বাঙালির মুক্তি কবি কাজী নজরুলের হাতে

বাঙালির মুক্তি কবি কাজী নজরুলের হাতে – বিষয়টি নিয়ে আজকের আলোচনা। বঙ্গ সংস্কৃতির আকাশে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং যখন সূর্যের হতো বিরাজমান তখন একদিক থেকে সংকটমুক্তি নিয়ে কোনও সংশয় ছিল না। তাঁর ‘শুচি’ কবিতা ‘গোরা’ উপন্যাস একদিক থেকে সংকট মুক্তির দলিল। কিন্তু মুসলমান সমাজের নির থেকে এই সংকটের জাল ছিঁড়ে বেরনোর প্রশ্ন থেকেই গিয়েছিল। সাংগঠনিক বৌদ্ধিক দিক থেকে মুসলমান সমাজকে মুক্ত করার যে আয়োজন চলছিল নানাভাবে তাতে প্রাণসঞ্চার করার জন্য দরকার ছিল বাধাবদ্ধহীন এক কবির আবির্ভাব।

 

বাঙালির মুক্তি কবি কাজী নজরুলের হাতে

 

বাঙালির মুক্তি কবি কাজী নজরুলের হাতে

 

বাঙালির মুক্তি সাধকের হাতে নয়, বিদ্বানের হাতেও নয়, বাঙালীর মুক্তি কবির হাতে। হিন্দু সমাজে রেনেসাঁসের আলো পড়েছিল অনেকদিন ধরে তাই কবি আনন্দের কবি কিন্তু মুসলমান সমাজের মুক্তির পথ আগলে ছিল অনেকরকম বাধা, সেখানে জাগরণের চেয়ে পুনর্জাগরণবাদের শক্তি ছিল বেশি তাই তার কবিকে পেশীশক্তি সম্পন্ন না হলে চলত না।

নজরুল ইসলাম হলেন সংকট মুক্তির কবি যাঁর জন্য মুসলমান সমাজ দীর্ঘদিন অপেক্ষা করছিল। কাজী নজরুল যে কোনও কবি নন, তিনি পালন করতে এসেছিলেন সমস্যা বিজড়িত একটি সমাজের সংকট মুক্তির ঐতিহাসিক দায়। তাঁর কবিতায় যে পৌরুষপূর্ণ বিদ্রোহের কন্ঠস্বর শুনি তাও কোন আকস্মিক বা সঙ্গতিহীন বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়। যুগসঞ্চিত বিপত্তির নানা রকম চাপ ভেঙে যাঁকে মুক্তির গান গাইতে হবে তাঁকে তো বিদ্রোহী কবিই হতে হবে। কিন্তু বিদ্ৰোহী কৰি তাঁর মূল পরিচয় নয়, জাগরণ বা মুক্তির প্রয়োজনে তিনি বিদ্রোহী। আসলে তিনি জাগরণের কবি, রেনেসাঁসের কবি।

 

বাঙালির মুক্তি কবি কাজী নজরুলের হাতে

 

হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের ঘনীভূত অগ্নিপরিধির গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসার এই আবেদন তাঁর পক্ষেই রাখা সম্ভব যাঁর হাতে আছে রেনেসাঁসোচিত বিশুদ্ধ মানবতাবাদের জয়পতাকা। অর্ধশত বৎসরের ব্যবধানে সূচিত হিন্দু-মুসলিম দুই সমাজের জাগরণের মধ্যে রেনেসাঁসের সমান্তরালে রিভাইভ্যালিজমের পরস্পর বিরুদ্ধ যে টান ছিল তা সর্বদা এড়াতে পারেননি বঙ্কিমচন্দ্রের মতো সাহিত্যসম্রাটও। ‘আনন্দমঠ’-এর একটি চরিত্রের মুখে তিনি বসিয়ে দেন এমন সংলাপ, ধর্ম গেল, জাতি গেল, মান গেল, কুল গেল, এখনতো প্রাণ পর্যন্ত যায়।

রবীন্দ্রনাথের মতো মানবতাবাদী কবিও এড়াতে পারেন না ‘শিবাজী উৎসব রচনার সাময়িক স্খলন। বর্গীয় হাঙ্গামাকে মোহগ্রস্থ ব্যাখ্যায় গরিমাময় করে চিত্রিত করে লেখেন,

এক ধর্মরাজ্য পাশে, খণ্ড ছিন্ন বিক্ষত ভারত
বেঁধে দিব আমি ।

 

বাঙালির মুক্তি কবি কাজী নজরুলের হাতে

 

কাজী নজরুল ইসলাম অপেক্ষাকৃত দুর্বলতর একটি সমাজের জাগরণের কবি হয়েও এ ব্যাপারে কোথাও স্খলিত হননি। চাঁদে কলঙ্ক আছে, নজরুলের নেই। তাঁর চেতনার বৃত্তে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের যে স্বরূপটি পুষ্পিত হয়ে উঠেছিল তার কোনও তুলনা নেই ।

মোরা এক বৃন্দে দুটি কুসুম হিন্দু মোসলমান
মুসলিম তার নয়নমনি, হিন্দু তাহার প্রান
এক সে আকাশ মায়ের কোলে
যেন রবি শশী দোলে
এক রক্ত বুকের তলে, এক সে নাড়ীর টান

 

google news logo

 

তাইতো প্রাণে প্রাণ মিলিয়ে ধ্বনিত হচ্ছে বারবার- বাঙালির মুক্তির কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

Leave a Comment