নজরুলের পল্লীসঙ্গীত

নজরুলের পল্লীসঙ্গীত নিয়ে আজকের আলোচনা। পল্লীসঙ্গীতগুলি কাজী নজরুল রচিত অন্যান্য গ্রামসঙ্গীত থেকে আলাদা করেছি এই কারণে যে, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, বাউল, খেমটা ও ঝুমুরের প্রথাগত বক্তব্যের বাইরেও অনেক গান লোক সমাজে রচিত হয়, যা একান্তই গ্রামীন জীবনের কথাই বলে, বলে তাদের প্রতিদিনের সুখ দুঃখের কথা, বিশ্বাসের কথা।

 

নজরুলের পল্লীসঙ্গীত

 

নজরুলের পল্লীসঙ্গীত

পল্লী ( সঙ্গীতের বক্তব্যগুলির মধ্যে থাকে না কোনো তত্ত্বের ভাব গম্ভীরতা- একেবারে সাদামাটা কথায় ও সুরে গানগুলি গ্রামের মানুষের জীবনের বাস্তব চিত্র হিসেবেই আমাদের কাছে ধরা দেয়। নজরুল ইসলাম রচিত পল্লী সঙ্গীতগুলি এ নিয়মের মোটেই ব্যতিক্রম নয়। এই বিভাগের গানগুলির মধ্যে লক্ষিত হয়- প্রকৃতির রূপবর্ণনা বিষয়ক গান, কৃষ্ণ ভক্তি বিষয়ক গান, প্রেম ও বিরহ বিষয়ক গান ও গ্রামীন জীবন কেন্দ্রিক গান ।

প্রকৃতির রূপ বর্ণনা বিষয়ক পল্লীসঙ্গীতে গ্রামের পাশের ঘুমতি নদীর রূপবর্ণনায় ব্যবহৃত হয়েছে আরো কিছু প্রাকৃতিক বস্তু, যার সঙ্গে গ্রামের মানুষের সম্পর্ক ন প্রতিনিয়তঃ

….. মেঘ এসেছে আকাশভরে- যেন শ্যামলী ধেনু চড়ে। নাগিনীর সম বিজলী ফণা তুলে নাচে, নাচে নাচে রে মেঘ-ঘন গগন তলে ॥’

শুধু নদীর রূপবর্ণনায় নয় পাখির সঙ্গেও যেন গভীর আত্ময়িতা, চোখগেলো পাখির ডাকে পাখির মনের ব্যথার সঙ্গে একাত্ববোধ করে পল্লীবধূ (‘চোখ গেল, চোখ গেল কেন ডাকিস রে’)।

 

নজরুলের পল্লীসঙ্গীত

 

আধ্যাত্মিক জগতে শ্রীকৃষ্ণ সর্বময় ঈশ্বর হলেও গ্রামীন জীবনে মানষের মনে কৃষ্ণকথা অনেকটাই তাদের নিজস্ব পল্লী জীবনের প্রেম-ভালোবাসার কাহিনী। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যে আমরা যে গেঁয়ো ও কথাকথিত অসভ্য কৃষ্ণকে দেখেছিলাম, নজরুল ইসলাম রচিত পল্লী সঙ্গীতের কৃষ্ণ কিন্তু তার থেকে একচুলও নড়েননি। এ জগতে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার সঙ্গে গ্রাম্য কিশোর ও গ্রামবধূর প্রেমলীলার কে নো তফাৎ নেই, তা একেবারেই বাস্তবের দৃশ্য।

কবি সৃষ্ট গ্রাম্যবধু কৃষ্ণের চরণদাসী হবার বাসনায় ‘খাড়ু’ বাঁধা দিয়ে ক্ষীরের নাড়ু নিয়ে আসে তাঁকে সন্তুষ্ট করার জন্য (‘ওরে রাখাল ছেলে, বল্ কি রতন পেলে দিবি হাতের বাঁশি’)। এই কৃষ্ণ কিন্তু ঐশ্বর্যশালী শ্রীকৃষ্ণ নন, – একেবাইে গোপপল্লীর গোপবালক। কুলবধূ রাধা তার ননদিনীকে আহ্বান জানায় কৃষ্ণনামে যথেচ্ছা গালি দিতে, কারণ যতই তাঁর নাম ধরবে ততই সেনাম শ্রবণে আনে আনন্দ- শুধু নাম শোনারই ছল (‘গুলো ননদিনী বল্ কপট নিপট কালা নিঠুর খল’)।

 

নজরুলের পল্লীসঙ্গীত

 

বৈষ্ণব পদাবলি পুর্বরাগ পর্যায়ের পদেরই অনুরূপ গ্রাশ্রন রমণী রাধার কালো মেঘ দেখে কৃষ্ণের কথা মনে পড়ার পাশাপাশি পুকুরের নীর শালুক ও কলমীলতার গাত্রবর্ণ কৃষ্ণের কথাই মনে করায়। প্রকৃতির নামী দামি বস্তুর বদলে কবি প্রকৃতির কোলে অতি অনাদরে যে লতা ও পুষ্পগুলি শোভা পায়, তাকেও কৃষ্ণের উপমা হিসেবে ব্যবহার করেছেন (‘কালো জল ঢালিতে সই চিকন কালোরে পড়ে মনে’) :- এ কালা তো নিতান্তই গ্রাম্য যুবক, যে গুরুজনদের ভয় না করে ডাকে তার প্রেমিকাকে আর-

‘রাতের বেলা চোরের মত চাহে বেড়ার ফাঁকে লো-
চাহে বেড়ার ফাঁকে। ‘

-এ প্রেমে আধ্যাত্মিকতার পরিবর্তে পূর্ণ লৌকিকতাকে কবি অতি যত্নের সঙ্গে রক্ষা করেছেন। (‘কালো পাহাড় আলো করে কে’)। কৃষ্ণবিরহী পরস্ত্রী রাধার সংসার পিঞ্জরের মধ্যে প্রাণ ওষ্ঠাগত

যেন চোরের বউ কাঁদতে নারি, ভয়ে ফুকারিয়া গো

পল্লীসঙ্গীতে কবি নজরুল ইসলাম মানুষের প্রতিদিনের প্রেম ও বিরহের সঙ্গী করে। এনেছেন প্রকৃতিকে, কখনো বা গৃহের ব্যবহার্য জলের কলসীটিকে পর্যন্ত।

পদ্মার ঢেউকে যেমন পদ্ম দিয়ে প্রেমিকা পাঠায় তার দূর-প্রিয়ের কাছে (‘পদ্মার ঢেউরে’), নিশিপবন দূত হয়ে যায় রূপকথা সুলভ ফুলের দেশের কন্যার খোঁজে, তেমনি তরুলতাকে জিজ্ঞাসা করে বিহিণী নায়িকা তার প্রাণের বন্দুর সন্ধান (‘নিশিপবন! নিশিপবন। ফুলের দেশের যাও’) (‘ডাল মেল’, পত্র মেল’ ওরে তরুলতা’)। আবার ‘নাইতে এসে ভাটির স্রোতে যে কলসী ভেসে গেল, কন্যা তাকেই দুত করে পাঠায়।

 

নজরুলের পল্লীসঙ্গীত

 

তার প্রিয়ের খোঁজে। বনবিহঙ্গকে মেঘনা নদীর পারে প্রিয়ের কাছে পাঠায় প্রেমিকা, তার হাতের শাপ্লার মালা দিয়ে। তার বদলে চায় তার ভালোবাসার মানুষটির বুকের সমস্ত জ্বালা, তাকে নিজে ভোগ করার বদলে দেখতে চায় এক সুখী জবনে। তাই তার কামনাঃ

সে যেন রে বিয়া করে, সোনার কন্যারে আনে ঘরে
আমার পাটের জোড় পাঠাইয়া দিব সে কন্যারে’
(বনবিহঙ্গ। যাওরে উড়ে)

এছাড়া ফেলে আসা দিনে প্রকৃতির সঙ্গে ওতঃপ্রোতভাবে জড়ানো আনন্দের দিনগুলের স্মৃতি এসেছে পল্লীসঙ্গীতে (‘বন্ধু, আজো মনে রে পড়েআম কুড়ানো খেলা’)। লাল টুকটুকে সুন্দর বৌটির সৌন্দর্যের কথা বলতে গিয়ে কবি তাকে নিয়ে উপস্থিত করেছেন লাল নটের ক্ষেতে। তার রূপে ক্ষেতে জাগে চঞ্চলতা- মৌমাছিরা মেতে ওঠে, লাল পুঁইলতাটি তার পায়ে জড়িয়ে ধরে। এমন সুন্দর বৌ এর পথ আগলে ‘কাঁকাল বাঁকা ছোঁড়া, এ যেন কবি কল্পনার পল্লীগ্রামের গাওয়ার কৃষ্ণ। কিন্তু

‘রাঙা বৌ এর চোখে লাগে লাল লঙ্কার ঝাল ।
বৌর এর ঘেমে ওঠে গা, লাজে সরে না পা
সে মুখফিরিয়ে শাড়ির আঁচাল, আঙুলে জড়ায় গো

 

google news logo

 

বৌটি কিন্তু একেবারেই সাদামাটা পল্লীবধূ, রাধার চঞ্চলতা তার মদ্যে অনুপস্থিত। কবি এখানে শুধুমাত্র বৌ এর রূপ বর্ণনায়ই প্রকৃতির সাহায্য নিয়েছেন।

Leave a Comment