শাস্ত্রীয় টপ্পা ও কাজী নজরুল ইসলাম এর টপ্পা সম্পর্কিত আলোচনা । নজরুলের ভাবনা

শাস্ত্রীয় টপ্পা ও কাজী নজরুল ইসলাম এর টপ্পা সম্পর্কিত আলোচনা : টপ্পা পর্যায়ের গান ভারতীয় উপমহাদেশের বিশেষ ধারার একটি বিশেষ গীতিরীতি। শাস্ত্রীয় টপ্পার বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্যে নজরুলের টপ্পা রচিত। বাংলা গানের বিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলা টপ্পা সংযোজন একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আমরা আলোচনার ভিত্তিতে শাস্ত্রীয় টপ্পা ও কাজী নজরুলের টপ্পার সঠিক তথ্য পাবার চেষ্টা করব। প্রকৃতপক্ষে টপ্পা একটি বিশেষ গায়ন পদ্ধতি। ধ্রুপদ ও খেয়াল অপেক্ষা সংক্ষেপতর গানকে মূলত টপ্পা বলে ।

 

শাস্ত্রীয় টপ্পা ও কাজী নজরুল ইসলাম এর টপ্পা সম্পর্কিত আলোচনা

 

শাস্ত্রীয় টপ্পা ও কাজী নজরুল ইসলাম এর টপ্পা সম্পর্কিত আলোচনা । নজরুলের ভাবনা

উৎপত্তি :

১৭৪২ সালে গোলাম রাসুল এর পুত্র গোলামনবী টপ্পা গানের প্রবর্তন করেন। টপ্পা গান প্রথমে পাঞ্জাবে উৎপত্তি হয়েছিল, এটি ছিল পাঞ্জাবের প্রসিদ্ধগীতরীতি, এটি অবশ্য বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে পাওয়া যায়। “টপ্পাগান মূলত উট চালকদের মুখে মুখে অর্থাৎ মৌখিক সঙ্গীত হিসাবে পাঞ্জাবে প্রচলিত ছিল।” পরবর্তীতে বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য লক্ষ করে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি অংশ হিসাবে টপ্পাগান আত্মপ্রকাশ করে।

নিধুবাবু ও বাঙলা টপ্পা :

নিধু বাবু ১৭৪১ সালে হুগলী জেলার চাঁপতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা-হরিনারায়ণ গুপ্ত। শাস্ত্রীয় টপ্পার আদলে প্রথম তিনিই টপ্পা পর্যায়ের গান রচনা করেছিলেন। তাঁর গানের সংখ্যাও অনেক। প্রায় ছয়শতটি। তাঁর প্রথম রচনা হলো :

“নানান দেশের নানা ভাষা”
তাল : ত্রিতাল
রাগ: খাম্বাজ

 

শাস্ত্রীয় টপ্পা ও কাজী নজরুল ইসলাম এর টপ্পা সম্পর্কিত আলোচনা

 

শ্রীধর কথক ও বাঙলা টপ্পা :

নিধুবাবুর পরবর্তীতে বাঙলা টপ্পায় মননিবেশ করেন শ্রীধর কথক। অবশ্য, তার নাম ডাক ততটা সফলতা অর্জনে সক্ষম হয়নি। যেমন :

“নয়নে চাহিয়া কেন চল বারে বারে।”
রাগ : দেবগান্ধার
তাল : ত্রিতাল

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বাংলা টপ্পা :

বাংলা টপ্পার সঠিক রূপায়ণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা যাঁরা রচনা করেছেন তাঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তথা রবীন্দনাথ বাংলা গানকে টপ্পা অঙ্গের গানে বেশ প্রভাবিত করেছে। যেমন :

“সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে”
রাগ : মিশ্র ভৈরবী (বৈতালিক)

 

শাস্ত্রীয় টপ্পা ও কাজী নজরুল ইসলাম এর টপ্পা সম্পর্কিত আলোচনা

 

কাজী নজরুল ও বাংলা টপ্পা :

টপ্পা রচনার ক্ষেত্রে সর্বশেষ রচিয়তা কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি তাঁর টপ্পা রচনার ক্ষেত্রে প্রতিটি গানই তালে নিবদ্ধভাবে বিন্যাসিত করেন। আধুনিক গীতিরীতির বৈশিষ্ট্যে তাঁর টপ্পা রচিত। গায়ন শৈলী, সুরবিন্যাস, সার্বিকভাবে নিধুবাবু ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের টপ্পার অনুকরণীয়।

নজরুল সৃষ্ট টপ্পা সম্পর্কিত মতবাদ :

নজরুলের টপ্পার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাল সংযোগে পরিবেশিত হওয়া। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর টপ্পাগানের বিস্তৃতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন,

“আমি ছয়টি পর্যায়ের গান বিভক্তি হিসাবে সৃষ্টি করেই গিয়েছি বটে কিন্তু নজরুল শুধুমাত্র শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে গিয়েই টপ্পা গান সৃষ্টি করেছিলেন”

তথ্যসংগ্রহ : “বাংলাগানের চারদিগন্ত”
লেখক : সুধীর কুমার দত্ত

নজরুলের টপ্পার বৈশিষ্ট্য :

১. বাণী ও সুরের অপূর্ব সম্মিলন।
২. সব ধরনের টপ্পাই তালে নিবদ্ধ
৩. রাগ রূপায়ণে সঠিক অবস্থান নির্ণয়।
৪. নজরুলের টপ্পা পরিবেশনে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে পারদর্শিতা লক্ষ্যণীয়।
৫. বিষয়ভিত্তিক বর্ণনায় বাক্য ও শব্দের অলংকারিক দিক উপস্থাপন ।
৬. বাংলা গানের বিবর্তনে নজরুলের টপ্পার প্রবাব লক্ষ্যণীয়।
৭. তাল হিসাবে যৎ, সুরফাঁক এর ব্যবহার প্রচলিত।
৮. রাগের ব্যবহারে দেশ-খাম্বাজ, গারা-খাম্বাজ, তিলোক-কামোদ, বাঁরোয়া ইত্যাদির প্রয়োগ দেখা যায় ।
৯. যন্ত্র হিসাবে লঘু সঙ্গীতে ব্যবহৃত যন্ত্রগুলিই প্রচলিত ।
১০. অবয়ব হিসাবে কখনও স্থায়ী, অন্তরা এবং কখনও স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগের অবস্থান লক্ষ্যনীয়।

উৎস :

নজরুল সৃষ্ট টপ্পা রচনার প্রেক্ষাপটে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভূমিকা লক্ষ করা যায়। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ধারার একটি পর্যায়ক্রমিক রচনা নজরুলের টপ্পা। প্রেক্ষাপটের দিক দিয়ে ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল ও ঠুমরী অঙ্গের গান টপ্পা রচনা ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করছে।

 

শাস্ত্রীয় টপ্পা ও কাজী নজরুল ইসলাম এর টপ্পা সম্পর্কিত আলোচনা

 

সুরের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ :

রাগ নির্ভর রচনা হবার কারণে সুরের চলন, রাগের শাস্ত্রীয় চলন অনুসারেই রচিত। সুরের বৈচিত্র্যের কারণে রাগের শাস্ত্রীয় অবস্থান থেকে সরে গিয়ে গানের নান্দনিক দিক লক্ষ করে তিনি রাগ বহির্ভূত স্বর ব্যবহার করেছেন।

যেমন : দিও বর হে স্বামী
টপ্পার ভাবার্থ : এখানে টপ্পার ভাবার্থ দেয়া হলো :
“যাহা কিছু মম আছে প্রিয়তম
সকলি নিও হে স্বামী
যত সাধ আশা প্রীতি ভালোবাসা
সঁপিনু চরনে আমি”

এ টপ্পাটি স্বাভাবিকভাবে আধ্যাত্মিকতায় পরিপূর্ণ। কবি নজরুল এখানে হে স্বামী বলতে সৃষ্টিকর্তাকে বুঝিয়েছেন। ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তাঁর চরণে সবকিছু আপন করবার অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। পৃথিবীর সকল আশা ভালোবাসা অর্থহীন এবং অপরিপক্ক।

দিবস যামী শুধু পরম করুণাময়ের আবেশে নিজেকে নিয়োজিত রাখা প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেন মায়ার আচ্ছন্ন এই ধরার সবাই পুতুল খেলার সম, নিজেকে কিছু সময়ের জন্য ভুলিয়ে রাখা যে অবহেলায় “হে প্রভু তোমাকে আমি ভুলে আছি, আমি তোমার দূয়ারে থামি, আমার সকল আকুতি তোমার চরণে নিবেদন করেছি, হে স্বামী তুমি আমাকে এ মহাকাল থেকে পরিত্রান কর” ।

 

শাস্ত্রীয় টপ্পা ও কাজী নজরুল ইসলাম এর টপ্পা সম্পর্কিত আলোচনা

 

দর্শনতাত্ত্বিক আলোচনা :

দর্শনতাত্ত্বিক আলোচনার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নজরুলের রচনাকালীন অবস্থানকে বোঝানো হয়েছে। মৌলিক সঙ্গীত রচনা, সুর এবং বাণীর বিভক্তির ক্ষেত্রে তার অনুভূতি টপ্পা রচনার ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক প্রতিফলন ঘটিয়েছে। জাগতিক ভাবধারার প্রভাব নজরুল সৃষ্ট টপ্পায় অনুপস্থিত বলে ধরে নেয়া যায়। মূলত আধ্যাত্মিক বাণীতে সাঙ্গীতিক উপকরণ শুধুমাত্র পরিবেশনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়েছে বলে তা দর্শনতাত্বিক ধারায় প্রকাশ পেয়েছে।

ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র :

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ব্যবহৃত বাদ্য যন্ত্রে ও নজরুলের টপ্পায় ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রে কিছুটা পার্থক্য লক্ষ্যণীয়। শাস্ত্রীয় টপ্পার ক্ষেত্রে তানপুরা, সুরমণ্ডল, হারমোনিয়াম, তবলা, ব্যবহৃত হয় তবে, নজরুল সৃষ্ট টপ্পায় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার লঘু প্রকৃতির ।

অবয়ব প্রসঙ্গ :

শাস্ত্রীয় টপ্পা ও নজরুল সৃষ্ট টপ্পা সর্বক্ষেত্রেই স্থায়ী অন্তরা, সঞ্চারী, আভোগ এবং স্থায়ী ও অন্তরার (একাদিক) সমন্বয় দেখা যায় ।

ব্যবহৃত রাগ-রাগিনী :

কাজী নজরুল তাঁর টপ্পা পর্যায়ের গানে যে-সব রাগের ব্যবহার করেছেন তার মধ্যে সিন্ধু-ভৈরবী, জয়জয়ন্তি, বাঁরোয়া, মান্দ-মিশ্র ইত্যাদির ব্যবহার দেখা যায় ।

তালের ব্যবহার :

নজরুলের টপ্পা গানে যত্তালের ব্যবহারই বেশি করেছেন। এ ছাড়াও মধ্যমান ও চৌতালের ব্যবহার দেখা যায় ।

 

google news logo

 

গীতিশৈলী :

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের টপ্পা ও নজরুলের টপ্পা পরিবেশনা সম্পূর্ণ ভীন্নধর্মী অবস্থানে। কারণ, শাস্ত্রীয় টপ্পা হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ধারার একটি। নজরুলের টপ্পা রচনার আঙ্গিক বহুমুখী হলেও ইহা লঘু প্রকৃতির তাই দুটির পরিবেশনা ভীন্নতর প্রায় ৷

উপসংহার :

উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে, কাজী নজরুল সৃষ্ট টপ্পা সাঙ্গিতিক অবস্থানে যথেষ্ট অবদান রেখেছে। এটির গায়ন পদ্ধতি তালে নিবন্ধের কারণে সহজতর নয় তাই সাধারণভাবে সমাদ্রিত। তবে, নজরুলপ্রেমিক, নজরুলসঙ্গীত। শিল্পী ও নজরুলসঙ্গীত শিক্ষার্থী, গবেষকদের কাছে এর মূল্য গানকে করেছে সমৃদ্ধ এবং নজরুল রচনাকে সার্থক করেছে।

Leave a Comment