কাজী নজরুলের গানে মানব দর্শনের অবস্থানঃ কাজী নজরুল ইসলাম হলেন মানবতার কবি, সাম্যের কবি, প্রেমের কবি, মুক্তির কবি আরো কত কি। দরিদ্র পরিবারে জন্ম হলেও বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি রূপায়ণে নজরুলকে একজন দার্শনিকও বলা যায়। যার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর রচিত সঙ্গীত ভাণ্ডারে। মানবজীবনের বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্যকে তিনি সাঙ্গীতিক অবকাঠামোতে রূপায়িত করেছেন।

কাজী নজরুলের গানে মানব দর্শনর অবস্থান
জীবনের প্রেম, অনুভূতি, আবেগ, পূর্ণতা, অপূর্ণতা সবকিছুকে তিনি বানীবদ্ধ করেছেন সুরের বাঁধনে। দর্শনের দৃষ্টিতে জীবনের সকল বৈশিষ্ট্যই নজরুলের গানে বিদ্যমান। পরাধীনতার শৃঙ্খল হতে ভারতীয় উপমহাদেশের জনগণের মুক্তি প্রশ্নে নজরুল বাণীবদ্ধ করেছেন বিদ্রোহী ভাবাত্মক গান।
যে গানের বাণীতে অগ্নিশ্রাবী শব্দের গাঁথুনি রযেছে, রয়েছে সকল জাতি ভেদ ভুলে একই পতাকাতলে সমবেত হবার আহ্বান। এ পর্যায়ের গানের মধ্যে রয়েছে উদ্দীপনামূলক গান, নারীজাগরণের গান, সাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতির গান ইত্যাদি। নজরুলের সঙ্গীত প্রতিভা বিরল, তাইতো তার গান বাংলা গানের সর্বক্ষেত্রেই বিরাজমান। তাঁর গানে দর্শনের মূল ধারা দুটি ১টি জাগ্রতিক প্রেমের উপাখ্যান এবং অন্যটি আধ্যাত্মিক উপাসনা মাত্র।
ধর্মীয় বিষয়ভিত্তিক সঙ্গীত রচনার ক্ষেত্রে নজরুল সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। সনাতন ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে রয়েছে-শ্যামা, আগমনী, ভক্তিমূলক ভজন- কীর্তন প্রভৃতি গান। এ ছাড়া ইসলাম ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে নজরুলের রচনায় রয়েছে। হামদ, নাত, রমজান, মক্কা, মদিনা প্রভৃতি বিষয়ক গান।

ধর্মীয় উপাখ্যানে মানবীয় যে সকল আধ্যাত্মিক বিষয় রয়েছে তার সবই নজরুলের ধর্মবিষয়ক গানে স্থান পেয়েছে। নজরুল নিজে কালী সাধক ছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় যেহেতু সাধক শব্দটির ব্যাপ্তি এবং এর গতিপ্রকৃতি তিনি তাঁর গানে রূপায়িত করেছেন। তাঁর গানের বাণী বিন্যাসে রয়েছে ছন্দবদ্ধ প্রক্রিয়া যা চর্যাপদ অনুসরণীয়। চর্যাপদের পদকাররাও মানবদর্শনকে শ্রেষ্ঠ রূপ দিয়েছেন তাঁদের পদরচনায়।
কাজী নজরুলের সঙ্গীতে মানবদর্শন প্রতিফলিত হবার মূল কারণ হলো তিনি সর্বশ্রেণীর মানুষের জন্যে গান রচনা করেছেন তাইতো তিনি জনগনের কবি হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁর রচিত গানের মধ্য রয়েছে রাগপ্রধান, কাব্যগীতি, ভজন, কীর্তন, দেশাত্মবোধক, লোকসঙ্গীত, গজল, উদ্দীপনামূলক, শ্রমিকের গান, ঝুমুর গান, সাঁওতালী প্রভৃতি পর্যায়ের গান। মানুষের সকল কাজে মনের মাঝে তারই স্বাক্ষর রেখেছেন কাজী নজরুল।

যেমন –“কারার ঐ লৌহ কপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট” এগানটি সম্পর্কে অনেকেই একমত পোষণ করেন যে গানটি জেলে বসে লেখা। আসলে এ গানটি নজরুল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের বাংলার কথা প্রতিকার জন্য লিখেছিলেন। এ গানটির দর্শনতত্তে যা আলোকপাত করা হয়েছে তা হলো ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ পরাধীনতার শৃঙ্খল হতে মুক্তি চায়। মুক্তিকামী মানুষের মানবিক জাগ্রত চেতনাকেই নজরুল সুরসংযোজনে বাণীবদ্ধ করেছেন।

ঠিক তেমনি -“আরো কতদিন বাকি” এ গানটি কাব্যগীতি । এ গানের দুটি দিক একটি জাগতিক প্রেমের উপাখ্যান এবং অন্যটি আধ্যাত্মিক। দুটি ধারাই মানবদর্শনের রূপরেখা। “আরো কত দিন বাকি তোমাকে পাওয়ার আগে বুঝি হায় নিভে যায় নিভে যায় মোর আঁখি।” এ বাক্যটি স্বয়ং প্রভুকে উদ্দেশ্য করেও বলা যায়। তিনিই মানুষের সবচাইতে আপন। এ ছাড়া প্রেমিকাকে উদ্দেশ্য করেও বলা যায়। দুটি রূপকেই মানব দর্শনের অংশ বলা চলে ।
এ ছাড়া ভক্তিমূলক, ভজন, কীর্তন, ইসলামিক প্রভৃতি গানেতো সৃষ্টি কর্তার আরধনার কথাই বর্নিত হয়েছে যেমন-জগতের নাথ কর পার, আল্লাহকে যে পাইত চায়, কি দিয়ে পূজিব ভগবান, প্রভৃতি গান। অতএব নজরুলের গানে মানব দর্শনের সার্বিক অবস্থান নান্দকিভাবেই বর্ণিত আছে। যা থেকে আমরা পেতে পারি জীবনের গতিপ্রকৃতি ।

