বাংলা সাহিত্য ও সংগীত–ভুবনে বিদ্রোহী কবি হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামের পরিচিতি কেবল তাঁর কাব্য থেকেই নয়, তাঁর অগ্নিমূর্তি সঙ্গীত থেকেও প্রতিষ্ঠিত। অসুন্দর, অবিচার ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তিনি নিজের জীবন ও কলমকে উৎসর্গ করেছিলেন। মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা, সত্যকে প্রতিষ্ঠার দৃঢ় সংকল্প এবং দেশমাতৃকার মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নজরুলকে পরিণত করেছিল এক অনন্য বিদ্রোহী শিল্পীতে। তাঁর গান শুধু সুররচনা নয়; তা ছিল যুগের পরিবর্তনের ডাক, নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর, সামাজিক অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলো জ্বালানোর অগ্নিশিখা। তাই বলা হয়—নজরুল বিদ্রোহী কবি শুধু কবিতায় নন, তাঁর সঙ্গীতেও।

একজন বিদ্রোহী কবি নজরুল – সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রমাণ । নজরুলের ভাবনা
নজরুলের সঙ্গীতে যে বিদ্রোহীসত্তা প্রকাশ পেয়েছে, তার ভিত্তি তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং মানবতাবাদী চেতনা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের দমননীতি, সমাজের সাম্প্রদায়িক বিভাজন, দরিদ্র মানুষের শোষণ—সবই তাঁকে তীব্রভাবে নাড়া দিয়েছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে অসহযোগ আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা আছে; প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ শক্তির জাগরণ, বিপ্লবী চেতনার উন্মেষ। তাই তাঁর সঙ্গীতে রয়েছে সাহসের আহ্বান, প্রতিবাদের উচ্চারণ এবং শাসকের বিরুদ্ধে ধ্বনিত বজ্রনিনাদ। তাঁর গান ছাত্র–যুবসমাজকে, বিপ্লবীদের, শ্রমিক–কৃষকদের, সাধারণ নিপীড়িত মানুষের হৃদয়ে জাগিয়ে তুলেছিল নতুন আশা ও শক্তি—যা সেই সময়ের রাজনৈতিক জোয়ারে এক অপ্রতিরোধ্য প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়।

নজরুলের সঙ্গীতের বিদ্রোহমূলক দিকটি বিশেষভাবে স্পষ্ট হয় তাঁর উদ্দীপনামূলক, কোরাস ও মার্চ সঙ্গীতে। এই গানগুলো রাগপ্রধান বা নন্দনতাত্ত্বিক সুর–আয়োজনে আবদ্ধ নয়; বরং এগুলো বাণীমুখী, সরাসরি হৃদয়ে আঘাত করা, উত্তেজনাপূর্ণ ও বিপ্লবী চেতনায় ভরপুর। তাঁর প্রতিটি বিদ্রোহীমূলক গান যেন সৈনিকের যুদ্ধডাক, স্বাধীনতার স্লোগান। এই গানগুলো ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় বিপুলভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল, মানুষের মাঝে জাগ্রত করেছিল সংগ্রামের অগ্নিশক্তি। বিশেষ করে “চল্ চল্ চল্”, “ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল” বা “কারার ঐ লৌহকপাট” শুধু গান নয়—এগুলো হয়ে উঠেছিল মানুষের স্বাধীনতা–চেতনার প্রধান বাহন।
নজরুলের এই গানগুলিতে বিশেষভাবে লক্ষণীয় তাঁর ছন্দ, গতি ও শব্দপ্রয়োগ। দ্রুতলয়, উত্তেজনাদায়ক ঝংকার, সংক্ষিপ্ত ও তীব্র বাক্যপ্রবাহ—এসব তাঁর সঙ্গীতকে দিয়েছে বিদ্রোহের সুর। অনেক গানেই সামরিক মার্চের ধাঁচ আছে, যা স্বাধীনতা আন্দোলনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করেছে। তাঁর গানের আহ্বান—“ভাঙ্রে শিকল ভাঙ্”, “জাগো অচেতন জাগো”, “মোরা ঝঞ্ঝার মত চল”—এসবই প্রমাণ করে যে নজরুলের সঙ্গীত ছিল এক প্রকার বিপ্লবী শক্তি, যার অভিঘাত কেবল সঙ্গীতের জগতে নয়, সমগ্র রাজনৈতিক ইতিহাসেও গভীরভাবে প্রোথিত।
এছাড়া নজরুলের দেশাত্মবোধক গানগুলিও তাঁর বিদ্রোহী মনোভাবকে উজ্জ্বল করে। দেশমাতৃকার মুক্তির আহ্বান, দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার ডাক এবং স্বাধীনতার প্রার্থনা—সবই বহন করে তাঁর বিদ্রোহী সত্তার পরিচয়। এই গানগুলোতে তিনি কখনো মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসাকে বিপ্লবের শক্তিতে রূপান্তর করেছেন, কখনো নিপীড়িত মানুষের কান্নাকে পরিণত করেছেন যুদ্ধের শঙ্খধ্বনিতে।
নিচে তাঁর কয়েকটি বিখ্যাত বিদ্রোহীমূলক গানের প্রথম পঙ্ক্তি উল্লেখ করা হলো—যা তাঁর বিপ্লবী সঙ্গীতধারার সত্যতা আরও দৃঢ় করে:
১) কারার ঐ লৌহ কপাট – বন্দিত্ব ভেঙে মুক্তির বজ্রডাক
২) এই শিকল পরা ছল – দাসত্বের প্রতারণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
৩) জয় হোক জয় হোক – জাগরণ ও বিজয়ের আহ্বান
৪) ঘর সামলেনে এই বেলা তোরা – সংগ্রামের প্রস্তুতির সতর্কতা
সব মিলিয়ে বলা যায়, কাজী নজরুল ইসলাম কেবল কবিতায় নয়—সঙ্গীতেও ছিলেন এক অগ্নিমূর্তি বিদ্রোহী। তিনি সঙ্গীতকে ব্যবহার করেছেন অস্ত্র হিসেবে, যা দিয়ে তিনি দাসত্বের অন্ধকার ভেদ করে স্বাধীনতার সূর্যোদয়কে ত্বরান্বিত করতে চেয়েছেন। তাঁর গান আজও মানুষের মনের আগুন জ্বালায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি দেয় এবং প্রমাণ করে—নজরুল সত্যিই বাংলার চিরবিদ্রোহী কবি, আর তাঁর সঙ্গীতই তার সর্বোচ্চ প্রমাণ।

