বঙ্কিমের বাংলা নয় নজরুলের বাংলা – ব্যাখ্যা

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় “বঙ্কিমের বাংলা নয় নজরুলের বাংলা” — এই উক্তি কেবল একটি সাহিত্যিক তুলনা নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রতিধ্বনি। আজকের আলোচনায় আমরা দেখবো কীভাবে কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা ভাষাকে নতুন জীবন, নতুন গতি এবং নতুন দিশা দিয়েছিলেন — যা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক, সংস্কৃতঘেঁষা বাংলার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এক নবযুগের সূচনা করে।

 

বঙ্কিমের বাংলা নয় নজরুলের বাংলা

 

বঙ্কিমের বাংলা নয় নজরুলের বাংলা – ব্যাখ্যা কর

 

বঙ্কিমের বাংলা: সংস্কৃতনির্ভর শিক্ষিত শ্রেণির ভাষা

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উনবিংশ শতাব্দীর বাংলাভাষা নির্মাণে অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর ভাষা ছিল প্রাজ্ঞ, বিশুদ্ধ ও সংস্কৃতঘেঁষা; যা মূলত শিক্ষিত, শহরমুখী মধ্যবিত্ত পাঠকের জন্য নির্মিত। তাঁর গদ্য ও কাব্যের ভাষায় এক ধরনের শৃঙ্খলা, ঐতিহ্য ও গাম্ভীর্য ছিল—কিন্তু তা সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারেনি। বঙ্কিমের বাংলা ছিল এক প্রকার ‘অভিজাত বাংলা’, যা রাজনীতি ও ধর্মীয় ভাবধারায় হিন্দুত্ববাদী চেতনা দ্বারা প্রভাবিত ছিল।

এই ভাষা ও ভাবধারা নবজাগরণের সূচনা করলেও, তা গ্রামীণ ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ফলে বাংলাভাষা একসময় দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে—একদিকে ছিল বঙ্কিমের কৃত্রিম, শিক্ষিত শ্রেণির বাংলা; অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা, যা তখনও সাহিত্যভাষা হিসেবে মর্যাদা পায়নি।

নজরুলের বাংলা: জীবন্ত, জনভিত্তিক, বিপ্লবী ভাষা

এই দ্বিধাগ্রস্ত সময়ে আবির্ভূত হন কাজী নজরুল ইসলাম—একজন স্বশিক্ষিত, দরিদ্র, সৈনিক, সাংবাদিক ও কবি। তিনি বঙ্কিমের শিক্ষিত সমাজের ভাষাকে ভেঙে সাধারণ মানুষের জীবনের ছন্দে, কণ্ঠে, রক্তে ও রাগে ঢেলে দিলেন নতুন প্রাণ।

নজরুলের বাংলা ছিল বাঙালির আত্মপরিচয়ের ভাষা—যেখানে হিন্দু-মুসলমান, গ্রাম-শহর, পুরুষ-নারী—সবাই মিশে গিয়েছিল এক অবিচ্ছেদ্য জাতিসত্তায়। তিনি বঙ্কিমের ‘সংস্কৃত কণ্টকিত’ ভাষাকে সরল, প্রাণবন্ত ও হৃদয়গ্রাহী রূপে রূপান্তর করেন।

নজরুলের ভাষা শুধু সাহিত্যের জন্য নয়, জাতীয় জাগরণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তাঁর কবিতা ও গানে যেমন “বিদ্রোহ”, “সমতা”, “মানবতা” ও “প্রেম”ের আহ্বান ছিল, তেমনি ছিল শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর। তিনি বলেন—

“আমি চির বিদ্রোহী বীর, আমি পৃথিবীর শাপমোচন,
আমি মানব, দানব, দেবতা একসাথে চিরবিস্ময়!”

নজরুলের ভূমিকা: জাতীয় ও সাংস্কৃতিক মুক্তির পথপ্রদর্শক

নজরুল যদি বাংলা ভাষা ও মুসলিম জাগরণের হাল না ধরতেন, তবে এ তরী তুফান অতিক্রম করতে পারতো কিনা, তা সত্যিই সন্দেহ। তাঁর কলমে মুসলমান বাঙালি পেলো আত্মবিশ্বাস ও গৌরবের অনুভূতি। তিনি বাংলা ভাষাকে দিলেন মুক্তি—দিলেন সাহস, দিলেন ছন্দ, দিলেন গান, দিলেন নতুন দৃষ্টি।

বঙ্কিমের বাংলা যেখানে ছিল নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের, নজরুলের বাংলা সেখানে হল সমগ্র বাঙালি জাতির। তাঁর ভাষা কেবল সাহিত্যিক প্রকাশ নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির ঘোষণা।
তিনি শিখিয়েছিলেন—ভাষা কেবল উচ্চারণ নয়, এটি অস্তিত্বের প্রতীক

নজরুলের অবদান: সাহিত্য থেকে বিপ্লবে

বাংলা সাহিত্যে নজরুলের আগমন মানে এক নতুন যুগের সূচনা। রবীন্দ্র-পরবর্তী সময়ে তিনি ছিলেন সেই একমাত্র কবি, যিনি রবীন্দ্রনাথের অনুকরণ থেকে মুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব কাব্যভাষা সৃষ্টি করেন। তাঁর কবিতা, গান ও প্রবন্ধে ছিল আগুনের মতো উচ্ছ্বাস, সমাজবদলের আহ্বান এবং স্বাধীনতার ঘোষণা।

ইংরেজ সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর কবিতা ‘বিদ্রোহী’, ‘দারিদ্র্য’, ‘ধর্মনীতি’ ও প্রবন্ধগুলো ছিল একেকটি বিপ্লবের ম্যানিফেস্টো। ফলে ইংরেজ সরকার তাঁর পত্রিকা ও গ্রন্থ নিষিদ্ধ করে, তাঁকে কারাদণ্ড দেয়। জেলখানায় থেকেও তিনি লিখলেন—

“আমি সেই দিন হব শান্ত, যেদিন অত্যাচারীর হাত থেকে মুক্ত হবে পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষ।”

তাঁর অনশন, প্রতিবাদ, রাজবন্দীর জবানবন্দী এবং রবীন্দ্রনাথের সমর্থনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন—সব মিলিয়ে নজরুল হয়ে উঠলেন বাংলার আত্মা, জাতির কণ্ঠস্বর

বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা সাহিত্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন—কিন্তু নজরুল সেই ভিত্তিকে দিলেন প্রাণ ও বিপ্লবের জোয়ার।
তাঁর বাংলা কেবল ভাষা নয়—এটি ছিল আত্মমুক্তির ঘোষণা, মানবতার আহ্বান, এবং জাতীয় চেতনার স্ফুলিঙ্গ
এই কারণেই বলা হয়—

“বঙ্কিমের বাংলা নয় নজরুলের বাংলা”—
কারণ নজরুলের বাংলা হল সকল বাঙালির বাংলা, জীবনের বাংলা, জাগরণের বাংলা।

Leave a Comment