Editor's Choice

সর্বহারা কাব্যগ্রন্থের ‘সর্বহারা’ কবিতা — কাজী নজরুল ইসলাম

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সর্বহারা’ (১৯২৬) কাব্যগ্রন্থটি সাম্যবাদ, শোষিতের অধিকার আদায় এবং মেহনতি মানুষের জাগরণের এক অনন্য দলিল। এই কাব্যের নাম-কবিতা ‘সর্বহারা’-তে কবি সেইসব নিঃস্ব ও নিপীড়িত মানুষদের জাগরণের ডাক দিয়েছেন যারা যুগের পর যুগ ধরে অভাব ও বঞ্চনার চোরাবালিতে আটকে আছে। কবি তাদেরকে কান্নার এই মিথ্যা মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে বাস্তবের শক্ত মাটিতে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামসর্বহারা
কবির নামকাজী নজরুল ইসলাম
মূল কাব্যগ্রন্থসর্বহারা
প্রকাশের বছর১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দ (১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ২৫ আশ্বিন)
কবিতার ধরনসাম্যবাদী, জাগরণমূলক ও বিদ্রোহী কবিতা (Egalitarian and Awakening Poem)

সর্বহারা – সম্পূর্ণ কবিতা

ব্যথার সাতার-পানি-ঘেরা

চোরাবালির চর,

ওরে পাগল! কে বেঁধেছিস

সেই চরে তোর ঘর?

শূন্যে তড়িৎ দেয় ইশারা,

হাট তুলে দে সর্বহারা,

মেঘ-জননীর অশ্রুধারা

ঝ’রছে মাথার’ পর,

দাঁড়িয়ে দূরে ডাকছে মাটি

দুলিয়ে তরু-কর।।

কন্যারা তোর বন্যাধারায়

কাঁদছে উতরোল,

ডাক দিয়েছে তাদের আজি

সাগর-মায়ের কোল।

নায়ের মাঝি! নায়ের মাঝি!

পাল তু’লে তুই দে রে আজি

তুরঙ্গ ঐ তুফান-তাজী

তরঙ্গে খায় দোল।

নায়ের মাঝি! আর কেন ভাই?

মায়ার নোঙর তোল্।

ভাঙন-ভরা ভাঙনে তোর

যায় রে বেলা যায়।

মাঝি রে! দেখ কুরঙ্গী তোর

কূলের পানে চায়।

যায় চ’লে ঐ সাথের সাথী

ঘনায় গহন শাঙন-রাতি

মাদুর-ভরা কাঁদন পাতি’

ঘুমুস্ নে আর, হায়!

ঐ কাঁদনের বাঁধন ছেঁড়া

এতই কি রে দায়?

হীরা-মানিক

চাসনি ত সাত ক্রোর,

একটি ক্ষুদ্র মৃৎপাত্র-

ভরা অভাব তোর,

চাইলি রে ঘুম শ্রানি-হরা

একটি ছিন্ন মাদুর-ভরা,

একটি প্রদীপ-আলো-করা

একটু-কুটীর-দোর।

আস্ ল মৃত্যু আস্ত্র জরা,

আস্ ল সিঁদেল-চোর।

মাঝি রে তোর নাও ভাসিয়ে

মাটির বুকে চল্!

শক্তমাটির ঘায়ে হউক

রক্ত পদতল।

প্রলয়-পথিক চ’ল্বি ফিরি

দ’লবি পাহাড়-কানন-গিরি!

হাঁকছে বাদল, ঘিরি’ ঘিরি’

নাচছে সিন্ধুজল।

চল্ রে জলের যাত্রী এবার

মাটির বুকে চল্ ।।

Shorb hara – Shompurno Kobita

Byathar shatar-pani-ghera
Chorab alir chor,
Ore pagol! Ke bendhechhis
Shei chore tor ghor?
Shunye torit dey ishara,
Haat tule de shorbohara,
Megh-jononir oshrudhara
Jh’rchhe mathar’ por,
Dar iye dure dakchhe mati
Duliye taru-kor.
Konyara tor bonnyadhar ay
Kandchhe utorol,
Dak diyechhe tader aji
Shagor-mayer kol.
Nayer majhi! Nayer majhi!
Pal tu’le tui de re aji
Turongo oi tufan-taji
Toronge khay dol.
Nayer majhi! Ar keno bhai?
Mayar nongor tol.
Bhangon-bhora bhangone tor
Jay re bela jay.
Majhi re! Dekh kurongi tor
Kuler pane chay.
Jay ch’le oi shather shathi
Ghonay gohon shangon-rati
Madur-bhora kandon pati’
Ghumus ne ar, hay!
Oi kand oner bandhon chhera
Etoi ki re day?
Hira-manik
Chashni to shat kror,
Ekti khudro mritpatro-
Bhara obhab tor,
Chaili re ghum shrani-hora
Ekti chhinno madur-bhora,
Ekti prodip-alo-kora
Ektu-kutir-dor.
Ash’lo mrityu ashtra jora,
Ash’lo sindel-chor.
Majhi re tor nao bhashiye
Matir buke chol!
Shokto matir ghaye houk
Rokto podotol.
Proloy-pothik cholbi phiri
Dolbi pahar-kanon-giri!
Hakchhe badol, ghiri’ ghiri’
Nachchhe sindhujol.
Chol re joler jatri ebar
Matir buke chol.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • চোরাবালির মায়া ও জাগরণের ডাক:“ব্যথার সাতার-পানি-ঘেরা / চোরাবালির চর, / ওরে পাগল! কে বেঁধেছিস / সেই চরে তোর ঘর?”— কবি সর্বহারা মানুষকে প্রশ্ন করেছেন, কেন তারা দুঃখ-কষ্ট আর অভাবের চোরাবালিতে নিজেদের জীবনকে আটকে রেখেছে। আকাশ থেকে যেন বজ্রপাত ইশারা দিচ্ছে এই মিথ্যা সংসার বা মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে উঠে দাঁড়ানোর জন্য।
  • অভাবের গণ্ডি ভেঙে বৃহত্তর সংগ্রামের আহ্বান:“হীরা-মানিক / চাসনি ত সাত ক্রোর, / একটি ক্ষুদ্র মৃৎপাত্র- / ভরা অভাব তোর,”— শোষিত মানুষ কখনোই কোটি কোটি টাকার হীরা-জহরত চায়নি, তারা চেয়েছে কেবল একটি ছোট মাটির পাত্রে একটুখানি বেঁচে থাকার রসদ এবং শান্তিতে ঘুমানোর একটি কুঁড়েঘর। কিন্তু সেই সামান্য অধিকারটুকুও সমাজ তাদেরকে দেয়নি। তাই অভাবের এই ছিন্ন মাদুর ছেড়ে বৃহত্তর সংগ্রামের ময়দানে নামার কথা বলা হয়েছে।
  • মাটির পৃথিবীতে কঠিন লড়াইয়ের নির্দেশ:“মাঝি রে তোর নাও ভাসিয়ে / মাটির বুকে চল্! / শক্তমাটির ঘায়ে হউক / রক্ত পদতল।”— কবি জলের যাত্রীকে অর্থাৎ মোহ ও কান্নায় ভাসতে থাকা মানুষকে বাস্তবের শক্ত মাটিতে নামার নির্দেশ দিয়েছেন। সংগ্রাম করতে গিয়ে যদি পা রক্তাক্তও হয়, তবু এই প্রলয়ের পথে হেঁটে শোষকের বিরুদ্ধে নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে আনতে হবে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি কাজী নজরুল ইসলামের প্রামাণ্য রচনাবলী ও ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশনা (১৯২৬) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Tags :

কাজী নজরুল ইসলাম

<div id="model-response-message-contentr_6711829050503afa" class="markdown markdown-main-panel md-content enable-luminous-fast-follows enable-updated-hr-color tutor-markdown-rendering" dir="ltr" aria-live="polite"> <div>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।</div> </div>

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত