কাজী নজরুল ইসলাম বাংলার ইসলামী সংগীতে দিয়েছেন নতুন প্রাণ নতুন সুর। তাঁর লেখা সংগীত ছাড়া বাংলা ভাষায় ইসলামী সংগীত ভাবাই যায় না। তাঁর সমসাময়িককালে কবি গোলাম মোস্তফা ও অন্যান্য দু’-একজন কবি ইসলামী সংগীত লিখলেও কাজী নজরুলই ইসলামী সংগীতের ভান্ডারকে কানায় কানায় পূর্ণ করেছেন। যা আজ ও আগামী প্রজন্মের জন্য নক্ষত্রের উজ্জ্বলতায় জ্বলজ্বল করবে নি:সন্দেহে।

নজরুলের ইসলামী গানের বৈচিত্র্য । নজরুলের ভাবনা
নজরুলের ইসলামী গানের বৈচিত্র্যতা নিম্নরূপ :
হামদ :
আল্লাহর গুনাবলি রচনায় রচিত গীতিরীতিকে হামদ বলা হয়। প্রবাদ পুরুষ নজরুল ইসলাম এই পর্যায়ের গীতিরীতির সার্থক রচনাকার।
যেমন “রোজ হাশরে আল্লাহ আমার”।
গ্রন্থ “আব্বাস উদ্দীনের গান”।
স্বরলিপি – নজরুল স্বরলিপি, ৪র্থ খণ্ড।
রেকর্ড ? ১৩৪৩৪
শিল্পী আব্বাস উদ্দীন, তাল কাহারবা

নাথ :
এ পর্যায়ের গান মূলত নবী বিষয়ক সঙ্গীত। পৃথক সঙ্গীত রচনার ক্ষেত্রে ইসলামিক ভাবধারার নজরুলের নাথ ইসলাম ধর্মের মানবিক দিককে প্রভাবিত করেছে। যথা: “নাম মোহাম্মদ বলবে মন” ।
গ্রন্থ “হামদ ও নাথ”
স্বরলিপি : নজরুল স্বরলিপি ৩য় খণ্ড,
শিল্পী আব্বাস উদ্দীন, সুরকার কমল দাসগুপ্ত,
রেকর্ড ? ৪৭১৫
তাল : কাহারবা ।
আবির্ভাব :
আবির্ভাব শব্দটি মূলত আগমনি বার্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ইসলাম ধর্মের বিষয়ভিত্তিক বর্ণনায় কাজী নজরুল তার অভ্যন্তরীণ বহির্বিন্যাসে আগমনী সঙ্গীত রচনা করেন।
(১) “আমিনার কোলে নাচে হেলেদুলে”।
গ্রন্থ নজরুল গীতি অখত
প্রকাশকাল : আগস্ট ১৯৩৮।
রেকর্ড নং ১২৪৯৫ সিরাজুর রহমান।
ভাল কাহরবা।

তিরোভাব :
বিরোভাব শব্দটির আভিধানিক অর্থ এসে পুনরায় ফিরে যাবার ইতিকথা। তেমনি বাক্য, বিষয় সংযোজনের মাধ্যমে এ শব্দের মূলভাব তথা ইসলাম ধর্মকে প্রভাবিত করে নজরুল রচনায় স্থান পেয়েছে তিরোভাব পর্যায়ের ইসলামিক গান।
(১) “যেওনা যেওনা মদিনা দুলাল”।
গ্রন্থ নজরুল গীতি অখণ্ড।
রেকর্ড নং । ৪৮৮৪ ।
প্রকাশকাল মে ১৯৩৭
সুরকার: সুবল দাস গুপ্ত।
শিল্পী আব্দুল লতিফ আন্ড পার্টি 1
নবী মহিমা :
নাথ পর্যায়ের গানের বাহিরেও নজরুল নবীর মহিমা বর্ণনায় কিছু ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের গান রচনা করেছেন যা ইসলামী গানের বৈচিত্র্যতা এবং ইসলাম ধর্মকে করেছে সমৃদ্ধ । যেমন : “ইয়া মোহাম্মদ বেহেস্ত হতে” ।
গ্রন্থ। নজরুল গীতি ৩য় খণ্ড কোলকাতা।
প্রকাশ কাল ১৯৪০।
রেকর্ড নং- ঋ ১৩৪৩৪
তাল কাহারবা ।

আল্লাহ-রাসুল:
আল্লাহ-রাসুল পর্যায়ের গান ইসলামী গানের ভীন্ন বৈচিত্র্য বহন করে। নজরুল আল্লাহ এবং রাসুলের বিষয়কে একত্রিকরণের মাধ্যমে একটি ভিন্নতর বৈশিষ্ট্যের গান রচনা করেছিলেন। (১) “আল্লাহকে যে পাইতে চায় হযরতকে ভালবেসে” ।
গ্রন্থ আব্বাস উদ্দীনের গান।
সুরলিপি নজরুল সুরলিপি ৪র্থ খণ্ড।
রেকর্ড নং যা ১৩৬৪৭।
সুরকার : চিত্ত রায়।
শিল্পী আব্বাস উদ্দিন।
তাল কাহারবা ।
ঈদ :
ঈদ মূলত ইসলাম ধর্মাবলম্বি মানুষের একটি পূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান। ইসলামিক গানের বৈচিত্র্যতার ক্ষেত্রে এ পর্যায়ের গান অবিস্মরণীয়। ঈদকে প্রধান্য নিয়ে নজরুল রচিত ইসলামিক গান সার্থকভাবে ঐশ্বর্যমণ্ডিত এবং গীতিময়। (১) “ঈদ মোবারক ঈদ মোবারক”।
গ্রন্থ : আব্বাস উদ্দীনের গান।
রেকর্ড নয় – ১২২১।
প্রকাশ কাল ১৯৪১।
স্বরলিপি : স্বরধ্বনি।
শিল্পী : আব্বাস উদ্দীন
তাল: কাহারবা।

রমযান :
রমযান ইসলাম ধর্মের একটি পবিত্রতম মাস। মানবিক ভক্তিসাধন এবং তা আল্লাহর কাছে পৌঁছে দেয়ার ব্যাপ্তি এই ৩০ টি দিনে পরিমার্জিত রূপে প্রকাশ পায়। সে বিষয়েও নজরুলের ইসলামী গান রচনায় ব্যাপকতা পেয়েছে। যথা “যাবার বেলা সালাম লহ হে রমযান”।
গ্রন্থ আব্বাস উদ্দীনের গান,
স্বরলিপি নজরুল সুরলিপি। ৪র্থ খণ্ড।
রেকর্ড: ৭৪৪৮।
শিল্পী : আব্বাস উদ্দীন।
আযান, মসজিদ, নামাজ:
নামাজ, আযান এবং মসজিদ এই ৩টি শব্দ ইসলাম ধর্মের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নামাজ, মসজিদ, এবং আযানের আভিধানিক অর্থ এবং মানব জীবনে এর প্রয়োগ সম্পর্কে মোটামুটিভাবে সবারই জানা। মহা পবিত্র মসজিন এবং তা থেকে প্রেরিত আযানের ধ্বনি সার্বিকভাবে সবাইকে বিমোহিত করে। (১) “হে নামাজি আমার ঘড়ে”।
গ্রন্থ নজরুল গীতি অখণ্ড।
স্বরলিপি – নজরুল
স্বরলিপি ৬ষ্ঠ খণ্ড।
রেকর্ড নং – ৪২১৬।
শিল্পী : আব্বাস উদ্দীন।
তাল : কাহারবা।

মহররম:
মহররম বিষয়ক গানের বিষয়বস্তু মূলত কারবালার প্রান্তরে হাসান হোসেনের মৃত্যুগীতি সম্পর্কিত। ইসলামিক গানের সকল বিষয় উপস্থাপন করতে গিয়ে কাজী নজরুল এই পর্যায়ের গান রচনায়ও মনোনিবেশ করেন। নজরুল এই পর্যায়ের গানগুলিকে মর্সিয়া হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। (১) “ওগো মা ফাতেমা ছুটে আয়” ।
গ্রন্থ । আব্বাস উদ্দীনের গান।
প্রকাশ কাল : এপ্রিল ১৯৩৬
রেকর্ড নয় – ৪৩২৮।
শিল্পী আব্বাস উদ্দীন।
আরব, মক্কা, মদিনা:
ইসলামী গানের বিষয় ও বৈচিত্র্যতার কারণে আরব, মক্কা ও মদিনাকে প্রাধান্য দিয়ে কাজী নজরুল তাঁর রচনাকে সার্থক করেছেন। যে গানগুলিতে স্থান পেয়েছে আরবের সৌন্দর্যময় দিকগুলো। মক্কা ও মনিদার কথা। যাতে করে ইসলাম ধর্মের বাইরের মানুগুলো পেয়েছে ইসলামী গান গাইবার সুযোগ, (১) “আমি যদি আবর হতাম মদিনারই পথ”।
গ্রন্থ : বুলবুল (পৌষ ১৩৩৪)
স্বরলিপি : নজরুল স্বরলিপি ৪র্থ খণ্ড।
তাল : কাহাররা।
রেকর্ড নং ৯৮৫৬।
শিল্পা সকিনা বেগম সুর কমল দাস।
উপসংহার:
বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য উপস্থাপন প্রক্রিয়ার প্রেক্ষিতে এটা প্রমাণিক যে নজরুল রচিত ইসলামী গানগুলো রচনার ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক ধারাবাহিকতা প্রভাবিত। যেখানে বী ও সুরের গাঁথুনি তাঁর ইসলামী গানগুলোকে করেছে নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ।

