বাংলা সঙ্গীতে কাজী নজরুল ইসলামের রাগপ্রধান গানগুলোর বিশেষ স্থান রয়েছে। নজরুল ছিলেন বাংলা গানে রাগশাস্ত্রের অন্যতম শক্তিশালী প্রয়োগকারী। তাঁর আগে বাংলা গানে রাগ-রাগিণীর চর্চা অবশ্যই ছিল, কিন্তু নজরুল রাগকে শুধুমাত্র সুরের কাঠামো হিসেবে গ্রহণ করেননি—তিনি রাগকে আবেগের বহিপ্রকাশ, কবিতার ভাবমাধুর্য এবং গায়কীর প্রকাশ–ক্ষমতার সঙ্গে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করেছেন। ফলে তাঁর রাগপ্রধান গানগুলো শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সৌন্দর্য বহন করলেও তা কখনোই কঠোর বা গম্ভীর হয়ে ওঠেনি; বরং সহজ, সুরেলা, হৃদয়গ্রাহী রূপে মানুষের কাছে পৌঁছেছে। নজরুলের তিন হাজারেরও বেশি গানের মধ্যে প্রায় শতাধিক গান রাগপ্রধান, যা বাংলা শাস্ত্রীয় গানের ইতিহাসে এক অনন্য অবদান। তাঁর গান ১০টি প্রধান ভাগে বিভক্ত হলেও রাগপ্রধান গানের বিভাগটি বিশেষভাবে শিল্পমান, সাংস্কৃতিক মূল্য এবং সুর–ঐতিহ্যের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য।

৪টি রাগপ্রধান গানের পরিচয় । নজরুলের ভাবনা
নিচে নজরুলের চারটি গুরুত্বপূর্ণ রাগপ্রধান গানের বিস্তৃত পরিচয় দেওয়া হলো, যা বাংলা গানের অনন্য বৈশ্বিক ঐতিহ্যকে সামনে আনে।
প্রথম গান “কেন মেঘের ছায়ার আজি চাঁদের চোখে”, অন্তর্ভুক্ত বুলবুল গ্রন্থে এবং ১৯৪০ সালে প্রকাশিত। জ্ঞান গোস্বামীর কণ্ঠে রেকর্ড হওয়া গানটি রচিত হয়েছে দারবারী কানাড়া রাগে এবং ত্রিতাল তালে। দারবারী কানাড়া মূলত গভীর, গম্ভীর, আবেগময় রাগ—যা সাধারণত রাতের শেষ প্রহরে পরিবেশিত হয়। নজরুল এই রাগকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে চাঁদের চোখে মেঘের ছায়া নামার দুঃখ, বিষাদ এবং আকাঙ্ক্ষা যেন সুরের প্রতিটি ভাগে প্রতিধ্বনিত হয়। দারবারীর নৈঃশব্দ্যপূর্ণ রাগধর্ম এখানে গানের কাব্যিকতা বাড়িয়ে তুলেছে। গানটিতে রাগের স্বরবিন্যাস এত নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে যে এটি বাংলা রাগপ্রধান গানের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
দ্বিতীয় গান “নিশি নিঝুম ঘুমনা’হি আসে”, প্রকাশিত হয় নজরুল গীতি অখণ্ড গ্রন্থে, এবং বিজন কুমার বসুর কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়। এই গানটির রাগ বেহাগ—যা মূলত সৌন্দর্য, কোমলতা, প্রেম ও শান্তির রাগ হিসেবে পরিচিত। বেহাগে স্বরপ্রয়োগে এক ধরনের উজ্জ্বল, নির্মল আবেশ তৈরি হয়। নজরুল এই রাগকে ব্যবহার করেছেন নিশি–বিরহ, অশান্ত হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা এবং ঘুম না আসার দোলাচল প্রকাশ করতে। ত্রিতালের স্থির গতি বেহাগ রাগের সুরলহরিকে ভারসাম্য দিয়েছে। গানটি রাগপ্রধান হওয়ার পাশাপাশি কাব্যিক আবেগে পূর্ণ, যা শাস্ত্রীয় শৈলীকে সহজবোধ্যতার আবরণে পাঠক–শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেয়।
তৃতীয় গান “নীলাম্বরী শাড়ি পরি”, যা বুলবুল (২য় খণ্ড)—এ অন্তর্ভুক্ত এবং রেকর্ড করেন শিল্পী ধীরেন মিত্র। এটি রচিত হয়েছে নীলাম্বরী রাগে, যা নিজেই অত্যন্ত সুমধুর, শান্ত ও মনোমুগ্ধকর রাগ। নীলাম্বরীর সুরের মূর্ছনায় থাকে স্নিগ্ধতার আবেশ, কোমলতার ছায়া। নজরুল এই রাগকে ব্যবহার করে নারীর সাজ, শাড়ির শোভা, সৌন্দর্য এবং নীলাভ আবহকে সুনিপুণভাবে সুরে রূপ দিয়েছেন। ত্রিতাল ব্যবহারে গানটি পেয়েছে এক সৌন্দর্যমণ্ডিত প্রবাহমানতা। নবরাগ গীতিআলেখ্য কাবেরী তীরে–তে যুক্ত হওয়ায় গানটির নন্দন–পরিসর আরও সম্প্রসারিত।
চতুর্থ গান “প্রথম প্রদীপ জ্বালো”, যা নজরুল গীতি (চতুর্থ খণ্ড)-এ অন্তর্ভুক্ত, এবং রাগ পটদীপ–এ রচিত। এটি মূলত সন্ধ্যা বা গোধূলির রাগ, যেখানে আলোর প্রথম দীপ্তি, সন্ধ্যার আবেশ এবং পবিত্রতার ধ্যানমগ্নতা চিত্রিত হয়। নজরুল এই রাগে প্রথম প্রদীপ জ্বালানোর আধ্যাত্মিক অনুভূতিকে সুরায়িত করেছেন। আদ্ধা তালের নরম গতি রাগটির আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যকে আরও গাঢ় করেছে। স্বরলিপি হিসেবে এটি রাগবিচিত্রায় সংরক্ষিত—যা নজরুলের শাস্ত্রীয় জ্ঞান ও সুরশৈলীকে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করে।

সবমিলিয়ে বলা যায়, নজরুলের রাগপ্রধান গান বাংলা সঙ্গীতকে কেবল শাস্ত্রীয় রাগরীতির সঙ্গে যুক্ত করেনি, বরং তা জনসাধারণের কাছে সহজ ও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। তিনি রাগকে বেদনা, আনন্দ, প্রেম, আধ্যাত্মিকতা কিংবা প্রকৃতির অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে এক নতুন সুর–মাধুর্য সৃষ্টি করেছেন। তাঁর কল্পনা, সৃজন–বৈচিত্র্য ও রাগশাস্ত্রে গভীর অনুধাবন—এই গানগুলোকে আজও বিশেষ মর্যাদায় স্থাপন করে। নজরুলের রাগপ্রধান গান তাই কেবল সঙ্গীতরীতি নয়—এটি বাংলা সঙ্গীতসংস্কৃতির মহামূল্যবান সম্পদ।
