নজরুলের সঙ্গীত রচনার উৎস ও প্রেক্ষাপট : সৃষ্টির সকল ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট ও উৎস অন্তর্নিহিতভাবে বিরাজমান। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও এর ব্যতিক্রম নন। তাঁর সঙ্গীত ভাণ্ডারকে পরিপূর্ণভাবে বিশ্লেষণ করলে তাঁর সঙ্গীত রচনার প্রেক্ষাপট ও উৎসের সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে। আমরা এ ক্ষেত্রে গঠনমূলক প্রামাণিক তথ্য উপস্থাপন করার চেষ্টা করবো।

নজরুলের সঙ্গীত রচনার উৎস ও প্রেক্ষাপট । নজরুলের ভাবনা
মন্তব্য: দিলীপ কুমার রায় তাঁর বাংলা গানের ইতিবৃত্ত নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- “নজরুলের সঙ্গীত রচনার উৎস বর্ণনা যেমনি হউক, প্রতিভা ধারণ করেই নজরুল পৃথিবীতে অবির্ভূত হয়েছিলেন, তা না হলে রচনা করা সম্ভব হতো না। ৩,৫০০ এর বেশি সঙ্গীত ।”
(১) পারিবারিক অবস্থান :
সঙ্গীতের ঐহিত্যগত ধারা পারিবারিকভাবেই নজরুলকে প্রভাবিত করেছিল। যে কারণে জন্মগতভাবেই নজরুলসঙ্গীত প্রতিভা লাভ করেছে। যদিও পারিবারিক পরিমণ্ডলে সঙ্গীত নিয়ে বিখ্যাত প্রশ্নে নজরুল ছাড়া কেউই এ পর্যায়ে যেতে পারেনি।
(২) শৈশব কালীন পরিবেশ :
শৈশবেই নজরুল সূফী, বাউল, সন্ন্যাসীদের আবেশপুষ্ট ছিলেন। গ্রামীণ পর্যায়ের সকল ধর্মীয় সঙ্গীতানুষ্ঠান নজরুলকে প্রভাবিত করত। ফলে শৈশবেই তাঁর মধ্যে সঙ্গীত প্রতিভা সজাগ দৃষ্টি ফেলেছিল। যা পরিপূর্ণতা পেয়েছে পরবর্তী সময়ে ।
(৩) সনাতন ধর্মের প্রভাব :
সনাতন ধর্মের সার্বিক পরিসর নজরুলসঙ্গীতে সংযুক্ত রয়েছে। বিষয় বস্তুর উপর ভিত্তি করে এ সঙ্গীত রচিত, যার মধ্যে রয়েছে রামায়ণ, মহাভারত, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীচৈতন্য, বিষ্ণু প্রিয়া, সীতা, রাধা, শিব, দূর্গা, কালী প্রভৃতি প্রসঙ্গ। এই পর্যায়ের গানগুলো নজরুলকে অনুপ্রাণিত করেছিল ধর্মীয় চেতনায়।

(৪) বিদেশী সুরের প্রভাব :
নজরুল ৪৯নং বাঙালি রেজিমেন্টে যোগ দিয়ে করাচী চলে যান। তৎকালীন সময়ে করাচীতে থাকা অবস্থায় তিনি বিদেশী সুর ও ভাষা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করেছিলেন।
(৫) ব্রিটিশ শাসন
কৈশোর থেকেই নজরুল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ গড়ে তোলে। পরাধীনতার শৃঙ্খল হতে মুক্তির জন্যে দেশবাসীর হিতার্থে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর বিদ্রোহী কাব্য ও উদ্দীপনামূলক সঙ্গীত সমগ্র ভারতবাসীকে স্বাধীনতার পতাকা তলে একত্রিত হবার আহবান জানিয়েছেন।
(৬) পরাধীনতার শৃঙ্খল হতে মুক্তি লাভের আকাঙ্ক্ষা :
ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনের ব্যপ্তি নজরুল তাঁর কাব্য ও সঙ্গীতের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ভারতবর্ষের সর্ব ক্ষেত্রে। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভের জন্যে তিনি অসুন্দরকে পরিহার করে সুন্দর ও সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এবং রচনা করেছিলেন বিদ্রোহী মূলক সঙ্গীত ও কাব্য ।
(৭) উপজাতীদের প্রভাব :
নজরুল যেখানে বসবাস করতেন তার পাশাপাশি ছিল উপজাতিদের পদচারণা। যাতে করে বিভিন্ন উপজাতি সাম্প্রদায়ের সঙ্গীত নজরুলকে প্রভাবিত করে। যা প্রতিফলিত হয়ে নজরুল রচনা করেছেন বিভিন্ন উপজাতিদের সুরের আঙ্গিকে নজরুলসঙ্গীত।

(৮) ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত :
সঙ্গীতের উৎপত্তির শুরু থেকে বিবর্তনের ধারায় ভারতীয় শাস্ত্রীয়সঙ্গীত বিংশ শতাব্দীতে বাংলা সঙ্গীতে বেশ প্রভাব বিস্তার করে। নজরুল নিজেও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নিয়েছে বিভিন্ন খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে। সে কারণে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিশীলিত ধারায় তিনি রচনা করেছেন নান্দনিক সঙ্গীত সম্ভার।
(৯) প্রাচীন বাংলা গান :
নজরুল পূর্ব বাংলা সঙ্গীত নজরুলের সঙ্গীত রচনায় বেশ আলোচিত। উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা গানের বৈচিত্র্যতা কাজী নজরুলকে সঙ্গীত রচনায় অনুপ্রাণিত করেছিল। তৎকালীন সময় বাংলা গানের ধরন, শব্দ সমন্বয়, বাণী সমন্বয়, তাল ও রাগের ব্যবহার, সুরের আঙ্গিক নজরুল রচিত সঙ্গীতে খুঁজে পাওয়া যায়। এতে বোঝা যায় যে, প্রাচীন বাংলা গানের অনুপ্রবেশে নজরুলসঙ্গীত সৃষ্টি সার্থক হয়েছে।
(১০) লেটো দলের প্রভাব :
ছোটবেলায় নজরুল লেটো দলের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিলেন। এই গানের যে বৈশিষ্ট্য তা হলো গীত রচনা, সুর সংযোজন এবং এক দল গানের মাধ্যমে অন্যদলকে প্রশ্ন করা সে ক্ষেত্রে নজরুল ছিলেন একজন দক্ষ গীতিকার ও সুরকার। মূলত লেটো দলে থাকা অবস্থায় নজরুলের সঙ্গীতের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
(১১) অতুল প্রসাদ, ডি. এল. রায়, রজনীকান্ত, রবীন্দ্রনাথ এর গানের প্রভাব :
পঞ্চ-গীতি কবিদের মধ্যে নজরুলকে সর্বশেষ গীতিকবি হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। ডি. এল. রায়, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ ও রবীন্দ্রনাথ এর গানের বৈশিষ্ট্য নজরুলকে প্রভাবিত করলেও তিনি এই চার গীতি কবিদের বাইরে সঙ্গীত এর বৈচিত্র্যকে তুলে ধরেন। সঙ্গীতের এমন কোনো ক্ষেত্র নাই যেখানে তিনি বিচরণ করেন নি।
(১২) লোকসঙ্গীতের প্রভাব :
নজরুলের লোকসঙ্গীতানুগ গীত তাঁর সঙ্গীত ভাণ্ডারের একটি উল্লেখযোগ্য পার্যায়। পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলাসহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের লোকসঙ্গীতের আঙ্গিক নজরুলকে লোকসঙ্গীত পর্যায়ের গান রচনায় প্রভাবিত করে। এবং তিনি রচনা করেন। লোকসঙ্গীতানুগ নজরুলসঙ্গীত।

(১৩) প্রকৃতিগত অবস্থান :
নজরুল ছিলেন স্বভাব কবি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কবি মনকে সব সময়ই নন্দিত করত। যার প্রতিফলন ঘটেছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেশাত্মবোধক ও লোকসঙ্গীতে, দেশমাতৃকার সৌন্দর্য্য বর্ণনায় কবি সর্বক্ষেত্রে স্বার্থকতা অর্জন করেছে। এবং রচনা। করেছেন প্রকৃতিগত বর্ণনায় সঙ্গীত ও কাব্য ।
(১৪) নব তাল ও রাগ সৃষ্টির প্রেক্ষাপট :
সৃষ্টির প্রেরণা নজরুলকে সব সময় প্রভাবিত করত। যার কারণে সঙ্গীত জীবনের শুরু থেকে নতুন কিছু রচনার ক্ষেত্রে তার মনোনিবেশ ছিল সব কিছুর ঊর্ধ্বে। এই সত্ত্বাকে প্রাধান্য দিয়েই নজরুলের নবতাল ও নর রাগ সৃষ্টি। যা আমরা দেখতে পাই তাঁর রচিত সঙ্গীতে।
(১৫) তৎকালীণ সময়ের সঙ্গীতের সামগ্রিক ভূমিকা :
নজরুল পৃথিবীতে আবির্ভূত হবার পূর্ব থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে বাংলা গানের চর্চা অব্যাহত ছিল। জন্মের শুভ লগ্ন থেকেই পারিবারিক সাঙ্গিতিক পরিবেশ তৎকালীন সময়ের বিচিত্র পর্যায়ের গান নজরুলকে সঙ্গীত রচনায় প্রভাবিত করেছিলেন।
(১৬) সামাজিক প্রেক্ষাপট :
নজরুলের সঙ্গীত রচনার ক্ষেত্রে সামাজিক প্রেক্ষাপট একটি অন্যতম কারণ। ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু ধর্ম অবলম্বন প্রক্রিয়া সামাজিকভাবে অনেক পূর্ব থেকেই প্রতিষ্ঠিত। সঙ্গীতের পর্বটি হিন্দুদের পূজা, পার্বন থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রেই প্রচলিত। ইসলাম ধর্মে যা মোটামুটি ভাবে অনুপস্থিত বলা চলে। ফলে সামাজিক বিষয়টি নজরুলকে সঙ্গীত রচনায় তরান্বিত করে।
(১৭) দেশাত্মবোধ চেতনা :
গানের জগতে নজরুল এসেছিলেন এক হাতে পুস্প সম্ভার আর অন্য হাতে গানের মালা নিয়ে। যাতে ছিল বিচিত্র পর্যায়ের গান, পরাধীন ভারতবর্ষের মুক্তির প্রশ্নে নজরুলের দেশাত্মবোধক গান রচনা তাঁর সঙ্গীত সৃষ্টির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্যে সোচ্চার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তিনি। রচনা করেছিলেন প্রাণবন্ত দেশাত্মবোধক সঙ্গীত।
(১৮) সাম্প্রদায়িক অবস্থান
পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ শাসকরাই সাম্প্রদায়িকতাকে একটি শক্ত অবস্থানে দাঁ করিয়েছেন। যা আজও চলমান অবস্থায় আছে। ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষকে একটি অবস্থানে দাঁড় করবার জন্য নজরুল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গান রচনা করেছিলেন। তিনি রচনা করেছিলেন-
(ক) মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান
(খ) জাতের নামে বদজাতি সব জাত জালিয়াত খেলছো জুয়া।
(১৯) শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিশীলিত ধারা:
নজরুলের সঙ্গীত জীবন পর্যালোচনা করতে গেলে দেখা যায় নজরুল অনেকের কাছেই গান শিখেছে। যাদের মদ্যে কাদের বক্স, মঞ্জু সাহেব, জমিরউদ্দিন খ অন্যতম। শাস্ত্রীয়সঙ্গীতে পরিপক্বতা এবং নজরুলসঙ্গীতের বৈচিত্র্যতার জন্যে নজরুলের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিশিলিত ধারায় গান রচনা।
(২০) নজরুলসঙ্গীত রচনার সার্বিক মূল্যায়ান :
নজরুলের সঙ্গীত রচনায় সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্য পরিপূর্ণ, মূল্যবোধের দৃষ্টিতে নজরুলসঙ্গীত বাংলা গানের একটি স্বার্থক রূপায়ন।
উপসংহার :
প্রত্যেক রচনারই ছোট, বড় একটি প্রেক্ষাপট থেকে যায়। সে দৃষ্টিতে নজরুলের সঙ্গীত রচনার প্রেক্ষাপট সুন্দর ও স্বার্থকময়ভাবে উপস্থাপন করবার চেষ্টা করেছি মাত্র। উপরোক্ত আলোচনা স্বার্থক হয়েছে বলে আমি আশাবাদী।

