কাজী নজরুলের আত্মমূল্যায়ন

কাজী নজরুলের আত্মমূল্যায়ন নিয়ে আজকের আয়োজন। কবি নিজেই নিজের যে মুল্যায়ন তাঁর অভিভাষণ ও পত্রের মাধ্যমে করে গেছেন, তার ওপরে বোধ হয় আমার বক্তব্য মুল্যহীন হয়ে দাঁড়াবে। তাই ১৯৪১ – খ্রীষ্টাব্দের ৫ই ও ৬ই এপ্রিলে অনুষ্ঠিত ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির জুবিলি উৎসবের সভাপতির ভাষাণে কাজী নজরুলের আত্মমূল্যায়ন, কাজী মোতাহার হোসেনকে লিখিত দুটি পত্রে (পদ্মা। ২৪-২-২৮ সন্ধ্যা/ “Vulture” ষ্টীমার), (১৫ জেলিয়াটোরলা ট্রীট /কলিকাতা/৮-৩-২৮/ সন্ধ্যা) বিধৃত কবির বক্তব্যকে তুলে ধরে তাঁর মুল্যায়ন করলাম। এ শুধু গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো মাত্র।

 

কাজী নজরুলের আত্মমূল্যায়ন

 

কাজী নজরুলের আত্মমূল্যায়ন

“যে মহাসাগর থেকে ঝড়ের রাতে শ্যামঘন মেঘরূপে আমি সহসা এসোলাম ঘন ঘন বিদ্যুৎছটায়, বজ্রের রোলে, ঘোর তিমির ঘনঘটায়, মুক্তজটায় দিগদিগন্ত ছেয়ে ফেলেছিলাম, অজস্র বারিবর্ষণে ভূষিত মাঠঘাট প্রান্তরের তৃষ্ণ মিটিয়েছিলাম, আমার রুদ্রসুন্দর নৃত্য দেখে যারা দেখতে পাননি যে, এই অশান্ত মেঘঘন রূপ শুধু রুদ্রের ডমরু বিষাণ নিয়েই আসেনি, এরই করুণ নয়নের অশ্রুধারায় পৃথিবীতে ফুটেছে প্রেমের ফুল, শতদল, বৃত্ত; বনলতা হয়ে উঠেছে আনন্দে কণ্টকিত; এই মেঘই এনেছে আনন্দ-বন্যা, ছন্দের নুপুর-ধ্বনি, সুরের সুরধুনী, গানের প্রবাহ, সেই মেঘ একদিন দেকতে পেল সে তুষারীভূত হয় শ্বেত শুভ্ররূপে হিমালয়ের উচ্চতম শিকরে পড়ে আছে।

তার শক্তি— তার প্রিয়াও যেন মহাশ্বেতা রূপে তার বামে সমাধিস্থা। সেই সমাধির মাঝে আমি যেখান থেকে এসেছিলাম সেই সমুদ্রকে স্মরণ করতাম। সহসা মনে হত, এই মহাসমুদ্র এল কোথা থেকে। খুঁজতে গিয়ে মন বুদ্ধি অহংকার- সব কিছু হারিয়ে যেত আকাশের পর আকাশ পেরিয়ে কোন এক পরম শূন্যে। তাই বন্ধুদের বলছি, এ আমার কার্পণ্য নয়, স্বার্থপরতা নয়- এ আমার স্বধর্ম, আমার স্বভাব।

 

কাজী নজরুলের আত্মমূল্যায়ন

 

তাঁরা তুষারীভূত আমাকে ভেঙে যেটুকু বরফ পেয়েছেন, তাতে তাঁদের তৃষ্ণা দূরীভূত হয় না। বলছেন আমি তাঁদের আমার অসহায় অবস্থার কথা বললে বিশ্বাস করেননি। ঘুড়ি উড়তে উড়তে গেছে ভালে আটকে, টানাটানি করতে সুতো ঘুড়ি সব যাবে ছিঁড়ে- অবুঝ হাত তবু টানা-হেঁছড়া করতে ছাড়ে না।

আনন্দ-রসঘন স্বর্ণবর্ণের এক না-জানা আকাশ থেকে যে শক্তি অমায় রস সরবরাহ করতেন- আগেই বলেছি, তিনি মহাশ্বেতা রূপে মাঝে মাঝে হয় যান সমাধিস্থা। তখন আমিও হয়ে যাই নীরব, আমার বাঁশি আর বাজে না, রসস্রোত হয়ে যায় তুষারীভূত, আমার আনন্দময় তনু হয়ে যায় পাষাণ-বিগ্রহ। এ মৃত্যু নয়, কিন্তু মৃত্যুর চেওে নিরানন্দময়। আজ আপনাদের কাছে বলে যাব- আবার নিদ্রিতা সমাধিস্থা শক্তি জেগেছেন, তবে তন্দ্রার ঘোর সমাধির বিহলতা কাটেনি।

আমার সেই আনন্দময়ী শক্তি যদি আবার সমাধিস্থা না হন, আমার পরম শূন্যে নিয়ে গিয়ে চিরকালের জন্য লয় না করেন, তাহলে এই পৃথিবীতে যে প্রেমের, যে সাম্যের, যে আনন্দের গান গেয়ে যাব- সে গান পৃথিবী বহু কাল শোনেনি। আমার চিরজনমের প্রিয়া এই প্রেমময়ীর প্রেম যদি না পই- তাহলে বুঝব আমার এ বারের মতো খেলা ফুরাল। অমার বাঁশি বিরহ যুমনার তীরে ফেলে চলে যাব। শুষ্ক যমুনার বালুচর থেকে সেই বেণু কুড়িয়ে যদি অন্য কেউ বাজাতে পারেন, আমার ফেলে যাওয়া বাঁশি ধন্য হবে।…

 

কাজী নজরুলের আত্মমূল্যায়ন

 

যদি আর বাঁশি না বাজে আমি কবি বলে বলছিনে- আমি আপনদের ভালোবাসা পেয়েছিলাম সেই অধিকারে বলছি- আমায় ক্ষমা করবেন- আমায় ভুলে যাবেন। বিশ্বাস করুণ আমি কবি হতে আসিনি, আমি নেতা হতে আসনি – আমি প্রেম নিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম-সে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নীরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।

হিন্দু মুসলমানের দিন রাত হানাহানি, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ বিগ্রহ, মানুষের জীবনে একদিকে কঠোর দারিদ্র, ঋণ, অভাব অন্যদিকে লোভী অসুরের যক্ষের ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা পাষাণ-স্তূপের মত জমা হয়ে আছে- এই অসাম্য, এই ভেদ জ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলাম। আমার কাব্যে, সঙ্গীতে, কর্মজীবনে, অভেদসুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম- অসুন্দরকে ক্ষমা করতে, অসুরকে সংহার করতে এসেছিলাম- আপনারা সাক্ষী আর সাক্ষী আমার পরম সুন্দর।

আমি যশ চাই না, খ্যাতি চাই না, প্রতিষ্ঠা চাই না, নেতৃত্ব চাই না- তবু- আপনারা আদর করে যখন নেতৃত্বের আসনে বসান, তখন অশ্রু সম্বরণ করতে পারি না। তাঁর আদেশ পাইনি, তবু কণ্ঠ সুনদর রূপে আবার আপনাদের নিয়ে এই অসুন্দর, এই কুৎসিত অসুরদের সংহার করতে ইচ্ছা করে। যদি আপনাদের প্রেমের প্রবল টানে আমাকে আমার একাকিত্বের পরম শূন্য থেকে অসময়েই নামতে হয়- তাহলে সেদিন আমায় মনে করবেন না আমি সেই নজরুল।

সে নজরুল অনেক দিন আগে মৃত্যুর খিড়কি দুয়ার দিয়ে পালিয়ে গেছে। সেদিন আমাকে কেবল মুসলমানের বলে দেখবেন না- আমি যদি আসি, আসব হিন্দু মুসলমানের সকল জাতির ঊর্ধ্বে যিনি একমেবাদ্বিতীয়ম তাঁরই দাস হয়ে। আপনাদের আনন্দের জুবিলি-উৎসব আজ যে পরম বিরহীর – আত্মা ছায়াপাতে বর্ষাসজল রাতের মতো অন্ধকার হয়ে এল, আমার সেই বিরহ সুন্দর প্রিয়তমকে ক্ষমা করবেন, আমায় ক্ষমা করবেন- মনে করবেন- পূর্ণত্বের তৃষ্ণ নিয় যে একটি অশস্ত তরুণ এই ধরায় এসেছিল, অপূর্ণতার বেদনায় তারই বিগত- যেন স্বপ্নে আপনাদের মাঝে কেঁদে গেল।

সাহিত্য ব্যক্তিত্বেরই প্রকাশ। আমি সাহিত্যে কী করেছি, তার পরিচয় আমার ব্যক্তিত্বের ভিতর। পদ্ম যেমন সুর্যের ধ্যান করে, তারই জন্য তার দল মেলে, আমিও আমার ধ্যানের প্রিয়তমের দিকে চেয়েই গড়ে উঠেছি। আমি কোনো বাধা-বন্ধন স্বীকার করিনি, বিস্তৃত দিনের স্মৃতি আমার পথ ভুলায়নি, আমি আমার বেগে পথ কেটে চলেছি ।

রবীন্দ্রনাথ আমায় প্রায় বলতেন, “দেখ, উন্মাদ, তোর জীবনে শেলীর মত কীটস এর মত খুব বড় একটা tragedy আছে, তুই প্রস্তুত হ!” জীবনে সেই ট্রাজেডি দেখবার জন্য আমি কতদনি অকারণে অন্যের জীবনকে অশ্রুর বরযারয় আচ্ছন্ন ক’রে দিয়েছি, কিন্তু আমারই জীবন রয়ে গেছিল বিশুষ্ক মরুভূমির মত তপ্ত মেঘের উর্ধে শূন্যের মত। কেবল হাসি কেবল গান। কেবল বিদ্রোহ।

আমার রক্তে রক্তে শেলীর মত কীটসকে এত করে অনুভব করছি কেন? বলতে পার? কীটস এর প্রিয়া ফ্যানিকে লেখা তাঁর কবিতা পড়ে মনে হচ্ছে, যেন এ কবিতা আমিই লিখে গেছি। কীটস এর ‘সোরথ্রোট’ হয়েছিল- আর তাতেই মরল ও শেষে- অবশ্য তার সোর্স হার্ট কি না কে বলবে কণ্ঠ প্রদাহ রোগে আমিও ভুগছি ঢাকা থেকে এসে অবধি, রক্তও উঠছে মাঝে মাঝে আর মনে হচ্ছে আমিই যেন কীটস। সে কোন্ ফ্যানির নিষ্করুণ নির্মমতায় হয়ত বা আমারও বুকের চাপ ধরা রক্ত তেমনি ক’রে কোনদিন শেষ ঝলক উঠে আমায় বিয়ের বরের মত ক’রে রাঙিয়ে দিয়ে যাবে।

তারপর হয়ত বা বড় বড় সভা হবে। কত প্রশংসা কত কবিতা বেরুবে হয়তা আমার নামে। দেশপ্রেমিক, ত্যাগী, বীর, বিদ্রোহী- বিশেষণের পর বিশেষণ। টেবিল ভেঙে ফেলবে থাপ্পড় মেরে বক্তার পর বক্তা। এই অসুন্দর শ্রদ্ধানিবেদনের শ্রাদ্ধ-দিনে- বন্ধু। তুমি যেন যেয়ো না। যদি পার চুপটী ক’রে বসে আমার অলিখিত জীবনের কোন একটি কথা স্মরণ করো। তোমার ঘরের অভিনায় বা আশেপাশে, যদি একটি করা, পায়ে পেষা ফুল পাও, সেইটিকে বুকে চেপে বলো- “বন্ধু, আমি, তোমায় পেয়েছি।”

আকাশের সবচেয়ে দূরের যে তারাটির দীপ্তি চোখের জলকণার মত ঝিলমিল করবে- মনে করো, সেই তারাটি আমি। আমার নামে তার নামকরণ করো। কেমন?”

Leave a Comment