বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের তেজোদীপ্ত রণসঙ্গীত ও মার্চ-সংগীতের এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি “ঝড় ঝঞ্ঝায় ওড়ে নিশান ঘন”। কবির বিশিষ্ট গীতিসংকলন ‘গানের মালা’-র (১৯৩৪) অন্তর্ভুক্ত এই গানটিতে তারুণ্যের অদম্য প্রাণশক্তি, স্থবিরতা চূর্ণ করার প্রত্যয় এবং নবীন অভিযাত্রীদের বিশ্বমঞ্চে স্বীয় মর্যাদায় স্থান করে নেওয়ার উদাত্ত আহ্বান ধ্বনিত হয়েছে। প্রলয়ঙ্কর বজ্রের বিষাণ এবং দ্রুত মার্চ তালের বলিষ্ঠ ছন্দে কবি এখানে অলস ঘুমন্ত জাতিকে রণসাজে সজ্জিত হয়ে মরণ-পাথার পেরিয়ে অনন্ত জীবনের অমল আলোকলোকে পৌঁছানোর অবিনাশী প্রেরণা জুগিয়েছেন।
Table of Contents
Toggleগানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| শিরোনাম | ঝড় ঝঞ্ঝায় ওড়ে নিশান ঘন-বজ্রে বিষাণ বাজে |
| পর্যায় | রণসঙ্গীত / উদ্দীপনামূলক পর্যায় (মার্চ সঙ্গীত) |
| সংগীত সংকলন | গানের মালা (প্রথম প্রকাশ: ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ) |
| গীতিকার ও সুরকার | কাজী নজরুল ইসলাম |
| সংগীতধারা | নজরুল সঙ্গীত (রণসঙ্গীত / মার্চ-গান) |
| তাল ও লয় | দ্রুত মার্চ তাল (৪/৪ লয় / কাহারবা) |
| মূল উপজীব্য | জড়তা পরিহার, তারুণ্যের জয়যাত্রা, বাধা অতিক্রম করে নবনির্মাণ এবং বিশ্বসভায় সমমর্যাদা অর্জন |
| প্রধান চিত্রকল্প | ঝড়-ঝঞ্ঝার নিশান, ঘন-বজ্রের বিষাণ, রণ-সাজ, মরুতে ফুল-ফসল, জীবন-নদী, মৃত্যু-পাথার, পদতলে প্রাণ-শতদল |
| আবেগীয় আবহ | বীররস, তীব্র উদ্দীপনা, অপরাজেয় সংকল্প ও নবজাগরণ |
ঝড় ঝঞ্ঝায় ওড়ে নিশান ঘন গানের কথা :
ঝড়-ঝঞ্ঝায় ওড়ে নিশান ঘন-বজ্রে বিষাণ বাজে।
জাগো জাগো তন্দ্রা-অলস রে, সাজো সাজো রণ-সাজে॥
দিকে দিকে ওঠে গান, অভিযান অভিযান!
আগুয়ান আগুয়ান হও ওরে আগুয়ান
ফুটায়ে মরুতে ফুল-ফসল।
জড়ের মতন বেঁচে কী ফল?
কে রবি পড়ে লাজে॥
বহে স্রোত জীবন-নদীর
চল চঞ্চল অধীর,
তাহে ভাসিবি কে আয়,
দূর সাগর ডেকে যায়।
হবি মৃত্যু-পাথার পার
সেথা অনন্ত প্রাণ বিরাজে॥
পাঁওদল রণে চল, চল রণে চল
মরুতে ফুটাতে পারে ওই পদতল
প্রাণ–শতদল।
বিঘ্ন-বিপদে করি সহায়
না-জানা-পথের যাত্রী আয়,
স্থান দিতে হবে আজি সবায়
বিশ্ব-সভা-মাঝে॥
Jhor Jhonjhay Ore Nishan Ghon Gaaner Kotha:
Jhor-jhonjhay ore nishan ghon-bojre bishan baje.
Jago jago tondra-olos re, sajo sajo ron-saje.
Dike dike othe gaan, ovijan ovijan!
Aguwan aguwan hao ore aguwan
Phutaye morute phul-foshol.
Jorer moton beche ki fol?
Ke robi pore laje.
Bohe srot jibon-nodir
Chol chonchol odhir,
Tahe bhasibi ke ay,
Dur sagor deke jay.
Hobi mrityu-pathar par
Setha ononto pran biraje.
Paondol rone chol, chol rone chol
Morute phut ate pare oi podotol
Pran-shotodol.
Bighno-bipode kori shohay
Na-jana-pother jatri ay,
Sthan dite hobe aji shobay
Bishwo-shobha-majhe.
গানের মূল ভাব
চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. ঝঞ্ঝার নিশান ও রণসাজে জাগরণ
- “ঝড়-ঝঞ্ঝায় ওড়ে নিশান ঘন-বজ্রে বিষাণ বাজে / জাগো জাগো তন্দ্রা-অলস রে, সাজো সাজো রণ-সাজে…”গানটির সূচনাই হয় প্রচণ্ড সামরিক গতি ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে। প্রকৃতির তাণ্ডব মূলত পরিবর্তনের সংকেত। অলস ঘুম ভেঙে বীরবেশে সজ্জিত হওয়ার এই ডাক কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধের নয়, বরং জীবনের প্রতিটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান।
২. অভিযানের গান ও মরুতে প্রাণের অভিষেক
- “দিকে দিকে ওঠে গান, অভিযান অভিযান! / আগুয়ান আগুয়ান হও ওরে আগুয়ান, ফুটায়ে মরুতে ফুল-ফসল / জড়ের মতন বেঁচে কী ফল? কে রবি পড়ে লাজে…”জড়বৎ নিষ্ক্রিয় জীবনের তীব্র ধিক্কার। সংবেদনহীন পাথর বা উদ্ভিদের মতো বেঁচে থাকায় কোনো গৌরব নেই। বরং দুর্গম মরুভূমিতেও প্রাণের ফসল ফলিয়ে নবীন অভিযাত্রীদের অগ্রগামী হতে হবে, যাতে পিছিয়ে থাকার লজ্জায় কাউকে মুখ লুকাতে না হয়।
৩. জীবন-নদীর জোয়ার ও মৃত্যুজয়ী চেতনা
- “বহে স্রোত জীবন-নদীর, চল চঞ্চল অধীর / তাহে ভাসিবি কে আয়, দূর সাগর ডেকে যায় / হবি মৃত্যু-পাথার পার, সেথা অনন্ত প্রাণ বিরাজে…”গতিই জীবন, স্থবিরতাই মৃত্যু। জীবন এক প্রবহমান নদী, যা অনন্ত সাগরের ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে চলেছে। পার্থিব জীবনের ক্ষুদ্র মোহ পেরিয়ে যারা মৃত্যু-সমুদ্র পার হতে পারে, তারাই অমরত্বের অনন্ত প্রসাদ লাভ করে।
৪. পদতলে প্রাণ-শতদল ও বিশ্বসভার অধিকার
- “পাঁওদল রণে চল, চল রণে চল, মরুতে ফুটাতে পারে ওই পদতল প্রাণ–শতদল / বিঘ্ন-বিপদে করি সহায়… স্থান দিতে হবে আজি সবায় বিশ্ব-সভা-মাঝে…”পদাতিক বাহিনীর সংহত পদক্ষেপের রূপক। নবীন পদাতিকদের দৃঢ় পদক্ষেপের ছোঁয়ায় তপ্ত বালুরাশিতেও ফুটবে সহস্র পদ্ম। ভয় ও বিপদকে সঙ্গী করেই অজানার পথে পা বাড়াতে হবে, কারণ এই জাতির সংগ্রাম কেবল মুক্তির জন্য নয়—সমগ্র মানবজাতির বিশ্বমঞ্চে স্বীয় মর্যাদার আসন ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য।
বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন
সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
- বীররসের নিখুঁত রূপায়ণ: পদাবলীর প্রতিটি শব্দে সামরিক তেজ ও গতির সঞ্চার ঘটেছে, যা শ্রোতার রক্তে শিহরণ জাগিয়ে তোলে।
- অনুপম অনুপ্রাস ও ধ্বনিঝংকার: ‘ঝড়-ঝঞ্ঝা’, ‘ঘন-বজ্রে বিষাণ’, ‘আগুয়ান-অভিযান’, এবং ‘পদতল-শতদল’—শব্দযোজনায় রণবাদ্যের মতো এক অবিরাম ছন্দধ্বনি অনুরণিত হয়েছে।
- গতিবাদী দর্শন (Dynamic Philosophy): জীবনের অর্থ স্থবিরতায় নয়, নিরবচ্ছিন্ন অভিযানে—এই রূপক তত্ত্ব পুরো কবিতাকে এক উচ্চাঙ্গের সার্বজনীন রূপ দান করেছে।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা
- ওয়েস্টার্ন মার্চ ও দেশীয় তালের সমন্বয়: গানটির সুর পাশ্চাত্য সামরিক মার্চের (Military March) পদবিক্ষেপের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও এর ভেতরে ভারতীয় রাগসংগীতের তেজস্বী স্বরবিন্যাস নিপুণভাবে মিশে গেছে।
- ৪/৪ ছন্দের সুদৃঢ় চলন: তালের দৃঢ় ও সমানুপাতিক মাত্রা পদাতিক বাহিনীর বুটের আওয়াজের মতো এক অবিচল গতিশীলতা তৈরি করে।
- সমবেত স্বরক্ষেপণ (Chorus/Choral Effect): একক গায়নের চেয়ে সমবেত কণ্ঠে গানটির আবেগ ও প্রত্যয় বহুগুণ মহিমান্বিত হয়ে ওঠে।
শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি
- কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬): বাঙালির জাতীয় কবি ও অবিসংবাদিত সংগীতস্রষ্টা। বাংলা গানে রণসঙ্গীত ও উদ্দীপনামূলক মার্চের একক স্রষ্টা হিসেবে নজরুল চিরভাস্বর। তাঁর রচিত ‘চল্ চল্ চল্’ বাংলাদেশের রণসংগীতের মর্যাদা লাভ করেছে, আর এই ধারারই আরেক জ্যোতির্ময় প্রকাশ এই গানটি।
- গানের মালা সংকলন (১৯৩৪): ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত ‘গানের মালা’ গ্রন্থে নজরুলের বহু কালজয়ী দেশাত্মবোধক ও উদ্দীপনামূলক গান স্থান পায়, যা পরাধীন ভারতের তরুণদের রক্তে আত্মদানের প্রেরণা জুগিয়েছিল।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
উৎস ও তথ্যসূত্র
- গানের মালা (প্রথম সংস্করণ, ১৯৩৪), কাজী নজরুল ইসলাম।
- নজরুল রচনাবলী (রণসঙ্গীত ও স্বদেশী গীতি শাখা), নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
- নজরুল সঙ্গীত পরিক্রমা ও সুর-সমীক্ষা, সুফি জুলফিকার হায়দার।





















