নজরুলের বিদ্রোহী সত্ত্বার পরিচয় : নজরুল আবির্ভূত হয়েছিলেন এক ঐতিহাসিক যুগ-সন্ধিক্ষণে। ব্রিটিশ যুগে পরাধীন ভারত ও নিপীড়িত বাংলার মর্মবেদনা তাঁর সংবেদনশীল কবিহৃদয়ে সৃষ্টি করেছিল সহমর্মিতা ও আবেগ-আলোড়ন।

নজরুলের বিদ্রোহী সত্ত্বার পরিচয় । নজরুলের ভাবনা
শৈশবেই পিতা-মাতার স্নেহবঞ্চিত ও দরিদ্রপীড়িত জীবনে অভিজ্ঞতা, কৈশোরের জীবন-সংগ্রাম এবং পরবর্তীকালের সৈনিক জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা নজরুলের রোমান্টিক ও স্পর্শকাতর মনে জাগিয়ে তুলেছিল প্রেম-ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা ও অনুভূতি, স্বপ্ন ও সৌন্দর্যবোধ এবং জন্ম দিয়েছিল সংগ্রামী চেতনা।
বস্তুত, এই পটভূমি এবং মানস প্রবণতার কারণেই নজরুলের রচনার প্রকৃতি, প্রেম, স্বপ্ন ও সৌন্দর্যবোধ, সুখ-দুঃখের অনুভূতি, আর্তি- আকুলতা এবং রোমান্টিক হাহাকার ব্যাত্ময় হয়েছে আবার পাশাপাশি দীপ্ত হয়েছে সমাজ ও দেশ-চৈতন্যের পরিচয়। নজরুল বলেছেন-
“আমি শুধু সুন্দরের হাতে বীণা, পায়ে পদ্মফুলই দেখিনি তাঁর চোখে চোখভরা জলও দেখেছি, শ্মশানের পথে, গোরস্থানের পথে তাঁকে ক্ষুধাজীর্ণ মূর্তিতে, ব্যথিত পায়ে চলে যেতে দেখেছি, যুদ্ধভূমিতে তাঁকে দেখেছি; কারাগারের তাঁকে দেখেছি। ফাঁসির মঞ্চেও তাঁকে দেখেছি, আমার গান সেই সুন্দরকে রূপে রূপে অপরূপ দেখার স্তবস্তুতি”।’

রাজনৈতিক বক্তব্যের শিল্পসম্মত কাব্য রূপায়ণ ঘটিয়ে, মানব-মুক্তির বাণী উচ্চারণ করে গভীরতর অর্থে বিদ্রোহের লক্ষণই প্রতিফলিত করেছেন। রবীন্দ্রযুগের কবিদের মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত মানবিকতা ও মানুষের সাম্যের গান গেয়েছেন, নিপীড়িতের স্বপক্ষে বাণী উচ্চারণ করেছেন। দুঃখবাদী কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের রচনায়ও চাপা বিদ্রোহ ব্যঙ্গ ধ্বনিত হয়েছে, কিন্তু এঁদের রচনায় ঠিক বিদ্রোহের সুর ধ্বনিত হয়নি, যা নজরুলের কণ্ঠে বলিষ্ঠভাবে উচ্চারিত।
বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহের সুর নতুন নয়, এবং যুগে যুগে বিদ্রোহী চেতনামূলক কবিতা নানাভাবে ও ভাষায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রচিত হলেও, নজরুলের মতো বিদ্রোহী শিরোনামে কোনো কবিতা এর আগে কেউ রচনা করেছেন কি? বাংলা সাহিত্যের কোনো কবি কি শির উঁচু করে এমন স্পর্ধিত ঘোষণায় বলেছেন :
বল বীর
বল উন্নত মম শির।
শির নেহারী, আমারই নত শির শিখর হিমাদ্রির।
মনের রাখা দরকার, নজরুল ভাবে, ভাষায় ও ছন্দে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কবিতা লিখে পাঠক ও সুধী সমালোচক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন এবং অভিনন্দন লাভেও সক্ষম হয়েছিলেন। বিদ্রোহী রচনা ও প্রকাশের অনেক আগেই তাঁর ‘শাত- ইল-আরব’, ‘কোরবাণী’, ‘মহররম’, ‘খেয়াপারের তরণী’ প্রভৃতি বিখ্যাত কবিতা খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা এনে দিয়েছিল।

তবে, নজরুলের ‘বিদ্রোহী’র আত্মপ্রকাশ রবীন্দ্রোত্তর বাংলাকাব্যে সম্পূর্ণ নতুনত্ব নিয়ে আসে এবং ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বাংলা সাহিত্যে বহু প্রতিভাবান কবিই অনেক উন্নতমানের এবং জনপ্রিয় কবিতা লিখেছেন। সে-সব কবিতা পাঠক এবং সুধী সমালোচক মহলে, আলোচিত সমালোচিতও হয়েছে। কিন্তু নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার মতো এমন ব্যাপক আলোড়ন সম্ভবত আর কোনো কবিতাই সৃষ্টি করেনি।
প্রকাশের সাথে সাথে এমন আলোচিত-সমালোচিতও বোধ হয় হয়নি। একটি কবিতার প্রায় একই সময়ে একাধিক পত্রিকায় আত্মপ্রকাশ এবং বহু পত্রপত্রিকায় পুনর্মুদ্রণের ঘটনাও ‘বিদ্রোহী’ ছাড়া অন্য কোনো কবিতার ক্ষেত্রে ঘটেছে কিনা, বলা কঠিন।
নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার এমন জনপ্রিয়তা এবং আবেদনশীলতা শুধু এর বক্তব্য-বিষয়ের জন্য নয়, শিল্পরূপের উৎকর্ষ এবং প্রকাশের জন্যেও। প্রচলিত অর্থে যাকে বিদ্রোহের কবিতা কিংবা বিদ্রোহী মানষজাত শিল্পসৃষ্টি হিসেবে গণ্য করা হয় বাংলা কাব্যের ইতিহাসে তেমন কবি এবং কাব্যশিল্পের পরিচয় খুব একটা মেলে না।
উল্লেখযোগ্য যে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে কবিতায় বিদ্রোহের সুর ধ্বনিত করে একমাত্র ইসমাইল হোসেন সিরাজী এবং কাজী নজরুল ইসলামই কারাবরণ করেছিলেন, তাঁদের কাব্যগ্রন্থও বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। ইসমাইল হোসেন সিরাজীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নজরুল বলেছেন, ‘সিরাজী সাহেব ছিলেন আমার পিতৃতুল্য। তাঁহার সমগ্র জীবনই ছিল অনলপ্রবাহ। আমার রচনায় সেই অগ্নি- স্ফুলিঙ্গের প্রকাশ ।

যাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনচেতনা, তাঁর কাছে চেতনা, তাঁর কাছে সমাজ ও জীবন- নিরপেক্ষ সৌন্দর্য ও শিল্পসাধনা মুখ্য হতে পারে না এবং নজরুলের রচনায় তা হয়নি। বাঁশের বাঁশিকে নজরুল কখনো ফেলে দেননি সত্য, কিন্তু রণতূর্যকেই কখনো কখনো অধিক মূল্য দিয়েছেন।
স্বদেশ ও স্বজাতির এবং নির্যাতিত-নিপীড়িত, শোষিত বঞ্চিত মানুষের মর্মবেদনা তিনি তাঁর রচনায় নানারূপে বিধৃত করে জাতীয় চেতনা ও জাগরণী প্রেরণা সৃষ্টির, নিপীড়িত মানুষের নব উত্থানের উদ্দীপনা জাগানোর সামাজিক ও মানসিক দায়িত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি সাহিত্যকে ব্যবহার করেছেন হাতিয়াররূপে।
সেই হাতিয়ার কখনো ব্যবহৃত হয়েছে বিদেশী শাসনের বিরুদ্ধে, কখনো তা স্বদেশী শোষনের বিরুদ্ধে-সোচ্চার প্রতিবাদে। যেখানেই তিনি শোষণ, শাসন ও কুসংস্কার এবং গোড়ামীর আধিপত্য লক্ষ করেছেন, সেখানেই আঘাত হেনেছেন। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে—
মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না।
এমন বিদ্রোহী চেতনা এবং প্রত্যয়-দৃঢ়তার অধিকারী ও শিল্পনিপুণ ছিলেন বলেই গণচেতনামূলক রচনার মাধ্যমেও তিনি সারা দেশে জাগরণের বন্যা বইয়ে দিতে পেরেছিলেন। কাব্যবেত্তারা বলেন, বিশ্বাসে জোর না বাঁধলে বাকবন্ধন দৃঢ় হয় না। সাহিত্যের মাধ্যমে নজরুল সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন—এমন বিশ্বাস ছিল তাঁর সুদৃঢ় এবং এই কারণেই তাঁর বাক্যবন্ধনে জোর বেঁধেছিল বিদ্রোহের বাণীর।

