বেলাশেষে কবিতা । দোলনচাঁপা কাব্যগ্রন্থ ১৯২৩

বেলাশেষে কবিতা  টি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর দোলনচাঁপা কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে । দোলনচাঁপা কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি কাব্যগ্রন্থ ।এটি ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে (আশ্বিন, ১৩৩০ বঙ্গাব্দ) আর্য পাবলিশিং হাউস থেকে প্রকাশিত হয়।

 

বেলাশেষে কবিতা

ধরণী দিয়াছে তার

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ গাঢ় বেদনার

রাঙা মাটি-রাঙা ম্লান ধূসর আঁচলখানি

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ দিগন্তের কোলে কোলে টানি।

পাখি উড়ে যায় যেন কোন মেঘ-লোক হতে

সন্ধ্যা-দীপ-জ্বালা গৃহ-পানে ঘর-ডাকা পথে।

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ আকাশের অস্ত-বাতায়নে

অনন্ত দিনের কোন্ বিরহিণী কনে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ জ্বালাইয়া কনক-প্রদীপখানি

উদয়-পথের পানে যায় তার অশ্রু-চোখ হানি?

আসি’-বলে চলে যাওয়া বুঝি তার প্রিয়তম আশে,

অস্ত-দেশ হয়ে ওঠে মেঘ-বাষ্প-ভারাতুর তারি দীর্ঘশ্বাসে।

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ আদিম কালের ঐ বিষাদিনী বালিকার পথ-চাওয়া চোখে–

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ পথ-পানে-চাওয়া-ছলে দ্বারে-আনা সন্ধ্যা-দীপালোকে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ মাতা বসুধার মমতার ছায়া পড়ে।

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ করুণার কাঁদন ঘনায় নত-আঁখি স্তব্ধ দিগন্তরে।

কাঙালিনী ধরা-মা’র অনাদি কালের কত অনন্ত বেদনা

হেমন্তের এমনি সন্ধ্যায় যুগ যুগ ধরি বুঝি হারায় চেতনা।

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ উপুড় হইয়া সেই স্তূপীকৃত বেদনার ভার

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ মুখ গুঁজে পড়ে থাকে;​​ ব্যথা-গন্ধ তার

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ গুমরিয়া গুমরিয়া কেঁদে কেঁদে যায়

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ এমনি নীরবে শান্ত এমনি সন্ধ্যায়।…

ক্রমে নিশীথিনী আসে ছড়াইয়া ধূলায়-মলিন এলোচুল,

সন্ধ্যা-তারা নিবে যায়,​​ হারা হয় দিবসের কূল।…

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ তারি মাঝে কেন যেন অকারণে হায়

আমার দুচোখ পুরে বেদনার ম্লানিমা ঘনায়।

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ বুকে বাজে হাহাকার-করতালি,

কে বিরহী কেঁদে যায় ‘খালি,​​ সব খালি!

ঐ নভ,​​ এই ধরা,​​ এই সন্ধ্যালোক,

নিখিলের করুণা যা-কিছু,​​ তোর তরে তাহাদের অশ্রুহীন চোখ!

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ মনে পড়ে-তাই শুনে মনে পড়ে মম

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ কত না মন্দিরে গিয়া পথের সে লাথি-খাওয়া ভিখারির সম

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ প্রসাদ মাগিনু আমি–

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ ‘দ্বার খোলো,​​ পূজারী দুয়ারে তব আগত যে স্বামী!

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ খুলিল দুয়ার,​​ দেউলের বুকে দেখিনু দেবতা,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ পূজা দিনু রক্ত-অশ্রু,​​ দেবতার মুখে নাই কথা।

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ হায় হায় এ যে সেই অশ্রুহীন-চোখ,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ কেঁদে ফিরি,​​ ওগো এ কি প্রেমহীন অনাদর-হানস দেবলোক!

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ ওরে মূঢ়! দেবতা কোথায়?

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ পাষাণ-প্রতিমা এরা,​​ অশ্রু দেখে নিষ্পলক অকরুণ মায়াহীন

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ চোখে শুধু চায়।

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ এরাই দেবতা,​​ যাচি প্রেম ইহাদেরই কাছে,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ অগ্নি-গিরি এসে যেন মরুভূর কাছে হায় জল-ধারা যাচে।  ​​​​ 

আমার সে চারি পাশে ঘরে ঘরে কত পূজা কত আয়োজন,

তাই দেখে কাঁদে আর ফিরে ফিরে চায় মোর ভালোবাসা-ক্ষুধাতুর মন,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ অপমানে পুন ফিরে আসে,

ভয় হয়,​​ ব্যাকুলতা দেখি মোর কি জানি কখন কে হাসে।

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ দেবতার হাসি আছে,​​ অশ্রু নাই;

ওরে মোর যুগ-যুগ-অনাদৃত হিয়া,​​ আয় ফিরে যাই।…

এই সাঁঝে মনে হয়,​​ শূন্য চেয়ে আরো এক মহাশূন্য রাজে

দেবতার-পায়ে-ঠেলা এই শূন্য মম হিয়া-মাঝে।

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ আমার এ ক্লিষ্ট ভালোবাসা,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ তাই বুঝি হেন সর্বনাশা।

প্রেয়সীর কণ্ঠে কভু এই ভুজ এই বাহু জড়াবে না আর,

উপেক্ষিত আমার এ ভালোবাসা মালা নয়,​​ খর তরবার।

Leave a Comment