কাজী নজরুলের কয়েকটি গানের গীতিউৎস

বিভিন্ন রাগ-রাগিণী ও সুর-তালের ব্যবহারে নজরুল আধুনিক বাংলা গানকে শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন, তাই হাজার বছরের বাংলা গানের ইতিহাসে নজরুল এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। তাঁর গান একদিকে যেমন মধ্যযুগীয় বাংলার কীর্তন ও শ্যামাসঙ্গীত বা ঐতিহ্যবাহী লোকসঙ্গীতকে বিষয় ও সুরের দিক থেকে অবলম্বন করেছে, অপরদিকে তেমনি উত্তর ভারতীয় রাগসঙ্গীত ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুম্রি, টপ্পা ও গজলকে আঙ্গিক ও সুরের ভিত্তি করেছে।

 

কাজী নজরুলের কয়েকটি গানের গীতিউৎস পার্ট ১

 

Table of Contents

কাজী নজরুলের কয়েকটি গানের গীতিউৎস

(১) বসিয়া বিজনে কেন একা মনেঃ

কৃষ্ণনগরের চাঁদ সড়কে থাকাকালীন নজরুল একবার সবান্ধবে দূরবর্তী চাবড়ির বিলে হাঁস শিকার করতে যান। শিকার পূর্ব সমাপান্তে কবি বসে ছিলেন নৌকায়। শেষ বিকেলে অন্তগামী সূর্যের অপূর্ব শ্যালিমায় বিলের জল রাঙা হয়ে উঠেছে। যেন একটি স্বর্গীয় দৃশ্য। দূরে গৃহস্থ বধূরা দল বেঁদে জল ভরতে আসছে। এ দৃশ্য কবির মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। সেদিন রাতেই তিনি লিখলেন এই বিখ্যাত গজল, ‘বসিয়া বিজনে কেন একা মনে, পানিয়া ভরণে চললো গোরী’ রচনাকাল, মাঘ, প্রকাশিত হয় ৪র্থ বর্ষ ১১শ সংখ্যা ‘কল্লোল’-এ (ফাল্গুন ১৩৩৩ সাল মোতাবেক ফেব্রুয়ারি ১৯২৭)। গানটি পরে ‘বুলবুল’ ও ‘নজরুল গীতিকা’য় সংকলিত হয়। পরে গানটিতে কণ্ঠদেন কে মল্লিক, রেকর্ড নং এইচ এম ভি ১১৪৭১।

(২) আসিলে কে গো অতিথি উড়ায়ে নিশান সোনালী

মুসলিম সাহিত্য সমাজের অমন্ত্রণে এই সমাজের প্রথম বার্ষিক সম্মেলনে উদ্বোধন করতে নজরুল ঢাকায় আসেন ১৩৩৩ সালের মাঘ মাস মোতাবেক ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ২৮ ফেব্রুয়ারি, রবিবারে। এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন সঙ্গীত হিসেবে ঢাকায় আসার পথে পদ্মার বুকে স্টীমারে বসেই ২৭ তারিখে কবি রচনা করেন এই গানটি। “খোশ আমদেদ” শিরোনামে গানটি পরে ‘শিখা’র ১ম বর্ষের ১ম সংখ্যায় (চৈত্র ১৩৩৩), সওগত ৪র্থ বর্ষ ১০ম সংখ্যায়, প্রগতি ১৩৩৪ সালের মাঘ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ‘জিঞ্জীর’, ‘চোখের চাতক’ এবং ‘নজরুল গীতিকা’ এই তিনটি গ্রন্থেই গানটি সংকলিত হয়েছে।

(৩) চল চল চল, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল :

মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধন উপলক্ষ্যে কবি পুনরায় ঢাকায় আসেন ১১২৮ সালের মার্চে। এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন সঙ্গীত হিসেবে তিনি রচনা করেন তাঁর এই বিখ্যাত গানটি। গানটি ‘শিখা’ (চৈত্র ১৩৩৪), ‘সওগাত’ (ফালগুন ১৩৩৫) ‘প্রগতি’ ‘মোয়াজ্জিন’ প্রভৃতি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ‘সন্ধ্যা’ এবং ‘নজরুল-গীতিকা’য় গানটি পাওয়া যাবে। গৌরী কেদার ভট্টাচার্য এবং অন্যান্য শিল্পীর কণ্ঠে প্রথমে কলম্বিয়ায় (জি. ই৭৮৩২) রেকর্ড হয়, পরে এইচ এম ভি-তে (এন ৩১১৫৪)। “চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন’ ছায়াচিত্রেও এই জনপ্রিয় সঙ্গীতটি ব্যবহৃত হয়েছে।

(৪) হায় চির ভোলা। হিমালয় হতে অমৃত আনিতে গিয়া

১০৩২ সালের ২ আষাঢ় মোতাবেক ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জুনে দার্জিলিং-এ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ পরলোক গমন করেন। দাজিলিং থেকে কলকাতায় আসার পথে নৈহাটী স্টেশনের হুগলীবাসীদের পক্ষ থেকে শবদেহে মাল্য অর্পন করা হয়। কবি নজরুল তখন হুগলীতেই অবস্থান করছিলেন। দেশবন্ধুর মৃত্যু উপলক্ষ্যে ৩ আষাঢ় ১৩৩২ তিনি গানটি রচনা করেন এবং অর্ঘ্য হিসেবে গানটিকে মালার সঙ্গে আটকিয়ে দেওয়া হয় । গানটি ‘চিত্তনামা’ গ্রন্থের প্রথমেই স্থান পেয়েছে।

(৫) তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে তুমি ধন্য ধন্য হে

কবি তখন হুগলী (১৯২৩) জেলে বন্দী। জেল সুপারিনটেন্ডেন্ট ছিলেন আর্সটন। বন্দীদের প্রতি তার আচার-আচরণে কোনো রকম সৌজন্যতা ছিল না বরং অভদ্রতাই প্রকাশ পেত। এই সুপারকে উদ্দেশ্যে করেই কবি লিখলেন এই গানটি। এই রবীন্দ্রনাথের ‘তোমারই গেহে পালিছ স্নেহে, তুমি ধন্য ধন্য হে’ এই গানটির প্যারডি। সুপার আর্সটন পরিদর্শনে এলে বন্দীরা এক সঙ্গে গানটি গেয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাত। ‘সুপার (জেলের) বন্দনা’ শিরোনামায় গানটি কবির ‘ভাঙার গান’ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

 

কাজী নজরুলের কয়েকটি গানের গীতিউৎস পার্ট ১

 

(৬) এই শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল :

এই বিখ্যাত গানটিও হুগলী জেলে লিখিত। জেলের সকল রকম অত্যাচারের প্রতিবাদ যেন গানটির মধ্যে ব্যাঙ্গময় হয়ে উঠেছে। ‘শিকল পরার গান’ শিরোনামায় এটি কবির ‘বিষের বাঁশী’-তে (শ্রাবণ, ১৩৩১ স্থান পেয়েছে)। রেকর্ডে কণ্ঠ দিয়েছেন গিরীণ চক্রবর্তী, রেকর্ড সংখ্যা জি. এই ৭৫০৬।

(৭) অমর কানন, (মোদের) অমর কানন

১৩৩২ সালের আষাঢ়ে (১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের জুলাই) কবি বাঁকুড়া যুব ও ছাত্র সমাজ এবং গঙ্গাজল ঘাটী জাতীয় বিদ্যালয় থেকে আমন্ত্রণ পেয়ে বাঁকুড়া সফরে যান। শেষোক্ত বিদ্যালয়টি অমর নামে এক স্বেচ্ছাসেবকের অক্লান্ত পরিশ্রম গড়ে ওঠে এবং শেষে বিদ্যালয়টির আশ্রমেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। প্রতিষ্ঠাতা অমরের নামানুযায়ী বিদ্যালয়টির নাম হয় ‘অমর কানন’। বীর অমরের কীর্তিপলাপ শুনে কবি খুবই অনুপ্রাণিত এবং অভিভূত হয়ে পড়েন। এই বিদ্যালয়ের উদ্বোধন সঙ্গীত হিসেবেই কবি রচনা করেন এই গনাটি। ১৩৩২ সালের শ্রাবণের ‘বিজলী’তে প্রকাশের পর ‘ছায়ানট’ এবং ‘নজরুল গীতিকা’য় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

(৮) ঘর সামলে নে এই বেলা তোরা :

১৯২৬ সালের ২ এপ্রিল হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার পিছনে প্রচ্ছন্নভাবে যে ইংরেজদের হাত ছিল-এ কথা কারো অজানা নয়। হিন্দু মুসলিমকে দাঙ্গায় মাতিয়ে দিয়ে ইংরাজেরা আনন্দ উপভোগ করছিল। ১৯২৬ সালে হঠাৎ ইংল্যান্ডে শুরু হলো সাধারণ ধর্মঘট। ব্যাপক ধর্মঘটের তীব্র আঘাতে ইংরেজরা তখন বিপর্যস্ত। এ ধর্মঘট কবির মনে হিন্দু- মুসলিম মিলনের আশার সঞ্চার করেছিল।

তিনি লিখলেন ‘যা শত্রু পরে পরে ধর্মঘটের জের সামলাতে ইংরেজরা বিপর্যন্ত (সিংহ-যখন পঙ্কলীন) হোক এই অবকাশে হিন্দু-মুসলিম বিভেদ ভুলে গিয়ে মিলনের পটভূমিতে একত্রে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সমবেত হোক, নিজেদের ঘর সামলে নিকঃ ‘ঘর সামলে নে এই বেলা তোরা ওরে ও হিন্দু-মুসলিমিন।’ লেখাটি ‘যা শত্রু পরে পরে’ শিরোনামায় ‘শক্তি’ (১৩৩৩ সালের আশ্বিন), ‘গণবাণীতে (১৩৩৩ সালের ২৫ আশ্বিন মোতাবেক ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ১২ অক্টোর) প্রকাশিত হয় এবং ‘ফণি-মনসা’ কাব্য গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

(৯) জাগো আজ দণ্ড হাতে চণ্ড বঙ্গবাসী

পীঠস্থান তারকেশ্বরের অসাধু মোহান্ত সতীশ গিরিকে পদচ্যুত করার জন্যে যে ব্যাপক আন্দোলনের সূচনা হয় সে উপলক্ষ্যে এই গানটি রচিত। ‘মোহান্তের মোহ-অন্তের গান’ শিরোনামায় ‘ভাঙার গান’-এ (শ্রাবণ ১৩৩১) সংকলিত হয়েছে।

(১০) কারার ঐ লৌহ কপাট

অনেকের মনে এমন ধারণা আছে যে এ গানটি কবি জেলে বসে লিখেছিলেন-কিন্তু তা ঠিক নয়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পত্রিকা’ বাংলার কথা’র জন্য একটি লেখার অনুরোধ আসাতে কবি এই অপূর্ব গানটি রচনা করেন ১৯২১ সালে। দেশে তখন অসহযোগ আন্দোলন চলছে। হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষ কারাবরণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। বন্দীশালাগুলি তখন পরিপূর্ণ। নামে নিরুপদ্রব অসহযোগ আন্দোলন কিন্তু দেশের পরিস্থিতি তখন অগ্নিগর্ভ। এই পরিবেশে ‘ভাঙার গান’ শিরোনামায় গানটি রচিত এবং ঐ নামের গ্রন্থে সংকলিত। গানটি ১৯২২ সালের ২০ জানুয়ারি তারিখের (‘বাঙ্গালার কথা’য়) মুদ্রিত হয়েছিল। গিরিণ চক্রবর্তীর কণ্ঠে, রেকর্ড সংখ্যা ৭৫০৬।

 

কাজী নজরুলের কয়েকটি গানের গীতিউৎস পার্ট ১

 

(১১) ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও :

ফিরে চাও ওগো পুরবাসী। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর প্রিন্স অব ওয়েলস (অষ্টম এডওয়ার্ড) ভারত-পরিদর্শনে এলে সারা দেশ হরতাল ও ব্যাপক হাঙ্গামায় মেতে ওঠে। নজরুল তখন কুমিল্লায়। সেখানেও ২১ নভেম্বর প্রতিবাদ-হরতাল মিছিলের আয়োজন করা হয়। এই উপলক্ষ্যে প্রবোদ চন্দ্র সেনের পক্ষ থেকে একটি গান রচনার অনুরোধ নিয়ে কবির সাথে দেখা করেন শৈলেশচন্দ্র সেন, হেমেন্দ্র ভট্টাচার্য এবং উমেশচন্দ্র চক্রবর্তী। তাঁদের অনুরোধেই কবি ‘জাগরণী’ গানটি রচনা করেন এবং মিছিলের অগ্রভাগে অংশ নিয়ে স্বকণ্ঠে গানটি গাইতে গাইতে শহর পরিক্রমা করেন। ১ম বর্ষ ২য় সংখ্যা মোতাবেক শ্রাবণ ১৩২৯-এর ‘ধূমকেতু’তে প্রকাশিত এবং ‘ভাঙার গান’-এ সংকলিত।

(১২) চল-চঞ্চল বাণীর দুলাল এসেছিল পথ ভুলে

১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ২৫ জুন মোতাবেক ১৩২৯ সালের ১০ আষাঢ় শনিবার রাত আড়াইটায় অকালে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত মারা গেলেন। ১১ আষাঢ় রোববারে স্টুডেন্টস হলে একটি শোকসভার আয়োজন বলা হয়। সভাপতি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন সঙ্গীত হিসেবে কবি রচনা করেন এই গানটি । “সত্যেন্দ্র প্রয়াণ গীতি’ শিরোনামায় গানটি ১৩২৯ সালের শ্রাবণ সংখ্যা ‘বসুমতী’তে প্রকাশিত হবার পর ‘ফণি-মনসা’ এবং ‘সঞ্চিতায়’ সংকলিত হয়েছে।

(১৩) ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিয়ে আর জাগায়ো না :

১৩৪৮ সালের ২২ শ্রাবণে রবীন্দ্রনাথ মারা গেলেন। মৃত্যুর অল্পকাল পরেই নজরুল এটা রচনা করেন করেন এবং স্বকণ্ঠে গ্রামোফোন কোম্পানিতে রেকর্ড করেন। রেকর্ড নং এন ২৯১৮৮। অবশ্য কবির সঙ্গে কণ্ঠে সহযোগিতা করেন ইলা মিত্র (ঘোষ) এবং সুনীল ঘোষ। ‘বিদায়’ শিরোনামে গানটি ‘বুলবুল’ ২য়-তে সংকলিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ উপলক্ষ্যে নজরুল রচনা করেন একটি দীর্ঘ কবিতা “রবিহারা’। এটিও কবি স্বকণ্ঠে আবৃত্তি করেন। রেকর্ড নং ২৭১৮৮ ।

(১৪) চীন ও ভারত মিলেছি আবার মোরা শতকোটি লোক :

১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ৯ ফেব্রুয়ারিতে চীনের চিয়াং কাই-শেক ও তাঁর স্ত্রী ভারতে আসেন। এ উপলক্ষ্যে গ্রামোফোন কোম্পানির কর্তৃপক্ষ কবিকে একটি গান লিখে দিতে বলেন। কবি রচনা করেন এই গানটি। এটি পরে প্রতিভা ঘোষ, জগন্ময় মিত্র এবং সত্য চৌধুরীর কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়। রেকর্ড নং এন ২৭৩০৩

(১৫) কোন কুসুমে তোমায় আমি

বিখ্যাত বংশীবাদক জনাব তকরীমউদ্দীন আহমদ একবার একটি গান রচনার অনুরোধ নিয়ে এলেন কবির কাছে। তবে একটি মাত্র শর্ত পংক্তির শেষ শব্দটি হবে ‘বল বল’। সম্ভবত এমন একটি সুর তিনি ঠিক করে রেখেছিলেন ‘বল বল’ বা ঐ জাতীয় শেষে থাকলে সুরারোপের সুবিধা হয়। খাতা-পেন্সিল নিয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যে কবি লিখে ফেললেন গানটি, “কোন কুসুমে তোমায় আমি পুঁজিব নাথ বল বল । তোমায় পূজার কুসুম ডালা সাজায় নিতি বনতল ॥’ গানটি ‘গুলবাগিচার’য় স্থান লাভ করেছে।

(১৬) নিশি ভোর হলো জাগিয়া

সেদিন নজরুল জেলেটোলায় নলিনীকান্ত সরকারের বাড়িতে ছিলেন। পথচারী হিন্দুস্থানী নর-নারীর কণ্ঠে উর্দু গজল ‘জাগ পিয়া’ গানটি শুনে নজরুল এমন অনুপ্রাণিত হয়ে পড়েন যে ভৈরবী সুরের গানটির কাঠামোয় তিনি রচনা করলেন, “নিশি ভোর হল’ গজলটি। নলিনীকান্ত সরকারের মতে, এইভাবে নজরুল প্রথম গজল গান রচনায় মেতে ওঠেন। তথ্যের দিক দিয়ে সম্ভবত এটা সত্য নয়। কেননা এ গজল রচনার পূর্বেই নজরুল আরো অনেকগুলি গজল রচনা করেন এবং তাঁর সম্পাদিত ‘প্রগতি’তে ১৩৩৪ সালের চৈত্র সংখ্যায় মুদ্রিত হয়। গানটি ‘বুলবুল’ এবং ‘নজরুল-গীতিকা’য় স্থান পেয়েছে। পরে আঙ্গুরবালার কণ্ঠে এইচ. এ. ভি-তে রেকর্ড হয়, এন ১১৭৮৯১।

 

কাজী নজরুলের কয়েকটি গানের গীতিউৎস পার্ট ১

 

(১৭) আসে বসন্ত ফুল বনে সাজে বনভূমি সুন্দরী

১৩৩৩ সালের অর্থায়নে মিশরীয় নর্তকী মিস ফরিদা কলকাতার আলফ্রেড রঙ্গমঞ্চে নাচ দেখাতে আসেন। একদিনের অনুষ্ঠানের নাচ নজরুলও দেখছিলেন। উর্দু গজল “কসু’ কি খায়ারো মায় নাজনে, কবরো মে’ দিল হিলা নিয়া’ সহযোগে উর্বশী ফরিদার লীলায়িত ভক্তিমার নাচ কবির মনে উদ্দীপনার সঞ্চার করেছিল। তিনি এই গজল গানের অনুপ্রেরণায় ও সুরের কাঠামোয় ১৩৩৩ সালের ২৮ অগ্রহায়ণ কৃষ্ণনগরে লিখলেন এই বাংলা গজলটি। গানটি প্রথ/ে ১৩৩৩ সালের পৌষ সংখ্যা ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয় এবং পরে ‘বুলবুল’ ও ‘চোখের চাতক’-এ অন্তর্ভুক্ত হয়। শিল্পী আব্বাসউদ্দীন এটিকে রেকর্ড করেন। রেকর্ড সংখ্যা জে এন জি ৪৫।

(১৮) জাগো অনশন-বন্দী, উঠরে যত :

জনাব মুজফ্ফর আহমদের ‘কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা’ গ্রন্থ থেকে জানতে পারা যায় যে একজন ফরাসি মজুর মূল ইন্টারন্যাশন্যাল সঙ্গীতটি রচনা করেন। পরে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় এটি অনুবাদ হয়েছে। জনাব মুজফ্ফর আহমদের অনুরোধে নজরুল একটি আমেরিকান তর্জমা অবলম্বনে বাংলা অনুবাদটি সম্পন্ন করেন- শিরোনাম দেন ‘অস্তরন্যাশনাল-সঙ্গীত’। অনুবাদের তারিখ ১ বৈশাখ ১৩৩৪ সাল। প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ২১ এপ্রিলের ‘গণবাণী’তে। পরে ‘ফণি- মনসা’, ‘নজরুল-গীতিকা’ ও ‘সঞ্চিতা’য় স্থান পেয়েছে। গ্রামোফোন রেকর্ডে কণ্ঠ দেন সত্য চৌধুরী, রেকর্ড সংখ্যা এন ২৭৬৬৬।

(১৯) মোর প্রিয়া হবে এস রাণী :

দেব খোঁপায় তারার ফুল। আব্বাসউদ্দীন আহমদ তাঁর ‘আমার শিল্পী জীবনের কথায় এই গানটির যে জন্মেতিহাস দিয়েছেন তা এই একদিন কবি এবং আরো কয়েকজন শিল্পী গ্রামোফোন কোম্পানিতে বসে গল্প করছিলেন-এমন সময় প্রশ্ন উঠল লটারীতে হঠাৎ যদি কেউ এক লাখ টাকা পেয়ে যায় তবে সে তার প্রিয়াকে কেমনভাবে সাজাবে। কেউ কমলালয় স্টোর্সে যেতে চাইলেন, কেউ ওয়াসেল মোল্লায়, কেউ আবার সুইজ্যারল্যাণ্ড পর্যন্ত যেতে চাইলেন। খাতা-কলম নিয়ে এই গানে কবি সাজালেন তাঁর প্রিয়াকে। গান শেষ করে শুধালেন ‘কী মহারথীর দল। ক’ টাকা লাগল প্রিয়াকে সাজাতে?’ গানটি প্রথমে ‘বুলবুল’ – ২য় খণ্ডে স্থান পায়। সুর যোজনা করেন চিত্ত রায়, রেকর্ড করেন সত্য চৌধুরী। সংখ্যা এন ২৭৩৪০

(২০) নদীর নাম সই অঞ্জনা

আব্বাসউদ্দীন আহমদের জন্মভূমি কোচবিহার। পল্লীগীতি ভাওয়াইয়ার জন্য কোচবিহার বিখ্যাত। একদিন রিহার্সাল রুমে বসে আব্বাসউদ্দীন আহমদ আপন মনে এই ভাওয়াইয়া গানটি গাইছিলেন, ‘নদীরে নাম সই কচুয়া/মাছ মারে মাছুয়া/মুই নারী দিচোঙ ছ্যাকা পাড়া। কবি দরজার পাশে দাড়িয়ে গানটি শুনে তার সুরে মুগ্ধ হলেন। তিনি আব্বাসউদ্দীনকে বার বার গানটি গাইতে বললেন। তার মনে তখন একই সুরের কাঠামোয় নতুন জন্ম দিয়েছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি লিখে ফেললেন। এই গানটি সম্ভবত এটাই ভাওয়াইয়া সুরে রচিত নজরুলের প্রথম গান। কবির ‘বন- গীতি’ গ্রন্থে গানটি প্রথম স্থান পায়। অব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে মেগাফোনে রেকর্ড হয়। সংখ্যা জে, এন, জি ৬।

(২১) পদ্মদীঘির ধারে ধারে ও

আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে তেরষা নদীর পারে পারে ও’ এই ভাওয়াইয়া গানটি শুনে নজরুল একই সুরে ‘পদ্মাদিঘীর ধারে ধারে ও’ গানটি রচনা করেন। এটিতেও মেগাফোনে কণ্ঠ দেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ। সংখ্যা জেন এন জি ৫ আব্বাসউদ্দীনের মতে, এরপর থেকেই পল্লীগীতি রচনায় নজরুলের বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে।

(২২) স্নিগ্ধ শ্যাম বেণী বর্ণা এস মালবিকা :

জৈষ্ঠ্যের শেষে একদিন বিকেলে আকাশ কালো করে মেঘ জমে উঠল। গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সাল রুমের হৈ হুল্লোড়ের মধ্যে হঠাৎ কবি গম্ভীর হয়ে গেলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই লিখে ফেললেন একটি অপূর্ব গান, আসন্ন বর্ষার আহ্বানগীতি। সঙ্গে সঙ্গে সুরযোজিত হলো। কয়েকদিনের মধ্যেই আব্বাসউদ্দীন রেকর্ড করলেন, সংখ্যা এন ৯৭২৭। মাসিক ‘বুলবুল’ ১ম বর্ষের ৩য় মোতাবেক ১৩৪০ সালের পৌষ সংখ্যায় গানটি প্রকাশিত হয় এবং পরে ‘গানের মালা’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। কন্ঠ দিয়েছেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ। রেকর্ড নং এন ৯৭২৭।

 

কাজী নজরুলের কয়েকটি গানের গীতিউৎস পার্ট ১

 

(২৩) গুণে গরিমায় আমাদের নারী আদর্শ দুনিয়ায়

তুরস্ক নারী জাগরণের অগ্রদূত হালিদা এদিব হানুম এলেন কলকাতায়। কারমাইকেল হোস্টেলের ছেলেরা তাকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্যে এক সভার আয়োজন করেছে, সভাপতি হবার জন্যে তারা কবির কাছে অনুরোধ জানাতে এল । কবি সম্মত হলেন। এ উপলক্ষ্যে তিনি লিখলেন মালকোষ রাগিণীতে অপূর্ব গানটি। যৌথভাবে গানটিতে সুরারোপ করেন আব্বাস উদ্দীন আহমদ এবং আবদুল করীম খাঁ ওরফে বালী। গানটি রেকর্ড করেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ। রেকর্ড সংখ্যা এফ টি ৩৭৬৬ ।

(২৪) আমি ভাই ক্ষ্যাপা বাউল :

শরৎচন্দ্রের ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসটির নাট্যরূপ দিয়েছিলেন শ্রীশাস্তিপদ সিংহ-ইনি ‘ধূমকেতু’র কর্মসচিব ছিলেন। এই নাটকে দৃশ্য পরিবর্তনের সময়টুকু আনন্দদায়ক করার জন্যে নায়ক সতীশের মেসে এক ভিখারীকে উপস্থিত করেছিলেন নাট্যকার। তার জন্যে গান দরকার। শাস্তিপদ কবিকে অনুরোধ জানাতে পাত্র, পরিবেশ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নজরুল লিখে দিলেন বাউল সুরের এই অপূর্ব গানটি। গানটি কবির ‘বন-গীতি’ ও ‘চন্দ্রবিন্দু’ উভয় গ্রন্থেই স্থান পেয়েছে।

(২৫) দারুণ পিপাসায় মায়া মরীচিকায় :

শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘রক্তকমল’ নাটকটির সঙ্গীত রচনা এবং সুরসংযোজনার ভার নিয়েছিলেন নজরুল। এ উদ্দেশ্যে একদিন শান্তিপদ সিংহকে নিয়ে মোনমোহন থিয়েটারের দিকে যাত্রা শুরু করলেন। ইন্টালী মার্কেটের ওখানে এক ভিখারিণীকে দেখে শাস্তিপদ কবির দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন এবং জানালেন যে এই সেই মেয়েটি। পিছনের ইতিহাসটি সংক্ষেপে এই, এক বড় পুলিশ অফিসারের ছেলের প্রেমে পড়ে মেয়েটি ঘরছাড়া হয় ।

তারপর দুটি সন্তান উপহার দিয়ে ছেলেটি ‘প্রেমে প্রেম খেলায় বিরচিত টেনে সরে পড়ে। অসহায় মেয়েটির সামনে ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা থাকে না।…. সেদিন রাতে থিয়েটার থেকে ফিরে কবি ‘জয়জয়ন্তী’ রাগে রচনা করলেন এই গানটি, দারুণ পিপাসায় মায়া মরীচিকায় চাহিতে এলি জল বনের হরিণী।’ গানটি পরে ‘চোখের চাতকে’র সম্পদ হয়েছে।

(২৬) বহে নিতি রূপের ঢেউ পাথার ঘনশ্যাম তোমার নয়নে

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ৮/১ পানবাগান লেনে থাকার সময় একদিন উমাপদ ভট্টাচার্য মহাশয় এলেন সে বাড়িতে। তখন পুরোদমে দাবা খেলা চলছিল। উমাপদ বাবু উচ্চশিক্ষিত এবং অত্যন্ত সুকণ্ঠের অধিকারী ছিলেন। প্রথম দিকে নজরুল-গীতি জনপ্রিয় করার মূলে উমাপদ বাবুর দান অনেক। নজরুলের অনেক গান তিনি রেকর্ড করেছেন। ঘরে প্রবেশ করেই তিনি জানালেন যে একটা ভালো হিন্দী ভজন তিনি শুনে এসেছেন এবং সেটা লিখেও এনেছেন। সকলেই গানটা শুনতে চাইলেন। হারমোনিয়াম টেনে তিনি গানটা সকলকে শুনিয়েও দিলেন। গানের শেষ লাইনটা ছিল “শ্যাম তুমহারী আখোমে। কবি কখন খাতা-পেন্সিল টেনে নিয়েছিলেন। কবির অনুরোধে আবার গানটা গাওয়া হলো-গানের ধরতা ফেরতার মধ্যেই লেখা হয়ে গেল এই অপূর্ব গানটি ।

(২৭) ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ :

উর্দু কাওয়ালী গানের রেকর্ড হাজার হাজার বিক্রি হলেও বাংলা-ইসলামী গানের রেকর্ড বিক্রি হবে না-এ রকম একটা ভ্রান্ত ধারণা গ্রামোফোন কোম্পানির কর্তৃপক্ষের মাথায় বাসা বেঁধে ছিল। এ রকম ধারণা করার কোনো সঙ্গত কারণই ছিল না-কেননা বাজারে তখন বাংলা ভাষায় ইসলামী গানের একটি রেকর্ডও ছিল না। দীর্ঘ দিনের প্রচেষ্টায় অবশেষে আব্বাসউদ্দীন আহমদ ইসলামী গানের একটি রেকর্ড করার অনুমতি কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে আদায় করে নিয়ে এলেন। এখন চাই সঙ্গীত, সঙ্গে সুরও।

বাংলা ভাষায় তখন ইসলামী সঙ্গীত রচনার প্রচলন হয়নি। তিনি গিয়ে কাজী নজরুলকে সব কথা খুলে বললেন এবং গানের জন্য অনুরোধ জানালেন। সব কথা শুনে কবি খুশীই হলেন। আব্বাসউদ্দীনকে বসিয়ে রেখে অল্পক্ষণের মধ্যেই লিখে ফেললেন এই অপূর্ব গানটি-বাংলা ভাষায় প্রথম সার্থক ইসলামী সঙ্গীত। সুরও শিখিয়ে দিলেন সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু একটি গানে এক পিঠে রেকর্ড হয়-ইসলামী গানর সঙ্গে তো অন্যাগান দেওয়া যায় না! তা হলে? কবি পরের দিন আব্বাসউদ্দীনকে আসতে বললেন।

 

কাজী নজরুলের কয়েকটি গানের গীতিউৎস পার্ট ১

 

(২৮) ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এলো নবীন সওদাগর :

পরের দিন ঠিক একইভাবে লিখলেন এই ইসলামী গানটি। সুর-সংযোগ করে শিখিয়ে দিলেন আব্বাসউদ্দীনকে। ঠিক চার দিন পরে গান দুটি রেকর্ড করা হলো। বাংলার আকাশে-বাতাসে, অধিকাংশ মুসলমানের ঘরে ঘরে এই রেকর্ডটি সে কী বিপুল আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। গান দুটি ‘জুলফিকার’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শেষোক্ত গানটি ১৩৩৮ সালের কার্তিক ‘জয়তী’তে প্রকাশিত হয়েছিল। আব্বাসউদ্দীনের গাওয়া এই রেকর্ডটির সংখ্যা এন ৪১১৬।

(২৯) মোহররমের চাঁদ এলো ঐ কাঁদাতে ফের দুনিয়ায় :

ইসলামী সঙ্গীত তখন চালু হয়ে গেছে-সুতরাং দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। মুসলিম জাহানে বিষাদের ছায়া নিয়ে আসে মোহররম আব্বাসউদ্দীন কবির কাছে গিয়ে মর্সিয়া লিখে দেবার অনুরোধ জানান। কবিও উন্মনা হয়ে পড়েন। গান রচিত হয় একের পর এক ‘মোহররমের চাঁদ এলো ঐ কাঁদাতে ফের দুনিয়ায়’ (টুইন এফ, টি ২৫৯৫), ‘ওগো মা ফাতেমা ছুটে আয়, তোর দুলালের বুকে হানে চুরি’, ‘ফোরাতের পানিতে নেমে ফাতেমা দুলাল কাঁদে অঝোর নয়নেরে’ (এফ, টি ৪৩২৮) ইত্যাদি। প্রতিটি গান মোহররম পর্বকে উপলক্ষ করে রচিত।

(৩০) যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই :

কুমিল্লার দৌলৎপুর নিবাসী আলী আকবর খানের ভাগ্নী নাগিস আসার খানমের সঙ্গে নজরুলের বিবাহ হয় ১৩২৮ সালের ৩ আষাঢ়, শুক্রবারে। এ বিয়ে একেবারেই সুখের হয়নি। এমন কী বিয়ের দিন রাতেই কবি পায়ে হেঁটে চলে এসেছিলেন কুমিল্লায়। নাগিস খানমের সঙ্গে সম্ভবত আর কবির দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। এর প্রায় ষোল বছর পর নার্গিস কবিকে একটি চিঠি লেখেন।

১০৬ আপার চিৎপুর রোডে গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সাল রুমে বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় এলে কবি চিঠিখানি তাঁকে পড়তে দেন। চিঠি পড়ে শৈলজানন্দ তার একটা উত্তর দিতে বলেন। কবি সেখানে বসেই অতি অল্প সময়ের মধ্যে লিখে ফেলেন এই গানটি, ‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই, কেন মনে রাখ তারে।’ গানটি লিখে বন্ধুর হাতে কাগজটি এগিয়ে দিয়ে কবি বললেন, ‘এই তো চিঠির জবাব লেখা হয়ে গেল।’ এ গানটি ছাড়াও কবি নার্গিস খানমের চিঠিখানির উত্তরে একটি সুদীর্ঘ চিঠি লেখেন ১৯. ১৯৩৯ তারিখে। বুলবুল-২য় খণ্ডে স্থান পেয়েছে, রেকর্ড নং এন ১৭৩২০-কণ্ঠ দিয়েছেন সন্তোষ সেনগুপ্ত।

(৩১) বদনা-গাড়ুতে করেন নব প্যাকটের আশ নাই :

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে সিরাজগঞ্জে প্রাদেশিক সম্মেলনে (সম্ভবত ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে) স্বরাজ পার্টি (কংগ্রেসের একটি অংশ) হিন্দু-মুসলিম প্যাক্ট বিষয়ে একটি প্রস্তাব পাস করেন। প্রস্তাবের একটি ধারায় বলা হয়েছিল যে মুসলমানেরা বেশি পরিমাণে চাকরী পাবে, এ ছাড়া আরো কিছু সুযোগ-সুবিধা ও অধিকারের কথা ছিল। ফলে অধিকাংশ মুসলমান খুশীই হয়েছিল, হিন্দু মহলে অন্তোষ দানা বেঁধে উঠেছিল। নজরুল তা লক্ষ করেছিলেন। তাঁর মতে, এই প্যাক্ট একটা অবাস্তব ও হাস্যকর ব্যাপার। এই হাস্যকর প্যাক্টকে উপলক্ষ করেই তিনি লিখে ফেললেন, এই নির্মল হাসির গানটি ।

এই কমিক গানটি ‘চন্দ্রবিন্দু’ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে।

(৩২) ওরে ধ্বংস-পথের যাত্রী দল :

১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি মোতাবেক ১৩৩২ সালের ২৩ ও ২৪ মাঘ কৃষ্ণনগরে নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মিলনের দ্বিতীয় অধিবেশন বসে। অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি হন শামসুদ্দিন আহমদ এবং সম্মেলনের সভাপতি হন ডঃ নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত। এই সম্মেলনের উদ্বোধন সঙ্গীতরূপে কবি রচনা করেন এই গানটি।

এ প্রসঙ্গে শ্রদ্ধেয় হেমন্তকুমার সরকার লিখেছেন, “কনফারেন্সের জন্যে গান লেখার ফরমাস করা গেল নজরুলকে। তাঁকে একটা ঘরের মধ্যে ঠেলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে আদায় করলুম দুটি গান- ‘ধ্বংস পথের যাত্রীদল, আর ‘ওঠরে চাষী জগৎবাসী ধর কমে লাঙল। বাংলাসাহিত্যে এই ধরনের গান ছিল না এর আগে, নজরুলই তার পথকার।” “শ্রমিকের গান’ শিরোনামায় গানটি ১৩৩২ সালের ফাল্গুন সংখ্যা ‘লাঙল’-এর মুদ্রিত হবার পর কবির ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থে স্থান পেয়েছে।

 

google news logo

 

(৩৩) আমরা শক্তি আমরা বল, আমরা ছাত্রদল

কৃষ্ণনগর প্রাদেশিক সম্মেলনের (২২ মে ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দ) সঙ্গে আরো দুটি সম্মেলন (ক-ছাত্র সম্মেলন, খ-যুব সম্মেলন) অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্র সম্মেলনের উদ্বোধন সঙ্গীত ৰূপেই কবি রচনা করেন এই অভিবিখ্যাত ‘ছাত্রদলের গান। সুর-কীর্তন-বাউল- সোফা। গানটি ‘সর্বহারা’ ও ‘সঞ্চিতা’য় আছে। কণ্ঠ দেন গৌরীকেদার ভট্টাচার্য ও অন্যান্যেরা, রেকর্ড সংখ্যা জিই৭৮৩২।

(৩৪) তুমি শুনিতে চেয়োনা আমার মনের কথা

সন্তোষ সেনগুপ্ত তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘আমার সঙ্গীত ও আনুষঙ্গিক জীবন’ গ্রন্থে এই গানটির রচনা প্রসঙ্গ সম্পর্কে জানিয়েছেন ঃ নলিন সরকার স্ট্রীটে এইচ. এম. ভি- প্রতিদিন ১১-১২ টায় আসতেন এবং ৪/৫ ঘন্ট বসে গল্প, গান সুর সব কিছু র রিহার্সাল রুমে দোতালার ছাদে একটি ঘর ছির। সেই ঘরে নজরুল ইসলাম করতেন। যতদূর মনে পড়ে গিরীন চক্রবর্তী, চিত্ত রায় এবং আমি প্রতিদিন উপস্থিত থাকতাম।

কালীপদ সেন মাঝে মাঝে আসতেন। আরো কেউ কেউ আসতেন- এমন মনে নেই। আমি তাঁর অনেক গানই রেকর্ড করেছিলাম। কিছু গানের কথা মনে আছে- যথা, যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই, ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে তুমি আমার সকাল বেলার সুর, কত ফুল তুমি পথে ফেলে দাও, নন্দন বন হতে কে. গো, আমার নহে গো ভালবাস মোরে এবং আরো অনেক সব গান। এক দিন গিয়ে দেখি একটি গান লিখেছেন এবং তাতে সুরও দিয়েছেন। গানটি হল ‘কথা কও, কথা কও, থাকিও না চুপ করে’।

গানটি শুনে বললাম এটি আমি রেকর্ড করব। উনি বললেন, বেশ তো শিখেনে। শেখা হয়ে গেলে পর বললাম, এর তো একটা প্রত্যুত্তর চাই। উনি শুনে বললেন, বেশ একটু নিচ থেকে ঘুরে আয়, আর আমাকে চা ও পান পাঠাতে বল। এক ঘণ্টা পরে এসে দেখি গান লেখা হয়ে গেছে, সুর দেওয়াও প্রায় হয়ে গিয়েছে। গানটি হল- তুমি শুনিতে চেয়ো না আমার মনের কথা।

(৩৫) বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে দিসালে আজি দোল :

শ্রীসুরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ২৯ জুন ১৯৭৪ কলকাতার সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় ‘কল্লোলের কাল’ শিরোনামে এক পত্র দেন। সেখানে তিনি এই গানটি রচনার প্রসঙ্গ বিবৃত করে বলেন : “তখন সপরিবারে কাজী সাহেব থাকেন কেষ্টনগরে। তাঁর আর্থিক অবস্থা এ সময়ে সচ্ছল ছিল না। একদিন বিকালে তিনি ঝড়ের বেগে কল্লোল অফিসে ঢুকেই বলণেন, “শিগগির গোটা কয়েক টাকা যোগড় করে দে।

হাঁড়ি আজ সিকে থেকে নামে নি। তোরা যদি টাকার যোগাড় করে দিতে পারিস তা হলে নামবে। আমাকে এক্ষুণি কেষ্টনগরে ফিরে যেতে হবে। দেরি করলে চলবে না।” টাকার যোগাড় হল। কাজী সাহেব চলে গেলেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এলেন। কাজী সাহেব। হাতে তাঁর একখানি কাগজ। নৃপেন বাবুর গায়ের উপর ছুঁড়ে দিয়ে বললেন “ট্রেনে আসতে আসাতে লিখে ফেলেছি। দেখিস যদি চলে তো চালিয়ে দিস।”

কাগজখানি হ্যাণ্ডবিল। তার উল্লোসিঠে কাঁপা কাঁপা পেনসিলের লেখা। বুঝতে কষ্ট হয় না যে, ট্রেনের ঝাকুনিতে লেখাগুলি কেঁপে কেঁপে গেছে। পাঠোদ্ধার করে। দেখা গেল এটি কাজী সাহেবের সেই বিখ্যাত গজল ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে দিসালে আজি দোল’।

 

কাজী নজরুলের গানের গীতিউৎস পার্ট ২

কাজী নজরুলের কয়েকটি গানের গীতিউৎস

(৩৬) কেন প্রাণ উঠে কাঁদিয়া, কাঁদিয়া, কাঁদিয়া গো :

প্রতিভা বসু কলকাতা থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক সানন্দা পত্রিকার ১০ আগস্ট ১৯৮৯ সংখ্যায় তাঁর ধারাবাহিক জীবনস্মৃতি ‘জীবনের জলছবি’তে এই কর্তনটির রচনা প্রসঙ্গ জানিয়ে বলেছেন ঃ হঠাৎ নজরুল খুব কর্তীন লিখতে শুরু করলেন। অবম সেই অনুপ্রেরণার একটি নির্দিষ্ট কারণ ছিলো। আমাদের পরিচারিকা নজরুলকে দেখে বলেছিলো, ‘ওমা এযে কালো কৃষ্ণ গো’। সেটা শোনার পর থেকে পিসিমা সব সময়েই কালো কৃষ্ণ বলে ঠাট্টা করতেন। উনিও পিসিমাকে খাদা নাক বলে খ্যাপাতেন। পিসিমা জবাবে বলতেন, ‘তা যাই বলো বাপু, খাঁদাই হই যাই হই, রঙ খানাতো তোমার চেয়ে গোরা।’ হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলতেন, ‘নাও মেলাও, পরখ করে দ্যাখো একবার।

একদিন নজরুল বললেন, ‘নাহ্ কালো রূপের যে কতো গুণ সেটা আর না দেখালে নয়। সেই রাত্রেই কীর্তনের সুরে এই গানটি লিখলেন তিনি।

(৩৭) না মিটিতে আশা ভাঙিল খেলা

কলকাতা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকার ২৭ আশ্বিন ১৩৮৫ সংখ্যায় ব্যারাকপুর ১ থেকে শ্রীসুশীল ঘোষ এই গানটির রাচনাপ্রসঙ্গ জানিয়েছেন ঃ ১৬ই সেপ্টেম্বর ৭৮ তারিখে দেশ এ রেকর্ড সমন্বন্ধে আলোচনাকালে ‘নীরব কেন কবি’ শিরোনামে শ্রী দেবাশিস দাশগুপ্ত লিখেছেন, দেশী টোড়ীতে না মিটিতে আশা বহুশ্রুত একটি গান আবার সকলের মনে স্থান করে নেবে। প্রসঙ্গত মনে আসে, বহুদিন আগে শান্তা আপ্তের রেকর্ড করা এই গান। এই গানটির জন্ম ইতিহাস এইরূপ ঃ

এইচ, এম, ভি-র তৎকালীন রেডকর্ডিং রিপ্রেজনটেটিভ (স্বর্গত) হেম সোম মহাশয় শান্তা আন্তে হঠাৎ কলকাতা ছেড়ে যাচ্ছেন খবর পেয়ে শান্তার দক্ষিণ কলকাতার বাসভবনে তাঁর সঙ্গে দেখা করে তাঁকে বাংলা গান গাইতে রাজি করান। শান্তা এসেছিলেন ছবি করতে। কিন্তু মতভেদ হওয়ায় অভিনেত্রী শান্তা ছবি না করেই কলকাতা ত্যাগ করেছিলেন। হাতে সময় ছিল মাত্র দু-তিন দিন । ৩ এ নলিন সরকার স্ট্রিটের এইচ এম ভি-র রিহার্সাল রুম-এ কাজী সাহেবের

আলাদা ঘর ছিল। হেম বাবু কাজী সাহেবকে মরক্কো বাঁধানো মোটা মোটা একসারসাইজ বুক দিয়ে রেখে দিতেন। কাজী সাহেব তাঁর মার্জিমাফিক এক একটি পৃষ্টায় এক একটি গানের প্রথম লাইনটি আর (সাধারণত মিম্র) রাগরাগিনীর নাম, তাল, মাত্রা লিখে রাখতেন পৃষ্ঠার শিরোদেশে। হেমবাবু কোনও শিল্পীর জন্য গান চাইলে সেই বিশেষ শিল্পীর কণ্ঠ সম্পদের মান অনুযায়ী কাজী সাহেব গানটির বাকি লাইনগুলো লিখে ফেলতেন।

কোলের কাছে হারমোনায়ামটি টেনে নিয়ে বার দুই অভ্যাস করে কমল দাসগুপ্তকে সুরটি তুলে দিতেন। ব্যস, কাজী সাহেবের কার্য শেষ। বাকি কাজ কমল বাবুর। তিনি শিল্পীর কণ্ঠে গান তুলে দেওয়া, আর্কেস্ট্রেশন, রেডকর্ডি করানো- বাকি সবটুকুই করতেন। রেকর্ডের লেবেলে সুর কমল দাশগুপ্ত লেখা থাকলেও মূল সুর কিন্তু প্রায় সর্বক্ষেত্রেই কাজী সাহেবের। এর ব্যতিক্রম প্রায়ই নেই-ই।

হেমু বাবু বললেন, শাস্তা চলে যাচ্ছেন, কনট্রাক্ট ফুলফিল না করেই। বস্তু ছবির কাজ শুরুই হয় নি। কাজী সাহেব এই ঘনাকেই প্রথম কলি করে তক্ষুণি গান বেঁধে ফেললেন ঃ না মিটিতে আসা ভাঙিল খেলা।

(৩৮) চাম চিকা চাম চিকা চাম চিকা

এই হাসির গানটির রচনা প্রসঙ্গ জানিয়েছেন প্রণবরায় তাঁর স্মৃতিচারণে। প্রণব রায়ের পুত্রও প্রদীপ্ত রায় কর্তৃক অনুলিখিত এই স্মৃতিচারণ কলকাতা থেকে প্রকাশিত দেশ বিনোদন ১৩৯১ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। প্রণব রায় বলেন : হাসির গানেও যে তাঁর জোড়া কেউ ছিলেন না সেটাও প্রমাণ হয়ে গেছে তখনকার কালের যিনি মন্ত কমেডিয়ান ছিলেন, রঞ্জিৎ বাবু তাঁর রেকর্ডে।

কাজীদার লেখা হাসির গান রঞ্জিৎ বাবু অনেক রেকর্ড করেছেন এবং সেগুলো তখন খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল তখন সে সময় উড়হি Argentine way বলে একটা চবি এসেছিল কারমান মিরাণ্ডার। তাতে কারমান মিরাঙার একটা গান ছিল চিকা চিকা বোম চিক। সেটা শুনে এসে কাজীদা লিখলেন, চাম চিকা চাম চিকা চাম চিকা। সেও একটা অনবদ্য গান হয়েছিল।

 

কাজী নজরুলের গানের গীতিউৎস পার্ট ২

 

(৩৯) জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াত খেলছে জুয়া :

বহরমপুর জেল থেকে মুক্তি পেয়ে নজরুল এসে ওঠেন ডক্টর নলিনাক্ষ সান্যালের বাসায়। তাঁর সঙ্গে কবির বেশ হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। নলিনাক্ষ সান্যালের পণ ছিল তিনি কখনো বিয়ে করবেন না। কিন্তু বিয়ে যখন ঠিক হলো তখন বন্ধুমহলে সাড়া পড়ে গেল। সেই বিবাহসভায় একটি অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে এই গানটি রচিত।

স্মৃতিকথায় মুজফফর আহমদ ডক্টর সান্যালের চিঠির বরাত দিয়ে জানিয়েছেন :১৯২৮ সালের ১৭ই বা ১৮ই এপ্রিল বহরমপুরে নলিনাক্ষ সান্যালের বিয়ে হয়। কবির সাহিত্য ও সঙ্গীতের বন্ধু উপামপদ ভট্টাচার্যের কাকার বাড়ি ছিল তাঁর শ্বশুর বাড়ি। পরিবেশটি ছিল অত্যন্ত গোঁড়া হিন্দুয়ানী। শ্বশুর বাড়ির সঙ্গে ডক্টর সান্যালের শর্ত ছিল।

এই যে জাতিভেদ মেনে তাঁ নিমন্ত্রিতদের অপমান করা চলবে না। অমনিতে সঙ্গীতচর্চার জন্যে নজরুল ইসলাম উমাপদ ভট্টাচার্যের বাড়িতে যেত। কিন্তু সেদিন সে পবিত্রকুমার গঙ্গেপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে ডক্টর সান্যালের বিবাহ আসরে উপস্থি হলো। কয়েদী নজরুলের বহরমপুর জেলে সুপারিনটেনডেন্ট ও মুরশিদাবাদের সিভিল সার্জন ডাক্তার বসন্তকুমার ভৌমিকও এই আসরে উপস্থিত ছিলেন।

বরযাত্রীরা সমবেত নিমন্ত্রিতভাবে সঙ্গে বসতে যাচ্ছেন দেখতে পেয়ে গোঁড়ার দল উঠে গেলেন। তখন নজরুল ইসলাম উমাপদ ভট্টাচার্যের বাড়িতে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে আসরে ফিলে এলো। তার হাতে ছিল কাগজে লেখা ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ বা ‘জাত জালিয়াৎ’ কবিতাটি। তাতে সে সুরও সংযোজন করেছিল। এই কবিতাই সে বিবাহ আসরে গেয়ে শুনিয়ে দিল। ডক্টর সন্যাল তো ভেবেছিলেনই, সেখানে উপস্থিত আরো অনেকে ভেবেছিলেন যে, কবিতাটি তখনই নজরুল রচনা করে নিয়ে এসেছিল।

অবস্থার সঙ্গে অদ্ভুত খাপ খেয়ে গিয়েছিল কবিতাটি। ডক্টর সান্যালের কোন দোষ দেওয়া যায় না। আসলে স্মৃতি হতে কবিতাটি তখন নজরুল কাগজে লিখে নিয়েছিল। অন্য কবিতার বিষয়ে বিজলীর পুরানো ফাইল ঘটতে গিয়ে পওয়া গেছে যে ২০ শে জুলাই, ১৯২৩ এই কবিতাটি জাত জালিয়াৎ শিরোনাম দিয়ে সাপ্তাহিক বিজলীতে প্রকাশিত হয়েছিল। ফুট নোটে লেখা আছে, মাদারীপুর শান্তি সেনা চারণ দলের জন্য লিখিতি অপ্রকাশিত নাটক হতে।

নজরুল ইসলাম মাদারীপুরের পূর্ণচন্দ্র দাসের অনুরোধে বহরমপুর জেলে থাকার সময়ে একখানা নাটক রচনা করেছিল একথা সত্য। কিন্তু সে নাটক ১৯২৩ সালের ২৩ শে জুলাইয়ের আগে কিছুতেই বিজলী অফিসে পৌঁছুতে পারে না। কারণ, তখন তার লেখাই শেষ হয় নি। আসলে কবিতাটি আলাদাভাবে রচিত হয়েছিল এবং বিজলীতে ছাপতে পাঠানো হয়েছিল। এই রকমভাবে লেখা জেল হতে বাইরে পাঠানো হতো। শুধু একটি আবরণ সৃষ্টি করার জন্য ফুট নোট লেখা হয়ে থাকবে।

দীর্ঘ অনশালের পরে জুন মাসের কোনো এক তারিখে নজরুল বহরমপুর জেলে বদলী হয়েছিল। হয়তো বা মাসের শেষাশেষিতে, কিংবা আশ্চর্য নয়, জুলাইর শুরুতেও হতে পারে। শরীরে বল পেতে সময় লেগেছে। তাছাড়া, অধ্যাপক জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায় যে পত্র নজরুলের নিকট হতে আমার জন্যে আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে বহন করে এনেছিলেন তা নিশ্চয়ই আগস্ট মাসের আগে নয়। তাতে নজরুল লিখেছিল যে পূর্ণদাসের চারণ দলের জন্যে সে একখানা নাটক লিখছে। নাটকখানা লেখা হয়েছিল সত্য, কিন্তু বাইরে পাঠানোর সময়ে কিংবা তার পরে পাণ্ডুলিপি হারিয়ে গিয়েছিল।

(৪০) খেলা শেষ হল, শেষ হয় নাই বেলা 

কাঁদিও না, কাঁদিও না

তব তরে রেখে গেনু প্রেম আনন্দ মেলা ॥

খেলো খেলো তুমি আজও বেলা আছে
খেলা শেষ হলে এসো মোর কাছে
প্রেম যমুনার তীরে বসে রব
লইয়া শূন্য ভেলা ॥

যাহারা আমার বিচার করেছে
ভুল করিয়াছে জানি
তাহাদের তরে রেখে গেনু মোর
বিদায়ের গান খানি ।

হই কলঙ্কী, হোক মোর ভুল
বালুকার বুকে ফুটায়েছি ফুল
তুমিও ভুলিতে নারিবে সে কথা
হানো যতো অবহেলা ॥

এই গানটি সম্পর্কে ঢাকায় কমল দাশগুপ্তের নিজের বক্তব্য : একটি খাতায় নজরুলের নিজের হাতে লেখা গানটি দেখিয়ে তিনি বলেছিলেন, এটাই কাজীদার সর্বশেষ গান। গানটির সুর কমল দাশগুপ্তের দেওয়া। সুর শুধু নয়, গানটির পাঠেরও তিনি কিছু পরিবর্তন করেছিলেন। যেমন, নজরুল লিখেছিলেন।

 

কাজী নজরুলের গানের গীতিউৎস পার্ট ২

 

যাহারা আমার বিচার করেছে
আর তাহাদের কেহ
দেখিতে পাবে না কলঙ্ককালি
মাখা মোর এই দেহ।

গাওয়ার সময় দেখা গেল, এই অংশটুকুতে সবার আপত্তি। নজরুল নিজকে যদিও কলঙ্ককালি মাখা বলেছেন, তবু তাকে ভালবাসেন যাঁরা, তাঁদের কেউ একথাগুলো উচ্চারণ করতে চান না। তাই কমল দাশগুপ্ত সে জায়গাটি পাল্টে দেন। কমলাদাশগুপ্ত জানিয়েছেন যে, এমন পরিবর্তনে কবির সম্মতি ছিল সর্বদাই। তিনি লেখেন যাহারা আমার বিচার করেছে ভুল করিয়াছি জানি, নজরুল লিখেছেন এই কলঙ্কী হোক মোর ভুল। কিন্তু কমলদাশ গুপ্ত পৃথিবীর বুকে এনেছি গোকুলের পরিবর্তে বালুকার বুকে ফুটায়েছি ফুল করে দেন।

(৪১) চিরজনমের প্রিয়া

কমলদাশগুপ্ত নজরুলের চিরদিনের প্রিয়া কবিতাটিকে ভাব অনুসারে ৬টি ভাগে ভাগ করেন এবং ৬টি ভাগকে ৬টি গানে রূপান্তরিত করেন ও তাতে সুর দেন। গীতরূপ দেয়ার জন্য কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করতে হয়েছিল তাঁকে। ৬টি গানের সুরারোপ করা যেদিন শেষ হল, তারপর দিন নজরুল ষ্টুডিওতে এলে কমলদাশগুপ্ত তাকে বললেন, কাজীদা, দেখুন তো গানকটা কেমন হল? তারপর গানগুলো শুনে নজরুল খুব খুশি হলেন। কিন্তু নিজের কবিতায় অন্যতম সুর দিয়েছেন এমনভাব দেখা গেল। না তাঁর মধ্যে। কমলদাশ গুপ্ত নজরুলকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন লেখা যে আপনার সেটা কি খেয়াল আছে? তাই নাকি? আরে সেটাতো খেয়াল করিনি। কমলদাশ নজরুলকে গানগুলোতে আরো পরিমার্জিত রূপ দিতে বললেন এবং নজরুল তা করে দেন।

একটি গান হচ্ছে :

আরো কত দিন বাকি

তোমারে পাওয়ার আগে বুঝি হায়

নিভে যায় মোর আঁখি ॥

কত আঁখি তারা নিভিয়া গিয়াছে

কাঁদিয়া তোমার লাগি

সেই আঁখিগুলি তারা হয়ে অ্যাজো

আকাশে রয়েছে জাগি

যেন নীড়হারা পাখি ॥

যত লোকে আমি তোমারই বিরহে

ফেলেছি অশ্রুজল

ফুল হয়ে সেই অশ্রু ছুঁইতে

চাহে তব পদতল

সে সাধ মিটিবে নাকি ॥

এই গানটি ‘চির জনমের প্রিয়া’র ‘আরো কতদিন বাকি তোমারে পাওয়ার আগে বুঝি, হায় নিভে যায় মোর আঁখি। যতলোকে আমি তোমার বিরহে ফেলেছি অশ্রুজল ফুল হয়ে সেই অশ্রু ছুইতে চাহে তব পদতল’ অংশ অবলম্বনে রচিত।

আরেকটি গান হচ্ছে

তব মুখ খানি খুঁজিয়া ফিরি গো সকল ফুলের মুখে

ফুল ঝরে যায় তব স্মৃতি জাগে কাঁটার মতন বুকে

তব প্রিয়া নাম ধরে ডাকি

ফুল সাড়া দেয় মেলি আঁখি

তোমার নয়ন ফুটিল না হায়। ফুলের মতন সুখে ॥

তোমার বিরহে আমার ভুবনে ওঠে রোদনের বাণী

কানাকানি করে চাঁদ ও তারায় জানি গো তোমারে জানি।

খুঁজি বিজলীপ্রদীপ জ্বেলে

কাঁদি ঝঞ্জার পাখা মেলে

অন্ধ গগনে আধার মেঘের ঢেউ ওঠে মোর দুখে ॥

এই গানটি ‘চিরজনমের প্রিয়াংকা’ কবিতার’ তব মুখখানি খুঁজিয়া ফিরেছি- না পেয়ে উগ্র দুখে/ ঝরায়েছি ফুল পথের ধুলায় ঝরা ফুল রেণু মুখে… আজও যবে চাও, আমার ভুবনে ওঠে রোদের বাণী / কানাকানি করে চাঁদে ও তারাতে “জানি গো তোমারে জানি” অংশ অবলম্বনে রচিত।

তৃতীয় গানটি হচ্ছে 

মনে পড়ে আজ সে কোন জনমে

বিদায় সন্ধ্যাবেলা আমি দাঁড়ায়ে রহিনু এপারে

তুমি ওপারে ভাসালে ভেলা ॥

সেই সে বিদায় ক্ষণে

শপথ করিলে বন্ধু আমার

রাখিবে আমারে মনে

ফিরিয়া আসিবে খেলিবে আবার সেই পুরাতন খেলা ॥

আজো আসিলে না হায়

মোর অশ্রুর লিপি বনের বিহগী

দিকে দিকে লয়ে যায় তোমারে খুঁজে না পায়।

মোর গানের পাপিয়া ঝুরে

গহন কাননে তব নাম লয়ে

আজও পিয়া পিয়া সুরে।

গান থেমে যায় হায় ফিরে আসে পাখি

বুকে বিঁধে অবহেলা ॥

এই গান ‘চিরজনমের প্রিয়া’র ‘মনে কর যেন সে কোন্ জনমে বিদায় সন্ধ্যাবেলা/ তুমি রয়ে গেলে এপারে, ভাসিল ওপারে আমার ভেলা’ থেকে কবিতার শেষাংশ পর্যন্ত অবলম্বনে রচিত।

 

কাজী নজরুলের গানের গীতিউৎস পার্ট ২

 

(৪২) জাগো আজ দণ্ড হাতে চণ্ড বঙ্গবাসী :

তারকেশ্বরের শীবমন্দির একটি বিখ্যাত তীর্থস্থান। তারকেশ্বরের মোহন্ত সতীশ গিরি পীঠস্থানে ভয়ানক অনাচার শুরু করেছিল অথচ তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি। দেশের সর্বত্রওই মোহান্তের দুষ্কৃতির কাহিনী বর্ণনা করলে উত্তেজনা চরমে ওঠে। মোহান্তের বিরুদ্ধে সংগ্রামে যোগ দেন নজরুল। অনাচার, অত্যাচার, ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তাঁর ছিল আপোষহীন সংগ্রাম। তিনি লিখলেন মোহান্তের মোহঅন্তের গানঃ

জাগো আজ দণ্ডহাতে চণ্ড বঙ্গবাসী

ডুবালো পাপ চণ্ডাল তোদের বাঙালাদেশের কাশী

জাগো বঙ্গবাসী ॥

মিছিলে মিছিলে তরুণরা নজরুলের এই গানটি গেয়ে ফিরতে লাগল। মোহান্তের বিরুদ্ধে জনমত প্রবল হলো এবং মোকদ্দমায় মোহান্তের দশ বছরের জেল হলো।

(৪৩)

বন্ধু আমার থেকে থেকে কোন সুদূরের নিজনপুরে

‘বন্ধু আমার থেকে থেকে কোন সুদূরের নিজনপুরে ডাক দিয়ে যাও ব্যথার সুরে’

নজরুল একবার স্বাস্থ্যনিবাস দেওঘরে গিয়ে কিছুদনি থেকে আসতে চাইলেন।

বায়ু পরিবর্তনের ইচ্ছার সঙ্গে স্বভাবসুলভ খেয়ালীপণাও যুক্ত ছিল এর সঙ্গে। দেওঘরে যাবার ব্যাপারে নজরুলকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন মোসলেম ভারত-এর আফজালুল হক। কথা হয়েছিল আফলজালুল হক প্রতি মাসে একশ টাকা করে নজরুলকে পাঠাবেন, আর নজরুল সেখানে যা লিখবেন তা শুধু মোসলেম ভারতে ছাপা হবে। সেই প্রতিশ্রুত টাকার ওপর ভরসা করে নজরুল দেওঘরে চলে গেলেন যাবার আগে একটি বিদায়ী চা চক্রের আয়োজন হলো। সুবিনয় রায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, মোহিতলাল মজুমদার, মুজফফল আহমদ, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন। নজরুল সে উপলক্ষ্যে একটি বিদায় সঙ্গীত রচনা করলেন এবং চা চক্রে তা গেয়ে শোনালেন। স্মৃতিকথায় মুজফফল আহমদ বলছেনঃ

দূরে চলে যাওয়ার জন্য তখনকার যে অনুভব সেটা চমৎকার হয়ে ফুটে উঠেছিল এই বিদায় সঙ্গীতে। শুনে সকলে মুগ্ধ হয়েছিলেন। কবি শ্রী মোহিতলাল মজুমদার বার বার নজরুলের চিবুক স্পর্শ করছিলেন।

(৪৪) শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয় :

‘ফিরে আয় ফিরে আয়’ এ গানটি রচনার একটি বিশেষ প্রসঙ্গ আছে। স্বনামধন্য গায়ক জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী রবীন্দ্রনাথের ‘অল্প লইয়া থাকি তাই মোর যাহা যায় তাহা যায়/কণাটুকু যদি হারায় তা লয়ে প্রাণ করে হায় হায়’ গানটি রেকর্ডে গাইতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর গায়নভাঙ্গিতে গানের রাবীন্দ্রিক মেজাজ না এসে প্রবল রাগসাঙ্গীতিক মেজাজ এসে যাচ্ছিল বলে তিনি সে গান রেকর্ড করার অনুমতি পান নি। জ্ঞান গোস্বামী সে ঘটনায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং ওই সুরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একটি গান লিখে দিতে বলেন নজরুলকে। নজরুল তখন শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয় গানটি রচনা করেন। জ্ঞান গোস্বামী খেয়ালোপম ভগিতে গেয়ে গানটিকে অসাধারণ জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন।

এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, এই গানটি কবিপুত্র বুলবুলের মৃত্যুস্মৃতি বিজড়িত। কিন্তু আসলে যে তা নয়, সে কথা জানিয়েছেন শান্তিপদ সিংহ। তিনি বলেছেন ঃ ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয়’ গানটি ১৯৩৩ সালে রচিত। বুলবুল মারা গেছে ১৯৩০ সালে। বুলবুলের মৃত্যুসম্পর্কে জড়িয়ে এ গানটি সম্পর্কে গুজব অজ্ঞাতসারে আমিই ছড়িয়েছিলাম। এক ছুটির বারে একজন নজরুল ভক্ত এসে আমাকে সকাল থেকে বিরক্ত করতে আরম্ভ করেন নজরুল সম্পর্কে খুঁটিনাটি নিয়ে। শেষের দিকে গানটি সম্পর্কে প্রশ্ন করেন যে, বুলবুল মারা যাবার পরেই কি গানটি রচিত হয়েছিল? আমি তাঁকে বলেছিলাম- হ্যাঁ। তিনি একথাটা বিশ্বাস করে ছড়িয়ে দেন। এর জন্য আমাকে দু চার জনে প্রশ্ন করেছলেন, আমি তাঁদের সত্য কথাটা বলেছিলাম ।

(৪৫) জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা :

প্রবোধকুমার সান্যাল তাঁর আত্মজৈবনিকগ্রন্থ ‘বনস্পতির বৈঠক’ এ নারী জাগৃতিমূলক এই গানটির রচনা প্রসঙ্গের উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে ১৯৩১ সালের দিকে শ্রীযুক্তা লাবণ্যপ্রভা দত্তের নেতৃত্বের কলকাতার ভবনীপুর ট্রামরাস্তা পেরিয়ে দেবেন্দ্রঘোষ রোডে আনন্দমঠ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। প্রবোধকুমার এই প্রতিষ্ঠান সংস্থাপনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং আনন্দমঠ নামকরণ করেন তিনিই। উদ্দেশ্য ছিল বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য একটি সম্মিলনী স্থানের ব্যবস্থা করা। প্রচার করা হলো যে, আনন্দমঠ একটি মহিলা প্রতিষ্ঠান ও সমাজসেবা কেন্দ্র, কারণ প্রকাশ্যে বিপ্লবীদের সহায়তার জন্যে কোন কাজ করা সম্ভব ছিল না। প্রবোধকুমার সান্যাল লিখেছেন:

আমাদের উদ্দেশ্য সামনের দিকে থাকবে একটি পাঠাগার- সেখানে থাকবে নানা রকমের বই এবং পড়াশোনার সুবিধা। ঘরখানা আলমারি দিয়ে পার্টিশান করা হবে। ভিতরের দিকে থাকবে শুধু একখানা বড় রকমের তক্তপোষ, সেখানে আনন্দমঠের সন্তানরা, অর্থাৎ বিপ্লবীরা গোপনে এসে মিলিত হবে। এই আইডিয়াটা পাওয়া গিয়েছিল ‘সিমলা ব্যায়াম সমিতি’র কল্যাণে । সামনের দিকে বাৎসরিক বারোয়ারী দুর্গাপুজো, ভিতরের দিকে সকল দলের বিপ্লবীদের বাৎসরিক সঙ্গোপন সম্মেলন।

পাছে আনন্দমঠের উদ্বোধন অনুষ্ঠান গোয়েন্দা পুলিশের সতর্ক দৃষ্টি আকর্ষণ করে সেজন্যে আমরা স্থির করলাম এর উদ্বোধন করা হবে হাজরা রোডের বাড়িরই নীচতলায়। এখানে উঠোন ছিল প্রশস্ত, যেটি সমাবেশের পক্ষে সুবিধাজনক ছিল। আমি নিজে গিয়ে কাজী নজরুল, নলিনীকান্ত সরকার এবং কাকে কাকে যেন নিমন্ত্রণ করে এলুম। আমাদের মুল উদ্দেশ্য যে পাঠাগার নয়, এটি ইষ্টমন্ত্রের মতো সকলের কাছেই চেপে রাখতে হলো। এটি একটি মহিলা প্রতিষ্ঠান ও সমাজ সেবাকেন্দ্র- এটিই প্রচারিত থাকল। নলিনীদা ও নজরুল আমাকে অবিশ্বাস করেন নি।

আনন্দমঠ- এর উদ্বোধনের দিন বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিনিধিদের আনিয়েছিলুম। দক্ষিণ কলকাতার বহু নেতৃস্থানীয়া মহিলা অনুষ্ঠানে উপস্থিতি হয়েছিলেন। উদ্বোধনসঙ্গীত গাইল নজরুল তার অনবদ্য কণ্ঠে। এই উপলক্ষে সে একটি গান রচনা করেছিল : “জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা

 

কাজী নজরুলের গানের গীতিউৎস পার্ট ২

 

(৪৬) আমি পূরব দেশের পূরণারী

নজরুলের মৃত্যুতে কলকাতার রবীন্দ্রসদনে ৩০ শে আগস্ট ১৯৭৬ আয়োজিত এক শোকসভায় বিখ্যাত নজরুল গীতি গায়িকা সুপ্রভা সরকার এই গানটির লেখন সম্পর্কে জানান

১৯৩৯ সালে ঢাকা রেডিও স্টেশন শুরু হয়। তখন আমি কাজীদার সঙ্গে পর পর দুবার ঢাকা গেছি। সেই যাবার পথে একবার একটি ঘটনা আমার খুব মনে পড়ে। গোয়ালন্দের কাছে গিয়ে আমাদের স্টিমারটা দাঁড়িয়ে পড়ল। অমনি আশপাশ থেকে কয়েকটা নৌককো স্টিমারের গায়ে এসে ভিড়ল। নৌকো থেকে মাঝিরা চিৎকার করতে লাগল চাঁদপুর, বরিশাল ইত্যাদি বলে। নিচের ডেক থেকে অনেকেই সেই নৌকোগুলোতে গিয়ে উঠতে লাগল। আমি আর কাজীদা ছিলাম উপরের ডেকে। আমি অবাক হয়ে কাজীদাকে বললাম, মেয়েরা এইভাবে স্টিমার থেকে নৌকো গিয়ে উঠছে, ওদের ভয় করে না?

কাজীদা বললেন, না, ভয় করবে কেন? তাছাড়া ওরা তো পূর্ববঙ্গের মেয়ে, ওরা অত সহজে ভয় পায় না। উনি কথা বলতেন খুব জোর গলায়, ফলে কথাটা নিচের ডেকের একজন বিবাহিতা মহিলা শুনতে পেয়ে চমকে তাকালেন আমাদের মুখের দিকে। সে মুখআজো আমি চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই। কি চমৎকার মুখশ্রী মহিলাটির। কাজীদাও দেখেছেন সেই মুখ। কয়েক মুহূর্তের ঘটনা একটি। একটু পরেই ঐ মুহুর্তটাকে সামনে রেখে কাজীদা লিখে ফেললেন তাঁর বিখ্যাত সেই গানটি, পূরব দেশের পূরণারী। গানটি লিখেই আমাকে বললেন, তোকে এটা রেডিওতে গাইতে হবে। আমি সেই গান ঢাকা রেডিওতে গেয়েছিলাম। | ভারত বিচিত্রা, ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬, পৃষ্ঠা ৩৮।

(৪৭) দুর্গম গিরি কান্তার শুরু :

১৯২৬ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতায় হিন্দুমুসলিম দাঙ্গা হয়। এতে কবি নজরুল অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন। তখন তিনি কৃষ্ণনগরে থাকেন। পরের মাসে কৃষ্ণনগরে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেগুলো হচ্ছে ঃ বঙ্গীয় প্রদেশশিক সম্মেলন, অর্থাৎ প্রাদেশিক কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলন, ছাত্র সম্মেলন ও যুব সম্মেলন। প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মেলন ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

নজরুল ইসলাম এই তিনটি সম্মেলনের আয়োজনের ব্যাপারেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। হিন্দুমুসলিম সম্প্রীতির তাৎপর্যকে বিষয়বস্তু করে নজরুল কংগ্রেস সম্মেলনের উদ্বোধনী সঙ্গীত রচনা করেন : দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার / লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার। নিজেই তিনি সভায় এই উদ্বোধনী সঙ্গীতটি গেয়েছিলেন।

ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান/আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা দিবে কোন বলিদান’ চরণদুটিতে সমকালীন একটি আত্মোৎসর্গের ঘটনা বিধৃত আছে। সন্ত্রাসবাদী দলীয় গোপীনাথ সাহা টেগার্ট সাহেবকে মারতে গিয়ে ভুল করে গুলি চালালেন ডে সাহেবের ওপর। টেগার্ট সাহেবকে খুব ভাল করে চিনতেন না গোপীনাথ।

সকাল বেলায় ডে সাহেব বেড়াতে বেরিয়ে চৌরঙ্গীর মোড়ে একটা দেকানের শোকেসে কী একটা কিছু দেখছেন, এমন সময় তাকে টেগার্ট মনে করে গুলী চালালেন গোপীনাথ। ডে সাহেব মারা গেলেন। তাকে হত্যার দায়ে ফাঁসির আদেশ হলো গোপীনাথের। অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত লিখেছেন : হলে হবে ফাঁসি, গোপীনাথ সে তোয়াক্কা করে না। সে দেশমুক্তির যজ্ঞে ইন্ধন যোগাতে পেরেছে এই তো তার আনন্দ।

ফল-অফল, ভুল-অভুল সমস্ত অবান্তর। ফাঁসির আগের দিন সে কোর্তায় সাবান দিল, চুল ছাঁটল, খেল পেটভরে। দেখা গেল পাঁচ পাউণ্ড ওজন বেড়েছে। হাসতে হাসতে মঞ্চে গিয়ে উঠল। বললে, মা আমাকে ডেকেছে তার বুকে মাথা রেখে এখন ঘুমুব। এই অকুতোভয় দেশপ্রেমিকের কথাই ধ্বনিত হচ্ছে চরণ দুটিতে

ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান আসি
অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা দিবে কোন বলিদান?

(৪৮) আমরা নিচে পড়ে বইবো না আর শোনরে ও ভাই জেলে :

এই গানটি ১৯২৬ সালে মাদারীপুরে অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রাদেশিক মৎস্যজীবী সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশালের উদ্বোধনী গান হিসেবে রচিত ও শুক হয়। নজরুল স্বয়ং এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন।

 

কাজী নজরুলের গানের গীতিউৎস পার্ট ২

 

(৪৯) এস এস রসলোকবিহারী

১৯৩২ সালের ২৫শে েিসম্বর কলকাতা এ্যালবার্ট হলে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনের পঞ্চম অধিবেশালের উদ্বোধন উপলক্ষে রচিত হয়। নজরুল এই গানটি গেয়ে অধিবেশালের উদ্বোধন করেন। ২৬শে ডিসেম্বর অধিবেশালের সমাধি উপলক্ষে রচিত হয়।

তোমাদের দান তোমাদের বাণী
পূর্ণ করিল অন্তর।

গানটি নজরুল নিজেই অধিবেশালের সমাপনী সঙ্গীতরূপে গানটি গেয়ে শোনান।

(৫০) বগলবাজা দুলিয়ে মাজা :

এটি একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ব্যঙ্গ গান। সাইমন কমিশন বর্জন করার পর কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি পণ্ডিত মতিলাল নেহরুকে প্রধান করে শাসনতন্ত্র রচনা কমিটি গঠন করে। এই কমিটি বৃটিশ রাজমুকুটের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে ডোমিনিয়ন স্টেটাস পাবার মতো করে শাসনতন্ত্র রচনা করেন। সুভাষচন্দ্র বসু, জওহরলাল নেহরু প্রমুখ ব্যক্তিরা এই প্রস্তাব সমর্থন করতে পারেন নি।

১৯২৮ সালের কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশালে মহাত্মা গান্ধীর চেষ্টায় নেহরু, কমিটির রিপোর্ট গৃহীত হয়। ১৯২৯ সালের অক্টোবরে বড়লাট লর্ডআরউইন ইংল্যাণ্ড থেকে ঘুরে এসে বলেন যে, ভারতের ডোমিনিয়ন স্টেটাস ও প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি আলোচনার জন্য লন্ডনে এক সম্মেলন আহ্বান করা হবে। শীর্ষস্থানীয় কংগ্রেসালেতারা এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বিবৃতি দেন।

১৯২৯ সালের লাহোর কংগ্রেসে ডোমিনিয়ন স্টেটাস-এর প্রস্তাব বাতিল করে স্বাধীনতার প্রস্তাব গৃহীত হয়। নজরুল ছিলেন ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার সমর্থক। তিনি ডোমিনিয়ন স্টেটাস- এর ধারণাকে ব্যঙ্গ করে এই রচনা করেন। গানটির শিরোনামও ডোমিনিয়ন স্টেটাস।

(৫১) দড়াদড়ির লাগলরে গিঠ

১৯২৯ সালের ৩১ শে আগস্ট বড়লাট লর্ড আরউইন ঘোষণা করেন যে সাইমন কমিশালের রিপোর্ট প্রকাশিত হবার পর ভারতের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র রচনার জন্য লণ্ডনে রাউণ্ড টেবিল কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হবে। সাইমন কমিশালের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত জনমতকে প্রশতিত করার পক্ষে তা ছিল এক চতুর পদক্ষেপ । ১৯২৯ সালের লাহোর কংগ্রেসে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করা হয় এবং বলা হয় যে গোল টেবিল বৈঠকের কোন প্রয়োজন নেই।

১৯৩০ সালের ৬ই এপ্রিল গান্ধী আইন অমান্য আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং মহাত্মা গান্ধীসহ অনেক কংগ্রেস নেতাকে আটক করে। এই পরিস্থিতে রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনের জন্য ১৯৩১ সালের নভেম্বরে লণ্ডনে গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করা হয়। তিন অধিবেশালে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম অধিবেশালে কংগ্রেস কোন প্রতি পাঠায় নি।

দ্বিতীয় অধিবেশালে মহাত্মা গান্ধী যোগ দেন। বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামীসহ অনেকের ধারণা ছিল গোল টেবিল বৈঠকে কোন লাভ হবে না। নজরুল গোল টেবিল বৈঠক বিরোধীদের দলে ছিলেন। তাই সে বিষয়ে তার এই ব্যঙ্গ গান।

(৫২) কোন শরতে পূর্ণিমা চাঁদ আসিলে এ ধরাতল

গানটি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে রচিত। নজরুল স্মৃতিতে দিলীপকুমার রায় এই গানটির রচনা প্রসঙ্গে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন। একনা আমার থিয়েটার রোডের বাড়িতে ওকে বন্দী করে ওর হাতে কলম দিয়ে বলি, “কাজী ভাই, শরৎ-সংবর্ধনা আসন্ন, তোমাকে কতবার বলেছি লিখতে একটি গান”। “সময় পাইনি দিলীপ মা’-

‘কিন্তু আজতো পেয়েছো? লেখো।’ বলে ওকে এক ঘরে পুরে তালাচাবি দিয়ে অপেক্ষা করে রইলাম। ও আধঘণ্টার মধ্যেই লিখে দিলে একটি গান যা আমি শরৎচন্দ্রের সামনে গেয়েছিলাম। গানটির প্রথম চরণ ছিল কোন শরতে পূর্ণিমা চাঁদ আসিলে এ ধরাতল ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই সেপ্টেম্বর লকাতা ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে আয়োজিত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মজয়ন্তী উৎসবে সাহানা দেবী গেয়েছিলেন।

 

কাজী নজরুলের গানের গীতিউৎস পার্ট ২

 

(৫৩) তোমার বিনা তারের গীতি :
(ক) আকাশে আজ ছড়িয়ে দিলাম প্রিয়

স্মৃতিচারণে কমল দাশগুপ্ত এগান দুটি রচনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে জানিয়েছেন কলকাতা রেডিও স্টেশন থেকে কাজীদা কয়েকটি বিশেষ প্রোগ্রাম করেছিলেন। আমি বিশেষ করে দুটি অপূর্ণ প্রোগ্রামের কথা জানাতে চাই। প্রথমটি হলো বেতার কথাটির অর্থ নিয়ে। বেতার, বিনা তার হলো বিষয়বস্তু এবং তার ওপর কাজীদার গান । প্রথমে লেখা হলো তোমার বিনা তারের গীতি বাজে আমার বীণার তারে’। এই গানটি প্রায় শোনা যায়, কিন্তু অর্থ না বুঝে গাওয়ার জন্য তোমার বিনা তার ও আমার বীণার তার কথা দুটি নিয়ে অনেকেই অসুবিধায় পড়ে।

কাজীদার কথা হলো তোমার বিনা তারের (রেডিও) সঙ্গীত আমার হৃদয় বীণার তারে ঝঙ্কার তোলে। আর একটি গান ‘আকাশে আজ ছড়িয়ে দিলাম প্রিয়, আমার কথার ফুল গো, আমার গানের মালা গো, কুড়িয়ে ‘তুমি নিও’ । এই কলিটির সাধারণ অর্থ কিছু হয় না। আকাশে কথার ফুল ছড়ানো যায় না,তেমনি সেখান থেকে কুড়িয়ে নেওয়াও যায় না। কিন্তু যে বৈদ্যুতিক তরঙ্গের সাহায্যে শব্দ ভেসে এসে ধরা পড়ে আমাদের বেতার যন্ত্রে তাকে ধরে নাও। বেতার নিয়ে গীতি আলেখ্য রচনার কথা ভাবাই যায় না। এ রকম তাঁর অনেকগুলি গান
আছে।

(৫৪) নেচেছ প্রলয় নাচে হে নটরাজ :

এ গানটি রচনা প্রসঙ্গে সুপ্রভা সরকার তাঁর নজরুল বিষয়ক স্মৃতি চারণে জানিয়েছেন। আরেক গানের জন্ম মুহুর্তের কথা আমার মনে আছে। একদিন রবীন্দ্রনাথের প্রলয় নাচন নাচলে যখন, গানটি কাজীদা শুনেছেন কিনা জিজ্ঞেসা করলে তিনি বললেন শুনেননি। কেষ্টদা তখন গানটি গেয়ে শোনালেন। শুনতে শুনতে কাজী দা কেমন যেন আনমনা হয়ে গেলেন।

গানের পরে তন্ময় হয়ে বসে রইলেন। তারপর হঠাৎ উঠে অর্গানে গিয়ে বসলেন। সুর তুললেন। এক রকম মুখে মুখে রচনা করলেন, ‘নেচেছ প্রলয় নাচে হে নটরাজ, বাজে গালে বম বম্‌৷ কেষ্টদা সঙ্গে সঙ্গে গানটি তুলে নিলেন। এই গানটিতে ঘরের পরিবেশের পরিবর্তন করে দিল। কথা ও সুরের রুদ্র রসে আমাদের শরীরে শিহরণ জেগেছিল, বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হয়ে গেলাম ।

(৫৫) তুমি কোন পথে এলে হে মায়াবী কৰি :

কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর সংবর্ধনা উপলক্ষে ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে বেলঘরিয়ো রসচক্র সাহিত্যসংসদ এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই উপলক্ষে নজরুল এই গানটি রচনা করেন। এই কীর্তনাঙ্গ গানটি গেয়ে তিনি স্বয়ং যতীন্দ্রমোহনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

(৫৬) বাজল কিরে ভোরের সানাই ।

নিখিল বঙ্গ মুসলিম যুব সম্মেলনের উদ্বোধনী গান হিসেবে রচিত।

(৫৭) দোলা লাগিল দখিনার বনে বনে

এই গানটি রচনা প্রসঙ্গ উল্লেখ করে নজরুল স্মৃতিচারণে ইন্দুবালা জানিয়েছেন চিৎপুর বিষ্ণুভবনে ছিল আমাদের গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সাল ঘর। কাজীদা ছিলেন আমাদের বাংলা গানের ট্রেনার। একদিন তাঁর ঘরে লোকজনের ভীড় ছিল কম। কাজীদা তাঁর প্রিয় পান আর জর্দার কোটো সামনে নিয়ে বসেছিলেন। মুখে একমুখ পান। সামনে গানের খোলা খাতা। আমার পায়ের আওয়াজ শুনে তিনি মুখ তুলে তাকালেন।

তারপর নিজস্ব কায়দায় হা হা করে হেসে উঠেলেন। এমন হাসি, যা আমার মনে হয়েছে, কাজীদা ছাড়া আর কেউ হাসতে পারবে না কোন দিন। হাসতে হাসতে বললেন, আয় ইন্দু, বোস। তারপর আমি তাঁর পাশটিতে বসতেই বললেন, আচ্ছা তোর ঐ ‘অগুলি লহ মোর সঙ্গীতে’- এর উল্টোপিঠের গানটি কি লিখি বলতো? আমি চট করে কোন জবাব দিলাম না। কাজীদা মহান কবি, শ্রেষ্ঠ গীতিকার।

তাঁর একথার জবাব দিতে যাওয়া আমার মতো মানুষের পক্ষে মুর্খামি ছাড়া আর কী? তাই একটুখানি চুপ করে থেকে শুধু বললাম, কাজীদা এই গানটার সঙ্গে ঐ নতুন গানটিও যেন খুব ভাল হয়। কাজীদা আবার হা হা করে সারা ঘর হাসিতে ভরিয়ে তুলে বললেন, আচ্ছা দাঁড়া, চুপটি করে বোস। বলে এক মুখ পান ঠেসে খস্ খস্ করে কাগজে লিখে দিলেন সেই আমার গাওয়া বিখ্যাত গানটি- দোলা লাগিল দখিনার বনে বনে।

 

কাজী নজরুলের গানের গীতিউৎস পার্ট ২

 

(৫৮) পরম পুরুষ সিদ্ধযোগী মাতৃভক্ত যুগাবতার :

(ক) জয় বিবেকানন্দ সন্ন্যাসী বীর চির গৈরিকধরী

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষে প্রথম গানটি শ্রীরামকৃষ্ণ সম্পর্কে এবং স্বামী বিবেকানন্দ সম্পর্কে দ্বিতীয় গানটি রচনা করেন। ১৯৩৭ সালে যূথিকা রায় গান ২টি রেকর্ড করেন।

সংগ্রহ :

১. অখণ্ড নজরুল

আব্দুল আজিজ আল-আমান সম্পাদিত

হরফ প্রকাশনী কোলকাতা ড. করুনাময় গোস্বামী

২. নজরুল গীতি প্রসঙ্গ

বাংলা একাডেমী-ঢাকা

স্বরলিপি পদ্ধতি :

(১) ভাতখণ্ডে পদ্ধতি

(ক) ৭টি শুদ্ধ স্বরের মধ্যে কেবলমাত্র সা, রে এবং নি এই তিনটিতে ‘আ’- কার এবং ‘ই’ কার ব্যহৃত হয়। অন্যান্যগুলি ‘আ-কার’ বর্জিত। যেমন আ ম প ধ ।

(খ) ৫টি বিকৃত স্বর নিম্নলিখিতভাবে লেখা হয় ।

রে গ ম ধ নি।

(গ) মন্ত্র সপ্তকের স্বরের নীচে চিহ্ন ব্যবহার করা হয়,

যেমন- নি ধ প ম ।

(ঘ) তার সপ্তকের স্বরসমূহের উপরে বিন্দু চিহ্ন দেওয়া হয়,

যেমন- সা রে গম ইত্যাদি ।

(ঙ) সমের চিহ্ন গুণ (x) চিহ্ন এবং ফাক চিহ্ন শূন্য (০)।

(চ) এক মাত্রার চিহ্ন -‘, দুই বা ততোধিক স্বর এক মাত্রার বোঝাতে হলে স্বরগুলির নিচে (~ .) চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। যেমন- সারে গম

(ছ) শব্দের অবগ্রহের স্থানে s চিহ্ন এবং স্বরের অবগ্রহের স্থানে -‘ চিহ্ন দেওয়া হয়।

(জ) বিভিন্ন প্রকার চিহ্নের ব্যবহার : -মীড়ের চিহ্ন = ( তাল বিভাগের চিহ্ন = ।

(ঝ) কোনো স্বরও স্পর্শ করে মূলস্বরে আসতে গেলে মূল স্বরের উপরে সেই স্পর্শ স্বরটিকে ছোট করে লিখতে হয়। যেমন-প, রে” ইত্যাদি।

(২) দণ্ডমাত্রিক স্বরলিপি পদ্ধতি

(ক) শুদ্ধ স্বর : স র গ ম প ধন।

(খ) কোমল স্বর : স্বরের উপরে ত্রিভুজের মত চিহ্ন (A) দেওয়া হয়, যেমন :

র গ ধ নি

(গ) মন্দ্র বা উদারা স্বর : স্বরের নিম্নে বিন্দু চিহ্ন (.) থাকে, যেমন : ন ধ প ম ইত্যাদি।

(ঘ) তারা বা তার সপ্তক স্বরের ঠিক উপরে বিন্দু চিহ্ন দেওয়া হয়,

যেমন: স র গ ম প ইত্যাদি।

(ঙ) তীব্র স্বর : স্বরের মাথায় পতাকা চিহ্ন দেয়া হয়।

(চ) স্বরের মাথায় যতগুলি দণ্ড থাকবে সেই স্বরটি স্থিতিকাল তত মাত্রা বুঝতে হবে, যেমন: র্স র্সা = এক মাত্রা; সা- দুই মাত্রা ইত্যাদি।

অর্ধমাত্রার চিহ্ন =

সিকি মাত্রার চিহ্ন =

(ছ) দণ্ডমাত্রিক স্বরলিপি পদ্ধতিতে প্রতিটি ভাগ বা ত্বকের প্রথমে ও শেষে দুইটি সমান্তরাল দাঁড়ি চিহ্ন (।।) ব্যবহৃত হয়। এই প্রকার দাঁড়ি সমাপ্তিসূচক।

(জ) তালের চিহ্ন ফাঁক-০, ১ম তাল-১, সম- এবং ৩য় তাল-৩।

(ঝ) এক মাত্রায় একাধিক স্বর থাকলে একটি মাত্রায় চিহ্নের নিম্নে বন্ধনী চিহ্ন দিতে হয়; যেমন:

গা। প।গ। ম

 

কাজী নজরুলের গানের গীতিউৎস পার্ট ২

 

(৩) বিষ্ণুদিগম্বর স্বরলিপি পদ্ধতি

শুদ্ধ স্বর : সা রে গ ম প ধনি।

কোমল স্বর : রে গৃ ধনি ।

কড়ি বা তীব্র স্বর ম

মন্দ্র বা উদারা সপ্তক : ম্ প্ নি।

মধ্য বা মুদারা সপ্তক – সা রে গ ম প ধ নি।

তারা বা তার সপ্তক সা রে গ ম।

এক মাত্রায় একটি স্বর সা রে গ ম প ধ নি ।

সিকি মাত্রায় একটি স্বর সা অর্থাৎ সা ১/৪ মাত্রা।

আট ভাগের একটি স্বর সা অর্থাৎ ১/৮ মাত্রা।

চার মাত্রায় স্বর – সা অর্থাৎ সা এর স্থায়িত্বকাল চার মাত্রা।

দুই মাত্রার একটি স্বর সা অর্থাৎ সা এর স্থায়ত্বিকাল দুই মাত্রা।

একটি স্বরকে দেড় মাত্রা বুঝাতে হলে স্বরের নীচে ড্যাস এবং পাশে একটি বিন্দু চিহ্ন দেওয়া হয়, যেমন : সা. অর্থ্যাৎ সা দেড় মাত্রা।

ভাতখণ্ডে পদ্ধতিতে যেমন গানের বাণীর কোন অক্ষরের একাধিক মাত্রা বোঝাতে হলে অবগ্রহ এবং স্বরকে একাধিক মাত্রা বোঝাতে হলে ড্যাস চিহ্ন দিয়ে বোঝান হয়, বিষ্ণুদিগম্বর পদ্ধতিতে তেমনি বাণীর সঙ্গে শুন্য এবং স্বরের সঙ্গে অবগ্রহ ব্যবহার করা হয়,

যেমন- রে সাংং । ম নে ০০

স্পর্শ বা কণস্বর আকার-মাত্রিক বা হিন্দুস্থানী পদ্ধতির অনুরূপ। যেমন রে*। বন্ধনীর () মধ্যে কোনো স্বর থাকলে হিন্দুস্থানী পদ্ধতির মতোই তার পূর্ব স্বর সেই স্বর এবং পরবর্তী স্বর একত্রে এক মাত্রার মধ্যে বুঝতে হবে। যেমন : (প) এক মাত্রায় ধপমপ কিংবা মপধপ।

মীড়ের চিহ্নও হিন্দুস্থানী পদ্ধতির অনুরূপ।

হিন্দুস্থানী বা আকারমাত্রিক পদ্ধতির অনুরূপে বিষ্ণুদিগম্বর পদ্ধতিতে তালের বিভাগ বার (Bar) চিহ্ন দিয়ে পূর্বে বোঝানো হত না। আজকাল কোন কোন ক্ষেত্রে অনুরূপ বিভাগের চিহ্ন দেওয়া হচ্ছে।

বিষ্ণুদিগম্বর পদ্ধতিতে :-

সম ১ চিহ্ন, ফাঁক বা খালির চিহ্ন +, সম বা ফাঁক ছাড়া অন্য বিভাগের তালগুলিকে মাত্রার সংখ্যা দিয়ে বোঝানো হয়। যেমন :-
১ ৩ + ৮
ধি না। ধি ধি না। তি না। ধি ধি না।

 

(৪) আকারমাত্রিক স্বরলিপি পদ্ধতির পরিচয়

(ক) আকারমাত্রিক স্বরলিপিতে প্রত্যেকটি স্বরই আ-কার দিয়ে লেখা হয়, যেমন- সা রে গা মা ইত্যাদি। তবে একাধিক স্বর একত্রে থাকলে কেবলমাত্র শেষ স্বরটিতে আ-কার দেওয়া হয়, যেমন- মগা।

(খ) পাঁচটি বিকৃত স্বর নিম্নলিখিত ভাবে লেখা হয়-

ঋ, জ্ঞ, ক্ষ, দ, ণ।

(গ) স্বরের নীচে হসন্ত’ চিহ্ন দ্বারা মন্ত্ৰ সপ্তক বোঝান হয়, যেমন- সারা গা ইত্যাদি এবং স্বরের মাথায় ‘রেফ’-এর মত চিহ্ন দিয়ে তার সপ্তকের স্বর বোঝান হয়, যেমন: র্সা র্রা র্গা ইত্যাদি।

(ঘ) স্থায়ী অংশে প্রত্যাবর্তন বা পুনরাবৃত্তির প্রয়োজনে যুগল দণ্ড-চিহ্ন (II) ব্যবহৃত হয়।

(ঙ) পুনরাবৃত্তির সময়ে সুরের পরিবর্তন প্রয়োজন হলে তার উপরে ছোট করে। বন্ধনী চিহ্ন (II) দিয়ে তার মধ্যে পরিবর্তিত স্বরগুলি লেখা হয়।

(চ) সময়ে নির্দেশ স্বরের মাথায় ‘১’ বা ‘২’ বা চিহ্ন দেয়া থাকে, যেমন-

২ ১
পা অথবা সা

(ছ) মাত্রার চিহ্ন, যেমন- ১ মাত্রা ও ১/২ = দুইটি সিকিমাত্রা = স্বর ইত্যাদি ।

(জ) ন্যান্য বিভিন্ন প্রকার চিহ্নের ব্যবহার :

মীড়ের চিহ্ন (—) স্বরের উপরে তাল বিভাগের চিহ্ন = । (দাঁড়ি)। ফাঁক

বা খালি = ০।

অবসানের চিহ্ন = (স্বরের মাথায়), যেমন সা

পুনরাবৃত্তির চিহ্ন = {} স্বরবর্তনের চিহ্ন- ()

(ঝ) শব্দের অবগ্রহের স্থানে ‘0’ চিহ্ন এবং স্বরের অবগ্রহের স্থানে। চিহ্ন বামদিকে হাইফেন থাকে।

(:) কোন স্বর স্পর্শ করে মূল স্বরে এলে মূল স্বরের উপরে বাম দিকে সেই স্পর্শ স্বরটিকে ছোট করে লেখা হয়, যেমন – “ধা।

মূল স্বরের পরে অন্য স্বরের রেশ লাগলে সেই স্বরটিকে মূল সরের উপরে ডান দিকে ছোট করে লেখা হয়, যেমন গরে।

Leave a Comment