বাংলা সঙ্গীতের বিস্তৃত পরিসরে নজরুল সঙ্গীতের সুর বিভ্রান্তি আজ একটি বহুল আলোচিত ও সমালোচিত ইস্যু। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার ও গায়ক—অর্থাৎ তাঁর গান নিজস্ব সুর–রীতির সঙ্গে অন্তর্গতভাবে যুক্ত। তিনি যে প্রতিটি গানের সুর তৈরি করেছেন, তা কেবল বাণীর সঙ্গে নয়, গানের ভাব, আবেগ, ছন্দ এবং রাগ–তালের সঙ্গে সমন্বিত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁর রচিত গান বিভিন্ন সুরকার ও শিল্পীর স্বেচ্ছাচারী সুরের কারণে নানাভাবে বিকৃত হতে থাকে। তাঁর জীবদ্দশায় সুরারোপ হয়েছে তাঁরই অনুমোদন সাপেক্ষে; সেই সুর নিয়ে কোনও অসঙ্গতি বা ত্রুটি ছিল না। কিন্তু নজরুল অসুস্থ হওয়ার পরে বহু সুরকার নিজ নিজ মত অনুযায়ী তাঁর গানে সুর বসাতে শুরু করেন। ফলে একই গান ভিন্ন ভিন্ন সুরে গাওয়া হতে থাকে এবং শ্রোতাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়—কোনটি আসল নজরুল সঙ্গীত এবং কোনটি পরবর্তী রূপ, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।

নজরুল সঙ্গীতের সুর বিভ্রান্তি । নজরুলের ভাবনা
এই সুর বিভ্রান্তির আরেকটি কারণ হলো—নজরুল রেকর্ডিংয়ের সময় বাণীর শব্দ কখনো কখনো নিজেই পরিবর্তন করতেন। তিনি শিল্পীকে সামনে বসিয়ে নিজের পছন্দমতো উচ্চারণ, ছন্দ কিংবা সুরের সার্থকতার জন্য সামান্য পরিবর্তন আনতে দ্বিধা করতেন না। ফলে মূল পাণ্ডুলিপি ও রেকর্ডকৃত গানের মধ্যে মাঝে মাঝে পার্থক্য দেখা যায়। কিন্তু নজরুলের নিজস্ব সম্পাদনাকেই যদি আমরা তাঁর গানের সত্যরূপ ধরি, তবে বর্তমানের অনেক শিল্পী ও সুরকার যে বাণী পরিবর্তন করছেন, তা এক ধরনের অশ্রদ্ধা—যা তাঁর সৃষ্টিকে বিকৃত করছে। তাঁদের অনেকেই দাবি করেন, নজরুলের গান গাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপ্তির স্বাধীনতা আছে, তবে এই স্বাধীনতা কখনোই মূল কাঠামো এবং সুররূপকে ধ্বংস করার অজুহাত হতে পারে না।

নজরুল সঙ্গীতের সংরক্ষণে একটি স্থায়ী কাঠামো বা “বোর্ড” থাকা উচিত—এ কথা বহুদিন ধরেই বলা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বোর্ডে কারা থাকবেন? কে সিদ্ধান্ত নেবেন কোন সুর সঠিক বা কোন রীতি গ্রহণযোগ্য? নজরুলের জীবদ্দশায় তাঁর সান্নিধ্যে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা অনেকেই নিজেদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে দাবি করেন যে তাঁরাই প্রকৃত ব্যাখ্যাতা। কিন্তু বয়সজনিত কারণে তাঁদের বক্তব্যেও মাঝে মাঝে পরস্পরবিরোধিতা দেখা যায়, যা গ্রহণ করা কঠিন হয়ে উঠে।
ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, নজরুল সুস্থ থাকাকালীন তাঁর গানের তিনটি স্বরলিপির গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল—১৩৩৮ বঙ্গাব্দে ‘নজরুল স্বরলিপি’, ১৩৪১ সালের আশ্বিনে ‘সুর–মুকুর’, এবং তার আগের মাসেই ‘সুরলিপি’। এগুলো তাঁর সঙ্গীত–সৃষ্টির সবচেয়ে প্রামাণ্য নথি। পরবর্তীতে জগৎ ঘটক, নিতাই ঘটক, কমল দাশগুপ্ত, মনোরঞ্জন সেন—যাঁরা নজরুলের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেছেন—তাঁরাও তাঁদের সংগৃহীত তথ্য ও স্বরলিপি পরিমার্জন করে প্রকাশ করেন। কিন্তু এতগুলো সূত্র থাকার ফলে কোনটি চূড়ান্তভাবে গ্রহণযোগ্য তা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যায়।
আজকের দিনে অধিকাংশ শিল্পী স্বরলিপি দেখে নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করেন—এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু স্বরলিপি থাকলেও গায়করা ব্যক্তিগত শৈলী, অলঙ্করণ বা রাগ–তাল পরিবর্তন করেন, ফলে মূল সুররূপ বিকৃত হয়। নজরুলের গান অবশ্যই গায়কের অনুভূতিতে প্রাণ পায়, কিন্তু সুরের কাঠামো ভেঙে দিলে গানটি আর তার মৌল রূপে থাকে না। স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচার নয়—নজরুল সঙ্গীতের ক্ষেত্রে এই সত্য আরও স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নজরুল সঙ্গীতের “সুর বিভ্রান্তি” আসলে সংরক্ষণব্যবস্থার অভাব, একাধিক সুর–ব্যাখ্যার সংঘর্ষ এবং সঠিক কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতির ফল। নজরুল ছিলেন যুগান্তকারী সঙ্গীত–স্রষ্টা—তাঁর সুরকে রক্ষা করা মানে বাংলা সঙ্গীতের ঐতিহ্যকে রক্ষা করা। তাই প্রয়োজন নির্ভুল গবেষণা, মানসম্মত স্বরলিপি, একক কর্তৃপক্ষ এবং সতর্ক পরিবেশনা। নজরুল সঙ্গীতকে সঠিকভাবে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাঁর সুরকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ এবং যথাযথভাবে পরিবেশন—দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
