কাজী নজরুলের ৪টি দেশাত্মবোধক গানের পরিচয়

বাংলা জাতীয় সঙ্গীতধারায় কাজী নজরুল ইসলামের দেশাত্মবোধক গানগুলো এক অনিঃশেষ উৎসের মতো। তাঁর রচিত ও সুরারোপিত তিন হাজারেরও বেশি গানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জাতীয় জাগরণ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং সংগ্রামী চেতনার প্রতীক। নজরুলের গান শুধু সুর-মধুরতায় গঠিত নয়; বরং তা মানুষের মনের গভীরে স্বাধীনতার শিখা প্রজ্বলিত করে। তাঁর “চল্‌ চল্‌ চল্‌ ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল” আজ বাংলাদেশের রণসংগীত—যা নজরুলের বিপ্লবী চেতনাকে প্রমাণ করে। দেশাত্মবোধ, সংগ্রাম, মানবমুক্তি ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে তিনি কখনো গান, কখনো কবিতা, কখনো প্রবন্ধে প্রকাশ করেছেন। নজরুলগীতি ১০টি ভিন্ন বিভাগে শ্রেণিবদ্ধ হলেও দেশাত্মবোধক ও রণসঙ্গীত তাঁর রচনার অন্যতম শক্তিশালী ক্ষেত্র। ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক শাসন, কৃষক-মেহনতি মানুষের শোষণ, জাতীয় মর্যাদা ও স্বাধীনতার লড়াই—সবই নজরুলকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ফলে তাঁর গান হয়ে উঠেছিল শোষণবিরোধী, মানবমুক্তিকামী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মুখপত্র।

 

কাজী নজরুলের ৪টি দেশাত্মবোধক গানের পরিচয়

 

কাজী নজরুলের ৪টি দেশাত্মবোধক গানের পরিচয় । নজরুলের ভাবনা

এই প্রেক্ষাপটে নজরুলের চারটি উল্লেখযোগ্য দেশাত্মবোধক গানের পরিচয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম গান “বল ভাই মাভৈ : মাভৈ”, যা তাঁর বিষের বাঁশি গ্রন্থে প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে। এটি দ্রুত দাদ্রা তালে বাঁধা এক প্রাণবন্ত গণসঙ্গীত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অন্ধকার সময়ে গানটি মানুষের মনে সংগ্রামের সাহস ও ঐক্যের বাণী পৌঁছে দেয়। গৌরী কেদার ভট্টাচার্য্যের কণ্ঠে রেকর্ডকৃত এই গান শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে। গানটির মূল বক্তব্য সমাজকে ভয়মুক্ত করা—“মাভৈ” অর্থাৎ “ভয় নাই”—আর ভয়ভীতি অতিক্রমের এই ডাক নজরুলের দেশপ্রেমিক মনের তেজকে প্রতিফলিত করে।

 

কাজী নজরুলের ৪টি দেশাত্মবোধক গানের পরিচয়

 

দ্বিতীয় গান “বলবীর উন্নত মম শির” প্রকাশিত হয় মোসলেম ভারত, বিজলী ও প্রবাসী পত্রিকায়, এবং নজরুলের বিখ্যাত গ্রন্থ অগ্নিবীনা–তেও অন্তর্ভুক্ত। শेख লুৎফর রহমান ও গিরীণ চক্রবর্তী এ গানের সুরারোপে কাজ করেন। কাহারবা তালের গতি, শক্তিশালী ছন্দ এবং “বলবীর”— অর্থাৎ বলবান বীর—এই আহ্বানই গানটিকে পরিণত করে এক অনন্য গণসঙ্গীতে। গোটা ভারতের স্বাধীনতাকামী জনতার প্রতি নজরুলের একটি শক্তিশালী বার্তা ছিল—শির উঁচু করে বাঁচো, অত্যাচারের সামনে মাথা নত করো না। গানটির শব্দ, সুর এবং দহনশীল চেতনায় প্রতিফলিত হয় তাঁর অগ্নিগর্ভ বিপ্লবী মন।

 

google news logo
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

তৃতীয় গান “আমার দেশের মাটি ও ভাই খাঁটি সোনার”—যা ১৯৩৩ সালে চোখের চাতক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়—নজরুলের দেশপ্রেমের এক কোমল, মাটির গন্ধমাখা প্রকাশ। এটি বাউল বা পল্লীসঙ্গীত ঘরানায় রচিত, যেখানে লোফা বা শ্রীখোল তালের সহজ প্রবাহ গানটিকে গ্রামীণ আবেগের সঙ্গে যুক্ত করেছে। গোপাল চন্দ্র সেনের কণ্ঠে রেকর্ড করা এই গান দেশের মাটি, প্রকৃতি, মানুষের সরলতা—সবকিছুকে “খাঁটি সোনা” রূপে উপস্থাপন করেছে। এখানে নজরুলের দেশপ্রেম রণহুংকার নয়; বরং মাতৃভূমির প্রতি নিখাদ ভালোবাসা, মমতা এবং বাঙালির গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতি গর্বের প্রকাশ।

চতুর্থ গান “কারার ঐ লৌহকপাট”, রচিত হয় ১৯২৩ সালে কলকাতায়। এটি নজরুলের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও শক্তিশালী দেশাত্মবোধক গানগুলোর একটি। প্রকাশিত হয় বাংলার কথা পত্রিকায় এবং পরবর্তীতে নজরুল গীতিমালার দ্বিতীয় খণ্ডে। দ্রুত দাদ্রা তালে লেখা এই গানটি প্রকৃত অর্থে বন্দি মানুষের স্বাধীনতার দাবিতে উচ্চারিত এক বজ্রকণ্ঠ। লৌহকপাট ভেঙে মুক্তির আহ্বান নজরুলের যুগান্তকারী বিপ্লবী মনোভাবকে সুরের মাধ্যমে প্রকাশ করে। গিরীণ চক্রবর্তী যখন গানটি রেকর্ড করেন, তখন থেকেই এটি সংগ্রামী জনতার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, আন্দোলনের মাঠে বাজতে থাকে বিজয়ের ধ্বনি হিসেবে।

সমগ্র বিবেচনায় দেখা যায়, নজরুলের দেশাত্মবোধক গান কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়; তা ছিল এক সাংস্কৃতিক মুক্তির ভাষা। তাঁর গান সাধারণ মানুষকে সাহস দিয়েছে, আত্মমর্যাদা শিখিয়েছে এবং শোষণমুক্ত মানবসমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছে। এই চারটি গান সেই সৃষ্টিভাণ্ডারের উজ্জ্বল প্রতিনিধিত্ব করে—যেখানে একদিকে রয়েছে বিপ্লবী ক্রোধ, অন্যদিকে স্বাধীনতার অচিন আগুন, আবার কখনো মাতৃভূমির প্রতি নিখাদ প্রেম। গান ও কাব্যে নজরুল যে দেশপ্রেমের বহুমাত্রিক রূপ ধরেছেন, তা বাংলা সংগীতকে করেছে আরও গভীর, সমৃদ্ধ এবং চিরকালীন।

প্রয়োজনে আমি চাইলে এই চারটি গানের ব্যাখ্যা, নন্দনতত্ত্ব, তুলনামূলক বিশ্লেষণ কিংবা একাডেমিক প্রবন্ধরূপে আরও বিস্তৃত করে দিতে পারি।

Leave a Comment