নজরুলের মধ্যে বৈশ্বিক মানুষ

রেনেসাঁস যুগে “বৈশ্বিক মানুষ” বা Universal Man-এর ধারণা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন আলোকবর্তিকা জ্বালিয়েছিল। জাতি, ধর্ম, ভাষা, স্বদেশ বা সংস্কৃতির সংকীর্ণ সীমানা পেরিয়ে মানুষ হয়ে উঠেছিল বিশ্বের নাগরিক — citizen of the world। এরাজমুস (Erasmus, ১৪৬৯–১৫৩৬), যিনি ‘Prince of Humanists’ নামে খ্যাত, তাঁকে নিয়ে বলা হয়েছিল— “He belonged to no nation.” ইউরোপের রেনেসাঁস সেই মানুষকেই সৃষ্টি করেছিল, যে সকল ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্বজনীন মানবতার প্রতিনিধি। বাংলায় রাজা রামমোহন রায় থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত সেই বিশ্বমানবতাবাদের সুর আমরা বারবার শুনেছি।

বৈশ্বিক মানুষ

 

নজরুলের মধ্যে বৈশ্বিক মানুষ

এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় নজরুল ইসলাম ছিলেন বাংলা ও বাঙালির প্রথম সত্যিকারের বৈশ্বিক মানুষ। তাঁর চিন্তাধারা, সাহিত্য, সংগীত ও দর্শন সর্বত্র মানবতার এক অখণ্ড বাণী ছড়িয়ে দিয়েছে। তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতি বা সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং “মানুষের কবি” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে সেই চিরন্তন আহ্বান—

“যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম খ্রিস্টান।”
(‘সাম্যবাদী’, ১৯২৫)

রেনেসাঁসের আগে ইউরোপে “মানুষ” বলতে বোঝানো হতো একজন “খ্রিস্টান”-কে। কিন্তু রেনেসাঁস মানবতাবাদ (Humanism) সেই সংকীর্ণতা ভেঙে দিয়ে ঘোষণা করেছিল— মানুষের পরিচয় ধর্ম নয়, মানবতা। বাংলায় সেই মানবতাবাদের অন্যতম দার্শনিক ভিত্তি গড়ে তোলেন রাজা রামমোহন রায়; আর নজরুল ইসলাম সেই ধারাকে আধুনিক যুগে রূপ দেন কাব্য, সংগীত ও চিন্তার মাধ্যমে।

নজরুলের মধ্যে বৈশ্বিক মানুষ

 

নজরুলের সাহিত্যজীবনে হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের পরিবর্তে দেখা যায় এক গভীর ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদী দৃষ্টি। তিনি মধ্যযুগের ধর্মান্তরপ্রবণ “মিশ্র ভাষারীতি”-র কবিদের পথ অনুসরণ করেননি, যেখানে লেখা হতো—

“দেও পূজা ক্ষমা দেহ ঝুঁটি মালা ছাড়,
এক ভাবে নবীর কলেমা মুখে পড়ে।”
(আমীর হামজা, জৈগুণের পুঁথি)

বরং নজরুল ধর্মের গণ্ডি ভেঙে মানবতার ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর দৃঢ় ঘোষণা—

“অবতার, পয়গম্বর কেউ বলেননি আমি হিন্দুর জন্য এসেছি,
আমি খ্রিস্টানের জন্য এসেছি। তাঁরা বলেছেন— আমি মানুষের জন্য এসেছি,
আলোর মত, সকলের জন্য।”
(‘হিন্দু-মুসলমান’, রুদ্র-মঙ্গল)

এই মানবিক দর্শনই নজরুলকে করে তুলেছে বৈশ্বিক। তাঁর কাছে মসজিদ, মন্দির, গির্জা কিংবা উপাসনালয় নয়— মানুষের হৃদয়ই শ্রেষ্ঠ তীর্থস্থান। তাই তিনি লিখতে পেরেছেন—

“হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির কাবা নাই।”

এই এক অনন্য মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে অন্যান্য কবিদের থেকে আলাদা করেছে। তাঁর চোখে মানুষই সর্বোচ্চ, ঈশ্বরও যেন মানুষের মধ্যেই প্রকাশিত—

“মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।”
(‘মানুষ’, সাম্যবাদী)

নজরুলের এই ভাবধারা আজও আমাদের পথপ্রদর্শক। তিনি শিখিয়েছেন, মানবতা হল সর্বোচ্চ ধর্ম, ভালোবাসাই হল সকল বিভেদের একমাত্র সেতুবন্ধন। তাই তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত “মানুষ” শব্দটি কেবল কবিতার প্রতীক নয়, বরং এক বৈশ্বিক চেতনার মহাগান— এক এমন মানবতার আহ্বান, যা সমস্ত কাল, জাতি ও ধর্মের সীমা অতিক্রম করে।

Leave a Comment