কাজী নজরুলের গানে উপমা অলঙ্কারের প্রয়োগ

বাংলা কাব্য ও গানের জগতে কাজী নজরুল ইসলাম এমন এক কবি-সুরকার, যিনি ভাষাকে জীবন্ত ও সংবেদনশীল করে তুলেছিলেন তাঁর অলঙ্কারপ্রয়োগের মধ্য দিয়ে। অলঙ্কার কেবল বাক্যসৌন্দর্যের উপাদান নয়, বরং তা ভাব, রস, অনুভূতি এবং দার্শনিক চিন্তার এক নান্দনিক প্রকাশ। তাঁর ব্যবহৃত নানা অলঙ্কারের মধ্যে উপমা অলঙ্কার অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী। নজরুলের গানে উপমা কেবল অলঙ্কার নয়, তা আবেগের অভিব্যক্তি, কল্পনার বাস্তবায়ন এবং শিল্পের গভীর সৌন্দর্যের প্রতিফলন।

 

কাজী নজরুলের গানে উপমা অলঙ্কারের প্রয়োগ 

 

কাজী নজরুলের গানে উপমা অলঙ্কারের প্রয়োগ

 

উপমা অলঙ্কারের সংজ্ঞা ও গঠনরীতি

উপমা অলঙ্কারে দুটি ভিন্ন (বিজাতীয়) বস্তুর মধ্যে কোনো একটি সাধারণ ধর্ম বা সাদৃশ্য নির্দেশ করে তুলনা স্থাপন করা হয়।

  • যে বস্তুকে তুলনার বিষয় করা হয়, তাকে উপমেয় বলে।

  • যার সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাকে উপমান বলে।

  • তুলনা বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দ (যেমন— যেন, সম, প্রায়, তুল্য, সদৃশ ইত্যাদি) কে বলে তুলনাবাচক শব্দ

  • উপমেয় ও উপমান উভয়ের মধ্যে যে গুণ বা ধর্মটি এক, সেটিকে বলা হয় সাধারণ ধর্ম

উপমা অলঙ্কারের মূল উদ্দেশ্য হলো ভাব বা অভিব্যক্তিকে আরও উজ্জ্বল, স্পষ্ট এবং হৃদয়গ্রাহী করে তোলা।

নজরুলের গানে উপমা অলঙ্কারের ব্যবহার

নজরুলের গানগুলোয় উপমা অলঙ্কার এমনভাবে ব্যবহৃত হয়েছে যে তা শব্দের অলঙ্কার ছাড়িয়ে গভীর রসাত্মক চিত্র নির্মাণ করে। তাঁর উপমা কেবল তুলনা নয়, বরং এক আবেগময় রূপক, যেখানে প্রকৃতি, প্রেম, সংগ্রাম, ভক্তি ও মানবতা একাকার হয়ে যায়।

১. “প্রদীপ-শিখা সম কাঁপিছে প্রাণ মম”

(অখণ্ড নজরুল-গীতি)

এই পংক্তিতে প্রাণকে তুলনার বিষয় করা হয়েছে, অর্থাৎ উপমেয়। আর “প্রদীপ-শিখা” হলো উপমান। “সম” শব্দটি তুলনাবাচক শব্দ, যা উপমা সম্পর্ক স্থাপন করছে।
এখানে সাধারণ ধর্ম হচ্ছে কাঁপন বা দোলন, যা উভয় ক্ষেত্রে বিদ্যমান। প্রদীপের শিখা যেমন বাতাসে কেঁপে ওঠে, তেমনি প্রেম বা বেদনার তীব্রতায় মানুষের প্রাণও কেঁপে ওঠে।
নজরুল এই উপমার মাধ্যমে অন্তর্দ্বন্দ্ব, আবেগ ও অনুভূতির সূক্ষ্ম আন্দোলনকে রূপ দিয়েছেন।

এই তুলনা শুধু দৃশ্যমান সাদৃশ্য নয়, বরং মানসিক অবস্থারও প্রতিফলন। প্রাণের কাঁপন এখানে প্রেম, ভয়, প্রত্যাশা ও বেদনার একাত্ম অনুভূতি—যা প্রদীপের শিখার কাঁপনের সঙ্গে এক গভীর কাব্যিক সমান্তরাল তৈরি করে।

২. “তুমি সুন্দর, তাই চেয়েছি বারবার / তুমি দূর, তাই প্রিয় আরও বেশি”

এই গানে নজরুল এক সূক্ষ্ম মানসিক উপমা ব্যবহার করেছেন। এখানে প্রিয়জনের দূরত্বকে আকর্ষণের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। উপমা এখানে কেবল দৃশ্যগত নয়, বরং ভাবগত—
‘দূরত্ব’ = ‘আকর্ষণ’,
যেখানে বিপরীত ধারণার মধ্যেও এক গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই ধরণের উপমা নজরুলের ভাবনার পরিণতি, যেখানে প্রেম কেবল মিলনে নয়, বিরহেও সৌন্দর্য খুঁজে পায়।

৩. “আমি ভয় করি মোর প্রেমভরে, যেন জ্বলিয়া না যায় তব দীপধারে”

এখানে প্রেমিকের হৃদয়ভরা প্রেমকে আগুন বা তাপের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, আর প্রিয়জনের হৃদয়কে করা হয়েছে দীপধার বা প্রদীপধারীর সঙ্গে।
এখানে উপমা দুটি স্তরে কাজ করছে—
প্রথমত, প্রেমের তীব্রতা ও আগুনের তাপের মিল,
দ্বিতীয়ত, প্রিয়জনের কোমল হৃদয় ও দীপধারীর নাজুক সত্তার মিল
এই তুলনা কেবল রূপক নয়, বরং এক নৈতিক সতর্কতা—প্রেম যেন অনিয়ন্ত্রিত আবেগে প্রিয়জনকে দগ্ধ না করে।

৪. “বাঁধনহারা ঢেউ সম বেজে ওঠে প্রাণে”

এই উপমায় উপমেয় “প্রাণ” এবং উপমান “ঢেউ”। উভয়ের মধ্যে সাধারণ ধর্ম হলো অস্থিরতা ও উচ্ছ্বাস। নজরুল এখানে প্রাণের আন্দোলনকে প্রকৃতির ঢেউয়ের সঙ্গে তুলনা করে এক সজীব নন্দন সৃষ্টি করেছেন।
এ উপমা শুধু দৃশ্যমান নয়—এটি এক জীবনবোধ, যেখানে আবেগের ঢেউ ও জীবনের গতি একে অপরের প্রতিচ্ছবি।

নজরুলের উপমার বৈশিষ্ট্য

১. লোকজ ও প্রকৃতিনির্ভর উপমান:
নজরুলের উপমায় প্রকৃতি ও গ্রামীণ জীবনের উপাদান প্রায়ই দেখা যায়—চাঁদ, ঢেউ, ফুল, আগুন, বাতাস ইত্যাদি।

২. মানসিক ও আধ্যাত্মিক সংযোগ:
তাঁর উপমা শুধু বাহ্যিক সাদৃশ্য নয়, বরং মানসিক ও আধ্যাত্মিক সাদৃশ্য প্রকাশ করে। যেমন—প্রেমের আগুন, ভক্তির স্রোত, বেদনার শিখা।

৩. সংগীতধর্মিতা:
গানের স্বরলিপি ও ছন্দের সঙ্গে উপমা এমনভাবে জড়িত যে তা শব্দ ও অর্থের মেলবন্ধনে সুরের সৌন্দর্য সৃষ্টি করে।

৪. প্রেম ও সংগ্রামের দ্বৈততা:
একদিকে তাঁর উপমায় প্রেমের কোমলতা, অন্যদিকে বিদ্রোহের তীব্রতা। যেমন—“আমার চক্ষু দাও প্রলয়ের শিখা” বা “আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে”—এখানে প্রেম ও বিপ্লব একসঙ্গে মিশে যায়।

 

কাজী নজরুল ইসলাম

 

কাজী নজরুল ইসলামের গানে উপমা অলঙ্কার শুধু অলঙ্কারিক রীতি নয়—এটি তাঁর কাব্যিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রাণ। তাঁর উপমা কখনও প্রিয়ার চোখে চাঁদ, কখনও বেদনার জ্বালায় আগুন, কখনও আবার জীবনের ঢেউয়ে ভেসে চলা মানবমনের প্রতীক।

তিনি উপমার মাধ্যমে আবেগকে দৃশ্যমান, বিমূর্তকে বাস্তব, এবং সাধারণকে অনন্য করে তুলেছেন।
এই কারণেই বলা যায় —
“নজরুলের উপমা কেবল তুলনা নয়, তা জীবন ও অনুভূতির সুরের প্রতিধ্বনি।”

Leave a Comment