সঙ্গীতে ব্যবহৃত বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের পরিচয়

সঙ্গীতে ব্যবহৃত বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের পরিচয় নিয়ে আজকের আলোচনা। বাদ্যযন্ত্র হল এমন একপ্রকার যন্ত্র যা এমনভাবে তৈরি বা সংস্কার করা হয়েছে যাতে তা সুর বা সুরেলা শব্দ সৃষ্টি করতে পারে এবং গানের সহায়ক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। অর্থগত দিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, যেকোনো বস্তু যা শব্দ সৃষ্টি করতে পারে, তাকেই আমরা বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারি।

সঙ্গীতে ব্যবহৃত বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের পরিচয়

সঙ্গীতে ব্যবহৃত বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের পরিচয়

তানপুরা :

তানপুরা বা তাম্বুরা কণ্ঠসঙ্গীতের পক্ষে একটি অপরিহার্য বাদ্যযন্ত্র । তবে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গেও তানপুরা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ‘এই যন্ত্রটিতে তারের সংখ্যা চারটি । ১ম তারটি মন্ত্র সপ্তকের পঞ্চম (রাগবিশেষে মধ্যম বা নিষাদ), ২য় ও ৩য় অর্থাৎ মাঝের তার দুটির (জুড়িয়ে তার) মধ্যে সপ্তকের ষড়জে এবং ৪র্থ তারটিকে মন্ত্র ষড়জে বাঁধা হয়ে থাকে; প্রথম তিনটি তার সাধাণত: স্টিলের হয় এবং ৪র্থ তারটি হয় পিতলের; তবে কেউ কেউ ১ম তারটি পিতলে ব্যবহার করে থাকেন। চারটি তার ব্যতীত তানপুরার অন্যান্য অঙ্গের বিবরণ নিম্নে দেওয়া হল ।

(১) তানপুরার তুম্বা-

লাউয়ের মতো প্রায় গোলাকার খোলটির নাম তুম্বা এবং এটির ভিতরটা ফাঁপা থাকে ।

(২) তানপুরার তবলী-

তুম্বার উপরিভাগস্থ কাঠের ঢাকনাটাকে তব্‌লী বলে ।

(৩) তানপুরার দণ্ড-

এটি কাঠের এবং এর ভেতরটা ফাঁপা। তুম্বার সঙ্গে যুক্ত লম্বা কাষ্ঠখণ্ডটির নাম দণ্ড ।

(৪) তানপুরার ব্রিজ-

তবলীর উপরস্থ হাড়ের টুকরাটিকে ব্রিজ বলে। ব্রিজের উপর দিয়ে চারটি তার গেছে।

(৫) তানপুরার গুলু-

তুম্বা ও দণ্ডের সংযোজক স্থানটিকে বলা হয় গুল বা গুলু ।

(৬) তানপুরার খুটি –

দণ্ডের উপরিভাগস্থ চারটি ছোট ছোট কাঠের খণ্ড। চারটির মধ্যে দুটি থাকে দণ্ডের সামনে এবং অপর দুটি থাকে দণ্ডের পাশে। খুঁটিকে আবার কানও বলা হয়। চারটি তার এই চারটি কানের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।

(৭) তানপুরার লগোট বা মোগরা-

তুম্বার শেষস্থ ছোট ছোট ছিদ্রযুক্ত কাঠের পট্টির নাম লগোট, মোগরা বা পন্থী। চারটি তার এখান হতে ব্রিজের উপর দিয়ে কানের বা খুঁটির সঙ্গে সংযুক্ত থাকে ।

(৮) তানপুরার মনকা-

ব্রিজের নীচে চারটি তারের সঙ্গে যুক্ত ছোট ছোটগুলিকে বলে মনকা। মনুকাগুলি সাধারণ: হাড়ের হয় এবং হাঁস বা পান ইত্যাদি বিভিন্ন ডিজাইনেরও হয়ে থাকে।

(৯) তানপুরার অটি-

দণ্ডের উপর, কিন্তু খুঁটির ঠিক নিচেই ছোট ছোট দুইটি কাঠের বা হাড়ের টুকরার নাম অটি।

(১০) তানপুরার তারগহন-

অটির উপরস্থ পটিকে বলে তারদান বা তারগহন। এই তারগহনের চারটি ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে চারটি তার খুঁটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

(১১) তানপুরার সুতা-

ব্রিজের উপরে এবং তার চারটির নিম্নে থাকে সুতা। তানপুরায় জোয়ারী ঠিক করতে অর্থাৎ সুরের স্বাভাবিক ঝঙ্কার উৎপন্ন করবার জন্য সুতাগুলি ব্যবহার করা হয়।

 

বাদ্যযন্ত্রগুলির পরিচয়

 

তবলা:

তবলা বিতত বা অনবদ্ধ বাদ্য শ্রেণীভুক্ত। চর্মাচ্ছোদিত বাদ্যযন্ত্র বা উভয় হস্তের দ্বারা বাজান হয় সেগুলিকে অনবদ্ধ বাদ্য বলে। তবলা কোন সময় বা কার দ্বারা আবিষ্কৃত হয়েছিল সে বিষয়ে সঠিক করে কিছু বলা যায় না। তবে তবলার আবিষ্কার প্রসঙ্গে আমীর খসরুর (১২৫৩-১৩২৫ খ্রী:) নাম শোনা যায়। প্রবাদ আছে যে আমীর খসরু মৃদঙ্গকে দুই ভাগে বিভক্ত করে তার দক্ষিণ ভাগের অনুরূপ করে তবলা এবং বাম ভাগের মত করে ‘বায়া’ তৈরী করেন। তাই তবলা বাদনে তবলা এবং বাঁয়া দুটিরই প্রয়োজন। দক্ষিণ হস্তে বাজান হয় তবলা, তাই তবলার অপর নাম ‘দাহিনা’ এবং বাম হস্তে যেটিকে বাজান হয়ে তার নাম ‘বাঁয়া’। বাঁয়াকে কখনও কখনও ‘ডুগী’ ও বলা হয়। সঙ্গীতে তালরক্ষা বিষয়ে তবলা অপরিহার্য।

তবলার খোলটি হয় কাঠের এবং এর উপরিভাগ চর্মাচ্ছাদিত। বিশেষ প্রকারের কুঁড়ির মত হয় এর আকৃতি। তবলার বিভিন্ন অংশ আছে, যেমন কুঁড়ী, পুড়ী, গাট, গজরা, চিহাই, ময়দান, চাটা, ধাধ, গটা এবং গজারী। নিম্নে তবলার অংশগুলির বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া হল :-

তবলার কুঁড়ীঃ

কাঠের তৈরী একটি বিশেষ বস্তু যার নিম্নভাগ চওড়া এবং উপরিভাগ অপেক্ষাকৃত সরু। উপরিভাগটি চর্মাচ্ছাদিত থাকে। এই কাঠের খোলটিকেই বলে কুঁড়ী ।

তবলার পুড়ীঃ

পুড়ীকে কখন কখন গির্জাও বলা হয়। কুঁড়ীর উপরিভাগস্থ বিশেষ চর্মাচ্ছাদিত অংশটির নাম পুড়ী।

তবলার গোটঃ

পুড়ীর চতুস্পার্শ্বে দুই ইঞ্চি চওড়া যে চামড়াটি লাগান থাকে তাকে গোট বলে।

 

বাদ্যযন্ত্রগুলির পরিচয়

 

তবলার গজরাঃ

‘গোট’-এর পাশেই চতুর্দিকে সংলগ্ন চামড়ার গোলাকার (বিড়ার মত) পদার্থটির নাম গজরা।

তবলার চিহাই :

চর্মাচ্ছাদিত অংশের ঠিক মাঝখানে কালো রঙের গোলাকার অংশটিকে বলা হয় চিহাই।

তবলার ময়দানঃ

চিহাই এবং গোটের মধ্যবর্তী চতুর্দিকের গোলাকার অংশটির নাম ‘লব’ বা ময়দান ।

তবলার চাঁটীঃ

গোটের উপরে চতুর্দিকের গোলাকার উঁচু প্রান্তভাগটিকে বলা হয় চাঁটা।

তবলার বাঁধঃ

কুঁড়ীর চতুর্দিকে নীচু, হতে উপরের দিকে সরু সরু বেল্টের (Belt) মতো যে চামড়াগুলি থাকে তাকে ‘দল’ বা ‘বাঁধ’ বলে।

তবলার গট্টাঃ

প্রায় তিন ইঞ্চি লম্বা কাঠের তৈরী গোলাকৃতি একটি টুক্রা যেগুলি পৃথক পৃথক ভাবে “দল” এর মধ্যে প্রবেশ করান থাকে। এগুলিকে ‘অড্ডু’ও বলা হয়। এই ‘গট্টা’ বা অড্ডু’ সংখ্যায় থাকে ৮টি এবং এগুলি তবলায় সুর বাঁধার কাজে ব্যবহৃত হয়।

তবলার গজরাঃ

তবলার নীচে যে একটি চামড়ার গোলাকৃতি বস্তু থাকে তাকেই বলে গুজরী। উপরের গজরা এবং নীচে এই গুজরীর সঙ্গে দলগুলি সংযুক্ত থাকে।

 

সঙ্গীতে ব্যবহৃত বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের পরিচয়

 

তবলার বাঁয়ার বিবরণঃ

তামা, পিতল অথবা মাটি দিয়ে তৈরী হয় বায়ার অবয়ব। উপরিউক্ত তিনটির মধ্যে পিতলের বাঁয়ার প্রচলনই বেশী। তবলা হতে বাঁয়ার গঠন ভিন্ন প্রকার। বাঁয়ার নিম্নাংশ হতে ঊর্ধ্বাংশ অধিক চওড়া। তবলার মত বাঁয়ার ভিন্ন ভিন্ন অংশ আছে, যেমন-কুঁড়ী, পুড়ী, গোট, গজরা, চিহাই, দল, গুজরী, ময়দান এবং চাঁটা; কেবলমাত্র এত গট্টা নেই। তবলার বর্ণিত অংশের মতই বায়ার অংশগুলি, তবে কিছু পার্থক্য আছে। যেমন-

(ক) তবলার ‘চিহাই’ থাকে ‘পুড়ীর’ ঠিক মাঝখানে, কিন্তু বাঁয়ার ‘চিহাই’ থাকে কিনারার দিকে।

(খ) তবলার ‘চিহাই’ বিশেষ প্রয়োজনীয় অংশ, কারণ এর উপর নানা প্রকার বোল বাজান হয়ে থাকে, কিন্তু বাঁয়ার ‘চিহাই’-এর উপর কোন বোল বাজান হয় না।

 

গীটার :

বর্তমান কালে গীটার একটি জনপ্রিয় যন্ত্র। এই যন্ত্রে একদিকে যেমন শাস্ত্রীয় রাগের সুষ্ঠু রূপায়ণ সম্ভব, তেমনই রবীন্দ্রসঙ্গীত, অতুলপ্রসাদী গান, নজরুলসঙ্গীত ইত্যাদিও সুপরিবেশন করা যায়। গীটারের উৎপত্তি সম্বন্ধে নানা মত প্রচলিত আছে। কারো কারোও মতে ভরতের কচ্ছপী বীণার পরিবর্তিত রূপ বর্তমান কালের গীটার, আবার কারো মতে এই যন্ত্রটির উদ্ভব হয়েছে স্পেন দেশে।

 

 

বাদ্যযন্ত্রগুলির পরিচয়

 

গীটার দুই প্রকার :

স্প্যানিষ (Spanish) এবং হাওয়াইয়ান (Hawaian)। স্প্যানিশ গীটার বামহস্তের অঙ্গুলী দ্বারা বিভিন্ন পর্দা চেপে ধরে দক্ষিণ হস্তধৃত একটি স্ট্রাইকার দ্বারা আঘাত করে বাজান হয়। এই স্প্যানিশ গীটার থেকেই হাওয়াইন গীটারের উদ্ভব হয়েছে। হাওয়াইন গীটারের আর একটি প্রকারকে বলা হয় ইলেকট্রিক গীটার। এই গীটারের সঙ্গে থাকে একটি অ্যামপ্লিফায়ার (Amplicier)। হাওয়াইয়ান গীটারের তার- সংখ্যা ছয়টি। এই যন্ত্রটি বাজান হয় দক্ষিণ হস্তের তিনটি অঙ্গুলীতে (বৃদ্ধাঙ্গুল তর্জনী এবং মধ্যমা) পরিহিত পিকস (Picks) দ্বারা।

তর্জনী এবং মধ্যমাঙ্গুলীর পিকস হয় প্লাস্টিক, সেলুলয়েড বা ব্যাকোলাইটের। পিসগুলির দ্বারা আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে বাম হস্তধৃত একটি স্টিলের বার (Bar) তারগুলির বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত করে হাওয়াইয়ান গীটার বাজাতে হয়। নিম্নে গীটারের অঙ্গের বর্ণনা দেওয়া হল।

গীটার যন্ত্রটি দেখতে অনেকটা বৃহৎ আকারের বেহালার মতো। এর সম্পূর্ণ আবয়বটি কাষ্ঠনির্মিত এবং মধ্যস্থানে থাকে একটি গোলাকার গর্ত, যাকে বলা হয় সাউন্ড হোল (sound Hole) গীটারের সরু লম্বা কাঠ খণ্ডটিকে বলা ফিঙ্গার বোর্ড (Finger Board)। এই ফিঙ্গার বোর্ডে ১৮/১৯ টি সরু পিতলের বা প্লাস্টিকের পর্দা লাগান থাকে যাকে বলা হয় ফ্রেট (Fret)। ফ্রেটের মাঝে মাজে থাকে ৩/৪টি সাদা গোল চিহ্ন। এই চিহ্নগুলিকে বলা হয় স্বরনির্দেশক চিহ্ন। সাউন্ড হোলের নিকটস্থ উঁচু স্থানটিকে বলা হয় ব্রিজ (Bridge) এবং গীটারের পশ্চাতে থাকে ত্রিকোণাকার ধাতু-নির্মিত টেল পীস (Tnl piece)। গীটারের যতৃতন্ত্রীকে এই টেল পীস থেকে বিয়ের উপর নিয়ে উভয় পার্শ্বে তিনটি করে ঊর্ধ্বাংশের ছয়টি কর্ণের সংযুক্ত করা হয়েছে। এই ছয়টি কর্ণ হয় প্লাস্টিকের বা ধাবত নির্মিত ।

প্রয়োজনানুসারে একাধিক স্কেলে গীটারের সুর বাঁধা হয়, তবে কিছু রাগ এবং বিভিন্ন গান বাজনার জন্য সাধারণত: ‘ই’ মেজর সমকো১ মধ্যলাজোসপ্তকের বড়জ, ২য় তার-মন্ত্র পঞ্চম, ৩য় তার মন্ত্র গান্ধার, ৪র্থ। অঞ্চলমন্ত্রবজি, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তার-অতি মন্ত্র পঞ্চম ও ষড়জ) সুর বাঁধা হয়ে থাকে তিনটি বিভাগে ৩টি তালি।

 

 

google news logo

 

খোলঃ

খোল আবদ্ধ বা অনবন্ধ বাদ্যের অন্তর্গত। এর আর একটি নাম মৃদঙ্গ। পাখোয়াজ বা দক্ষিণ ভারতীয় মৃদঙ্গের সঙ্গে খোলের কোন মিল নেই। খোলের সম্পূর্ণ কাঠামোটাই তৈরি হয় পোড়া মাটি দিয়ে। “দুই নিক চালু মধ্যস্থলের পরিধি স্ফীত। বাম এবং দক্ষিণ দুইটি মুখ চর্মাকৃত এবং মধ্যভাগ গাবযুক্ত। বাম মুখটি দক্ষিণ অপেক্ষা বৃহত্তর। দুই মুখের চর্মাবরণ চামড়ায় টানায় আঁটিভাবে সংযুক্ত থাকে (ভারতকোষ)। খোলের দক্ষিণ মুখের পরিধি মাত্র ২/৩ ইঞ্চির বেশী হয় না এবং সুর অতি তারার কোন স্বরে থাকে। কিন্তু এর বাম মুখটিতে অনেকটা বাঁয়ার মত শব্দ হয়। খোলের বৈশিষ্ট এই যে তবলার মত এর সুর বাঁধাবাঁধির ব্যাপার নেই।

Leave a Comment