নজরুলসঙ্গীত কেন জনপ্রিয় হলো সে সম্পর্কে আলোচনা । নজরুলের ভাবনা

নজরুলসঙ্গীত কেন জনপ্রিয় হলো সে সম্পর্কে আলোচনা : বাংলা গানের ক্ষেত্রে যারা নাম কিনেছেন তাদের মধ্যে কাজী নজরুল অন্যতম। তাঁর গানের ভাণ্ডার বাংলা গানকে দিয়েছে পরিপূর্ণতা।

 

নজরুলসঙ্গীত কেন জনপ্রিয় হলো সে সম্পর্কে আলোচনা

 

Table of Contents

নজরুলসঙ্গীত কেন জনপ্রিয় হলো সে সম্পর্কে আলোচনা । নজরুলের ভাবনা

বাংলা গানের বিবর্তনের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তিনি বিচরণ করেননি। ফলে নজরুলসঙ্গীত পেয়েছে গ্রহণ যোগ্যতা এবং ব্যাপকতা ।

(১) বাংলা গানে নজরুল সঙ্গীতের প্রভাব :

১৯৪৭ পরবর্তী বাংলা গানের বিভক্তি যেমনটি ছিল বিবর্তনের ধারায় তা ভারতীয় সঙ্গীতাঙ্গনে আজ পর্যন্ত অনেক কিছু দিয়েছে, যার সফল রূপকার কাজী নজরুল। নজরুলসঙ্গীত প্রভাবিত করেছে সকল পর্যায়ের সঙ্গীতকে। পরিবেশনের আঙ্গিকে ভিন্ন হবার কারণে এবং অন্য সুরকারের সমন্বয়ের কারণে নজরুলসঙ্গীত বৈচিত্র্যমুখী প্রসার লাভ করেছে।

(২) শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রভাবিত নজরুল সঙ্গীত :

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিশীলিত ধারায় নজরুলের সঙ্গীত রচনা বেশ প্রাধান্য পেয়েছে। এর মধ্যে ধ্রুপদ, ধামার, ঠুমরী, টপ্পা, শাস্ত্রীয় শ্রোতাদের অনুপ্রাণিত করেছে। যার ফলে নজরুলসঙ্গীত বাংলা গানের পরিসরে বিখ্যাত বলে ধরে নেওয়া যায়।

(৩) ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নজরুল সঙ্গীতের আয়োজন:

নজরুল ছিলেন বিদ্রোহী কবি। তার বিদ্রোহী সত্ত্বাকে প্রাধান্য দিয়ে রচিত কাব্য ও সঙ্গীত ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জনগণকে অনুপ্রাণিত করেছিল। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদের ভাষা নজরুলের কাব্য ও সঙ্গীতের মাধ্যমে বিকাশ লাভ করে। নজরুল চেয়েছিলেন অসুন্দরকে পরিহার করে সুন্দরও সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে। তাঁর রচিত সঙ্গীত যেমন- “জয় হোক জয় হোক সত্যের জয় হোক” এবং কাব্য “বিদ্রোহী” আনন্দময়ীর আগমন, মুক্তি ইত্যাদি।

 

নজরুলসঙ্গীত কেন জনপ্রিয় হলো সে সম্পর্কে আলোচনা

 

(৪) সনাতন ধর্ম বিষয়ক নজরুল সঙ্গীত

নজরুল ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার এবং সঙ্গীত শিল্পী। গান রচনার বৈচিত্র্যতা এবং সুর সংযোজনের ক্ষেত্রে নজরুল প্রতিভা বিরল। বিশেষ করে হিন্দু মাইথোলজি প্রয়োগে নজরুল যে গানগুলি রচনা করেছেন (ভজন, কীর্তন, শ্যামা, ভক্তিমূলক) তাতে করে হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে তার জনপ্রিয়তা বেশ বেড়েছে তৎকালীন সময় থেকেই। বিষয় ভিত্তিক রচনার কারণে নজরুলসঙ্গীতের ব্যাপ্তি আজও সুন্দরভাবে প্রবাহমান।

(৫) নজরুলের ইসলামিক গান :

নজরুলের ইসলামিক গান তাঁর রচনার একটি সার্থক প্রকাশ। পর্যায় ভিত্তিক ইসলামিক গান রচনার কারণে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ নজরুলকে অভিনন্দিত করেছিল। যার মধ্যে ছিল রমজান, মক্কা, মদিনা, মসজিদ, ঈদ প্রভৃতি প্রসঙ্গ। যেদিন থেকে নজরুল ইসলামিক গান রচনা করেন ঠিক তখন থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে নজরুলের ইসলামিক গানের প্রচার প্রসার একটি আধিপত্য বিস্তার লাভ করেছে।

(৬) নব রাগ সৃজনে কাজী নজরুল

সৃষ্টির রহস্য চিরদিনই মানুষ ধারণ করে আছে। এই ক্ষেত্রে নজরুলকে সহযোগিতা করেছিল সুরেষ চক্রবর্তী, আকাশ বাণী থেকে প্রচারিত নবরাগ এবং হারামনি এই দুইটি অনুষ্ঠান সুরেখ চক্রবর্তী কর্তৃক প্রচারিত হয়েছিল। নতুন রাগ সৃষ্টি এবং অপ্রচলিত রাগের প্রয়োগের কারণে নজরুলসঙ্গীত দর্শক শ্রোতাদের কাছে আরও বেশি প্রাণবন্ত হয়েছে।

(৭) নজরুল সৃষ্ট তাল

নজরুল তাঁর গানে বৈচিত্র্য সাধনের জন্য ভাল প্রবর্তনের ক্ষেত্রে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি ৬টি তাল সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর সঠিক প্রয়োগ করেছেন তাঁর গানে।

যেমন- “প্রিয়া ছন্দ” সাত মাত্রার তাল, ছন্দ- ২/৩/২

গানের কথা :- “মহুয়া বনে বন পাপিয়া ”

তাল বৈচিত্র্যের কারণে নজরুলসঙ্গীত বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

(৮) নারী জাগরণের গান :

নারী জাগরণের গান নজরুলসঙ্গীতের একটি অন্যতম পর্যায়। ব্যতিক্রমধর্মী রচনার কারণে সঙ্গীত পিপাসু মানুষ তথা উপমহাদেশের নারীদের মধ্যে এক নব জাগরণের সূচনা হয়। নজরুলের অগ্নিশ্রাবী সঙ্গীত রচনার জন্য উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীরা নজরুলকে অভিনন্দিত করেছিল। যথা- “জাগো নারী জাগো”

(৯) সাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতি গান :

ব্রিটিশ শাসনের শুরু হতে পর্যায়ক্রমিকভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক অবস্থান দানা বাঁধতে থাকে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর এটি আরো ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। নজরুল ছিলেন পরাধীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ জানাবার একজন কাণ্ডারী ।

তিনি সাম্প্রদায়িকতা তুলে সকল শ্রেণীর মানুষকে এক পতাকা তলে নিয়ে আসার জন্যে নিজেকে দেশবাসীর হিতার্থে উৎসর্গ করেছিলেন। তাই তিনি রচনা করেছিলেন সাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতির গান, যে গানের সুবাদে নজরুলসঙ্গীত আজ এতটা গ্রহণযোগ্য । যেমন : “মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম ”

 

নজরুলসঙ্গীত কেন জনপ্রিয় হলো সে সম্পর্কে আলোচনা

 

(১০) বাংলা কীর্তন ও কাজী নজরুল :

শ্রী চৈতন্য দেবকে বাংলা কীর্তনের প্রবর্তক বলা হয়। কীর্তনের উৎপত্তি এবং এর বিস্তৃতি আজ পর্যন্ত নানাভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। কাজী নজরুল বাংলা কীর্তনকে নতুন আঙ্গিকে সাজিয়েছে। বিষয় একই হলেও সুর সংযোজনের ক্ষেত্রে কাজী নজরুল অন্যতম। কীর্তনের সুর বৈচিত্র্যের কিছু কিছু ক্ষেত্র নজরুল তাঁর রচিত কীর্তন গানে উপস্থাপন করেছেন। পর্যায় কীর্তন হলেও এতে রয়েছে বিভিন্ন সুরের সমাহার যাতে করে নজরুলের কীর্তন পেয়েছে গায়কী বৈশিষ্ট্যে স্বার্থকতা।

(১১) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তথা নজরুল ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম :

নজরুল ইনিস্টিটিউট বাংলাদেশে সরকার তথা সাংস্কৃতিক মন্ত্রাণালয়ের অধিনে একটি প্রতিষ্ঠান। যেখানে নজরুলের বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা এবং সঙ্গীতের নানা দিক নিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সঙ্গীতের জন্য রয়েছে সত্যায়ন বোর্ড, স্বরলিপি প্রকাশ, আদি রেকর্ড ভিত্তিক সুর ও বাণী প্রকাশ প্রভৃতি। আদি সুর ও বাণীতে নজরুলসঙ্গীতে প্রশিক্ষণ দেবার কারণে ক্রমান্বয়েই নজরুলসঙ্গীত জনপ্রিয়তার শীর্ষে। শুদ্ধভাবে নজরুলসঙ্গীত প্রচারের জন্য বাংলাদেশ সরকারের এটি একটি মহৎ উদ্যোগ।

(১২) মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুলসঙ্গীত চর্চা :

নজরুল রচনায় বিশেষ গুরুত্ব থাকার কারণে নজরুলের সৃষ্টিকে মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে শুরু থেকে নজরুলের রচনা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে জন মানুষের কাছে। জনগণের কবি হিসাবে নজরুলের স্বীকৃতি তাঁর রচনার সার্থক রূপ।

(১৩) নজরুলের বিভিন্ন বিষয়ে এমফিল ও পি. এইচ. ডি. প্রোগ্রাম :

স্নাতকোত্তর শ্রেণীর পরের পর্যায় হলো এমফিল এবং পি. এইচ. ডি. প্রোগ্রাম। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুলসঙ্গীতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম চলছে। এক্ষেত্রে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগে এ প্রোগ্রামে গবেষণা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় দুটি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ।

 

google news logo

 

(১৪) জাতীয় গণমাধ্যমে নজরুলসঙ্গীতের প্রচার :

নজরুলসঙ্গীত জনপ্রিয়তা লাভ করার পেছনে প্রধান এবং অন্যতম কারণ হলো গণমাধ্যম। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করবার কারণে তারা একমাত্র রেডিও এবং টেলিভিশন দুইটি মাধ্যমেই নজরুরের গান শুনতে পান। জেলা শিল্পকলার মাধ্যমে নজরুলসঙ্গীত প্রশিক্ষণ দেবার ব্যবস্থা থাকার কারণে বাংলাদেশের সঙ্গীত পিপাসু মানুষ নজরুলসঙ্গীত শেখার সুযোগ পাচ্ছে। নজরুল ইনিস্টিটিউট এবং কেন্দ্রীয় শিল্পকলা মূখ্য ভূমিকা পালন করলে নজরুলসঙ্গীত আরও প্রসার লাভ করবে বলে আমি মনে করি।

উপসংহার :

উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে আমরা এই সিদ্ধান্তে উন্নীত হতে পরি যে, যে ধারাবাহিকতার আলোকে নজরুলসঙ্গীত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে তা মূলত পরিপূর্ণ সঙ্গীত হিসাবে। আশা করছি সুন্দর ব্যবস্থাপনায় নজরুলসঙ্গীত আগামীর পথে আরো নান্দনিকতা লাভ করবে।

Leave a Comment