কবি নজরুল ও নার্গিসের বিবাহ

কবি নজরুল ও নার্গিসের বিবাহ নিয়ে আজকের আলোচনা। নজরুল সাহিত্যে প্রেম একটি বড় অধ্যায় ও বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। তাঁর প্রথমা পত্নী নার্গিস আসার খামনের সঙ্গে নজরুলের পরিচয়, গভীর প্রণয়, পরিণয় ও বিচ্ছেদ উৎস হয়েছে তাঁর বহু গান ও কবিতায়। নজরুল ও নার্গিসের বিবাহ- সম্পর্কিত বিষয়টি আজও অনেকখানি রহস্যাবৃত অবস্থায় রয়েছে।

 

কবি নজরুল ও নার্গিসের বিবাহ

 

কবি নজরুল ও নার্গিসের বিবাহ

নার্গিসের সঙ্গে নজরুলের বিবাহ ও বিচ্ছেদ সম্পর্কিত বিষয়ে অনেকে প্রকৃত তথ্য না জেনে বিবাহের ব্যাপারটাকে একেবারে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেছেন। কমরেড মুজফফর আহমদ তাঁর নজরুল-বিষয়ক স্মৃতিচারণ মূলক গ্রন্থে এই মর্মে অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, নজরুল-নার্গিস বিবাহ আদৌ অনুষ্ঠিত হয়নি। অথচ নজরুল ইন্সটিটিউট কর্তৃক সংগৃহীত কমরেড মুজফ্ফর আহমদের এক পত্রে ভিন্নরূপ তথ্য রয়েছে। কলকাতার ৫১, মীর্জাপুর-স্ট্রীট থেকে কুমিল্লার (তৎকালীন ত্রিপুরার) দৌলতপুরের ঠিকানায় নার্গিসের মামা আলী আকবর খানকে ১৯২১ সালের ২১ শে জুন নিম্নোক্ত পত্র লেখেন:

খান সাহেব,

বিবাহের নিমন্ত্রণপত্র পাইয়াছি বিবাহ হইয়া যাওয়ার পরে। আগে পাওয়া গেলেও বোধ হয় স্ট্রাইকের জন্য যাওয়া তেমন সুসাধ হইত না। তবে ১০/১২ দিন পূর্বে খবর পাইলে একবার চেষ্টা করা যাইত। যাহা হোক, আশা করি ভালয় ভালয় তত কাজ শেষ হইয়া গিয়াছে। মঙ্গলময়ের মঙ্গল-আশীয়ে সংসার-পথের এই নবীন পথিকদ্বয়ের জীবন ধন্য ও বরেণ্য হোক, খোদার দরবারে এ প্রার্থনা জানাইতেছি আমি ভাল আছি। আশা করি, আপনারা কুশলে আছেন।

আপনার

মুজফ্ফর আহমদ

 

 

কবি নজরুল ও নার্গিসের বিবাহ

 

নজরুল ও নার্গিসের বিবাহ স্থায়ী না হলেও, এই বিয়ের ‘আকদ’ যে সম্পন্ন হয়েছিল, তা নজুলের পত্র থেকেও বোঝা যায়। কুমিল্লার কান্দিরপাড় থেকে ১৯২১ সালের ২৩শে জুলাই আলী আকবর খানকে নজরুল ‘নুরু’ নামে যে পত্র লেখেন তাতে এক জায়গায় আছে : “আপনাদের এই অসুর জামাই পশুর মতন ব্যবহারে যা কিছু কসুর করেছে, তা ক্ষমা করো সকলে। অবশ্য যদি আমার ক্ষমা চাওয়ার অধিকার …বাকী উৎসবের জন্য যত শীগগির পারি বন্দোবস্ত করবো।” থাকে ……. উদ্ধৃত পত্র থেকে স্পষ্ট যে, নজরুল ও নার্গিসের বিয়েতে ‘আকদ’ সম্পন্ন হলেও, “ৰাকী উৎসব’ অনুষ্ঠীত হয়নি।

বলাবাহুল্য, কমরেড মুজফ্ফর আহমদ দৌলতপুরে বিয়ের আসরে উপস্থিত ছিলেন না, তিনি ছিলেন তখন কলকাতায়। সুতরাং বিয়ের দিন ঐখানে কি কি ব্যাপার ঘটেছিল, তা মুজফ্ফর আহমদ প্রত্যক্ষভাবে জানতেন না। তিনি পরবর্তীকালে অন্যের মুখে ঘটনার বিবরণ শুনেই হয়তো এমন ধারণা করে নিয়েছিলেন যে, নজরুল ও নার্গিসের বিবাহ আদৌ অনুষ্ঠিত হয়নি।

নজরুলকে দৌলপুরের ঠিকানায় লেখা তাঁর সাহিত্যিক ও সাংবাদিক বন্ধুদের পত্র থেকেও নজরুল-নার্গিস প্রেম, প্রণয় ও পরিণয়ের ব্যাপার এবং এর ট্র্যাজিক পরিণতির হাশকো সম্পর্কে কিছুটা আভাস পাওয়া যায়। লিওর (পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম) নামে ১৩২৮ সালের ২৫শে জ্যৈষ্ঠ কলকাতার ৩নং হেটংস স্ট্রীট থেকে কুমিল্লার দৌলতপুরের ঠিকানায় লেখা এক পত্রে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় বলেন “র্যাকে পেয়েছিস তিনিই যে তোর “চিরজনমের হারানো গৃহলক্ষ্মী” একথা সত্যি।

 

কবি নজরুল ও নার্গিসের বিবাহ

 

যদি এতটুকু সত্যি হয় তাহলে তোর সৌভাগ্যে আমার সত্যই দা হাম আমাদের ভাবী বৌমার বাইরের ঐশ্বর্যের কথা না লিখলেও ভোর নীল ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছে। জেনে সুশাই হলাম যে তার বাইরের ঐশ্বর্যও যথেষ্টই আছে। জানিয়ে কোনো লাভ নেই। কেননা, কেউ তা বিশ্বেস করবেনা তা জানি।  তোর বিয়েতে উপস্থিত হবার ইচ্ছে আমার কত প্রবল ১৯২১ সালের ২৬ জুন কলকাতার ২৭নং মহেন্দ্র গোস্বামী লেন থেকে কুমিল্লার দৌলতপুরের ঠিকানায় নজরুলকে লেখা এক পত্রে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় বলেন “আশ্চর্য। বিয়েটা হতে না হতেই তুই এমন হয়ে গেলি। হবেও বা! কেননা, ইংরেজীতে একটা কথা আছে না যে “Out of sight out of mind তোর বিয়ের খবর শৈল দিদিকে (ঘোষজায়া) জানিয়ে ছিলুম-তিনি লিখেছেন, “কাজী ভাই দৌলৎপুরে গিয়ে মহা দৌলত্বান হয়ে পড়েছেন জেনে বড় খুশি হলুম।

১৯২১ সালের ২৬ শে জুন কলকাতার ৫১ নং মির্জাপুর স্ট্রীট থেকে কুমিল্লার দৌলতপুরের ঠিকানায় নজরুলকে লেখা এক পত্রে কমরেড মুজফ্ফর আহমদ বলেন:

“কাজী সাজেব, আপনার পত্রাদি যে আর মোটেই পাওয়া যাইতেছেনা তার 1 কারণ কি? এমনভাবে শুনিয়া তুলিয়া থাকিলে আমরা গরীবেরা বাঁচি কি ধরিয়া। শুভ বিবাহ নিশ্চয় নির্দিষ্ট দিনে শেষ হইয়া গিয়াছে। এখন বোধ হয় ‘মধু-চন্দ্রটা খুব জোরে চলিতেছে। নয় কি?”

১৯২১ সালের ১৩ জুন রাতে কলকাতার ‘মোহাম্মদী’ অফিস (২৯, আপার সার্কুলার রোড) থেকে মোহম্মদ ওয়াজেদ আলী দৌলতপুরের ঠিকানায় কাজী নজরুল ইসলামকে যে পত্র লেখেন তাতে একস্থানে আছে

“নিভৃত পল্লীর যে কুটীরবাসিনীর (দৌলতপুরের দৌলতখানার শাহ জাদী বালাই বোধ হয় ঠিক, না?) সাথে আপনার মনের মিল ও জীবনের যোগ হয়ে গেছে, তাঁকে আমার শ্রদ্ধা ও প্রীতিপূর্ণ আদাব জানাবেন।”

 

 

google news logo

 

১৯২১ সালের ৫ জুন কলকাতার ৫/১ শাখারী টোলা লেন থেকে দৌলতদপুরের ঠিকানায় নজরুলকে লেখা একপত্রে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় বলেন

“যখন আজ তোর চিঠিতে জানলুম যে তুই স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে তাকে বরণ করে নিয়েছিস, তখন অবশ্য আমার কোন দুঃখ নেই। তবে একটা কথা, তোর বয়স আমাদের চাইতের ঢের কম, অভিজ্ঞতাও তদনুরূপ। Feeling-এর দিকটা অসম্ভব রকম বেশী, কাজেই ভয় হয় যে, হয়তো বা দুটো জীবনই ব্যর্থ হয়। এ বিষয়ে তুই যদি concious তা হলে অবশ্য কোনো কথা নেই। যৌবনের চাঞ্চল্যে আপাতমধুর মনে হলেও ভবিষ্যতে না পস্তাতে হয়। তুই নিজে যদি সবদিক ভেবে-চিন্তে বরণ। করাই ঠিক করে থাকিস তা হলে আমি সর্বান্তকরণে তোদের মিলন কামনা করছি। আশা করি তোদের মিলন মধুর হবে, শান্তির হবে।”

 

কবি নজরুল ও নার্গিসের বিবাহ

কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, নজরুলের বন্ধুদের এ আশা পূর্ণ হযনি নজরুল ও নার্গিসের মিলন মধুর ও শান্তির হয়নি, তা বিচ্ছেদের মাধ্যমে ট্রাজিক পরিণতির ভিতর দিয়ে বন্ধুদের আশংকাকেই সত্যে পরিণত করেছে।

Leave a Comment