বিংশ শতাব্দীর ১৯২০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ১৯৩০-এর দশকের সূচনা পর্যন্ত সময়কালটি ছিল কাজী নজরুল ইসলামের সংগীতজীবনের এক অবিশ্বাস্য স্বর্ণযুগ। তৎকালীন গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ডিং, বেতার ও মঞ্চে তাঁর রচিত গানগুলো গোটা বাংলায় অভূতপূর্ব উন্মাদনা তৈরি করেছিল। কিন্তু এই তুমুল জনপ্রিয়তার সাথে সাথে একটি নতুন সংকট দেখা দেয়—সংগীতশিল্পী ও শিক্ষকগণ লিখিত রূপ না থাকায় নিজ নিজ খেয়ালখুশিমতো নজরুল গীতি গাইতে শুরু করেন, যার ফলে মূল গানের রাগ-রাগিণী, তান ও তালের সূক্ষ্মতা বিকৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। নিজের সৃষ্টির আদি ও অবিকল রূপকে চিরকালের জন্য অক্ষুণ্ন রাখার তাগিদ থেকে ১৯৩১ সালে (১৩৩৮ বঙ্গাব্দ) নজরুল প্রকাশ করেন তাঁর সংগীতজীবনের প্রথম স্বরলিপি গ্রন্থ ‘নজরুল স্বরলিপি’।
Table of Contents
Toggleঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রচনার নেপথ্য
গ্রামোফোন বিপ্লব ও সুর সংরক্ষণের প্রথম উদ্যোগ
১৯২৮ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে ‘বুলবুল’ (১ম খণ্ড), ‘চোখের চাতক’ এবং ‘নজরুল গীতিকা’ প্রকাশের পর দেশজুড়ে নজরুল গান শেখার তীব্র চাহিদা তৈরি হয়। তৎকালীন প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ নলিনীকান্ত সরকার, ধীরেন্দ্রনাথ দাস এবং পরে এস. কে. দাসের মতো বিশেষজ্ঞ স্বরলিপিকারগণকে সাথে নিয়ে নজরুল তাঁর সর্বাধিক জনপ্রিয় গানগুলোর আদি সুরকে ‘আকারমাত্রিক স্বরলিপি’ (Akarmatrik Notation) পদ্ধতিতে কাগজে বন্দি করেন।
নজরুল অনুধাবন করেছিলেন, মৌখিক ঐতিহ্যে সুর এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে যেতে যেতে বদলে যায়। তাই গানকে চিরস্থায়ী করতে হলে সাহিত্যের মতো সংগীতকেও লিপিবদ্ধ রূপ দেওয়া অত্যাবশ্যক। সেই ঐতিহাসিক চিন্তার প্রথম বাস্তব রূপ ছিল এই ‘নজরুল স্বরলিপি’।
‘নজরুল স্বরলিপি’: নামকরণের তাৎপর্য ও স্ব-স্বাক্ষরের মহিমা
স্বরকে লিপিতে বাঁধার আত্মপ্রত্যয়
স্বরলিপি গঠন, রাগসংগীত ও সংগীতিক বৈশিষ্ট্য
১. আকারমাত্রিক পদ্ধতির নিখুঁত প্রয়োগ
২. উচ্চাঙ্গ রাগসংগীত ও গজলের প্রামাণ্য রূপ
‘নজরুল স্বরলিপি’ (১৯৩১) সংকলনের কালজয়ী গানসমূহের প্রামাণ্য তালিকা
১. প্রখ্যাত গজল ও প্রণয়গীতি:
- বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে দিস নে আজি দোল:
- সুর ও রাগ: পিলু-বারোঁয়া (দাদরা তাল)
- ভাববস্তু: বাংলা গজলের ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা গান, যেখানে অরণ্যের চঞ্চলতা ও মিষ্টি বিরহ ফুটে উঠেছে।
- চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না:
- সুর ও রাগ: কাফি-গজল (দাদরা তাল)
- ভাববস্তু: চোখের ইশারায় ভালোবাসার ব্যাকুলতা ও অধরা প্রিয়তমের প্রতি চঞ্চল আকুতি।
- কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে এলে অনুরাগী:
- সুর ও রাগ: খাম্বাজ (দাদরা তাল)
- ভাববস্তু: প্রেমিকের প্রতি প্রিয়তমার মিষ্টি অভিমান ও অনুযোগের ক্লাসিক গজল।
- কে বিদেশী মন-উদাসী বাঁশী বাজাও বনে:
- সুর ও রাগ: পিলু (দাদরা তাল)
- ভাববস্তু: বনের গহীনে ভেসে আসা বংশীধ্বনিতে মন উদাস হওয়ার চিরন্তন অনুভূতি।
- আধো আধো বল:
- সুর ও রাগ: খাম্বাজ (কাহারবা তাল)
- ভাববস্তু: প্রিয়জনের মুখের মিষ্টি আধো-ফোটা কথার মোহময় বিবরণ।
২. বিরহ, ভাবভক্তি ও নিভৃত ভাবনার সুর:
- মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর:
- সুর ও রাগ: ভৈরবী (দাদরা তাল)
- ভাববস্তু: স্বপ্নের মাঝে প্রিয়তমের আগমন এবং জেগে উঠে তাকে না পাওয়ার আকুল বিরহ।
- আমার কোন কূলে আজ ভিড়ল তরী:
- সুর ও রাগ: ভাটিয়ালি-কাফি (দাদরা তাল)
- ভাববস্তু: জীবনসংগ্রামের বাঁকে কূল হারানোর রূপকে নিভৃত আত্মানুসন্ধান।
- দূর দীপবর্তিকা:
- সুর ও রাগ: ছায়ানট (তিতাল)
- ভাববস্তু: অন্ধকার রাতে দূর আশার আলোর প্রতি আকুল দৃষ্টি ও ব্যাকুলতা।
- আজ নিশীথে কোন পরবাসী:
- সুর ও রাগ: দরবারি কানাড়া / কাফি (কাওয়ালি তাল)
- ভাববস্তু: নিঝুম রাতে প্রবাসে থাকা প্রিয়তমের স্মৃতিতে চোখের জল ফেলা।
- নিশুতি রাতের শশী:
- সুর ও রাগ: মিশ্র ভৈরবী (কাহারবা তাল)
- ভাববস্তু: গভীর রাতের আকাশের চাঁদের সাথে হৃদয়ের গোপন বেদনার তুলনা।
৩. প্রকৃতি, অরণ্য ও স্মৃতির সুর:
- দূর প্রবাসে কে মন-উদাসী:
- সুর ও রাগ: পিলু-বারোঁয়া (দাদরা তাল)
- ভাববস্তু: পরবাসে একা বসে মাটির ও প্রিয়জনের কথা স্মরণের হাহাকার।
- আজো কাঁদে কাননে কোয়েলিয়া:
- সুর ও রাগ: ঝিঁঝিট / পিলু (দাদরা তাল)
- ভাববস্তু: বসন্তের বনে কোকিলের ডাকে প্রিয়হারা হৃদয়ের আকুল প্রশ্ন।
- আমার কালো মেঘের দল:
- সুর ও রাগ: মেঘমল্লার (দাদরা তাল)
- ভাববস্তু: আষাঢ়ের কালো মেঘের সাথে কবির চঞ্চল মনের ভেলায় ভেসে চলা।
- অরুণ-কান্তি কে গো যোগী-বর:
- সুর ও রাগ: ভৈরবী (দাদরা তাল)
- ভাববস্তু: প্রভাতের স্নিগ্ধ আলোর রূপকে পরম প্রিয়জনের আগমনী সুর।
- পরদেশী বঁধু রে:
- সুর ও রাগ: পিলু-গজল (দাদরা তাল)
- ভাববস্তু: বহুদূরে চলে যাওয়া প্রিয়জনকে ঘরের আঙিনায় ফিরে আসার আমন্ত্রণ।
- শাওন-রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে:
- সুর ও রাগ: মেঘমল্লার / কাফি (কাওয়ালি তাল)
- ভাববস্তু: শ্রাবণের অঝোর ধারায় পুরনো স্মৃতির তোলপাড় ও হৃদয়ের ব্যাকুলতা।
বাংলা সংগীতে ‘নজরুল স্বরলিপি’-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব
সুরের প্রাতিষ্ঠানিক প্রামাণিকতা
সংকলনটির একনজরে সংক্ষিপ্ত রূপরেখা
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| গ্রন্থের নাম | নজরুল স্বরলিপি |
| রচয়িতা | কাজী নজরুল ইসলাম |
| প্রকাশকাল | ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৮ বঙ্গাব্দ) |
| মূল প্রকাশক | ডি. এম. লাইব্রেরি, কলকাতা |
| ঐতিহাসিক স্থান | কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম প্রকাশিত স্বরলিপি গ্রন্থ |
| স্বরলিপিকারগণ | কাজী নজরুল ইসলাম, নলিনীকান্ত সরকার, ধীরেন্দ্রনাথ দাস |
| গ্রন্থের ধরন | আকারমাত্রিক স্বরলিপিসহ রাগাশ্রিত গীতি-সংকলন |
| মূল উদ্দেশ্য | গ্রামোফোন যুগে নজরুল গানের মূল সুর, রাগ ও তালের অবিকল রূপ সংরক্ষণ করা |
| সাংস্কৃতিক প্রভাব | বাংলা কাব্যসংগীতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বরলিপি চর্চা এবং পরবর্তীতে নজরুল ইনস্টিটিউটের স্বরলিপি খণ্ডগুলোর দিশারী |








![ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ [ যুগবাণী, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম 2 ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ [ যুগবাণী, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম](/wp-content/uploads/2024/08/ডায়ারের-স্মৃতিস্তম্ভ-150x150.jpg)













