নজরুল রচিত প্রবন্ধগ্রন্থ, সম্পাদিত ও পরিচালিত পত্রিকা – কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও সাংবাদিকতা

বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেবল কবি বা সংগীতজ্ঞ নন—তিনি ছিলেন এক বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির আধার, যার লেখনী সাহিত্য, সাংবাদিকতা, সমাজচিন্তা ও রাজনৈতিক চেতনায় অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। তাঁর প্রবন্ধচর্চা ছিল সাহসী, মানবতাবাদী ও বিপ্লবাত্মক চিন্তাধারায় পরিপূর্ণ। নজরুলের প্রবন্ধ শুধু সাহিত্যরস নয়, বরং তা ছিল সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির প্রতিবিম্ব, মানুষের মুক্তি ও ন্যায়ের পক্ষে এক দৃঢ় উচ্চারণ।

 

নজরুল রচিত গ্রন্থ (প্রবন্ধ) সম্পাদিত পত্রিকা ও পরিচালিত পত্রিকাগুলোর নাম

 

প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধসমূহ

নজরুলের প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা’ প্রকাশিত হয় সওগাত পত্রিকার কার্তিক ১৩২৬ বঙ্গাব্দে (১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দ)
তখন তিনি করাচি সেনানিবাসে বাঙালি পল্টুনে সৈনিক ছিলেন। প্রবন্ধটিতে তিনি মুসলিম নারীর স্বাধীনতা ও সমাজে তাঁদের ভূমিকা নিয়ে এক সাহসী বক্তব্য রাখেন—যা তৎকালীন সময়ে এক বিপ্লবাত্মক পদক্ষেপ ছিল।

পরের বছর, অর্থাৎ ১৩২৭ বঙ্গাব্দে (১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ) তিনি আরও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লেখেন—

  • ‘জননীদের প্রতি’

  • ‘পশুর খুঁটিনাটি বিশেষত্ব’

  • ‘জীবন বিজ্ঞান’

এগুলো মোসলেম ভারত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এসব রচনায় নজরুলের মানবতাবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে।

নজরুল রচিত প্রবন্ধগ্রন্থসমূহ

প্রবন্ধকার নজরুলের বিকাশ ঘটে সাংবাদিকতার হাত ধরে। তাঁর চিন্তাশক্তি, ভাষাশৈলী ও সমাজদর্শন এই গ্রন্থগুলোতে পূর্ণতা পেয়েছে।

ক্র.গ্রন্থের নামপ্রকাশকালমন্তব্য
যুগবাণীকার্তিক ১৩২৯ (অক্টোবর ১৯২২)নজরুলের প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ; এতে সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি ও স্বাধীনতা বিষয়ক লেখাগুলো স্থান পেয়েছে। সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়।
রাজবন্দীর জবানবন্দীমাঘ ১৩২৯ (জানুয়ারি ১৯২৩)কারাজীবনের অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা প্রকাশিত হয় এই বইয়ে।
রুদ্রমঙ্গল১৩৩৩ বঙ্গাব্দ (১৯২৬)অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে মানবতার লড়াই ও নৈতিক জাগরণের আহ্বান।
দুর্দিনের যাত্রীভাদ্র ১৩৩৩ (সেপ্টেম্বর ১৯২৬)সমাজে দুঃসময়ের প্রতিচ্ছবি, নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর।
ধূমকেতুঅগ্রহায়ণ ১৩৬০ (জানুয়ারি ১৯৬১)নজরুলের নির্বাচিত প্রবন্ধ ও সাংবাদিক লেখার সংকলন।

 

নজরুল সম্পাদিত পত্রিকাসমূহ

নজরুলের সাংবাদিকতা তাঁর লেখনীকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকাগুলো ছিল সমাজ পরিবর্তনের অস্ত্র, স্বাধীনচেতা মতপ্রকাশের মঞ্চ।

  1. নবযুগ — প্রকাশকাল: ১২ জুলাই ১৯২০
    → ব্রিটিশবিরোধী ভাবধারা ও মানবমুক্তির বাণী প্রচারকারী এক প্রগতিশীল পত্রিকা।

  2. ধূমকেতু — প্রকাশকাল: ১১ আগস্ট ১৯২২
    → এটি ছিল নজরুলের সর্বাধিক আলোচিত পত্রিকা। স্বাধীনতার জাগরণে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই পত্রিকার লেখাগুলো ব্রিটিশ সরকারকে কাঁপিয়ে দেয়। ফলে এটি বাজেয়াপ্ত হয় এবং নজরুল গ্রেপ্তার হন। ‘ধূমকেতু’ থেকেই জন্ম নেয় তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’

 

 

নজরুল পরিচালিত পত্রিকাসমূহ

  1. লাঙল — প্রকাশকাল: ২৫ ডিসেম্বর ১৯২৫
    → এটি ছিল কৃষক-শ্রমিক শ্রেণির পত্রিকা, সমাজতান্ত্রিক আদর্শে পরিচালিত। নজরুল এই পত্রিকায় লিখেছিলেন সমাজ পরিবর্তনের জ্বালাময়ী আহ্বান—
    “জাগো দুরন্ত তারুণ্য, ভাঙো শৃঙ্খল, গড়ো নতুন দুনিয়া।”

    প্রথম দিকের কয়েকটি সংখ্যার পর পত্রিকার নাম পরিবর্তন করে প্রকাশিত হয় ‘গণবাণী’, যার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১২ আগস্ট ১৯২৬

 

কাজী নজরুল ইসলাম

 

কাজী নজরুল ইসলামের প্রবন্ধ ও পত্রিকা সম্পাদনা তাঁর সাহিত্যজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তিনি কলমকে ব্যবহার করেছিলেন মানুষের মুক্তির অস্ত্র হিসেবে।
নজরুল ছিলেন এমন এক সাংবাদিক, যিনি শব্দের আগুনে অন্যায়, শোষণ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ জ্বালিয়েছিলেন।

বাংলা প্রবন্ধসাহিত্য ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে তাই নজরুলের নাম আজও এক অনিঃশেষ দীপশিখা—
“যে দীপ নিভে যায় না, জাগায় চেতনার আলো।”

Leave a Comment