বাংলা গানের জগতে কাজী নজরুল ইসলাম এক অগ্নিমূর্তি। তিনি ছিলেন শুধু কবি নন, ছিলেন বিদ্রোহ, মানবতা ও জাগরণের প্রতীক। তাঁর কণ্ঠে ও কলমে প্রতিধ্বনিত হয়েছে শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির গান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সুর। নজরুলের সৃষ্ট উদ্দীপনামূলক গান বা প্রেরণাদায়ক গান জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিল স্বাধীনতার চেতনা ও মানবিক সাহসে।
তিনি তাঁর রচনায় যে বিপ্লবের আহ্বান উচ্চারণ করেছেন, তা শুধু রাজনৈতিক নয় — তা সামাজিক, নৈতিক এবং আত্মিক পুনর্জাগরণেরও প্রতীক। তাঁর গানে তিনি মানুষকে জাগিয়ে তুলেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, ভয় ও বশ্যতা ত্যাগ করতে, এবং নিজের শক্তি ও মর্যাদায় বিশ্বাস স্থাপন করতে।
নজরুল তাঁর সীমিত কর্মজীবনে ৩,০০০-এরও বেশি গান রচনা করেন, যার মধ্যে বহু গানই মানুষের মনোবল, দেশপ্রেম, বিপ্লব ও জাগরণের প্রতীক। এই উদ্দীপনামূলক গানগুলোই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এবং বিপ্লবী আন্দোলনে অনুপ্রেরণার উৎসে পরিণত হয়।

৪টি উদ্দীপনামূলক গানের পরিচয়
নজরুলের ৪টি উদ্দীপনামূলক গানের পরিচয়
১. জাগো অনশন বন্দী ওঠরে যত
রচনাকাল: ১লা বৈশাখ, ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ (১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ)
স্থান: গণবাণী কার্যালয়, কলকাতা
প্রকাশনা: গণবাণী পত্রিকা, ২১ এপ্রিল ১৯২৭
গ্রন্থ: ফণি মনসা
রেকর্ড নং: N-27666
স্বরলিপি: নজরুল সুর সঞ্চয়ন
বিষয়: দেশাত্মবোধক
শ্রেণী: গণসঙ্গীত
তাল: কাহারবা
শিল্পী: সত্য চৌধুরী
এই গানটি রচিত হয়েছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের যুগে। “জাগো অনশন বন্দী ওঠরে যত” গানে কবি বন্দিত্বের শৃঙ্খল ছিঁড়ে মানবমুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন। অনশনরত বিপ্লবীদের উদ্দেশে এই গান ছিল তাঁর সংগীত-সমরনিনাদ।
এখানে তিনি বলছেন — ঘুম থেকে ওঠো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াও, আত্মত্যাগে মুক্তির পথ খুঁজে নাও। গানের সুরে কাহারবা তাল ব্যবহার নজরুলের সঙ্গীতের রণধ্বনি ও বিপ্লবী শক্তিকে আরও তীব্র করেছে।
এই গান শুধু রাজনৈতিক বন্দীদের আহ্বান নয়; এটি প্রতীকী অর্থে সমগ্র জাতির জাগরণের গান।
২. জাগো নারী জাগো
গ্রন্থ: নজরুল গীতিকা
রচনাকাল: ১৯৩১
নাটিকা: আলেয়া
স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: কাজী নজরুল ইসলাম
রেকর্ড: N-31049
শিল্পী: জগময় মিত্র
রাগ: সারং
তাল: কাওয়ালী
এই গানটি নারীর জাগরণ ও মুক্তির এক অনন্য প্রতীক। ১৯৩১ সালে রচিত এই গানে নজরুল নারীকে আর কেবল গৃহিণী বা দুর্বল সত্তা হিসেবে দেখেননি; বরং সমাজগঠন ও মানবতার মুক্তির অন্যতম শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
“জাগো নারী জাগো” — এই আহ্বানটি কেবল নারীজাতির প্রতি নয়, বরং সমাজে সমতার ও মানবতার আহ্বানও। কবি বিশ্বাস করতেন, নারী মুক্তি ছাড়া জাতির মুক্তি অসম্ভব।
গানে সারং রাগের প্রয়োগে কোমলতার সঙ্গে উদ্দীপনার মিশেল ঘটেছে, আর কাওয়ালী তাল গানে এক সজীব, রণোন্মুখ ছন্দ তৈরি করেছে।
৩. এই শিকল পরা ছল
রচনাকাল: ১৯৪২ সাল
স্থান: হুগলী
পত্রিকা: ভারতী, জ্যৈষ্ঠ ১৩৩১
গ্রন্থ: বিষের বাঁশি
স্বরলিপি: নজরুল গীতি মালা (২য় খণ্ড)
রেকর্ড নং: G.E. 7506
প্রকাশকাল: জুন ১৯৪৯
শিল্পী: গিরীন চক্রবর্তী
পর্যায়: গণসঙ্গীত
তাল: দ্রুত দাদরা
“এই শিকল পরা ছল” গানটি এক গভীর বিদ্রোহের ভাষা। এখানে কবি শৃঙ্খল ও দাসত্বকে তীব্র ব্যঙ্গের মাধ্যমে চিহ্নিত করেছেন। গানটি এক অর্থে ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতীকী প্রতিবাদ, আবার অন্য অর্থে মানসিক পরাধীনতার বিরুদ্ধে আত্মার মুক্তি।
এই গানের বাণীতে আছে স্বাধীনতার পিপাসা, মিথ্যা শৃঙ্খল ভাঙার সাহস এবং ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানের বার্তা। “শিকল” এখানে শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ও সামাজিক বশ্যতারও প্রতীক। দ্রুত দাদরা তাল ও জোরালো সুর গানে উদ্দীপনা ও সংগ্রামের আবহ তৈরি করেছে।
৪. দুর্গম গিরি কান্তার মরু
পত্রিকা: বঙ্গবানী, জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৩
শিরোনাম: “কাণ্ডারী হুশিয়ার”
স্বরলিপি: সুর মুকুর
রেকর্ড নং: N-27666
প্রকাশকাল: ১৯৪৭
শিল্পী: সত্য চৌধুরী
বিষয়: দেশাত্মবোধক
শ্রেণী: গণসঙ্গীত
রাগ: বৃহৎ কেদার
তাল: একতাল
এই গানটি বাংলা সংগীতের ইতিহাসে অমর স্থান অধিকার করেছে। “দুর্গম গিরি কান্তার মরু” মূলত কবির রচিত “কাণ্ডারী হুশিয়ার” কবিতা থেকে সংগীতে রূপান্তরিত।
এখানে কবি দেশকে এক বিশাল নৌকার সঙ্গে তুলনা করেছেন — যেখানে মানুষ নাবিক, আর কাণ্ডারী (নেতা) হলো জাতির পথপ্রদর্শক। গানটি নেতৃবর্গকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানায় যেন নৌকা (দেশ) বিপথে না যায়।
এই গানে নজরুল একদিকে বিপ্লবী চেতনাকে জাগিয়ে তুলেছেন, অন্যদিকে মানবতার নৌকার কাণ্ডারীকে সত্য, ন্যায় ও সাহসের পথে পরিচালনার ডাক দিয়েছেন। বৃহৎ কেদার রাগের গাম্ভীর্য ও একতালের দৃঢ়তা গানটিকে মহাকাব্যিক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
নজরুলের উদ্দীপনামূলক গানের তাৎপর্য
কাজী নজরুল ইসলামের উদ্দীপনামূলক গান শুধুমাত্র রাজনীতিক আন্দোলনের সংগীত নয়; এগুলো ছিল মানবমুক্তির সার্বজনীন আহ্বান। তাঁর গান মানুষকে সাহস, ন্যায়বোধ ও আত্মমর্যাদার পাঠ দেয়।
এই গানগুলোই প্রমাণ করে যে নজরুল কেবল কবিতার নয়, সংগীতেরও বিদ্রোহী — যিনি কলম ও সুরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে।
নজরুলের উদ্দীপনামূলক গানগুলো আজও সমান প্রাসঙ্গিক — কারণ স্বাধীনতা, ন্যায়, মানবতা ও জাগরণের সেই বার্তা এখনো আমাদের পথপ্রদর্শক।
কাজী নজরুল ইসলামের উদ্দীপনামূলক গান বাঙালি জাতির চেতনায় চিরদিন অমর। “জাগো অনশন বন্দী”, “জাগো নারী জাগো”, “এই শিকল পরা ছল” এবং “দুর্গম গিরি কান্তার মরু” — এই চারটি গান বাঙালির অন্তরে চিরস্থায়ী জাগরণের প্রদীপ প্রজ্বলিত করেছে।
তাঁর গানের মূল সুর — “জাগো, উঠো, সাহসী হও, সত্যের পথে চলো” — আজও প্রতিটি প্রজন্মকে নতুন করে প্রেরণা দেয় স্বাধীনতা ও মানবতার জন্য লড়তে।
