাম, ডি. এম. লাইব্রেরি, কলকাতা (১৯৩১)।
  2. নজরুল রচনাবলী (ভক্তিমূলক ও ভজন সংকলন), নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
  3. নজরুল-জীবনী, রফিকুল ইসলাম।
Tags :

কাজী নজরুল ইসলাম

<div id="model-response-message-contentr_6711829050503afa" class="markdown markdown-main-panel md-content enable-luminous-fast-follows enable-updated-hr-color tutor-markdown-rendering" dir="ltr" aria-live="polite"> <div>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।</div> </div>

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

    Join Us!

    Hey there! Here’s a neat way to recieve our latest posts & updates – just subscribe to our newsletter.

    Error: Contact form not found.

    Zero spam, Unsubscribe at any time.