বাংলা সঙ্গীতজগতে কাজী নজরুল ইসলাম এক অনন্য প্রতিভা—কবি, গীতিকার, সুরকার এবং গায়ক—সব ভূমিকায় তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর সৃষ্ট নজরুলগীতি বা নজরুল সঙ্গীত বাংলা সংগীতভাণ্ডারের এক অমূল্য সম্পদ, যা এখনো সমানভাবে শ্রুতিমধুর, প্রাসঙ্গিক ও জনপ্রিয়।
নজরুলের সঙ্গীত গ্রন্থগুলোর নাম ও প্রকাশকাল

নজরুলের সংগীতজীবন দীর্ঘ নয়—তবু তাঁর সৃষ্টির পরিমাণ ও বৈচিত্র্য অভাবনীয়। প্রায় ৩,০০০টিরও বেশি গান তিনি রচনা করেছেন, যার মধ্যে অধিকাংশেরই সুর তিনি নিজেই দিয়েছেন। এককভাবে এত বিপুল সংখ্যক গান রচনার নজির পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষার কবি-সুরকারের ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না।
নজরুলের সংগীতে দেখা যায় এক অসাধারণ সংমিশ্রণ—দেশজ রাগ-রাগিণী, ইসলামী সঙ্গীতধারা, পাশ্চাত্য সুরের প্রভাব, বাউল ও কীর্তনের ছোঁয়া—সব মিলিয়ে তাঁর সংগীত এক “বিশ্বসুরের” প্রতিফলন। তিনি কেবল নতুন রাগ সৃষ্টি করেননি, বরং হারিয়ে যাওয়া বহু রাগ-রাগিণীকে পুনর্জীবিত করেছেন। তাঁর রচিত “হারামণি” পর্যায়ের গানগুলিতে লুপ্ত রাগের পুনরাবিষ্কার যেমন দেখা যায়, তেমনি “নবরাগ” ধারায় তাঁর সৃষ্ট রাগসমূহ তাঁর সংগীত-দর্শনের নবত্ব ও উদ্ভাবনশক্তির প্রমাণ বহন করে।
নজরুলের প্রধান সঙ্গীত গ্রন্থাবলি ও প্রকাশকাল:
| গ্রন্থের নাম | প্রকাশকাল (বঙ্গাব্দ) | প্রকাশকাল (খ্রিষ্টাব্দ) | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| বুলবুল (১ম খণ্ড) | আশ্বিন ১৩৩৫ | অক্টোবর ১৯২৮ | নজরুলের প্রথম প্রকাশিত সঙ্গীতগ্রন্থ |
| চোখের চাতক | অগ্রহায়ণ ১৩৩৬ | ডিসেম্বর ১৯২৯ | প্রেম ও প্রকৃতি-নির্ভর গানসমূহ |
| চন্দ্রবিন্দু | ১৩৩৭ | ১৯৩০ | সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত; পুনঃমুদ্রণ ১৯৪৮ (১৩৫২) |
| নজরুল গীতিকা | ভাদ্র ১৩৩৭ | সেপ্টেম্বর ১৯৬০ | নজরুলের নির্বাচিত গানসমূহ |
| নজরুল স্বরলিপি | শ্রাবণ ১৩৩৮ | আগস্ট ১৯৩১ | স্বরলিপি সংবলিত প্রথম গ্রন্থ |
| সুরসাকী | আষাঢ় ১৩৩৯ | জুলাই ১৯৩২ | রাগাশ্রিত সঙ্গীতের সংকলন |
| জুলফিকার | ভাদ্র ১৩৩৯ | সেপ্টেম্বর ১৯৩২ | ইসলামী ভাবধারার গানসমূহ |
| বন-গীতি | আশ্বিন ১৩৩৯ | অক্টোবর ১৯৩২ | প্রকৃতি ও প্রেমভিত্তিক গান |
| গুলবাগিচা | ১৩৪০ | ২৭ জুন ১৯৩৩ | জনপ্রিয় সঙ্গীতসংকলন |
| গীতি-শতদল | বৈশাখ ১৩৪১ | এপ্রিল ১৯৩৪ | শতাধিক গানের সংকলন |
| সুর-মুকুর | আশ্বিন ১৩৪১ | সেপ্টেম্বর ১৯৩৪ | রাগনির্ভর সঙ্গীতগ্রন্থ |
| গানের মালা | আশ্বিন ১৩৪১ | অক্টোবর ১৯৩৪ | জনপ্রিয় ও প্রার্থনামূলক গান |
| সুরলিপি | ভাদ্র ১৩৪১ | সেপ্টেম্বর ১৯৩৪ | স্বরলিপিসহ সংগীতগ্রন্থ |
| বুলবুল (২য় খণ্ড) | জ্যৈষ্ঠ ১৩৫৯ | ১৯৫২ | পূর্ববর্তী সংকলনের ধারাবাহিকতা |
| রাঙা জবা | বৈশাখ ১৩৭৩ | ১৯৬৬ | স্বাধীনতা ও মানবতার সুরে রচিত গান |
| নজরুল গীতি (অখণ্ড) | আশ্বিন ১৩৮৫ | ১৯৭৮ | নজরুলগীতির সমগ্র সংকলন |
| দেবীস্তুতি | মহালয়া ১৩৭৫ | ১৯৬৯ | দেবী আরাধনা ও ধর্মীয় ভাবধারার গান |
| সন্ধ্যামালতী | শ্রাবণ ১৩৭৭ | ১৯৭০ | প্রেম, বিরহ ও ভক্তিভাবের মিশ্র সুর |
সঙ্গীতদর্শন ও ঐতিহ্য
নজরুলের সঙ্গীত কেবল রাগ-রাগিণীর নিপুণ প্রয়োগ নয়—এটি মানবিকতার, সাম্যের, প্রেমের ও আধ্যাত্মিকতার সুর। তাঁর সঙ্গীতে যেমন শোনা যায় “ইয়া নবী সালাম আলাইকা”-র ধ্বনি, তেমনি অনুরণিত হয় “শ্যামা নামের মাঝে প্রাণের তান”। তিনি ছিলেন দুই ধারার সেতুবন্ধন—ইসলামী ও হিন্দু ভাবধারা, পূর্ব ও পশ্চিম সুরসংগীত, ধর্মীয় ও মানবিক চেতনা।
তাঁর গান মানুষকে শিখিয়েছে ভালোবাসা, সহিষ্ণুতা ও মানবতার সাধনা। তাই নজরুলের সঙ্গীত আজও কেবল গান নয়, এক মানবিক বার্তা—যা অতিক্রম করেছে ধর্ম, জাতি ও সময়ের সীমানা।
