বাংলা গানের পরিসরে কাজী নজরুল ইসলাম এক বহুমাত্রিক স্রষ্টা—তিনি একই সঙ্গে প্রেম, বিরহ, দেশাত্মবোধ, রণহুঙ্কার, ভক্তি, সমাজসংস্কার, ব্যঙ্গ ও হাস্যরস—সবই সমান দক্ষতায় গানে রূপ দিতে পেরেছেন। তাঁর রচিত তিন হাজারেরও বেশি গানের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো হাসির গান, যা বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে এক অনন্য মেজাজের সৃষ্টি করেছে। সাধারণত বাংলা গানে করুণ, প্রেমমাধুর্য বা ভক্তিভাবই প্রধান স্থান দখল করে; ফলে হাস্যরসধর্মী গান খুব বেশি দেখা যায় না। নজরুল এই ঘাটতি পূরণ করেন তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত কৌতুকবোধ, পরিস্থিতির মজা ধরার ক্ষমতা, ব্যঙ্গ-রসের ঝাঁজ এবং দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো ঘটনাকে গান করে তোলার আশ্চর্য দক্ষতার মাধ্যমে। তাঁর হাসির গান মানুষের মনকে যেমন হাসায়, তেমনি সামাজিক ব্যঙ্গ, পারিবারিক রসিকতা কিংবা মানবচরিত্রের খুঁটিনাটাও হালকা মেজাজে প্রকাশ করে। নজরুলগীতি ১০টি ধরনে বিভক্ত হলেও হাসির গান তাঁর সৃষ্টির এক মজাদার ও গুরুত্বপূর্ণ ধারাকে প্রতিনিধিত্ব করে, যা বাংলা গানের বৈচিত্র্য বাড়িয়েছে এবং শ্রোতার কাছে আনন্দের নতুন জগত উন্মোচন করেছে।

কাজী নজরুলের ৪টি হাসির গানের পরিচয় । নজরুলের ভাবনা
এই হাসির গানের ধারার মধ্যে নজরুলের চারটি উল্লেখযোগ্য গান বিশেষভাবে পরিচিত। প্রথম গান “আমার খোকার মাসি”, যা প্রকাশিত হয় ১৯৩৪ সালের অক্টোবর মাসে নজরুল গীতি অখণ্ড গ্রন্থে। কাহারবা তালে বাঁধা এই গানটি এক ধরনের পারিবারিক কৌতুক—শিশু, তার নানা দুষ্টুমি এবং পরিবারের সদস্যদের হাস্যকর প্রতিক্রিয়া নিয়ে রচিত। রঞ্জিত রায়ের কণ্ঠে রেকর্ডকৃত গানটি বাঙালির ঘরোয়া জীবনের সরল আনন্দকে অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফুটিয়ে তোলে। নজরুল এখানে ভাষার সুরেলা প্রক্ষেপণ এবং ছন্দের হালকা দোলায় এক নির্মল আনন্দ–বাতাবরণ তৈরি করেছেন। এটি তাঁর হাসির গানের ধারার এক চমৎকার প্রতিনিধি।

দ্বিতীয় গান “এই গাধার খাটুনির চেয়ে”, প্রকাশিত হয় ১৯৪০ সালে, যা একটি দ্বৈত-সঙ্গীত হিসেবে রেকর্ড হয়েছিল রাধারানী ও গোপাল ভট্টাচার্যের কণ্ঠে। রঞ্জিত রায় সুরারোপ করেন এই কাহারবা তালের প্রাণবন্ত গানটি। এখানে হাস্যরসের সঙ্গে মিশে আছে সমাজব্যঙ্গ—পরিশ্রম, ঘরোয়া কাজ, দায়দায়িত্ব এবং দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েনকে নজরুল অত্যন্ত মজাদার ভাষায় তুলে ধরেছেন। শিরোনাম থেকেই এর কৌতুকপূর্ণ ভাব প্রকাশ পায়, আর গানের কথায় ফুটে ওঠে মানবজীবনের দায়িত্বের প্রতি নিত্যদিনের বিরক্তি ও বিদ্রূপ, যা হাসতে হাসতে ভাবায়ও।
তৃতীয় গান “নম: নম: রাম খুঁটি” অথবা “রামখুঁটি বা খুঁটোর ভয়”—হাসির গানের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয়। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৩৩ সালে গীতিশতদল গ্রন্থে এবং হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়। দাদ্রা তালের এই গানটি গ্রামবাংলার সহজ রসিকতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। রামখুঁটির মতো একটি দৈনন্দিন বিষয়কে কেন্দ্র করে নজরুল যে হাস্য–আলঙ্কারিক পরিস্থিতি তৈরি করেন, তা তাঁর ভাষা-দক্ষতা ও কৌতুকবোধকে নতুন মাত্রা দেয়। এই গান দেখায়—নজরুল কেবল দার্শনিক বা বিপ্লবী নন; তিনি ছিলেন মানুষকে আনন্দ দিতে পারা এক অসাধারণ শিল্পী।
চতুর্থ গান “প্রিয়ার চেয়ে শালী ভালো”, যা সুরসাফী গ্রন্থে প্রকাশিত হয় এবং হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কণ্ঠে রেকর্ডকৃত। খাম্বাজ রাগে ভিত্তিক এই কাহারবা তালের গানটিতে হাস্যরস এবং ব্যঙ্গ মিলেমিশে এক দারুণ রূপ পেয়েছে। দাম্পত্য সম্পর্ক, গ্রামীণ আড্ডা, শালী–দুলাভাইয়ের মজার সম্পর্ক এবং ছোটখাটো খুনসুটিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় এই কৌতুকপূর্ণ বিন্যাস। নজরুল এখানে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন তা নিখাদ বাঙালি রসবোধের সঙ্গে জড়িত—স্বাভাবিক, প্রাণবন্ত ও সহজেই শ্রোতার মুখে হাসি এনে দেয়।
সমগ্র বিবেচনায় দেখা যায়, নজরুলের হাসির গান বাংলা সঙ্গীতকে যেমন বৈচিত্র্যময় করেছে, তেমনি দেখিয়েছে তাঁর অসাধারণ বহুমুখী প্রতিভা—যিনি একদিকে অগ্নিবীণা হাতে প্রতিবাদগীতি রচনা করতে পারেন, অন্যদিকে আবার মজার ছলে হালকা হাসির গান লিখেও শ্রোতার মন জয় করতে পারেন। তাঁর হাসির গানগুলো বাঙালির স্বভাবজাত রসবোধ, সহজ-সরল জীবনযাপন, ছোটখাটো আনন্দ–বেদনার রূপকে অত্যন্ত প্রাণোচ্ছলভাবে ফুটিয়ে তোলে। ফলে এই গানগুলি বাংলা গানের ঐতিহ্যে শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়; বরং একটি সাংস্কৃতিক সম্পদ, যা আজও একইভাবে তরতাজা, প্রাণময় এবং শ্রোতাপ্রিয়।
