বাংলা গীতি ও কাব্যসাহিত্যের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ধ্রুবতারা কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যযাত্রার প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা ঘটেছিল গদ্যের হাত ধরে। ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে (ফাল্গুন, ১৩২৮ বঙ্গাব্দ) ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ থেকে প্রকাশিত ‘ব্যথার দান’ কেবল নজরুলের প্রথম গল্পসংগ্রহই নয়, এটি ছিল বই আকারে আত্মপ্রকাশ করা কাজী নজরুল ইসলামের সর্বপ্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ। করাচির ৪৯ নম্বর বাঙালি রেজিমেন্টের সেনানিবাসে হাবিলদার পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় (১৯১৭–১৯২০) এক তরুণ সৈনিকের হৃদয়ে যে বিরহ, রোমান্টিসিজম ও মুক্তিকামী ভাবালুতা পুঞ্জীভূত হচ্ছিল, তারই প্রথম রসাল আত্মপ্রকাশ এই সংকলনটি।
করাচি সেনানিবাসের একাকী রাত, পশ্চিম এশিয়ার উত্তাল মরুঝড়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল এবং সুদূর প্রবাসে বসে রূপসী বাংলার স্মৃতি—সব মিলিয়ে নজরুল যে নিজস্ব একটি গদ্যভুবন নির্মাণ করেছিলেন, ‘ব্যথার দান’ তারই এক অনন্য দলিল। গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই তৎকালীন সমাজ ও পাঠককুলে এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে যায়। রবীন্দ্র-বলয়ে আবর্তিত তৎকালীন বাংলা কথাসাহিত্যে এক দুরন্ত তরুণ সৈনিকের এমন বাঁধভাঙা আবেগদীপ্ত ও প্রেমাতুর গদ্যরীতি ছিল সম্পূর্ণ নতুন ও সতেজ এক বাতাসের মতো।
Table of Contents
Toggle১. প্রেক্ষাপট, সেনাস্মৃতি ও মানবীয় ব্যাকুলতা
‘ব্যথার দান’ গ্রন্থটি রচনার অন্তরালে রয়েছে এক আবেগঘন ও সংবেদনশীল গল্প। করাচি সেনানিবাসে থাকাকালীন তরুণ নজরুল যখন হাবিলদার হিসেবে কোয়ার্টার মাস্টারের কাজ করতেন, তখন রাতের নিস্তব্ধতায় তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা লিখতেন। সেনাবাহিনী থেকে লেখা সেই গল্পগুলোর পাণ্ডুলিপি তিনি ডাকযোগে কলকাতায় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র ঠিকানায় প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও কমরেড মুজাফফর আহমদের কাছে পাঠাতেন। মুজাফফর আহমদ ও সাহিত্য সমিতির বন্ধুরা নজরুলের এই কাব্যিক গদ্য পড়ে মুগ্ধ হন এবং ১৯২০ সালে নজরুল সামরিক জীবন ছেড়ে কলকাতায় ফিরে আসার পর এই গল্পগুলো একত্র করে গ্রন্থাকারে প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এই গ্রন্থের সবচেয়ে মানবীয় ও আবেগময় দিক হলো এর অমর উৎসর্গপত্রটি। কবি তাঁর প্রিয় ‘মানসী’কে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন:
“মানসী আমার! মাথার কাঁটা নিয়েছিলুম বলে ক্ষমা করো নি, তাই বুকের কাঁটা দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত ক’রলুম।”
এই উৎসর্গের পেছনে ছড়িয়ে আছে কবির কৈশোর-যৌবনের এক গোপন অনুরাগের ট্র্যাজিক স্মৃতি। চব্বিশ পরগনার হাড়োয়ায় থাকাকালীন এক কিশোরীর (হাসনা) মাথার জাপানি সুদৃশ্য কাঁটা ভুলবশত তুলে নিয়ে কবির যে বেদনাময় অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সেই অপ্রাপ্তির হাহাকারই পরবর্তীতে সাহিত্যজুড়ে ‘বুকের কাঁটা’ বা বিরহবেদনা হয়ে বেজে উঠেছে।
২. আখ্যানশৈলী ও প্রধান ভাবাদর্শ
‘ব্যথার দান’ গ্রন্থের গল্পগুলোর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর পত্রোপন্যাস বা চিঠিপত্রভিত্তিক আখ্যানরীতি। চিঠির ব্যাকুল বয়ানে চরিত্রগুলো নিজেদের গোপন অনুতাপ, প্রেমানুরাগ ও মানসিক দ্বন্দ্বকে উন্মোচিত করেছে।
- রোমান্টিক ভাবালুতা ও ত্যাগের মহিমা: এ সংকলনের গল্পগুলোতে নর-নারীর প্রেম কেবল জৈবিক বা জাগতিক মিলনে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কামনা থেকে প্রেম এবং প্রেম থেকে বিরহের আগুনে পুড়ে তা কীভাবে স্বাতন্ত্র্য ও আত্মত্যাগের এক উচ্চমার্গে উন্নীত হয়—নজরুল তা নিপুণভাবে দেখিয়েছেন। ‘ব্যথার দান’ বা ‘হেনা’র মতো গল্পগুলোতে আমরা দেখি, ভালোবাসার মানুষকে পাওয়ার চেয়ে তার সুখ ও আদর্শের জন্য নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার মধ্যেই প্রেমিক আত্মতৃপ্তি খুঁজে পেয়েছে।
- আন্তর্জাতিক পটভূমি ও মুক্তির আকুতি: নজরুলের এই প্রথম সংকলনেই তাঁর আন্তর্জাতিকতাবাদী চেতনার বীজ রোপিত হয়েছিল। ‘হেনা’ বা ‘ব্যথার দান’ গল্পে কেবল তৎকালীন বাংলার প্রেক্ষাপট নয়, বরং পারস্য (ইরান), বোখারা এবং লোহিত সাগরের তীরবর্তী এলাকা ও রেড ক্রসের (Red Cross) বা মুক্তি ফৌজের স্বেচ্ছাসেবকদের বৈপ্লবিক জীবনের ঝলক দেখা যায়।
- কাব্যিক ও আবেগদীপ্ত গদ্য: নজরুলের গদ্য কোনো শুষ্ক বিবরণীয় গদ্য নয়; তা যেন এক গদ্য-কবিতা। অজস্র অলঙ্কার, ফারসি ও আরবি শব্দের সাবলীল মিশ্রণ এবং সংবেদনশীল বাক্যাংশের প্রয়োগে তিনি প্রতিটি দৃশ্যকে জীবন্ত করে তুলেছেন।
৩. বাংলা কথাসাহিত্যে ‘ব্যথার দান’-এর স্থান
বাংলা ছোটগল্পের বিবর্তনযাত্রায় ‘ব্যথার দান’ এক অনন্য ঐতিহাসিক স্মারক। পরবর্তীকালে নজরুল ‘রিক্তের বেদন’ ও ‘শিউলি মালা’য় যে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার পরিচয় দিয়েছেন, তার প্রারম্ভিক ভিত তৈরি করেছিল এই গ্রন্থটি। এতে সৈনিক জীবনের দূরবর্তী অভিজ্ঞতা এবং এক তরুণ কবির হৃদয়ের প্রথম প্রেমের রক্তক্ষরণ একসূত্রে গাথা হয়েছে। শতবর্ষ পার করেও নজরুলের এই প্রথম উপন্যাসোপম গল্পসংগ্রহ পাঠকহৃদয়ে চিরন্তন বেদনার সুবাস ছড়িয়ে চলেছে।
‘ব্যথার দান’ (১৯২২) গল্পগ্রন্থের সূচিপত্র
(সংগ্রহশালার কাঠামোগত সুবিধার্থে ‘ব্যথার দান’ সংকলনে অন্তর্ভুক্ত ৬টি কালজয়ী গল্পের তালিকা নিচে প্রদান করা হলো। পরবর্তীতে প্রতিটি গল্পের পৃথক ও বিস্তারিত আর্টিকেলের সরাসরি লিংক এই সূচিপত্রেই যুক্ত থাকবে:)
- ব্যথার দান — পত্রোপন্যাসভিত্তিক বিচ্ছেদ, আত্মত্যাগ ও মুক্তির আকুলতা
- হেনা — প্রবাস জীবনের প্রেম, যুদ্ধক্ষেত্রের রেড ক্রস ও আদর্শিক ত্যাগ
- বাদল বরিষণে — বর্ষার আবহ, প্রাক-মিলন ও গভীর বিরহবেদনার রূপক
- ঘুমের ঘোরে — অবচেতন মনের অনুরাগের স্মৃতি ও স্বপ্নিল হাহাকার
- অতৃপ্ত কামনা — মানবহৃদয়ের অপূর্ণ আশা ও প্রেমের টানাপোড়েন
- রাজবন্দীর চিঠি — দেশপ্রেম, রাজনৈতিক সংকল্প ও প্রেমাস্পদের উদ্দেশ্যে গোপন চিঠি
- পরির কথা
- সয়ফুল-মুলকের কথা
- দারার কথা
- বেদৌরার কথা




















