বাঙলার কথা ও কাজী নজরুল নিয়ে আজকের আলোচনা। ‘বাঙ্গলার নবযুগের সাপ্তাহিক মুখপত্র’ হিসেবে ‘বাঙ্গালার কথা’ আত্মপ্রকাশ করে। মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিন সংখ্যা দিয়ে পত্রিকাটির যাত্রা শুরু হয় ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯২১ মোতাবেক ১৩২৮ সনের ১৪ আশ্বিন। কলিকাতার ৭নং ভবানী দত্ত লেন (হ্যারিসন রোড-কলেজ স্ট্রিটের মোড়ের কাছে) কার্যালয় থেকে ‘বাঙ্গালার কথা’ প্রথম প্রকাশ পায়।

বাঙলার কথা ও কাজী নজরুল
‘বাঙ্গালার কথা’র সম্পাদক চিত্তরঞ্জন দাশ এবং সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন হেমন্তকুমার সরকার। তাঁরা উভয়েই ছিলেন সক্রিয় গান্ধীবাদী রাজনৈতিক নেতা। হেমন্তকুমার কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। পরে নদীয়া কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা ও স্বরাজ্য দলের চিফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে তিনিই রাজীনীতিতে এনেছেন। এই দুই স্বদেশেী।
বিপ্লবীর কারণেই হয়তো এ পত্রিকাটিতে রাজনৈতিক প্রবন্ধ-নিবন্ধই স্থান পেতো এবং তা অবশ্যই গান্ধীবাদী অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন সম্পর্কিত। এর প্রথম সংখ্যাতে (প্রথম পৃষ্ঠায়) পত্রিকা বিষয়ক যে ‘নিয়মাবলী’ মুদ্রিত হয়েছে তাতে ‘বাঙ্গালার কথা’র চরিত্রে অনেকটা ধরা পড়ে। যেমন, ‘জাতীয় উন্নতির সহায়ক বিষয়ে বিজ্ঞাপন লওয়া হয়, অন্য বিজ্ঞাপন লওয়া হয় না।

এই ‘জাতীয় উন্নতির সহায়ক’ বিষয়টি আরও কি করতে পত্রিকার চতুর্থ সংখ্যাতে মুদ্রিত হয়েছে, ‘জাতীয় উন্নতির সহায়ক বিষয়ে বিজ্ঞাপন লওয়া হয়। অন্য বিজ্ঞাপন হয় না। চরকা, খদ্দর, দেশী জিনিস, পুস্তক প্রকৃতির বিজ্ঞাপন লওয়া হয়। ‘আর লেখা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় নবজাগরণের আন্দোলন বিষয়ক প্রবন্ধ গৃহীত হইতে পারে।’ প্রথম সংখ্যায় মুদ্রিত হয়েছে চিত্তরঞ্চন দাশের ‘বাঙ্গালার কথা’, স্বরাজ সাধনা’ ও ‘বস্ত্র-যজ্ঞ’ নামক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শিক্ষার বিরোধ’ প্রবন্ধের প্রথম কিস্তি; শেষে কিছু বিজ্ঞাপন। ‘বাঙ্গালার কথা’র সম্পাদক চিত্তরঞ্জন দাশ লিখেছেন,
বাঙ্গালী হিন্দু হউক, মুসলমান হউক, খ্রিস্টান হউক, বাঙ্গালী বাঙ্গালী। বাঙ্গালীর একটা বিশিষ্ট রূপ আছে, একটা বিশিষ্ট প্রকৃতি আছে, একটা স্বতন্ত্র ধর্ম আছে। এই জগতের মাঝে বাঙ্গালীর একটা স্থান আছে, অধিকার আছে, সাধনা আছে, কর্তব্য আছে।……. অসহিষ্ণু হইলে চলিবে না, নিরাশ হইলে চলিবে না। যে অধিকার আজি আমরা দাবী করিতেছি, তাহার যুক্তি-সঙ্গত, ন্যায়সঙ্গত, আমাদের স্বভাবধর্য-সঙ্গত মানুষের স্বাভাবিক অধিকার-সঙ্গত, আমাদের ধর্ম্ম-সঙ্গত, জগতের ধর্ম্ম-সঙ্গত। এই অধিকার হইতে আমাদের কেহ বঞ্চিত করিতে পারিবে না।

একবার এস, আমরা সকলে সমন্বয়ে বলি, ‘চাই এই অধিকার আমাদের, যাহা আমাদের তাহা চাই।’ একবার এস, আমরা হিন্দু মুসলান খৃষ্টিয়ান সমন্বয়ে বলি-‘চাই এই অধিকার আমাদের, যাহা আমাদের তাহা চাই।’ .এস ভাই মুসলমান, তুমি আল্লার নামে প্রাণে প্রাণে বল ‘চাই’। এস ভাই হিন্দু, তুমি নারায়নের নামে প্রাণকে সাক্ষী রাখিয়া বল ‘চাই’। ঐ যে মা ডাকিতেছেন! এস এস সবাই এস। সম্মুখে বিস্তৃত কার্য, এস এস সবাই এস! বল ঈশ্বর। বল আল্লা, বল নারায়ণ, বল বন্দেমাতরম।
পত্রিকার ‘মুখবন্ধ’ প্রবন্ধে সম্পাদক চিত্তরঞ্চন দাশ যে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন তাতে জাত-পাত-ধর্ম নির্বিশেষে সব শ্রেণীর বাঙালিকে সংস্কৃতিগত ঐতিহ্য ধারণ করে সচেতনভাবে ঐক্যবদ্ধ হবার কথা বলেছেন। কেননা তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, সকল প্রজা যখন এক হইয়া আন্তরিক মিলনে মিলিত হইযা বলে ‘চাই’ জগতে এমন কোন রাজশক্তি নাই- যাহা সেই সমবেত আকাঙ্খার অপ্রতিহত বেগ রোধ করিতে পারে।”
স্বদেশী আন্দোলন সঙ্গত চেতনা-ভিত্তিক রচনা হিসেবে এই পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে (২১ অক্টোবর ১৯২১ সংখ্যায়)। প্রকৃত ঘোষের ‘ঢাকা জেলায় চরকা শি প্রবন্ধটি ভারতের তৎকালীন জাতীয় নেতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর একাধিক বক্তৃতা মওলানা আবুল কালাম আজাদের ‘খেলাফত তত্ত্ব প্রবন্ধের ধারাবাহিক অনুবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।

পত্রিকাটিতে শুধু রাজনীতি সম্পর্কিত প্রবন্ধই প্রকাশ পেতো অন্তত চিত্তরঞ্জন দাশ যতিদিন প্রত্যক্ষ সম্পাদন করেছেন ততদিন কোন কবিতা প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু বাসন্তী দেবীর সম্পাদনার ভারপ্রাপ্তির পর থেকে কমপক্ষে একটি কবিতা দিয়ে পত্রিকা-সূচনা প্রায় রীতিই হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। ভারতের জনজাগরণ ও স্বদেশী দ্রব্য গ্রহণ করে আন্দোলনকে বেগবান করার নানা কারণ ও যুক্তসমৃদ্ধ রচনাসমূহের পাশে এই আন্দোলন-সম্পূরক বিভিন্ন বিজ্ঞাপনও প্রকাশ হতো।
‘স্বরাজ-সাধনা’, বস্ত্র-যজ্ঞ’, ‘শিক্ষার বিরোধ’, ‘গোলামখানার শিক্ষা’, ‘স্বরাজ চাওয়া’, ‘ঢাকা জেলায় চরকাশিল্প’, ‘এক বৎসরে স্বরাজ’, ‘খেলাফত তত্ত্ব’, ইত্যাি শিরোনামে রচনা প্রকাশিত হয় পত্রিকায় যার শিরোনাম দেখেই বোঝা যায় যে, এর চরিত্র কতটুকু বিপ্লবী ছিলো।
‘বাঙ্গালার কথা’র রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখ করতে গিয়ে বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয় যে, ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর তৎকালীন বৃটেনের যুবরাজ ভারত সফরে আসার সংবাদে পত্রিকাটি ‘যুবরাজের সম্মান’ শীর্ষক এক সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে বৃটিশ শাসকদের তীব্র সমালোচনা করে এবং যুবরাজের অনুষ্ঠান বয়কট করার আহ্বান জানায়।

১৮ নভেম্বর ১৯২১-একই সংখ্যার পত্রিকার বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সমিতির সম্পাদক শ্রীবীরেন্দ্রনাথ শাসমল ও বঙ্গীয় প্রাদেশিক খেলাফৎ সমিতির সম্পাদক শ্রীমুজিবুর রহমানের যৌথ ইশতেহার প্রকাশিত হয় ‘যুবরাজের ভারতে আগম, ভারতবাসীর কর্তব্য’ শীর্ষনামে। এতে যুবরাজ যেদিন বোম্বাই বন্দরে জাহাজ থেকে অবতরণ করবেন সেদিন ভারতের সর্বত্র এবং ২৪ ডিসেম্বর ১৯২১-যেদিন তিনি কলিকাতা আগমন করবেন সেদিন বঙ্গদেশে হরতাল পালনের ঘোষণাসহ তার সম্মানে আয়োজিত সমস্ত অনুষ্ঠান বয়কট করার জন্যে। আহ্বান জানানো হয়।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ‘বাঙ্গলার কথা’র ধারাবাহিক মাত্র এগারোটি সংখ্যা (১৬ ডিসেম্বর ১৯২১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) সম্পাদনা করতে পেরেছিলেন। এরপর থেকে অর্থাৎ প্রথম বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা থেকে পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবী। অবশ্য একাদশ সংখ্যা যখন প্রকাশ পায় তখন তিনি ও হেমন্তকুমার সরকার জেলে, তাঁদের নাম তথাপি সম্পাদক ও সহকারী সম্পাদক হিসেবে মুদ্রিত হয়েছে।
সম্পাদক, সহমারী সম্পাদক উভয়েই যেহেতু জেলে, বোধকরি সে কারণেই প্রথম বর্ষ একাদশ সংখ্যা ‘স্বরাজ তীর্থের যাত্রী’ সংখ্যা হিসেবে বের হয়। হেমন্তকুমার সরকার পত্রিকাটির একধারে সহকারী সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন, আর ‘কর্মকর্তা’ হিসেবে মুদ্রিত হতো অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের নাম।
চিত্তরঞ্জন দাশ ‘বাঙ্গলার কথা’র যে এগারোটি সংখ্যা সম্পাদন করেছেন এর মাত্র একটি সংখ্যায় (নবম সংখ্যাম ২ ডিসেম্বর ১৯২১) কাজী নজরুল ইসলামের ‘নবযুগ’ নামধেয় একটি নিবন্ধ প্রকাশ পায়। এরপর বাসন্তী দেবী সম্পাদক ও অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় প্রকাশক হওয়ার পর নজরুলের অন্য লেখাগুলো ‘বাঙ্গলার কথা’য় ছাপা হয়েছে। সম্পাদক হলেও সম্পাদকীয় নীতির কোন পরিবর্তন হয়নি বরং এরপর থেকে পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় চিত্তরঞ্জন দাশের বিপ্লবী বিবৃতি উদ্ধৃত থাকতো। চিত্তরঞ্জন সহোদর সুকুমাররঞ্জন দাশসহ অনেক স্বদেশী রাজনৈতিক নেতার লেখা প্রকাশ পেয়েছে এই ক্ষুদ্রাকার পত্রিকায়।

