প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ময়দান থেকে ফেরা এক তরুণ কবি—কাজী নজরুল ইসলাম। যুদ্ধক্ষেত্রে দেখা মৃত্যু, ধ্বংস, অথচ মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অদম্য বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা—সবই তার ভেতরে জমা হচ্ছিল আগ্নেয়গিরির মতো। তখন ভারত জুড়ে চলছিল ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন। রাজপথে মিছিল, গ্রামে-শহরে সভা, আর যুবসমাজের হৃদয়ে অগ্নিশিখার মতো ছড়িয়ে পড়ছিল মুক্তির স্বপ্ন। সেই উষ্ণ সময়ে, ১৯২০-এর দশকের শুরুতে, নজরুল লিখলেন এক গান—যা শুধু সুর নয়, হয়ে উঠল আন্দোলনের পদচারণার ধ্বনি—“চল্ চল্ চল্”।
গানটি তিনি লিখেছিলেন সৈনিকের মার্চ-পদক্ষেপের তালে, যেন প্রতিটি শব্দ বুকে বাজে যুদ্ধের ঢাকের মতো। “চল্ চল্ চল্”—এই তিনটি শব্দে তিনি বুনেছিলেন মুক্তির আহ্বান, সংগ্রামের ডাক, আর ভয়হীন অগ্রযাত্রার প্রতিশ্রুতি। তামাশা বা মঞ্চসজ্জা নয়, এটি ছিল সরাসরি যুদ্ধের মন্ত্র, যা শুনে যে কেউ মনে মনে অস্ত্র তুলে নিতে প্রস্তুত হতে পারে।
গান প্রকাশের পর এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ছাত্রসমাজ ও বিপ্লবীদের মধ্যে। রাস্তার মিছিলে, রাজনৈতিক সমাবেশে, এমনকি নাটকের মঞ্চেও ধ্বনিত হতো এর তালে পদক্ষেপ। প্রতিটি গানের লাইনে ফুটে উঠত এক অদম্য দৃঢ়তা—যে দৃঢ়তা শোষণ ভেঙে মুক্তি আনতে চায়।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় গানটি আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে, সীমান্তের ওপারে প্রশিক্ষণ শিবিরে, মুক্তিকামী মানুষের সমাবেশে—সবখানেই বাজত এই গান। যেন এটি শুধু একটি গান নয়, যুদ্ধের অদৃশ্য পতাকা, যা লড়াইরত প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে উড়ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সরকার এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের জাতীয় রণসঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
আজও জাতীয় দিবসে, সামরিক কুচকাওয়াজে বা স্কুলের জাতীয় কর্মসূচিতে বাজে এই গান, আর মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা শুধুমাত্র অতীতের এক গল্প নয়, এটি এক চলমান অগ্রযাত্রা, যেখানে প্রতিটি প্রজন্মেরই দায়িত্ব আছে সামনে এগিয়ে চলার। “চল্ চল্ চল্”—এই ডাক আজও সময়ের সীমা পেরিয়ে নতুন প্রজন্মের রক্তে আন্দোলন তোলে, যেমনটি তা করেছিল একশো বছর আগে এক বিদ্রোহী কবির কলম থেকে জন্ম নেওয়ার দিন।
মার্চের সুর
তালঃ ত্রিমাত্রিক ছন্দ
চল্ চল্ চল্
চল্ চল্ চল্। চল্ চল্ চল্। ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল নিম্নে উতলা ধরণী-তল অরুণ প্রাতের তরুণ দল চল্ রে চল্ রে চল্ চল্ চল্ চল্।। ঊষার দুয়ারে হানি’ আঘাত আমরা আনিব রাঙা প্রভাত আমরা টুটাব তিমির রাত বাধার বিন্ধ্যাচল। নব নবীনের গাহিয়া গান সজীব করিব মহাশ্মাশান আমরা দানিব নূতন প্রাণ বাহুতে নবীন বল। চল্ রে নও জোয়ান শোন্ রে পাতিয়া কান মৃত্যু-তোরণ-দুয়ারে-দুয়ারে জীবনের আহবান। ভাঙ্ রে ভাঙ্ আগল চল্ রে চল্ রে চল্ চল্ চল্ চল্।।
