Editor's Choice

ব্যথার দান গল্পগ্রন্থের ‘দারার কথা’ – কাজী নজরুল ইসলাম

গোলেস্তান

 

তুমি কি সেই গোলেস্তান? তবে আজ তুমি এত বিশ্রী কেন? তোমার ফুলে সে সৌন্দর্য নেই, শুধু তাতে নরকের নাড়ি-উঠে আসা পূতিগন্ধ! তোমার আকাশ আর তেমন উদার নয়, কে যেন তাকে পঙ্কিল ঘোলাটে করে দিয়েছে! তোমার মলয় বাতাসে যেন লক্ষ হাজার কাচের টুকরো লুকিয়ে রয়েছে! তোমার সারা গায়ে যেন বেদনা! …

 

কী করলে বেদৌরা তুমি? – বেদৌরা! – নাঃ, এই যে ব্যথা দিলে তুমি, – এই যে প্রাণ-প্রিয়তমের কাছ থেকে পাওয়া নিদারুণ আঘাত, এতেও নিশ্চয়ই খোদার মঙ্গলেচ্ছা নিহিত আছে! আমি কখনই ভুলব না খোদা, যে, ‘তুমি নিশ্চয় মহান আর তোমার-দেওয়া সুখ-দুঃখ সব সমান ও মঙ্গলময়! তোমার কাজে অমঙ্গল থাকতে পারে না, আর তুমি ছাড়া ভবিষ্যতের খবর কেউ জানে না!’ ব্যথিতের বুকে এই সান্ত্বনা কী শান্তিময়! …

 

আচ্ছা, তবু মন মানছে কই? কেন ভাবছি, এ নিশ্চয়ই আঘাত? – তৃষাতুর চাতক যখন ‘ফটিক জল ফটিক জল’ করে কেঁদে কেঁদে মেঘের কাছে এসে পৌঁছে, আর নিদারুণ মেঘ তার বুকে বজ্র হেনে দিয়ে বিদ্যুৎ-হাসি হাসে, তখন কেন মনে করি, এ মেঘের বড়োই নিষ্ঠুরতা? – কেন?

 

কিন্তু এত দিনেও নিজের স্বরূপ জানতে পারলুম না! আগে মনে করতুম, আমি কতো বড়ো – কতো উচ্চ! আজ দেখছি, সাধারণ মানুষের চেয়ে আমি এক রত্তিও বড়ো নই! আমারও মন তাদের মতো অমনই সংকীর্ণতা আর নীচতায় ভরা। নইলে আমি বেদৌরার এ দোষ সরল মনে ক্ষমা করতে পারলুম না কেন? হোক না কেন যতই বড়ো সে দোষ! বাহিরটা তার নষ্ট হয়েছে বটে, কিন্তু ভিতরটা যে তেমনই পবিত্র আর শুভ্র রয়েছে! অনেকে যে ভিতরটা অপবিত্র করে বাহিরটা পবিত্র রাখবার চেষ্টা করে, সেইটাই হচ্ছে বড়ো দোষ। কিন্তু এই যে বেদৌরার সহজ সরলতায় তার ভিতরটা পবিত্র রয়েছে জেনেও তাকে প্রাণ খুলে ক্ষমা করতে পারলুম না, সে দোষ তো আমারই; কেননা আমি এখনও অনেক ছোটো। জোর করে বড়ো হওয়ার জন্যে একবার ক্ষমা করতে ইচ্ছে হয়েছিল বটে, কিন্তু তা তো হতে পারে না। সে যে হৃদয় হতে নয়! নাঃ, আমাকে পুড়ে খাঁটি হতে হবে। খুব দূরে থেকে যদি মনটাকে ঠিক করতে পারি, তবেই আবার ফিরব, নইলে নয়। – ওঃ কী নীচ আমি! প্রথমে বেদৌরার মুখ থেকে তার এই পতনের কথা শুনে আমিও তো একেবারে নরক-কুণ্ডে গিয়ে পৌঁছেছিলুম। মনে করেছিলুম আমিও এমনি করে আমার সুপ্ত কামনায় ঘৃতাহুতি দিয়ে বেদৌরার উপর শোধ নেব। তারপর নরকের দ্বার থেকে কেমন করে হাত ধরে অশ্রু মুছিয়ে আমায় কে যেন ফিরিয়ে আনলে! সে বেশ শান্ত স্বরেই বললে, – ‘এ প্রতিশোধ তো বেদৌরার উপর নয় ভাই, এ প্রতিশোধ তোমার নিজের উপর!’ ভাবলুম, তাই তো, অভিমানের ব্যথায় ব্যথিত হয়ে এ কী, আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলুম! আমি আবার ফিরলুম। তার পর বেদৌরাকে বলে এলুম, – ‘বেদৌরা! যদি কোনো দিন হৃদয় হতে ক্ষমা করবার ক্ষমতা হয়, তবেই আবার দেখা হবে, নইলে এই আমাদের চির-বিদায়! মুখে জোর করে ক্ষমা করলুম বলে তোমায় গ্রহণ করে আমি তো একটা মিথ্যাকে বরণ করে নিতে পারিনে। আমি চাই, প্রেমের অঞ্জন আমার এই মনের কালিমা মুছিয়ে দিক।’ বেদৌরা অশ্রু-ভরা হাসি হেসে বললে, – ‘ফিরতেই হবে প্রিয়তম, ফিরতেই যে হবে তোমায়! এ সংশয় দু-দিনেই কেটে যাবে। তখন দেখবে, আমাদের সেই ভালোবাসা কেমন ধৌত শুভ্র বেশে আরও গাঢ় পূত হয়ে দেখা দিয়েছে! আমি তোমারই প্রতীক্ষায় গোলেস্তানের এই ক্ষীণ ঝরনাটার ধারে বসে গান আর মালা গাঁথব। আর তা যে তোমায় পরতেই হবে। ব্যথার পূজা ব্যর্থ হওয়ার নয় প্রিয়! … কোথায় যাই এখন, আর সে কোন্ পথে? ওগো আমার পথের চিরসাথি, কোথায় তুমি? –

Tags :

কাজী নজরুল ইসলাম

<div id="model-response-message-contentr_6711829050503afa" class="markdown markdown-main-panel md-content enable-luminous-fast-follows enable-updated-hr-color tutor-markdown-rendering" dir="ltr" aria-live="polite"> <div>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।</div> </div>

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

    Join Us!

    Hey there! Here’s a neat way to recieve our latest posts & updates – just subscribe to our newsletter.

    Error: Contact form not found.

    Zero spam, Unsubscribe at any time.