বাংলা মুসলিম জাগরণের ইতিহাসে “মোসলেম ভারত” পত্রিকা ও কাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্ক এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। এই পত্রিকা শুধু একটি সাহিত্য সাময়িকী নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের মুখপত্র, যা ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

মোসলেম ভারত ও কাজী নজরুল
মোসলেম ভারত পত্রিকার সূচনা ও উদ্দেশ্য
প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে (১৯১৯–২০) বাংলার মুসলিম সমাজ এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল। রাজনৈতিকভাবে তারা বিভক্ত, শিক্ষায় পিছিয়ে, এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ছিল প্রান্তিক। এই অবস্থায় সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আফজালুল হক ১৯১৮ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন মোসলেম ভারত পত্রিকা।
এর উদ্দেশ্য ছিল —
মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার জাগরণ ঘটানো,
ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে আধুনিক মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা,
এবং মুসলিম সমাজকে উপনিবেশবাদী দাসত্ব থেকে মানসিক মুক্তি এনে দেওয়া।
এই পত্রিকাই হয়ে ওঠে বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বাংলার মুসলমানদের বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের প্রধান মঞ্চ।
নজরুলের যোগদান: সৈনিক থেকে সাহিত্যিকের অভিযাত্রা
১৯২০ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে করাচি সেনানিবাস থেকে ফিরে আসেন তরুণ সৈনিক কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর অন্তরে তখন বিদ্রোহের আগুন, সমাজবদলের স্বপ্ন ও সাহিত্যিক তৃষ্ণা।
এই সময়ে আফজালুল হক তাঁর প্রতিভার দীপ্তি অনুভব করে তাঁকে লেখালেখির জন্য উৎসাহিত করেন। নজরুল প্রথমে মোসলেম ভারত পত্রিকায় কবিতা ও প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন, যা অচিরেই পাঠকসমাজে সাড়া তোলে।
এই পত্রিকায় তাঁর প্রায় ৪০টি রচনা প্রকাশিত হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল—
‘বাঁধনহারা’,
‘খেয়াপারের তরণী’,
‘শাত-ইল-আরব’,
‘মহররম’,
‘ফাতেহা-ই-দোয়াজদাহম’,
‘কামাল পাশা’ প্রভৃতি।
এছাড়া সৈনিকের পোশাকে নজরুলের প্রথম প্রকাশিত ছবি এই পত্রিকাতেই ছাপা হয় — যা তাঁর “বিদ্রোহী সৈনিক কবি” পরিচয়কে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
‘মোসলেম ভারত’ ও নজরুলের সাহিত্যিক সাফল্য
মোসলেম ভারত পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের প্রবন্ধ, গল্প ও কবিতা কেবল সাহিত্য নয়, মুসলিম সমাজের চিন্তায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।
এই লেখাগুলোতে একদিকে ছিল ইসলামী ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যদিকে ছিল ইউরোপীয় মানবতাবাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মুক্তচিন্তার বিকাশ।
নজরুল তাঁর রচনায় দেখিয়েছিলেন— ইসলাম কেবল ধর্ম নয়, এটি এক বিপ্লবী জীবনদর্শন, যা অন্যায়, শোষণ ও দাসত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়।
তাঁর “কামাল পাশা” কবিতা ছিল মুসলিম বিশ্বের নবজাগরণের প্রতীক, যেখানে তিনি আধুনিক তুরস্কের নেতা মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বকে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে দেখিয়েছিলেন।
‘বিদ্রোহী’ ও ‘কামাল পাশা’— ইতিহাস সৃষ্টি করা প্রকাশনা
১৩২৮ বঙ্গাব্দের কার্তিক সংখ্যায় ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় একসঙ্গে প্রকাশিত হয় দুটি যুগান্তকারী কবিতা —
‘কামাল পাশা’
‘বিদ্রোহী’
এই সংখ্যায় নজরুলের একটি রঙিন ছবিও মুদ্রিত হয়, যার নিচে উক্ত কবিতাদ্বয়ের কয়েকটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত ছিল।
এই ঘটনা কেবল সাহিত্যিক প্রকাশ নয়, বরং ছিল বাংলা সাহিত্য ইতিহাসের এক বিপ্লবী মুহূর্ত।
এই দুই কবিতার প্রকাশের মাধ্যমে নজরুল ইসলাম একাধারে সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই আত্মপ্রকাশ করেন।
‘বিদ্রোহী’ কবিতা তাকে রাতারাতি জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়—
“বল বীর,
আমি চির-বিদ্রোহী বীর —
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা রে, বিশ্ববিধাতৃর চির-চরাচর!”
‘মোসলেম ভারত’ থেকে ‘বিজলী’— বিদ্রোহীর যাত্রা
‘মোসলেম ভারত’ এর ১৩২৮ বঙ্গাব্দের কার্তিক সংখ্যা বাজারে প্রকাশিত হওয়ার আগেই সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ (২২ পৌষ, ১৩২৮) পত্রিকা ঐ সংখ্যাটির প্রশংসা ও আলোচনার সূত্রে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি পূর্ণরূপে পুনর্মুদ্রণ করে।
ফলে কবিতাটি দ্রুতই জনমানসে ছড়িয়ে পড়ে এবং নজরুলের নাম সর্বজনীন পরিচিতি লাভ করে।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কোনো কবির এমন দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জনের নজির খুব কমই আছে।
‘মোসলেম ভারত’-এর সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
মোসলেম ভারত ছিল কেবল একটি সাহিত্য পত্রিকা নয়—এটি ছিল এক নতুন মানসিক মুক্তির প্রতীক।
এই পত্রিকা প্রথমবারের মতো মুসলমান তরুণ প্রজন্মকে কলম হাতে তুলে নিয়ে নিজের সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি ও সাহিত্য নিয়ে ভাবতে শেখায়।
এটি মুসলমানদের আত্মসম্মানবোধ জাগিয়ে তোলে এবং প্রমাণ করে যে, সাহিত্য কেবল বিনোদনের জন্য নয়—
এটি জাতি গঠনের হাতিয়ার।
এই ধারার নেতৃত্বে ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম।
তিনি মুসলমান তরুণদের শিখিয়েছিলেন—
“কলমই তরবারি, আর কাব্যই বিদ্রোহের মঞ্চ।”
‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকা না থাকলে হয়তো আমরা আজকের নজরুল ইসলামকে সেই তেজোদীপ্ত, বিদ্রোহী ও মানবতাবাদী কবি হিসেবে পেতাম না।
এই পত্রিকা তাঁর প্রতিভাকে উন্মোচিত করে, জাতীয় চেতনায় যুক্ত করে এবং তাঁকে বাংলা সাহিত্যের এক নতুন যুগের প্রতীক করে তোলে।
সাহিত্যিক আফজালুল হকের স্নেহে ও মোসলেম ভারত পত্রিকার মঞ্চে নজরুল যেভাবে বিকশিত হয়েছিলেন, তা প্রমাণ করে—
একটি কলম, একটি পত্রিকা এবং একটি জাতির জাগরণ — একসাথে ইতিহাস রচনা করতে পারে।
সেই ইতিহাসের নাম — “মোসলেম ভারত ও কাজী নজরুল ইসলাম।”

