কাজী নজরুল ইসলাম ও কুমিল্লা : ১৯২১-এর মার্চ/এপ্রিলের মাঝামাঝি ১৩২৭-এর চৈত্রে নজরুলকে চট্টগ্রাম মেলে চড়িয়ে আলী আকবর খান পাড়ি দিলেন কুমিল্লার পথে। আলী আকবরের অংকটা যেমন করে সাজানো হউক না কেন নজরুলের কাছে বাধ্যতামূলক কোনো শাসন ছিল না। চুম্বক লোহাকে, পুষ্পগন্ধ ভ্রমরকে তৃষ্ণা মেঘকে আকর্ষণ করবে নিখিল জুড়ে যেন তারই প্রস্তুতি।

কাজী নজরুল ইসলাম ও কুমিল্লা । নজরুলের ভাবনা
১৩২৮-এর বৈশাখ থেকে আষাঢ়ের ভিতর নজরুলের রচিত যে কয়টি কবিতা ছায়ানটে সংকলিত হয়েছে মনে হয় সে সবগুলিই মুকুলধরার আগমনী। ১৩২৮ বৈশাখে লেখা অবেলায়, অনাদৃতা, হারমানা হার, বিদায় বেলায়, জ্যৈষ্ঠ্যে লেখা শায়ক বেঁধা পাখি, হারামনি, মানসবধু, বিধুরা, পথিক প্রিয়া, আষাঢ়ে লেখা পরশপূজা, প্রভৃতি কবিতার অন্তরালে নিহিত কবির গোপন উদ্দেশ্য আবিষ্কার করা জীবনীকারের সাধ্যসাধন তত্ত্ব নয়।
মানুষবধু কবিতায় কবির রোমান্টিক ভাব প্রকাশ পেয়েছিল। অবশেষে সতেরই জুন ১৯২১ তেসরা আষাঢ় ১৩২৮ কবির বিবাহের দিন ধার্য করা হয় এবং সেই সংবাদবাহী পত্র পাঠানো হয় পরিচিত মহলে। এই বিবাহের নিমন্ত্রণ পত্রটি আলী আকবর খানের নামে মুদ্রিত হয়েছিল। কিন্তু মুজাফ্ফর আমহদ ঠিকই অনুমান করেছিলেন যে মুসাবিদা ছিল নজরুলেরই।

কুমিল্লা এসে নজরুল তার মানসিক স্থৈর্যে প্রত্যাবর্তন করতে বেশি সময় নেননি। বীরেন্দ্র কুমারের গৃহে তাঁর আনন্দঘন প্রতিষ্ঠাতা হয়েই গিয়েছিল। তখন সারাদেশে অসহযোগ আন্দোলনের তরঙ্গ আছড়ে পড়েছে। সেই উত্তেজনা কুমিল্লা শহরের নাগরিকদেরকেও চঞ্চল করে তুলল।
কাজী নজরুল ইসলাম দৈব- প্রৈরিতের মতো হয়ে দাঁড়ালেন তাঁদের সর্ব কর্মচিন্তা আনন্দের নেতা, নতুন পথসঙ্গীতে মাতিয়ে তুললেন নজরুল, ফিরে পেলেন তাঁর হতবল, সুপ্তপ্রতিভা, জনমোহন শক্তি, গণবিক্ষোভ, উদ্দীপনার শিল্পবুদ্ধি। কুমিল্লার প্রসঙ্গ নিয়ে দীর্ঘ প্রায় সাত-আট-দশক ধরে অনেক তথ্য সন্ধান গবেষণা ও সত্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা হয়েছে। এবং একাধিক মতবাদও গড়ে ওঠেছে।
নজরুল জীবনীকার আজহারউদ্দীন খান জানিয়েছেন, বিবাহবাসরে নজরুল বরবেশে উপস্থিত হলেন। কনে পর্দার আড়ালে রইলেন। বিবাহের উকিল ছিলেন নার্গিসের বড় মামা আলতাফ আলী খান, নজরুলের পক্ষে সাক্ষী ছিলেন সাদাত আলী মাস্টার, আর কনে পক্ষের সাক্ষী ছিলেন সৈয়দ আলী মাস্টার। ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের পরিবার ছাড়া বিবাহসভায় ছিলেন বঙ্গ রায় জমিদার রায় বাহাদুর রূপেদ্রলোচন মজুমদার, বাঙোঁরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অবনীমোহন মজুমদার।

দেন-মোহর ধার্য হয়েছিল পঁচিশ হাজার টাকা। ইসলামের বিধান মতে, আকদ হয়েছিল অথবা হয়নি এ বিষয়ে একটি বিতর্ক একালে গড়ে তোলা হয়েছে এবং ব্যক্তিগত অভিপ্রায়ানুযায়ী তার ব্যাখ্যা দেয়া চলছে আলী আকবর খানের মুসাবিদা করা কাবিন নামায় একটি শর্ত ছিল এই যে, নজরুল দৌলতপুর ছেড়ে নার্গিসকে অন্য কোথায় নিয়ে যেতে পারবেন না। এই শর্ত হঠাৎ নজরুলের গৌরবে ও আত্মমর্যাদায় ঘা দিয়ে তাঁকে এতদিনের অসহায় আত্মসমর্পনের জাড্য থেকে জাগিয়ে তুলল।
বিয়ের আসর থেকে উঠে এসে সকলকে হতভম্ব করে তিনি বিরজা সুন্দরীর কাছে এসে বললেন, ‘মা আমি এখন চলে যাচ্ছি, ইতিমধ্যে অসহযোগ আন্দোলনে সারাদেশে অশান্তি, গোলযোগে সংকট কর্মবিরতি ধর্মঘট বেড়ে চলছিল। ভারতব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল এই রাজনৈতিক অসন্তোষ। সারাদেশের মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। যদিও তার নীতি- আদর্শ উদ্দেশ্য সর্বদা স্পষ্ট ছিল না।

দৌলতপুরের বাঁধন ছিন্ন করে যখন নজরুল জুলাই মাসে কান্দির পাড়ে এসে কদিন ছিলেন, তখন যেন সদ্যসংঘটিত মানসিক ধসচিহ্ন ঢাকার জন্যেই কুমিল্লার রাজনৈতিক জীবনে জড়িয়ে পড়েছিল। লিখেছিলেন কয়েকটি দুর্ধর্ষ গণসঙ্গীত। কুমিল্লার তরুণ সম্প্রদায়ও মেতে উঠেছিলেন নজরুলকে নিয়ে। তাঁদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে নজরুল মিছিল করে গেয়ে বেড়িয়েছিলেন শৃঙ্খলিত কারাবন্দিদের উদ্দেশ্যে একটি অসামান্য অভিনন্দনগীত ।
“আজি রক্ত নিশিভোরে একী এ শুনি রে
বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার অগ্রহায়ন ১৩২৮ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়ে গানটি ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের সর্বত্র। মাঘ মাসের নারায়ণের পুনমুদ্রিত হলো সেটি। মোসলেম ভারতের ভাদ্র ১৩২৮ সংখ্যায় প্রকাশিত আরো একটি গান কুমিল্লায় রচিত। যে গানের রূপকল্প গান্ধিনেতৃত্ব হলেও, কুমিল্লাবাসীর কাছে পথে পথে গান গাওয়া নজরুলই হয়ে উঠেছিলেন যেন সে গানের স্মৃতিময় বাণী।
“এ কোন পাগল পথিক ছুটে এল বন্দিনী মার আঙিনায়।
নভেম্বরে নজরুল যখন আবার কুমিল্লায়, তখন প্রিন্স অব ওয়েলসের ভারত সফর উপলক্ষ্যে সারাদেশে হরতালের ডাক দেয়া হয়েছিল। নজরুল সেই উপলক্ষ্যে জাগরণী গানটি শুধু লিখেই দিলেন না। সুর দিয়ে শিখিয়ে কাঁধে হারমোনিয়াম নিয়ে শহরময় মিছিল পরিক্রমায় গেয়ে বেড়ালেন। গানটি দীর্ঘ আটটি স্তবকে রচিত। দুর্ভাগ্যবশত যে ঐতিহাসিক গান বহু সহস্রকণ্ঠে গীত হয়েছিল। কিন্তু সুরটি স্বরলিপিবদ্ধ হয়নি। এবং সেই সুর সংরক্ষণের চেষ্টাও করা হয়নি।
“ভিক্ষা দাও ভিক্ষা দাও ফিরে চাও ওগো পুরবাসী” । অতএব বিভিন্ন দিক আলোচনা করলে দেখা যায় যে, কুমিল্লার সাথে নজরুলের সম্পর্ক নিবিড়ভাবে জড়িত। যেখানে রয়েছে তার জীবনের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা।

