নজরুল রচিত কবিতায় চিত্রকল্পের রূপ রেখা প্রণয়ন

নজরুল রচিত কবিতায় চিত্রকল্পের রূপ রেখা প্রণয়ন নিয়ে আজকের আলোচনা। চিত্রকল্পময় কবিতাগুলোতে কবির অন্তর্গত মনের ভাবোচ্ছাস বিশেষত প্রেম চেতনা প্রকাশিত হয়েছে।

 

নজরুল রচিত কবিতায় চিত্রকল্পের রূপ রেখা প্রণয়ন

 

নজরুল রচিত কবিতায় চিত্রকল্পের রূপ রেখা প্রণয়ন

 

‘সিন্ধু-হিন্দোল’ ‘কাব্যের ফাল্গুনী’ কবিতাটি প্রেমের কবিতা। এই কবিতায় বসন্তের প্রকৃতির সঙ্গে কবির প্রেমাবেগের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে এবং এই মিথিষ্ক্রিয়ায় কয়েকটি অপূর্ব চিত্রকল্প নির্মিত হয়েছে,

১. আজ লাল-পানি নিয়ে দেখি সব-কিছু চুর।
সবে আতর বিলায় বায়ু বাতাবি নেবুর।

২. সখি মিষ্টি ও ঝাল মেশা এল একি বায়।

এ যে বুক যত জ্বালা করে মুখ তত চায়! ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ কাব্যের ‘রাখীবন্ধন’ কবিতায় শরৎকালীন প্রকৃতি অপরূপ চিত্রকল্পে সৃজিত হয়েছে। প্রকৃতি যে কতোটা শিল্পসুষমা এবং অলংকারময় হয়ে নজরুলের কবিতায় চিত্রিত হয়েছে তা ‘চৈতী হাওয়া’, ‘বাসন্তী’ ‘মাধবী-প্রলাপ’ ‘রাখীবন্ধন’ প্রভৃতি কবিতা পাঠ করলে অনুধাবন করা যায়। ‘চৈতী হাওয়া’, ‘বাসন্তী’ ও ‘মাধবী-প্রলাপ’-এই তিনটি কবিতারই উপজীব্য বসন্ত।

 

নজরুল রচিত কবিতায় চিত্রকল্পের রূপ রেখা প্রণয়ন

 

বসন্তের অনিন্দ্য প্রকৃতি অভূতপুর্ব চিত্রকল্পে প্রকাশিত হয়েছে এই কবিতাত্রয়ীতে। ছায়ানট কাব্যগ্রন্থের ‘চৈতী- হাওয়া’ কবিতায় অপূর্ব চিত্রকল্পের সমাহার। নজরুলের প্রকৃতি চেতনার সাথে প্রেম চেতনা একাকার হয়ে মিশে গেছে। বসন্তের প্রকৃতির বিভিন্ন অনুষঙ্গের প্রতীকে কবির দয়িতার জন্য তীব্র বিরহকাতরতা প্রকাশ পেয়েছে। এই কবিতার প্রতি স্তবকে স্তবকে অসাধারণ চিত্রকল্পের শোভা।

প্রকৃতির বিভিন্ন অনুষঙ্গ এসেছে, চাঁপা, বেল, টগর, নীলোৎপল, চামেলী, যুঁই, গোলাপ, সজনে ফুল, স্থলকমল, আম্রমুকুল, বকুল ইত্যাদি ফুল। গোলাপজাম, কামরাঙা, জামরুল ইত্যাদি ফল; পিয়াল-বন, বকুল-শাখা, ঝাউ- শাখা, শাল-বন ইত্যাদি গাছ। দয়িতার দেহের প্রসঙ্গ এসেছে গোলাপ-গাল, কমল- পা, চোখ, মুখ, বুক, ভাঙা ভুরু, খোঁপা ইত্যাদি ‘চৈতী হাওয়া’য় কয়েকটি চিত্রকল্প,

 

নজরুল রচিত কবিতায় চিত্রকল্পের রূপ রেখা প্রণয়ন

 

১. শঙ্খ বাজে মন্দিরে,
সন্ধ্যা আসে বন ঘিরে,
ঝাউ এর শাখায় ভেজা আঁধার কে পিঁজেছে হায়।

২. তেমনি আবার মহুয়া-মউ
মৌমাছিদের কৃষ্ণা-বউ
পান করে ওই ঢুলছে নেশায়, দুলছে মহুল বন
ফুল-সৌখিন দখিন হাওয়ায় কানন উচাটান।

৩. শূন্য ছিল নিতল দীঘির শীতল কালোজল।
কেন তুমি ফুটলে যেখা’ ব্যথার নীলোৎপল?
আঁধার দীঘির রাঙলে মুখ, নিটোল ঢেউ-এর ভাল বুক,

 

google news logo

 

“থলকমলী আঁউরে যেত তপ্ত ও-গাল ছই।’ রেখায়িত ক্রিয়াপদে অভিনব প্রয়োগে স্থলপদ্মের সংকোচনের আশ্চর্য চিত্র যেন জাদুবলে ফুটে ওঠে। বস্তুত এই ক্রিয়াপদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই চিত্রকল্পের ভিতরসাফল্য। আবার ‘ভুঁই-তারকা সুন্দরী।

সজনে ফুলের দল ঝরি/খোপা থোপা লাজ ছড়াত দোলন-খোঁপার পর এখানে লজ্জার ঐ নিম্নরেখ সচিত্র ও নব্য বিশেষণেই চিত্রকল্পের সার্থকতা নিহিত। পরে আবার ফাউ-এর শাখায় ভেজা আঁধার কে পিঁজেছে হায়।’ এখানে ক্রিয়াপদের দরুন ছবি উঠেছে জীবন্ত হয়ে। কল্পনার সম্প্রসারণে, নিসর্গের রূপায়নে, উপর্যুপরি চিত্রকল্পের প্রয়োজনায় ‘চৈতি হাওয়া কবিতাটি এক স্বর্ণঝরা অবিস্মরণ ফোয়ারা।

Leave a Comment